(এক)
বাস্তব ঘটনাই সবচেয়ে ভালো শিক্ষক। অসংখ্য লেখালেখি বা বক্তৃতা যা বোঝাতে পারে না, চোখের সামনে ঘটতে থাকা ঘটনাবলী তা অতি অল্প সময়েই বুঝিয়ে দেয়।
১৯৯৮ সালে কিছু নিকৃষ্ট কংগ্রেসী, কয়েকজন হতাশ ‘বিপ্লবী’, কয়েক পিস অসৎ ‘বামপন্থী’ (সিপিআইএম, ফরোয়ার্ড ব্লক ইত্যাদি থেকে বহিষ্কৃত), কিছু সুবিধাবাদী আমলা, ধান্দাবাজ ‘বুদ্ধিজীবী’ আর অত্যাচারী পুলিশ। এইসব সামাজিক জঞ্জাল মিলে একটা আদর্শহীন নীতিহীন জটলা তৈরি করেছিলো। ‘তৃণমূল কংগ্রেস’। এদের জোট বাঁধার পিছনে, অত্যন্ত দূরদর্শীর মতো, নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে প্রত্যক্ষ আশীর্বাদ ও সহযোগিতা জুটিয়েছিলো আরএসএস-বিজেপি।
তৃণমূলীরাও তার যথাযোগ্য প্রতিদান দিয়েছে বিজেপি-কে। বছরের পর বছর বিজেপির ইউনিয়ন সরকারে পূর্ণ মন্ত্রিত্ব করেছে; ভোটে বিজেপির হাত ধরে পশ্চিমবাংলায় নিয়ে এসেছে তাদের; লোকসভায় বারবার ভোটাভুটির সময়ে বিজেপিকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে; “ভালো আরএসএস” তত্ত্ব হাজির করেছে; ইত্যাদি।
পরবর্তীকালে অকল্পনীয় চুরি ছ্যাঁচড়ামি জালিয়াতি লাম্পট্য ইত্যাদির ফলে ‘তৃণমূল কংগ্রেস’-এর রাজনীতিহীন ধান্দাবাজির আসল চরিত্র পরিস্কার হয়ে যায় জনগণের সামনে; ফলে ২০২৬-এর ভোটে তাদের অভাবনীয় ভরাডুবি ঘটে। আরএসএস-বিজেপি’র কাছে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রয়োজন ফুরালো; তারা হয়ে পড়লো অপ্রয়োজনীয়।
কিন্তু যেসব সামাজিক জঞ্জাল একজোট হয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সবরকম অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিল বছরের পর বছর, তাদের পিঠ বাঁচানো খুবই জরুরি হয়ে উঠলো। ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের আমলে, বিজেপি স্বাভাবিকভাবে হয়ে উঠলো বাজারের সেরা ‘ওয়াশিং মেশিন’। সব জঞ্জাল তাই দলবদ্ধভাবে ‘এনডিএ’-তে ঢুকছে। যেহেতু এই মুহূর্তে বিজেপি সরাসরি তাদের দলে নিতে রাজি না। ‘সবুরে মেওয়া ফলে’!
বহুকাল যাবত বহুজনে বহুসময়ে একথা বারবার বলেছেন যে, ‘সংসদীয়’ সার্কাসের পথে দেশের কোনও মৌলিক সমস্যার সমাধান হতেই পারে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বলেছিলেন “পার্লামেন্টীয় রাজনীতির পুতুল খেলা।” কিন্তু ভোটুরে দলগুলো এই সত্যকে সবসময়েই অস্বীকার করে। আর সাধারণ মানুষকে সচেতনভাবেই সংসদীয় মিথ্যাচারের গোলকধাঁধায় ঘুরিয়ে মারে। এই মুহূর্তে পশ্চিমবাংলার ঘটনাবলী এব্যাপারে চমৎকার শিক্ষা হাজির করছে আমাদের সামনে।
(দুই)
যাঁরা প্রতি মুহূর্তে ‘আইনের শাসন’-কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মর্জিমাফিক ‘শাসকের আইন’ চালিয়ে পশ্চিমবাংলাকে নরক করে তুলেছিলেন ১৫ বছর ধরে, তাঁরা এবারে ‘আইনকে মান্যতা’ দেবার নাটক শুরু করেছেন! বিধানসভা ও লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের পাল্টিরামদের ছ্যাবলামো নিয়ে চলছে আইনি কচকচানি। একই সঙ্গে চলছে কাউকে গ্রেপ্তার, কারও বিরুদ্ধে সমন জারি, কারও নামে ‘লুক আউট নোটিশ’ জারি, ইত্যাদি। কিন্তু শাসক গোষ্ঠীর কেষ্টবিষ্টু্রা জালিয়াতি করে যে শতশত হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়েছেন, তা উদ্ধারের কোনও সম্ভাবনা অবশ্য এখনও দেখা যাচ্ছে না! তবে, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “মোকদ্দমার যুযুৎসু খেলা” বেশ জমে উঠেছে বলা চলে!
চুরি-ছ্যাঁচড়ামি-জালিয়াতি-লাম্পট্যের পাপচক্র যাঁদের সরাসরি মদত ছাড়া কিছুতেই চলতে পারতো না, তাঁরা এখন ‘যুধিষ্ঠির’/’গান্ধারী’ সাজার মরিয়া চেষ্টা শুরু করেছেন! নাহলে কাদের যে হাজত বাস হয়, বলা মুশকিল! কার মাথায় পচা ডিম, পচা টমেটো, গোবর এসে পড়ে, তা-ও বলা সম্ভব না। বাঁচার একটা মোক্ষম রাস্তা হলো ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারে ভিড়ে যাওয়া; তাদের মাতব্বর হয়ে ওঠা। তাহলে আপাতত নিশ্চিন্ত। পরের কথা পরে ভাবা যাবে! তবে সবার পক্ষে সে সুযোগ পাওয়া অবশ্যই মুশকিলের। নিজেদের পিঠের চামড়া বাঁচানোর চেষ্টায় খুবই কম্পিটিশন চলছে!
(তিন)
পশ্চিমবাংলায় সবসময়েই কোনও না কোনও ‘নির্বাচিত’ সরকার ক্ষমতায় থাকে। কিন্তু সব সরকারের আমলেই ভোটদাতা সাধারণ মেহনতী জনগণের উপর দমন-পীড়ন-জেল-হত্যা ঘটেই। কংগ্রেস, ‘বাম’, তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি, কোনও আমলেই ব্যতিক্রম হয় না। তবে সমাজটাকে শোষণে-শোষণে দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত করে রাখে যে শোষকশ্রেণী, তাদের একজনেরও কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি কোনও শাসক। ১৯৪৭ থেকে ২০২৬, একই ইতিহাস।
ভোটুরে রাজনীতির এটাই বর্ণপরিচয়। নেতৃত্বের বাতেলা একরকম, আর বাস্তবে তাদের কাজ ঠিক তার উল্টো। ফলে এ দলের জায়গায় ও দল; সরকারের পর সরকার আসে যায়। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের জীবন যন্ত্রণা একই থাকে। ‘অহিংসা’-র বদলে সহিংসতা; ‘শ্রমিকের স্বার্থ’-র জায়গায় পুঁজিপতিদের স্বার্থ; ‘সততা’-র জায়গায় জালিয়াতি; ‘সব কা সাথ’-এর নামে ‘সব কা বিনাশ’। এ-ই হলো ভোটুরে সার্কাসের ট্রাপিজের খেলা!
পশ্চিমবাংলায় এখন ভোটুরে সার্কাসের যে পর্ব চলছে, তা-ও নিঃসন্দেহেই চিত্তাকর্ষক! কারা যে কাদের মাথায় কাঁঠাল ভাঙে, কে যে কাদের পায়ে কখন ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিছুরই ঠিক ঠিকানা নেই।
(চার)
এখানে নতুন বিজেপি সরকারের এখন অগ্নিপরীক্ষা।
কলকাতায় সরকারি আরজি কর হাসপাতালের মধ্যে চিকিৎসক ‘অভয়া’-র ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় জড়িত সব চিকিৎসক, মন্ত্রী, পুলিশ, আমলা, রাজনৈতিক নেতা ইত্যাদিদের যথোপযুক্ত শাস্তি হয় কিনা, সেটাই দেখার। প্রশাসনিকভাবে সংগঠিত এই ঘৃণ্যতম অপরাধ সম্পর্কে নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি মানুষ দেখতে চায়। ২০১৩-র কামদুনি, ২০২২ সালে হাঁসখালি… প্রতিটি ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডে দোষীদের চরমতম শাস্তিরও অপেক্ষায় আছে রাজ্যবাসী। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রীর কদর্য মন্তব্যেরও সুবিচার চায় মানুষ।
দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।।










