কলেজে পড়ার সময়ে একদিন বিকেলে রবীন্দ্রসদন মেট্রো স্টেশনের কাছে এলগিন রোডের গা ঘেঁষে জনৈক লক্ষ্মী বাবুর আসলি সোনা চাঁদির দোকানের পাশ দিয়ে একটা সরু গলির পেট চিরে একটা আধা আলো আধা অন্ধকার ঘরে জীবনে প্রথম মোমো-র স্বাদ পেয়েছিলাম। মেডিক্যাল কলেজের সিনিঅর দাদা ইয়ার্কি মেরে বলেছিলেন, আরে এটা হলো তিব্বতি সিঙাড়া! সঙ্গে একবাটি গরম স্যুপ আর ঝালঝাল সস্ দিয়েছিল।আর সেদিন উত্তর কলকাতার বাঙলা মাধ্যমের ছেলে আমি, আমার অনভ্যস্ত হাতের কাঁটাচামচ থেকে ছিটকে এসে সস্ লেগেছিল জামায়। অনেক কেচেও সেই দাগটা পুরোপুরি যায়নি।এর পর থেকে মোমো-র সঙ্গে সস্ খাই না।দাগ লেগে যাবে, এই ভয়ে।
এখন মহানগরীর রাস্তায় ফুটপাতে অলিতে গলিতে মোমো পাওয়া যায়, হরেক রকমের। সেখানে মোমো-র সঙ্গে সস্ দেয় নিশ্চয়ই।কিন্তু আজকালকার ছেলেমেয়েরা অনেক স্মার্ট, মোমো খাওয়ার সময়ে তাদের পোশাকে সস্ ছিটকে পড়ে না।
মহানগরীর এখানে ওখানে এখন উন্নয়নের জোয়ার।
মোমো ও সস্ — এই সময়ে খেতে দারুণ লাগে!
খালি কীভাবে যেন কয়েকটা লোক,যারা ছিল মজুর ,_রক্তকরবী_ র সংখ্যা হয়ে ওঠার যোগ্যতাও যাদের ছিল না, এমনকি যারা পরিযায়ী হয়ে ভিনরাজ্যে চলে যায়নি, অথবা অন্য রাজ্য থেকে এখানেই এসেছিল জীবনে কিছু স্বাদ পাওয়ার জন্য — তারা স্রেফ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। খবরের কাগজ লিখেছে, এমনভাবে তারা পুড়ে গেছে যে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। খবরের কাগজে প্রথম পাতায় একটা ছবি দেখে জীবনবিজ্ঞান ভুলে যাওয়া মানুষটিও জেনে গেছেন কোন্ হাড়ের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ।
Yes, how many deaths will it take ’til he knows/ That hat too many people have died.
The answer, my friend, is blowin’ in the wind..
মোমো খেতে এখন আর পাহাড়ে যেতে হয় না, এলগিন রোডের ধারেও না। এখন মোমো মানে কর্পোরেটের মুনাফার ছোটো ছোটো তাল, ফলে মোমো দিয়েও যক্ষপুরীর সেই প্রাসাদ গড়ে ওঠে। সেই মোমো-র সুগন্ধ ও স্বাদ ছড়িয়ে পড়ে মহানগরীর প্রান্তে, জলাভূমির স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলে যেখানে যক্ষপুরী তৈরি হয়, আর তার ভেতরে আটকা পড়ে থাকা কয়েকজন মজুর স্রেফ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে মরে নিরুদ্দেশ হয়ে যান।
বহু বছর আগে এক দাড়িওয়ালা বুড়ো কীসব লিখেছিলেন, এখন নাকি সেসব যথেষ্ট আধুনিক নয় — _surplus value_…. _alienation_… এমন সব কথা! অথচ বারবার, সেই উত্তরের চা বাগান থেকে দক্ষিণের মোমো কারখানা — একই ছবি — শোষণের, মানুষকে নিংড়ে নিয়ে ছিবড়ে করে দেওয়া শোষণের।
মোমো-র সঙ্গে দেওয়া সস্ -এর দাগ কিছুতেই তুলতে পারিনি সেদিন।কিন্তু এখন আমরা অনেক বেশি আধুনিক, স্মার্ট, রং তুলে দেওয়ার বা গন্ধ চাপা দেওয়ার হরেক ব্যবস্থা আমাদের মুঠোয় — ফলে ঐ _ওয়াও মোমো_ -র কাপ থেকে ওঠা লাশের গন্ধ পোড়া ছাইএর গন্ধ কিংবা মোমো-র সঙ্গে লেগে থাকা সস্-এর মতো রক্তের দাগ — সবকিছু আমরা মুছে ফেলতে পারি।
আমাদের পোশাক থেকে। আমাদের মন থেকেও।জতুগৃহে যাদের লাশ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, তারা তো কোনোকালেই রাজপুত্র ছিল না। ফলে এই লাশগুলো আর কখনোই প্রশ্ন করতে পারবে না, জানতে পারবে না তাদের এই এভাবে মরে যাওয়ার কারণ।কাদের লোভ ও অপদার্থতায় শরীরের মাংস থেকে চর্বি থেকে হাড়গুলো সব পুড়ে আলাদা হয়ে ছিটকে খবরের পাতার ছবি হয়ে গেল, এই বিষয়ে কেউ কৈফিয়ৎ চাইবে না, কারণ এই শান্তিকল্যাণ আমাদের বেশ ভালো লাগে।
আমি মোমো খেতে খুব পছন্দ করি। সস্ দিয়ে, মাখিয়ে একটু একটু করে। ঠিক কর্পোরেট যেমন শ্রমিকের রক্ত খেতে ভালোবাসে। আগেও, এখনও।










