সাধারণ মানুষের জীবনের দাম নেই। যেমন দাম নেই ওয়াও মোমো কারখানায় জীবন্ত দগ্ধ হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের জীবনের, দাম নেই ছেলের চিকিৎসা করাতে এসে সরকারি হাসপাতালের বন্ধ লিফটে আটকে মৃত আমাদের সহ নাগরিকের জীবনের।
এবং এ মুহূর্তে ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ না করলে ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না এই ধারণাই যেহেতু ট্রেন্ডিং ফলে ধরে নেওয়া যায় সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায় বিচার ও নেই।
আর জি কর হাসপাতাল, ট্রমা কেয়ার বিল্ডিং। নিজের ছেলেকে চিকিৎসা করাতে দেখাতে এসে লিফটে বন্ধ হয়ে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হল বাবার, আমাদের একজন সহ নাগরিকের। দেড় ঘন্টা আটকে ছিলেন, তারপরেও লিফট ম্যানের দেখা মেলে নি, অপারেটর কে ফোনে পাওয়া যায়নি। আমরা যারা সরকারি হাসপাতালে কাজ করি তাদের এই অভিজ্ঞতা নতুন নয়। লিফট আটকে যাওয়া, কোনো ইমার্জেন্সী রেসপন্স না পাওয়া, এমনকি দমকলের গাড়ি এসে লিফটের দরজা খুলে উদ্ধারের ঘটনাও অতীতে ঘটেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল মানুষের টনক নড়তে মৃত্যু প্রয়োজন, সরকারের অপদার্থতা অকর্মন্যতার প্রমাণ সামনে আসতে হলে সাধারণ মানুষের অসহায়ের মতো মৃত্যু প্রয়োজন, এবং বারংবার প্রয়োজন কারণ আমাদের স্মৃতিশক্তি ক্ষণস্থায়ী, আমরা রাগ, ক্ষোভ বিষয়ান্তরে পাল্টে যায় অহরহ।
অভয়া আন্দোলনের দাবি গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সরকারি স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের পরিকাঠামোর উন্নতি, স্বাস্থ্যকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী সহ হাসপাতাল চালাতে যে যে জায়গায় লোকবল প্রয়োজন সেখানে নিয়োগ এর দাবি।
কেন এই কথা গুলো বলা? কারণ হাসপাতাল গুলোতে বেশির ভাগ জায়গায় কোনো লিফটম্যান নেই, কারণ নিয়োগ নেই। যেখানে আছে সেখানে বেসরকারি কোম্পানির সাথে চুক্তিভিত্তিক অত্যন্ত স্বল্প মাইনের কর্মচারী যার দায়িত্বে হয়তো একসাথে চার পাঁচটা লিফ্ট সামলানোর দায়িত্ব। আজ এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে এই বিষয় গুলো সামনে আসছে, কাল অন্য কোনো একটা বিপর্যয় অন্য পরিকাঠামোর অভাব গুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবে।
বারবার চিৎকার করে বলা, সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো নিয়ে। উল্টোদিকে প্রতিশ্রুতির বন্যা, সব হয়ে গেছে, সব হয়ে যাবে। সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে রাজ্য সরকার জানালো নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ৯০% কাজ হয়ে গেছে, সে প্রায় বছর দেড়েক আগে। কী হয়ে গেছে আর কী হওয়া বাকি আছে তার হিসেব সবার চোখের সামনেই স্পষ্ট। কখনো বা ভেসে এসেছে তির্যক বাক্যবাণ, এই দাবি গুলো নাকি ‘নিজেদের স্বার্থের দাবি’। একটা হাসপাতালে পরিকাঠামোর দাবি, পর্যাপ্ত নিয়োগের দাবি, নিরাপত্তার দাবি আসলে রোগী ও রোগী পরিজনদের স্বার্থে তোলা দাবি তা মেনে নিতেও শাসক বা শাসক হতে চাওয়া দল গুলোর সেকি সমস্যা!
আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য এই ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, পরিকাঠামোগত দুর্বলতা এবং তদারকির চরম ব্যর্থতার ফল। একই সঙ্গে অন্যান্য সরকারি হাসপাতালেও নিরাপত্তা ও যন্ত্রপাতি সংক্রান্ত সমস্যাগুলি ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে, কলকাতা মেডিকেল কলেজে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সংক্রান্ত ভয়ানক অভিযোগ উঠেছে। দামী বিদেশী যন্ত্রে নিম্নমানের সরঞ্জাম বসিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করার অভিযোগ এনেছেন বিভাগীয় প্রধান রাই, তার নাকি আবার তদন্ত(!) শুরু হয়েছে, আবার অন্যদিকে একই দিনে এস.এস.কে.এম হাসপাতালে এক সাফাই কর্মীর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের মতো ঘটনা.. গোটা রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা গভীর সংকটের মধ্যে আছে তারই প্রমাণ!
ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টের পক্ষ থেকে আমরা স্পষ্টভাবে জানাচ্ছি, এই মৃত্যুর দায় এড়ানোর কোনও সুযোগ নেই। স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য ভবনের এসি ঘরে বসে থাকা কর্তাব্যক্তিরা সহ স্বাস্থ্যমন্ত্রকের ভূমিকা এই দুর্ঘটনার পিছনে রয়েছে!
এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির পাশাপাশি আমাদের দাবি এখনই সমস্ত সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ অডিট শুরু করতে হবে ও প্রকাশ্যে আনতে হবে। লিফট সহ প্রতিটি জরুরি ব্যবস্থার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত টেকনিক্যাল স্টাফ, লিফট অপারেটর এবং সাপোর্ট স্টাফ নিয়োগ করতে হবে। উন্নতমানের যন্ত্রপাতি কেনা এবং তার স্বচ্ছ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা ও পরিকাঠামোগত উন্নতির যে দাবি আমরা অভয়া আন্দোলনের শুরু থেকে করে আসছি খাতায় কলমে সেসব দাবি পূরণের প্রহসন না করে বাস্তব রূপায়ণ করতে হবে।
প্রতিটি প্রাণহানির পর দায় অস্বীকারের চিরাচরিত যে রাজনীতি প্রশাসন তথা সরকারের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে তার উল্টোদিকে শক্তিশালী নাগরিক স্বরকে সোচ্চার হতে হবে। সাধারণ গণমানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই গড়ে তুলতে হবে।
#wbjdf #WestBengal #health










