১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪
_আজ আমরা আন্দোলনের একচল্লিশ নম্বর দিনে এসে বলতে পারি অভয়ার ন্যায় বিচারের জন্য যে পাঁচদফা দাবি নিয়ে আমাদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল তাতে প্রাথমিক ভাবে আমরা জয়ী হয়েছি।_
১) আমাদের আন্দোলনের চাপে আমরা বন্ধ করতে পেরেছি ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জঘন্য চক্রান্ত, তদন্ত ভেস্তে দেওয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। আমরা রাস্তায় যেমন লড়াই করেছি তেমন হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্টেও লড়ছি। কিন্তু আমাদের এই লড়াই শেষ হয়নি।
যতদিন না অভয়ার ন্যায়বিচার হচ্ছে, যতদিন না আসল দোষীরা এবং তাদেরকে যারা আড়াল করতে চেয়েছে তারা সকলে শনাক্ত হচ্ছে এবং শাস্তি পাচ্ছে ততদিন এই লড়াই চলবে।_
২) প্রবল আন্দোলনের চাপে সরকার গত ১৬ তারিখের মিটিং এ আমাদের ২ নং ও ৩ নং দাবির অধিকাংশ মেনে নিয়ে CP of Kolkata Police, DC north, DME DHS কে তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেয়৷ কিন্তু এ’সবের সাথে সন্দীপ ঘোষ, যার প্রতাপে আরজি কর হাসপাতাল সবরকম দুর্নীতির আখড়া হয়ে উঠেছিল, ত্রস্ত হয়ে ছিল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী সহ সমস্ত কর্মীরা। সে আজ অভয়া ধর্ষণ ও খুনের মামলায় CBI হেফাজতে, তার ডাক্তারি ডিগ্রিও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
এই সবকিছুর পরেও আমরা আমাদের ৪ নং ও ৫ নং দাবি নিয়ে আমাদের অবস্থান ও কর্মবিরতি চালিয়ে যাচ্ছিলাম। এই সমস্ত দাবি নিয়ে গতকাল ১৮ তারিখ _স্পেশাল টাস্ক ফোর্স এর সাথে মিটিং এ আমরা অংশগ্রহণ করেছিলাম।_ সেখানে মৌখিক ভাবে আমাদের দাবি নিয়ে সহমত প্রকাশ করলেও সরকার পক্ষ সেই সহমতি মিটিং এর মিনিটস এ দিতে অস্বীকার করেন। ফলে মিটিং থেকে কোনো সিদ্ধান্ত উঠে আসেনি৷ তবে মিটিং এর পরে ৪ ও ৫ নম্বর দাবিকে লাগু করতে গেলে আমাদের পক্ষ থেকে যে যে সুনির্দিষ্ট পদপেক্ষ প্রস্তাব করা হচ্ছে সরকার পক্ষ আমাদের সেগুলি মেল করতে অনুরোধ করেছিলেন। সেই মোতাবেক গতকাল রাত ৩ টের সময় আমরা সেই দাবিগুলি মেল করেছিলাম।
আজ সন্ধ্যে ৭ টার সময় মুখ্য সচিব এর তরফ থেকে সেই সংক্রান্ত উত্তর এসেছে৷ সেই মেল এ বেশ কিছু নির্দেশিকা জারির উল্লেখ করা হয়েছে।তাতে আমাদের বেশ কয়েকটি প্রস্তাব (বিশেষত ৪ নম্বর দাবি সংক্রান্ত প্রশ্নে) সরকার পক্ষ মেনে নিয়েছেন। আমাদের সুরক্ষা নিয়ে বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে এই নির্দেশিকাতে।
• সিসিটিভি, ডাক্তারদের জন্য নির্দিষ্ট রুম, জলের বন্ধোবস্ত এর সাথে সাথে কলেজে মহিলা পুলিশের উপস্থিতি, বিশেষ পুলিশ পেট্রোল, বিশেষ প্যানিক এলার্ম এর ব্যবস্থা করার সরকারি নির্দেশ এসেছে।
• এসেছে কেন্দ্রীয় ভাবে রেফারেল ব্যবস্থা চালু করা,প্রত্যেক হাসপাতালে শুন্য বেড এর সংখ্যা কেন্দ্রীয় ভাবে নজরদারি করার প্রস্তাব। আমরা আশা করছি হাসপাতালে বেড নিয়ে সাধারণ রোগীদের হয়রানি, দালাল চক্রের ছড়ি ঘোরানো কিছুটা হলেও বন্ধ হবে এর ফলে।
• শূন্য পদে ডাক্তার, নার্স, জিডিদের দ্রুত স্থায়ী নিয়োগ এর নির্দেশ ও দিয়েছে সরকার। এর ফলে উন্নত হবে সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। আরও ভালো পরিষেবা পাবে সাধারণ মানুষ।
• কিন্তু একই সাথে কলেজে কলেজে থ্রেট কালচার এর অবসান ঘটানো এবং গণ তান্ত্রিক ভাবে কলেজ পরিচালনার জন্য যে যে পদক্ষেপ আমরা প্রস্তাব করেছিলাম তাই নিয়ে কোন সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা এখনো আসেনি। শুধুমাত্র একটি গ্রিভান্স সেল এর প্রস্তাবনা করা হয়েছে অর্থাৎ আমাদের ৫ নম্বর দাবি বহু অংশ যেমন মেডিকেল কলেজ গুলিতে ছাত্র নির্বাচন করা, RDA নির্বাচন করা, থ্রেট কালচারের সাথে যুক্ত দোষীদের শাস্তি দেওয়া এই গুলি সম্পর্কে কোনো পদক্ষেপের নির্দেশ নেই এখানে।
৩) _এই অবস্থায় আন্দোলন এর অধিকাংশ দাবি অর্জন হওয়ার জন্য এক আমরা আন্দোলনের প্রাথমিক জয় হিসেবে দেখছি। সেই কারণে আগামীকাল আমরা স্বাস্থ্য ভবনের সামনের অবস্থান প্রত্যাহার করছি।_
আগামীকাল _আমরা প্রতিটি মেডিকাল কলেজে ফিরে যাবো সমস্ত এসেনশিয়াল সার্ভিসেস নিয়ে আলোচনা করে আগামী পরশু থেকে essential services-এ যোগদান করবো, বাকি বিষয়গুলিতে আমোদের কর্মবিরতি চলবে।_ দায়বদ্ধতার জন্য আমরা কাজে ফিরলেও এই অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থায় নিরাপত্তার দায়িত্ব রাজ্য প্রশাসনের এবং তার কোনও অন্যথা হলে আমাদের আবার কড়া সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু স্বাস্থ্য ভবনের সামনে অবস্থান বা আংশিক কর্মবিরতি তোলার অর্থ এই নয় যে, অভয়ার ন্যায় বিচারের দাবিতে WBJDF এর আন্দোলন শেষ হয়ে যাচ্ছে।
আমাদের ১ নং দাবি অর্থাৎ স্বচ্ছ দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থার প্রশ্নে এখনো আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখছি না। অভয়ার যন্ত্রণার অংশীদার হয়ে আমরা এই লড়াই করেছি। আমাদের বোনের খুনিদের শাস্তি আমাদের প্রথম এবং মূল দাবি। সেই কারণে আগামীকাল বেলা ৩ টের সময় স্বাস্থ্য ভবন থেকে অবস্থান তুলে নিয়ে আমরা সিবিআই এর অফিস CGO Complex অবধি একটি মহামিছিল এর ডাক দিচ্ছি।এই আন্দোলন এবং ন্যায়বিচারের স্পিরিটকে মাথায় রেখে ছাত্র-ছাত্রীসহ সমস্ত স্তরের মানুষকে আগামীকালের CGO অভিযানে সামিল হতে আহবান করছি। এর সাথে আমরা জানাচ্ছি মেডিকেল কলেজ গুলিতে অভয়ার ন্যায় বিচারের দাবিতে যে ধর্না মঞ্চ চলছিল সেগুলিও এর পরও চলতে থাকবে।
অবস্থান বা আংশিক কর্মবিরতি তুললেও _রাজ্য সরকার কে আমরা স্পষ্ট জানিয়ে দিতে চাই যে ৫ নং দাবিকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত পদক্ষেপ আমাদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে তার বাস্তব অগ্রগতি না ঘটলে আমরা আবার আন্দোলনকে তীব্রতর করব_। সুপ্রিম কোর্ট এ পরবর্তী শুনানি আগামী ২৭ তারিখ। আমরা চাই ২৭ তারিখের আগেই সরকার পক্ষ এই বিষয় গুলিতে পদক্ষেপ নিন। নইলে _২৮ তারিখ থেকেই আমরা আবার আমাদের আন্দোলন তীব্রতর করতে বাধ্য হব।_
৪) আমাদের WBJDF এর ঐক্য নিয়ে শাসক দলের বিভিন্ন মহল থেকে নানা কুতসা করা হচ্ছে। একথা অবশ্যই ঠিক যে আমাদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত আছে। সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য তা আবশ্যক। কিন্তু সেই বিভিন্ন মতের সদর্থক সংশ্লেষ করে কিভাবে দীর্ঘমেয়াদি ঐক্য আন্দোলন গড়ে তুলতে হয় তা WBJDF বাস্তবে দেখিয়ে দিয়েছে। এবং ভবিষ্যতেও এই প্রক্রিয়া যে আমরা জারি রাখতে পারব তা নিয়ে আমরা সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
৫) _আমাদের রাজ্যের বিপুল অংশ বন্যা কবলে পড়েছে। বন্যা কবলিত এই মানুষদের পাশে দাড়ানোর জন্য WBJDF এর পক্ষ থেকে দ্রুত অভয়া রিলিফ টীম ও অভয়া মেডিকেল টীম পাঠানো হবে। আমরা আশা করব বাংলার সাধারণ মানুষ যেভাবে অভয়ার ন্যায় বিচারের আন্দোলন এর পাশে থেকেছেন সেই ভাবেই বন্যা পীড়িত মানুষের পাশে থাকার ব্যাপারে উদ্যোগী হবেন। এই ব্যাপারে আমাদের বিস্তারিত উদ্যোগ আমরা দ্রুত প্রকাশ করব।_
সব শেষে আবারো বলতে চাই গত ৯ ই অগাষ্ট অভয়ার ন্যায় বিচারের দাবিতে যেভাবে আমরা পথে নেমেছিলাম তার পর থেকে প্রাথমিক জয় হাসিল হলেও আমাদের ন্যায় বিচারের সমস্ত দাবি এখনও অর্জন হয়নি। _আমাদের দিক থেকে সেই ন্যায় বিচারের দাবির আন্দোলন আগামী দিনেও জারি থাকবে, এই ব্যাপারে আমরা নিজেদের কাছে, অভয়ার বাবা-মা এর কাছে এবং সর্বোপরি বাংলার সমস্ত মানুষের কাছে অংগীকারবদ্ধ।_











