মাথাভাঙ্গার মাসিক স্বাস্থ্য শিবির শেষ করে শ্রমজীবীর টিম রওয়ানা হল মাথাভাঙ্গা স্টেশনের দিকে। আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে’ রাঙা হয়ে উঠেছে পশ্চিমাকাশ। রাস্তার দু ধারে ঘন সবুজের আস্তরণে অস্তরাগের রক্তিমাভা- লাল সবুজের আলিঙ্গন। ‘ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার পতাকার রঙ লাল সবুজ। রঙিন প্রকৃতি যেন বিদায় সম্ভাষণ জানায় ছত্তিশগড়ের আদর্শে গড়ে ওঠা শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের প্রতিনিধিদের। শ্রমিক কৃষক মৈত্রীর পতাকাকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ।
শিলিগুড়িতে রাত কাটিয়ে পরের দিন ভোরে কার্শিয়ং এর উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। মার্গারেটস হোপ আর রিংটং চা বাগানের মাঝে ফোরপোলে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের স্বাস্থ্য ক্লিনিক। শেয়ারের গাড়িতে গোরাবাড়ি। গোরাবাড়িতে গাড়ি নিয়ে হাজির ছিলেন সংগ্রামের সাথি শৈলেশ ছেত্রী। সরু পাহাড়ি পথে গাড়ি চলেছে মেঘ পিওনের দেশে। “মেঘ পিওনের ব্যাগে এবার মন খারাপের দিস্তা/সেই মন খারাপের স্রোতের টানে চলছে বয়ে তিস্তা”
মেঘপাহাড়ের টানে বারো মাস পর্যটকের আগমন। চা রপ্তানি আর পর্যটনে সরকারের বিপুল আয়। বিদেশি মুদ্রার হাতছানি। কিন্তু এই স্বপ্নলোকের মানুষরা কেউ ভাল নেই। উদয়াস্ত কঠিন পরিশ্রম করে যারা সরকারি ভাণ্ডার ভরছেন বিদেশি টাকায়, তাঁদের সামান্য হকের টাকা আদায় করতে অনশনে বসতে হয়, কখনো প্রাণ দিতে হয় পুলিশের গুলিতে। একদিকে প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম, চড়া দামে অত্যাবশ্যক পণ্য কিনে দৈনন্দিন জীবনধারণের সংগ্রাম, অন্য দিকে মালিকের সঙ্গে গ্রাসাচ্ছাদনের সম্বল আদায়ের লড়াই। চা বাগানের শ্রমিকদের শুধু কাজ নয়, সমগ্র জীবনযাপনের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে মালিকের। কারণ শ্রমিকের বাসস্থান, স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মস্থান- সব কিছু মালিকরাই তৈরি করে দেয়।
“In the plantation, to a greater extent than in the factory, the management exercise direct control over the labourers not only at work but also outside work…this created condition for the paternalism characteristic of the plantation system…As such, it was far more oppressive in nature than the paternalism characteristic of the traditional village community” (Andre Beteille, Forward to the book ‘Class Formation in the Plantation System’ by Sarit Bhowmik)
২০১৬ র শেষের দিকে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে তিনধারিয়া, মার্গারেটস হোপ আর রিংটং চা বাগানে সবার জন্য স্বাস্থ্য আন্দোলনের প্রচারে আসে। চা বাগানের হাসপাতালে পরিষেবার মান খারাপ। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। ক্লিনিক তৈরির পরিকল্পনা তখন থেকেই, কিন্তু বাস্তবায়িত করা যায়নি নানা কারণে। বিগত কয়েক বছর ধরে লালিগুরাস পত্রিকাগোষ্ঠীর কিছু সংগঠক পাহাড় এবং ডুয়ার্সের চা বাগানে কাজ করছেন। ২০১৭ সাল থেকে ডক্টর রাহুলদেব বর্মন এই চা বাগানে হেলথ ক্যাম্প শুরু করেন। লালিগুরাস (রডোডেনড্রন এর নেপালি নাম) পত্রিকা, হিল প্ল্যান্টেশন এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (HPEU) এবং শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের সহায়তায় চলত এই ক্যাম্প। বছরে একবার দুবারের বেশি ক্যাম্প করা সম্ভব হত না। নিয়মিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু করা যায়নি। ২০২৫ এর ৬ জুলাই থেকে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ ফোরপোলে মার্গারেটস হোপ আর রিংটং চা বাগানে মাসে দুবার ক্লিনিক চালু করে।

সাইরেন বাজার আগে পোঁছাতে না পারা, বাগান থেকে তুলে আনা পাতার ওজন দেখতে চাওয়া বা অন্যান্য নানা অজুহাতে শ্রমিকরা দৈহিক নির্যাতনের শিকার হতেন।
ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতা চা বাগানের শ্রমিকদের কাছে কোন নতুন মুক্তির আশ্বাস নিয়ে আসেনি। রাষ্ট্রের মিত্রস্থানীয় দেশি মালিকরা বিদেশি মালিকদের মতই শোষণ চালাত। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় এক দশক পরও চা শ্রমিকরা ঔপনিবেশিক নিয়মের অধীনেই ছিল।
১৯৫২/৫৩ সালে কুখ্যাত ‘হাত্তাবাহার’ প্রথা বাতিল (সামান্য ভুলের জন্যও ম্যানেজমেন্ট চাইলে কোনো শ্রমিককে ছাঁটাই করতে পারত এবং সেই চাকরিহারা ব্যক্তি পাহাড়ে বা ডুয়ার্সে আর কোনো বাগানে কাজ পেত না) এবং আরো কিছু দাবি নিয়ে বন্ধ চা বাগানের তিরিশ হাজারের বেশি শ্রমিক শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলেন। বিরপাড়া চা বাগানে গুলি চলে, যদিও কেউ হতাহত হয়নি। আন্দোলনের চাপে বোনাস, মাতৃত্ব কালীন ছুটি ইত্যাদি বেশ কিছু দাবি মানতে বাধ্য হয় মালিক পক্ষ। কিন্তু এই দাবি আদায় স্থায়ী হয় না। শ্রমিক আন্দোলন স্তিমিত হলেই মালিক পক্ষ বঞ্চনা আর নির্যাতনের পাল্লা ভারি করতে থাকে।
৭১ বছর আগে ১৯৫৫ সালে মার্গারেটস হোপ বাগানে এক ঐতিহাসিক আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে ছয়জন শ্রমিক মারা যান। জিতমান তামাং, কালে লিম্বু, ইচ্ছা সানোয়ার,অমৃত কামিনি, মৌলীশোভা রাইনি এবং পদমলাল কামি পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। ১৪ বছরের কালে লিম্বু গাছের মাথায় চড়ে মিছিল দেখছিল। সেখানেই গুলিবিদ্ধ হয়। মৌলিসোভা রাই গর্ভবতী ছিলেন। স্বাধীন ভারতে চা বাগানে পুলিশি গুলিচালনার প্রথম শহিদ এই ছয় জন শ্রমিক। প্রায় ২৪০ জন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়। নেপালি কবি আগম সিং গিরিকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
এই আন্দোলনে এক বাঙালি ডাক্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই আন্দোলন শুধু বাগানের শ্রমিক অধিকারের ইতিহাসই নয়, পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট আন্দোলনের গতিপথেও এক নাটকীয় পরিবর্তন আনে। ডা. অবনী রঞ্জন তলাপাত্র ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। তিনি ‘গরিবের ডাক্তার’ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন।
শ্রমিকদের জুতো, হাতঘড়ি, ফুলপ্যান্ট, ছাতা ব্যবহার করতে দেওয়া হতো না। এগুলো ছিল কেবল অফিসারদের জন্য। বৃষ্টির দিনে শ্রমিকরা বাঁশের ডগায় পাতা লাগানো হস্তনির্মিত ছাতা ব্যবহার করত, যাকে বলা হত ‘ঘুম’। আধপ্যান্ট পরে গুল্মের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে তাদের চামড়ায় ঘা হয়ে যেত। ডা. তলাপাত্র আইডিন মিশ্রিত জল রাখার একটি ট্যাংক তৈরি করেছিলেন যাতে শ্রমিকরা কাজ শেষে পা ধুতে পারত এবং সংক্রমণ থেকে বাঁচতে পারত। সন্ধ্যায় তিনি শ্রমিকদের ঝুপড়ি-ঘরে গিয়ে চিকিৎসা করতেন – এতে ম্যানেজমেন্ট সন্দেহ করত না। তবে তিনি শুধু চিকিৎসা করতেন না, শ্রমিকদের মধ্যে অধিকার সচেতনতা জাগানোর চেষ্টা করতেন। এতে ধীরে ধীরে শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হয় এবং বাগান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৯৫৫ সালে এআইজিএল-এর শ্রমিক সংগঠন ও সিপিআই এর মজদুর ইউনিয়ন ৮ই মে ১৪ দফা দাবি সম্বলিত একটি চার্টার প্ল্যান্টার ও সরকারের কাছে জমা দেয়। গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলির মধ্যে ছিল –
- হাত্তাবাহার প্রথা তুলে দেওয়া
- শ্রমিকদের ৩ মাসের মজুরি ও বোনাস দেওয়া
- দার্জিলিং চা শ্রমিকদের মজুরি ডুয়ার্স শ্রমিকদের সমান করা (১ টাকা ১১ আনা)
- অফিস স্টাফের সংখ্যা বাড়ানো
- মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা করা
- ১৯৫২-৫৩ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া বাগানের শ্রমিকদের জন্য অনুদানের ব্যবস্থা করা
এই দাবিগুলো আগে থেকেই ১৯৪৬ সালে সি পি আই প্রার্থী রতনলাল ব্রাহ্মণের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল। রতনলাল ব্রাহ্মণ, ডা. তলাপাত্র ও নদিয়ার আরেক কমিউনিস্ট নেতা সুশীল চ্যাটার্জি আন্দোলন গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। এরপর স্থানীয় সংগঠকেরা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন – হরিলাল সারদার, সমানে সারদার, রামজিত রাই, শৈলা তামাং প্রমুখ।
একসময় সিপিআই ও গোরখা লীগের নেতৃত্বে ধর্মঘট ডাকা হয়। কিন্তু সরকার ইউনিয়ন নেতাদের গ্রেপ্তার করা শুরু করে। ২৫শে জুন ১৯৫৫ সালে শ্রমিকরা মার্গারেটস হোপে জড়ো হয়। খবর আসে যে নিকটবর্তী বেল্টার বাগানে পুলিশ শ্রমিকদের জোর করে কাজে পাঠাচ্ছে। শ্রমিকরা বেল্টারের দিকে মিছিল শুরু করে। সেই সময় ম্যানেজারের নির্দেশে পুলিশ গুলি চালায়। ছয়জন শ্রমিক শহীদ হন।
এই নৃশংসতার ফলে পাহাড়-ডুয়ার্সের শ্রমিকরা ও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। প্রবল জনমতের চাপে সরকার ২৭শে জুন সমস্ত দাবি মেনে নেয় – বোনাস এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রদান ও হাত্তাবাহার প্রথা বাতিল।
১৯৫৫ সালের আন্দোলন চা শ্রমিকদের জীবনে ও অধিকারের ইতিহাসে এক জলবিভাজিকা। শ্রমিকদের যৌথ শক্তি জয়লাভ করেছিল এবং আজও এটি ভারতের সংগ্রামী মানুষদের অনুপ্রেরণা যোগায়।
শত সহস্র শ্রমিকের রক্তে ঘামে অর্জিত অধিকার বার বার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে মালিকের খেয়াল খুশিতে। এত লড়াই এর পর শ্রমিকের হাজিরা বেতন মাত্র ২৫০ টাকা। যারা একসময় আন্দোলন সংগঠিত করেছিল তারা ক্ষমতায় গিয়ে শিবির বদল করে ফেলল। শ্রমিকের বদলে মালিকের বন্ধু হয়ে উঠল সরকার। চা বাগান যে তিমিরে সে তিমিরেই।
তাই ২০২৬ সালেও লং ভিউ চা বাগানের শ্রমিকদের অনশনে বসতে হয় ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য। বছরের পর বছর ধরে শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং গ্র্যাচুইটি বাবদ বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে পাওনা মেটাতে অস্বীকার করছে মালিক পক্ষ।

১৬ জুন ৭২ ঘণ্টা রিলে অনশনের প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে ১৬ তারিখ সকাল ১১ টা থেকে অনশনে বসেছেন HPEU এর সেন্ট্রাল কমিটির জয়েন্ট সেক্রেটারি চিউয়াং ইয়নজোন, কোষাধ্যক্ষ এবং উকিল অনুপা তামাং এর সঙ্গে তিন জন শ্রমিক- লং ভিউ ইউনিট সেক্রেটারি তনুজা লামা, লাবিন বিশ্বকর্মা এবং দেবিকা ইয়নজোন। এখনো পর্যন্ত মালিক গোবিন্দ গর্গ এবং সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার কোন প্রস্তাব আসেনি। কোন সংবাদ মাধ্যম বা মিডিয়া চ্যানেলে এই খবর আসেনি। প্রচার মাধ্যম এখন সরকারের নির্দেশে অনুপ্রবেশ, অবৈধ নির্মাণ আর হকার উচ্ছেদ নিয়ে চিন্তিত, পুশ ব্যাক আর বুলডোজারের মাহাত্ম্যে মুগ্ধ!
প্রচারের আলো থেকে বহু দূরে থেকেও চা বাগানের লড়াই চলছে। মুক্তির জন্য অবিরাম সংগ্রাম চলবে। ঠিক যেমন চলবে সকলের জন্য স্বাস্থ্য আর শোষণমুক্ত সমাজের দাবিতে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের সংগ্রাম –
“জীবনের জন্য ভালোবাসার জন্য
আমাদের এ গান গাওয়া
সূর্যমুখী মানুষ সূর্য সন্ধানে সূর্য অভিযানে যাওয়া”
কৃতজ্ঞতা
ডক্টর পুণ্যব্রত গুণ, ডক্টর রাহুলদেব বর্মন, অমল রায়, অজিত বন্ধু ধর, বাচ্চু পাণ্ডে, সঞ্জয় চক্রবর্তী, গৌতম গুহ রায়, কমল কৃষ্ণ ব্যানার্জি, বরুণ সাহা, তন্ময় চক্রবর্তী, কপিলদেব বর্মন, অধ্যাপক কাঞ্চন সরকার, রূপম দেব এবং সালিম সুব্বা।













