
সকাল সাড়ে সাতটায় জলপাইগুড়ি রোড স্টেশনে পৌঁছাল উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস। জলপাইগুড়ি অভয়া মঞ্চের সদস্য সুলেখক বন্ধু গৌতম গুহ রায়ের বাড়িতে আমার থাকার বন্দোবস্ত। সেখান থেকে জলপাইগুড়ি ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশনের ক্লিনিকে এসে পৌঁছালাম সাড়ে নটা নাগাদ। মেডিক্যাল টিম আরো আধ ঘণ্টা আগে, ঠিক নটায় ক্লিনিক শুরু করে দিয়েছে। সারা রাত ট্রেনের স্লিপার ক্লাসে কখনো ঘুমিয়ে কখনো না ঘুমিয়ে ডক্টর পুণ্যব্রত গুণ, ডক্টর রাহুলদেব বর্মন আর স্বাস্থ্য কর্মী কপিলদেব বর্মন জলপাইগুড়ি পৌঁছে গণমুক্তি ফৌজের তৎপরতায় নটার সময় মাসিক স্বাস্থ্য শিবির চালু করে দিয়েছেন। শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের সহায়তায় জলপাইগুড়ি ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশনের এই হেলথ ক্যাম্প চলছে গত দশ বছর ধরে।
এখানে ন্যূনতম খরচে উন্নত মানের চিকিৎসা পরিষেবা পান নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ। চিকিৎসকদের সঙ্গে দক্ষ ও সংবেদনশীল স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিষেবার মানকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেন। কম মূল্যে জেনেরিক ওষুধ, ন্যূনতম মূল্যে রক্ত ও মল মুত্র পরীক্ষা, এক্স রে, ই সি জি, ফিজিওথেরাপি, সুলভ মূল্যে বা বিনা মূল্যে চশমা, অক্সিজেন, অ্যাম্বুলেন্স, শববাহী গাড়ি প্রভৃতি নানা ধরণের পরিষেবা দেয় এই সংগঠন।
জলপাইগুড়ি ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশন তৈরি হয় ১৯৮২ সালে। আশির দশকের শুরুতে জলপাইগুড়ি শহরে কয়েকজন যুবক মানুষের জন্য কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা ও স্বাস্থ্যের অধিকার সম্পর্কে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। এঁদের মধ্যে একটি বড় অংশ ‘সত্তরের বজ্র নির্ঘোষে’ সাড়া দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিলেন প্রত্যন্ত গ্রাম, শহর ও মফস্বলের বিভিন্ন প্রান্তে, রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। সত্তরের দশকের শেষে রাষ্ট্রীয় দমন নীতি, পরাজয় আর আশাভঙ্গের যন্ত্রণা অধিকাংশ বিপ্লবী তরুণ তরুণীকেই প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে এনেছিল। কিন্তু তাদের ভিতরের আগুনকে নেভানো যায়নি। হাসপাতালের অব্যবস্থা, ওষুধের অপ্রতুলতা, প্রশাসনিক ঔদাসিন্য এবং দুর্নীতির দাপট তাঁদের ভাবিয়ে তোলে। সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন মনে করেন তাঁরা। এই ভাবেই কিছু সমমর্মী সমাজ সচেতন মানুষ এই সংগঠন গড়ে তোলেন। বিপুল সংখ্যক মানুষ রাষ্ট্রের ন্যুনতম পরিষেবাটুকুও পান না। সংবিধান অনুযায়ী বেঁচে থাকার অধিকার সমাজে সকলের সমান কিন্তু স্বাস্থ্যের অধিকার মৌলিক অধিকার হিসাবে এখনো স্বীকৃতি পায়নি। সাধারণ রোগীদের দুর্ভোগ কমানো এবং স্বাস্থ্য সমস্যার প্রতিকারের দিকনির্দেশ করাই এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য।
বিগত চার দশকের বেশি সময় ধরে, এই সংগঠন তৈরির আগে থেকেই সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবার পাশাপাশি অন্যান্য অধিকার রক্ষার লড়াই এবং বিভিন্ন গণ আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন এই সংগঠনের সদস্যরা। অনেকেই ৭০, ৮০ এবং ৯০ এর দশকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনগুলির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সোনালি চা বাগানে শ্রমিক আন্দোলন, গুমটিঘর উচ্ছেদ আন্দোলন, JWO তৈরি হবার আগে গণ ঐক্য সংগ্রাম সমিতি তৈরি করে টিবির ওষুধ বিতরণ, ব্লাড ব্যাঙ্ক গঠনের দাবিতে আন্দোলন, তিস্তার জল ক্যানেলের মাধ্যমে গঙ্গায় প্রবাহিত করার অন্যায় প্রকল্প এবং সুন্দরবন ফার্টিলাইজার নামে রাসায়নিক সার কোম্পানির বিরুদ্ধে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন, ৮০র দশকে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের পাশে থাকা- জলপাইগুড়ি ওয়েলফেয়ার এর ইতিহাসে বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।
ছত্তিশগড়ের অবিসংবাদিত শ্রমিক নেতা শঙ্কর গুহ নিয়োগীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল সংগঠকদের। পৈতৃক বাড়ি জলপাইগুড়ি হবার সুবাদে নিয়োগীর যাতায়াত ছিল এই অঞ্চলে। এখানে যুক্তিসঙ্গত চিন্তার বিকাশে সায়েন্স ক্লাব গড়ে তোলায় তাঁর অবদান ছিল। সংঘর্ষ এবং নির্মাণের তত্ত্ব গভীর ভাবে প্রভাবিত করে সংগঠকদের।
১৯৮২ সালে কেরানি পাড়ার একটি ছোট গুমটি ঘরে JWO (Jalpaiguri Welfare Organisation) কাজ শুরু করে। পরে ক্লাব রোডে উত্তরা ক্লাবের নিচের তলায় চলে আসে এই সংগঠনের অফিস। এখানে আগে একটি সংস্কৃত টোল চলত যেটা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। টোল-এর ট্রাস্টি বোর্ড পরবর্তী কালে বাড়িটি সংগঠনকে দিয়ে দেয়।
প্রাথমিক ভাবে দুঃস্থ টিবি রোগীর সহায়তা করা এই সংগঠনের অন্যতম কাজ ছিল। স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে ক্যান্সার নির্ণয় কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। পরিকাঠামো এবং অর্থের অভাবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। দুজন খ্যাতনামা ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডক্টর প্রভাত ব্যানার্জি এবং ডক্টর চন্দন চক্রবর্তী দীর্ঘদিন জলপাইগুড়ি ওয়েলফেয়ার হেলথ ক্যাম্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখানে যখন ক্যান্সার ক্লিনিক শুরু হয়, উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে তখনো অঙ্কোলজি বিভাগ চালু হয়নি।
১৯৯২ সাল থেকে জলপাইগুড়ি ওয়েলফেয়ার এর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীদের স্বল্প মূল্যে ঔষধ সরবরাহের জন্য জেনেরিক ড্রাগ সেন্টার চালু হয়। ওষুধ কোম্পানিগুলি ঝাঁ চকচকে মোড়কের ব্যবস্থা করে এবং ওষুধ ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে যারা যুক্ত তাদের নানা ভাবে প্রলোভন দেখিয়ে অযথা মূল্যবৃদ্ধি করে চলেছে। কোম্পানির দেওয়া নামে নয়, জেনেরিক নামের ওষুধ সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে স্বল্পমূল্যে এবং বিশেষ ক্ষেত্রে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করে জলপাইগুড়ি ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশন। Community Development Medicine Unit (CDMU) থেকে স্বল্পমূল্যে ওষুধ কিনে সংগঠন চালানোর লভ্যাংশ রেখেও বাজারের চেয়ে অনেক কম দামে সাধারণ মানুষের কাছে ওষুধ পৌঁছে দিচ্ছে এই সংগঠন। জেলায় সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে স্বল্প মূল্যে ওষুধ সরবরাহের বহু আগেই JWO এই পরিষেবা চালু করে। পরিমিত লাভ রেখেও স্বল্পমূল্যে ওষুধ সরবরাহ করার মডেলটিকেই কার্যত অনুসরণ করেছে সরকার তাদের ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকানগুলিতে।
নেশা এবং মানসিক রোগের নিরাময়ের জন্য কাউন্সেলিং সেন্টার চলে জলপাইগুড়ি ওয়েলফেয়ার এর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। ক্লিনিক ছাড়াও সপ্তাহে সোম থেকে শনি প্রতিদিন বিনামূল্যে রক্তচাপ এবং দৈহিক ওজন মাপা হয়।
প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন, নারী অধিকার রক্ষা, পরিবেশ রক্ষা, শিক্ষার অধিকার এবং সকলের জন্য স্বাস্থ্যের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংগঠিত করে বা সহমতের ভিত্তিতে আন্দোলনে অংশ নেয় এই সংগঠন। বহু বছর ধরে এই সংগঠন শিশু পাচার এবং নারী পাচারের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভাবে কাজ করেছে এবং সদস্যরা উদ্ধার ও পুনর্বাসনের কাজে এগিয়ে এসেছেন। সরকারি চাইল্ড লাইন চালু হবার আগে জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি অঞ্চলে JWO-ই চাইল্ড লাইন এর কাজ করত। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ পৌঁছানো, বুক ব্যাঙ্ক আর স্টাডি সেন্টার তৈরি করা এই ধরণের বিভিন্ন সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে এই সংগঠন।
১৯৮৭ বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষাদান এবং বিশেষ পরিষেবার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে একটি বিশেষ শিক্ষা কেন্দ্র তৈরি হয়। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের অভিভাবকদের নিয়ে একটি ফোরাম তৈরি করা হয়। প্রধান শিক্ষিকা স্বাতী মিত্র মজুমদার এবং অন্যান্য শিক্ষিকা ও শিক্ষা কর্মীরা অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এই শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার।
২০২৪ এর অগাস্টে অভয়া আন্দোলন শুরু হলে জলপাইগুড়িতে এই আন্দোলনের প্রসারে JWO উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। জলপাইগুড়ি অভয়া মঞ্চ তৈরি হয়। JWO র অনেক সদস্যই জলপাইগুড়ি অভয়া মঞ্চের সক্রিয় সদস্য। গত ১১ জুন জলপাইগুড়ি মঞ্চের পক্ষ থেকে নারী সুরক্ষা সম্পর্কে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রস্তাব (স্থানীয় সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে জেলা মহিলা কমিশন এবং ভিজিল্যান্স কমিটি গঠন, নাইট বাসে প্রহরা, রাস্তায় পর্যাপ্ত আলো প্রভৃতি) নিয়ে জেলাশাসকের অফিসে Social Welfare Officer শ্রদ্ধা সুব্বার কাছে ডেপুটেশন জমা দেয় যে প্রতিনিধি দল, সেই দলেও উপস্থিত ছিলেন জলপাইগুড়ি ওয়েলফেয়ার এর সদস্যরা।


জলপাইগুড়িতে দু দিনের হেলথ ক্যাম্প শেষ করে শ্রমজীবীর টিম পৌঁছায় কোচবিহারের মাথাভাঙ্গায়। মাথাভাঙ্গায় ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির উদ্যোগে মাসিক স্বাস্থ্য শিবির চলে। 


গত ১৩ জুন কোচবিহারের ঘোকশাডাঙ্গা গ্রামে কৃতী ছাত্রছাত্রী এবং সমাজকর্মীদের পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে যাবার সুযোগ হয়েছিল। পরিবেশ আন্দোলনের নিরলস কর্মী হিসাবে বরুণ সাহা এই অনুষ্ঠানে পুরস্কৃত হন। এখানে অভয়া আন্দোলন নিয়ে গ্রামের মানুষের অদম্য আগ্রহ আমাদের উজ্জীবিত করে। ।
নতুন সমাজ খুব কাছে নয়। যেতে হবে বহুদূর। তবু জলপাইগুড়ি আর মাথাভাঙ্গার ক্লিনিকে, ঘোকসাডাঙ্গা থেকে ক্লিনিকে ফেরার পথে মনে হচ্ছিল শোষণমুক্ত সমাজের জন্য এই নিরলস স্বপ্ন দেখা আর স্বপ্নের অনুসরণ একদিন সার্থক হবে।
“এ গানের শেষেই আছে ভোরের আকাশ
এক ঝাঁক ইচ্ছেডানা /যাদের আজ উড়তে মানা/
মিলবেই তাদের অবাধ স্বাধীনতা” ।।













