১৯.০৯.২০২৪
৬৭. নবান্নে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কয়েকটা দামাল ছেলেমেয়ে প্রলয় তুলবে, আর অন্তরীক্ষে সেই প্রলয়ের আঁচ আসবে না, তা কি হয়! গাঙ্গেয় উপত্যকায় ঘনিয়ে এলো প্রবল নিম্নচাপ। স্বাস্থ্য ভবনে অবস্থানের প্রথম রাতেই বৃষ্টি এসেছিল, কিন্তু এই বৃষ্টির যেন কোনো শেষ নেই। রাত বেড়েছে, তার সাথেও তীব্রতর হয়েছে ঝড়বৃষ্টি। ইতিহাসের অনেক বড় যুদ্ধ হার মেনেছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাতে- পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পিঠ বাঁচাতেই কি তাহলে বরুণদেব অবতীর্ণ হলেন! তাহলে কি আন্দোলন ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে!!
সেই গুড়ে বালি! বৃষ্টির সাথে একই ধারায় বেড়েছে স্লোগানের স্বর। ত্রিপল আঁকড়ে গর্জে উঠেছে বাংলার বিপ্লবী সত্তা- যতই আসুক বৃষ্টি ঝড়, জাস্টিস ফর আরজিকর। শুধু অবস্থানকারী ডাক্তার-অডাক্তাররাই নন, রাত জেগেছে সমগ্র বাংলা। কেউ ব্যবস্থা করেছে অস্থায়ী তাঁবুর, কেউ পাঠিয়েছে ক্যাম্প খাট, কেউ চাদর, তোয়ালে, বালিশ, শুকনো জামাকাপড় ইত্যাদি ইত্যাদি। ন্যায়বিচারের আন্দোলন নিম্নচাপের চাপে দমে যাবেনা- এই বার্তাটা ছিল পরিষ্কার।
৬৮. রাত জেগেছে শাসকও, উদ্বেগে- আন্দোলনকারীদের স্বাস্থ্যের জন্য, নাকি নিজের গদির অস্থিরতায়! পরদিন দুপুর ১টা নাগাদ মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং উপস্থিত হলেন ধর্ণামঞ্চে। আর এখানেই মমতা ব্যানার্জি অনেকের থেকে আলাদা হয়ে যান। আন্দোলনের পালস তিনি বোঝেন এবং প্রয়োজনে নিজের রাজসিংহাসন ছেড়ে মাটিতে নেমে আসতে পারেন, সিংহাসনরক্ষার তাগিদেই। মুখে তিনি বলবেন, আন্দোলনকারীরা রাজনৈতিক মদতপুষ্ট এবং তারা চেয়ার চান, বিচার নয়। তিনি নাকি সব সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে চান, কিন্তু আন্দোলনকারীদের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। আবার তিনিই বার্তা দিতে উপস্থিত হবেন ধর্ণামঞ্চে- জনগণের সিমপ্যাথি ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য। যারা বেয়াড়া, যারা জোর করে কর্মবিরতিতে আছে, যাদের দাবিদাওয়া অন্যায্য- তাদের মঞ্চে এসে বার্তা দেওয়ার যুক্তি কী!! তাহলে নিশ্চয়ই উনি মেনেছেন এবং জেনেছেন যে দাবিগুলো আদৌ অন্যায্য নয়। এখানেই আন্দোলনের মুলসূত্র গাঁথা।
মুখ্যমন্ত্রীর আন্দোলনকারীদের মাঝে এসে দাঁড়ানো আন্দোলনেরও একটা জয় বলা যায়- কোনো হিংসাবৃত্তি ছাড়াই শাসককে তার চোদ্দ তলার অট্টালিকা থেকে মাটিতে নামিয়ে আনার তাৎপর্য অনেক।
৬৯. কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য প্রথম পুরুষে শুরু, প্রথম পুরুষেই শেষ। দ্বিতীয় পুরুষ তাতে গৌণ, তৃতীয় পুরুষ সব অপরাধের ভাগিদার। তিনি সমব্যথী, সমসাথী, দিদি হিসেবে এসেছেন এবং তিনি আন্দোলনকে কুর্ণিশ জানান ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি সব দাবি বিচার করে দেখবেন এবং দোষী কেউ ছাড়া পাবেনা- এরকম বহু প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে গেল।
তিনি বললেন, দোষীরা তাঁর বন্ধুও নয়, শত্রুও নয়- অভয়ার খুনীরা, যারা সমাজশত্রু হওয়ার কথা- তারাও নাকি মুখ্যমন্ত্রীর শত্রু নয়। অবশ্য সহ’চোর’ কবে শত্রু হয়!! তিনি সমস্ত রোগী কল্যাণ সমিতি ভেঙে দিলেন। অথচ তাঁর দলের নেতাদের দাক্ষিণ্যে এই সমিতিগুলো থেকে যে বিপুল দুর্নীতি লুঠতরাজ হয়েছে- তার কোনো কৈফিয়ত তিনি দিলেন না। এই দুর্নীতির ফাইল তাঁর কাছে আসেনি, এসব তাঁর অধীনে হয়নি- অথচ তিনি রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী!! এই পরিহাসের কী ব্যাখ্যা করা যায়!
পরিশেষে তিনি প্রচ্ছন্ন হুমকি দিলেন এই বলে যে শীর্ষ আদালতে শুনানি আছে এবং তিনি চান না আন্দোলনকারীদের কোনো ক্ষতি হোক!
৭০. মুখ্যমন্ত্রীর ধর্ণামঞ্চ অভিযানের অবধারিত ফলশ্রুতি হিসেবে আবার ‘খোলামনে’ বৈঠকের ডাক এসেছে- আশ্চর্যজনকভাবে সেই বৈঠকের স্থান হয়েছে কালীঘাট, নবান্ন নয়। ডাক্তারেরা জানিয়েছে, তারা দু’পক্ষেই স্বচ্ছতা বজায় রেখে বৈঠকে রাজি- এই বলেই তারা রওনা দেয়।
কালীঘাটে গিয়ে জানা যায়, লাইভ হবেনা মিটিং- কারণ এটা মুখ্যমন্ত্রীর আবাসন। এখানে নিরাপত্তার প্রশ্ন এসে যাচ্ছে। এরপর দাবি জানানো হয়, তাহলে অন্তত দু’পক্ষের ভিডিও রেকর্ডিং হোক- যাতে অন্তত সেটুকু স্বচ্ছতা বজায় থাকে। তাতেও না। আচ্ছা তবে সরকারি ভাবেই ভিডিও হোক, কিন্তু তাতে এই পক্ষেরও একজন থাকুক, যাতে পরে ‘টেকনিক্যাল সমস্যা’ হলে সামলানো যায়- তাতেও না।
বাংলার জননেত্রী অগ্নিকন্যা যে ক্যামেরায় এত ভয় পাবেন- এটা আজ অব্দি কেউ দেখেনি। কতটা ভয়, কতটা অপরাধবোধ থেকে মানুষ জনসমক্ষে আলোচনায় ভীত হয়- সেটা সবারই প্রণিধানযোগ্য।
৭১. দু’পক্ষের বার্তালাপ চলতে থাকে দরজার বাইরেই। তিন ঘন্টা বৃষ্টিতে ভেজে ডাক্তারেরা- গোটা দেশ দেখে সেই অতিথি আপ্যায়ন। আবারো মুখ্যমন্ত্রীর মাস্টারস্ট্রোক। বেরিয়ে এসে মাইকে বলতে থাকেন- তোমাদের বসার জায়গা দিয়েছি, ছাতা দিয়েছি, তোমরা ভিজো না। তোমরা ভেতরে এসো, আমার কাছে জামাকাপড় আছে। আলোচনা না করো, একটু চা খেয়ে যাও। এসব নানান ছেলেভোলানো কথাবার্তা চলে অনেকক্ষণ।
জনা ত্রিশ জুনিয়র ডাক্তার- কতই বা বয়স তাদের! মুখ্যমন্ত্রীর সামনে হাত জোড় করে একটা স্বচ্ছ আলোচনার দাবি জানায়। একটা আন্দোলন, যার উদ্দেশ্য কারো মাইনে বাড়ানো নয়, কাউকে কোনো সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নয়; যার একমাত্র উদ্দেশ্য একটা দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা- তার জন্য জুনিয়র ডাক্তারদের এই লড়াই অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
৭২. অনেক অনুনয়-বিনয়ের পরেও শুধু সভার কার্যবিবরণী ছাড়া কোনো প্রমাণই দিতে সরকারপক্ষ রাজি হয়না। তিন ঘন্টা ধরে বৃষ্টিস্নাত ডাক্তারেরা শেষে তাতেই রাজি হয়ে যায়। কারণ হাজার হোক, স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই জট কাটানোর দায়ও তাদেরই। রোগী পরিষেবা বিঘ্নিত হোক তারাও চায় না। সমাধানসূত্র তাদেরই বের করতে হবে- সরকারের মতো নির্লজ্জ দু’কানকাটা তারা হতে পারবে না। তাই আলোচনায় তারা প্রস্তুত হয়।
এমন সময় খবর আসে, সিবিআই সন্দীপ ঘোষ এবং টালা থানার ওসি অভিজিৎ মন্ডলকে গ্রেপ্তার করেছে অভয়া কাণ্ডে। অমনি আলোচনা শিকেয় ওঠে, অনেক দেরি হয়ে গেছে- এই অজুহাতে সব অধিকারিকরা বেরিয়ে পড়ে- হয়তো বা নিজেদের ঘর বাঁচানোর তাড়নায়!
দিনের শেষে মঞ্চে ফিরে আসে জুনিয়র ডাক্তারেরা- বৃষ্টিস্নাত, বিধ্বস্ত- কিন্তু হাত মুষ্টিবদ্ধ, চোয়াল শক্ত। তারা দেখিয়ে দিল, সরকার নিজের রাজ্যবাসীর কাছে আজ উলঙ্গ। যে মুখ্যমন্ত্রী পরিবহর সময় লাইভ আলোচনা করেছিলেন, নিজের প্রশাসনিক বৈঠকে দলীয় পোষ্যদের হ্যাটা করেন লাইভে- কিন্তু একটা জনস্বার্থ আলোচনায় একটা স্বচ্ছ লাইভ স্ট্রিমিং তিনি করতে চাইলেন না। এর চেয়ে লজ্জার আর কি হতে পারে!!










