প্রাইমেটস ও ট্রাইমেটসঃ প্রথমে প্রাইমেটস (Primates) নিয়ে অতি সংক্ষেপে আমরা একটু আলোচনা সেরে নেই। আপনারা জানেন যে লেমুর থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন প্রজাতির বানর, মানুষ সহ পাঁচ শতাধিক স্তন্যপায়ী (Mammals), স্তন্যপায়ীদের এই উন্নত গোত্রে পড়ে। এর মধ্যে চারটি বৃহদাকার প্রাইমেটস কে Great Apes বা বনমানুষ বলা হয়। এরা হল –
(১) বনবো (Bonbos or Pygmy Chimpanzee or Dwarf Chimpanzee): দক্ষিণ আমেরিকার অ্যামাজন অববাহিকার ক্রান্তীয় বৃষ্টি অরণ্য (Tropical Rain Forest) – র পর কঙ্গো নদীর অববাহিকায় (Congo Basin) ‘Democratic Republic of Congo (DRC)’ তে অবস্থিত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রান্তীয় বৃষ্টি অরণ্যে কঙ্গো নদীর দক্ষিণে এই বুদ্ধিমান বিপন্ন (Endangered) প্রাইমেটসদের দেখা যায়। এদের পুরুষদের ওজন ৩৪ – ৬০ কেজি, মেয়েদের ওজন গড়ে ৩৪ কেজি। উচ্চতা সাড়ে তিন থেকে চার ফুট। দেহে রোম কম। মাতৃতান্ত্রিক সমাজে দল বেধে থাকে। মুলত ফলভোজী (Frugivorous) হলেও পাতা, মধু, পাখির ডিম এবং ছোট বানর, ছোট হরিণ ইত্যাদি শিকার করে খায়। ২০ থেকে ৪০ বছর বাঁচে।
(২) চিম্পাঞ্জি (Chimpanzee): আফ্রিকার বিস্তীর্ণ বৃষ্টি অরণ্য ও তৃণভূমিগুলিতে (Savannah) এই বুদ্ধিমান বিপন্ন প্রাইমেটসদের বসবাস। পুরুষদের ওজন ৪০ – ৭০ কেজি এবং মেয়েদের ওজন ২৭ – ৫০ কেজি হয়। উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে দল বেধে থাকে। এরা সর্বভুক (Omnivorous) শিকারী প্রাণী হলেও মূলত ফল ও তৃণভোজী। ৩৩ – ৪০ বছর বাঁচে।

প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ বছর আগে এক আদি পুরুষ (Common Ancestor) থেকে এই চার রকমের বনমানুষ (Great Apes) এবং মানুষের উৎপত্তি আফ্রিকা মহাদেশে। DNA এর যথেষ্ট সাযুজ্য। তাই মানব বংশগতির (Human Evolution) গবেষণায় এরা গুরুত্বপূর্ণ।
এবার ট্রাইমেটস প্রসঙ্গে আসা যাক। বিশিষ্ট কেনিয় – ব্রিটিশ প্রত্নতাত্বিক (Archeaologist) ও জীবাশ্ম – নৃবিজ্ঞানী (Paleoanthropologist) Louis Leakey (১৯০৩ – ’৭২), যার আফ্রিকা মহাদেশে মানব জাতির বিবর্তন (Human Evolution) নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে, ব্রিটিশ জীবাশ্ম – নৃবিজ্ঞানী স্ত্রী Mary Leakey কে সঙ্গে নিয়ে আফ্রিকার Great Rift Valley – র অন্তর্গত Tanzania – র Serengeti Plain এ অবস্থিত Olduvai George এ গবেষণার কাজ করছিলেন। সেই গবেষণার অঙ্গ হিসাবে তিনি এতদঞ্চলে প্রাকৃতিক পরিবেশে বসবাসকারী প্রধান চারটি প্রাইমেটস Great Apes দের সঙ্গে মানুষের বিবর্তনের যোগসূত্রের বিষয়ে ক্ষেত্র গবেষণার (Field Research) উদ্যোগ নেন। সেই সময় তাঁর সঙ্গে তিন প্রকৃতি ও প্রাণী প্রেমী এবং দুঃসাহসী যুবতী জানে গুডাল, ডাইয়ান ফসি এবং বিরুটে গাল্ডিকুস এর যোগাযোগ ও দেখা হয়। তাঁর কাজে অনুপ্রাণিত পরবর্তীকালে বিশ্ববিখ্যাত এই তিন নিবেদিতপ্রাণ মহীয়সী প্রাইমেটস বিশেষজ্ঞ (Primatologists) এবং পরিবেশ সংরক্ষক (Conservationists) প্রাণী বিজ্ঞানী আফ্রিকা ও এশিয়ার গহন বৃষ্টি অরণ্যে নানারকম ঝুঁকি ও প্রতিকূলতার মধ্যেও দশকের পর দশক থেকে যথাক্রমে চিম্পাঞ্জি, গরিলা ও ওরাংওটান দের উপর নিবিড় গবেষণা সম্পন্ন করেন। লেকি তাঁদের গবেষণার ক্ষেত্র নির্বাচন ও অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে প্রাথমিক সহায়তা করেছিলেন। লেকি এই তিন প্রাইমেটস বিশেষজ্ঞর একটি চমৎকার নাম দেন – Trimates। অনেকে আবার তাঁদের Leakey’s Angels বলতেন। বনবোদের উপর গবেষণার জন্য লেকি চতুর্থ নারী গবেষক টনি জ্যাকম্যান কে নির্বাচিত করেছিলেন। কিন্তু লেকির মৃত্যুর কারণে সেই পর্যায়ে সেটি আর এগোয় নি।
জানে গুডাল (Jane Goodall, 1934 – 2025): ১৯৬০ থেকে ছয় দশক ধরে তানজানিয়ার (তদানীন্তন তাঙ্গানিকা) Gombe Stream National Park এ Kasakela Chimpanzee Community – র সামাজিক ও পারিবারিক জীবন নিয়ে গবেষণার জন্য বিশ্ববিখ্যাত। ইংল্যান্ডে র লন্ডনে জন্ম এবং বোরনমাউথ এ বেড়ে ওঠা। ১৯৫৭ তে প্রাণী ও আফ্রিকা প্রেমী তিনি তদানীন্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ কেনিয়ায় (স্বাধীনতা ১৯৬১) এক বন্ধুর ফার্মে উপস্থিত হন। সেখান থেকে ঘুরতে ঘুরতে তদানীন্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ তাঙ্গানিকার (স্বাধীনতা ১৯৬৩) Olduvai George এ পৌঁছলে তাঁর সঙ্গে লেকি দম্পতীর দেখা হয়। তাঁদের কাজ দেখে এবং তাঁদের উৎসাহে তাঁর জীবনের মোড়ও ঘুরে যায়। লন্ডনে ফিরে প্রাইমেটসদের নিয়ে পড়াশুনা করেন এবং তারপর ১৯৬০ এ মাকে নিয়ে আফ্রিকায় চলে যান। ধারাবাহিক চেষ্টায় উপরোক্ত বনভূমির বন্য চিম্পাঞ্জিদের ঘনিষ্ট হন। বাকিটা ইতিহাস। ১৯৬২ তে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি এইচ ডি পান। ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ পত্রিকা সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর প্রবন্ধ এবং তাঁকে নিয়ে লেখা নিয়মিত বেরোতে থাকে। ৩২ টি বই লেখেন। যারমধ্যে ‘Shadow of Man (1971)’ সবচাইতে বিখ্যাত। তাঁর লেখাগুলির ভিত্তিতে ৪০ টি সিনেমা হয়। প্রচুর পুরস্কার পান। দ্য নেদারল্যান্ডস এর ব্যারন ও ফটোগ্রাফার হুগো আরনড রডফের সঙ্গে বিয়ে হয় এবং তাঁদের একটি সন্তান হয়। পরে এই সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলে তানজানিয়ার প্রভাবশালী রাজনীতিক ও মন্ত্রী ডেরেক ব্রাইসেসন কে বিয়ে করেন। ব্রাইসেসন Gombe Stream National Park এ বহিরাগতদের ঢোকা বন্ধ করে জানে গুডালের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করেন। জানে গুডাল ১৯৭৭ এ ‘Jane Goodall Institute’ গঠন করেন এবং ১৯৯১ থেকে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য ‘Roots and Shoots Youth Programme’ শুরু করেন। সম্প্রতি তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
ডাইয়ান ফসি (Dian Fossey, 1932 – 1985): জানে গুডাল যদি হন অসামান্য চেষ্টা ও সাফল্যের প্রতীক, তাহলে ডাইয়ান ফসি হলেন অবিশ্বাস্য প্রচেষ্টা ও সাফল্যের পরেও ট্র্যাজিক নায়িকা। এই জগৎবিখ্যাত প্রাইমেট বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশসংরক্ষক ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ তে চোরা শিকারীদের হাতে খুন হয়ে যাওয়া অবধি প্রতিদিন পাহাড়ি গরিলাদের খুব কাছ থেকে নিরীক্ষণ করে গেছেন। মেঘে ঢাকা উচু পাহাড়ের দুর্গম জায়গার ঘন জঙ্গলে পাহাড়ি গরিলারা বাস করে। তাদের কাছে পৌঁছনই কঠিন। তার উপর তারা অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাণী এবং দলবদ্ধভাবে থাকে। আর তাদের কাছে দুপেয়ে মানুষ হত্যাকারী (শিকারী অথবা চোরা শিকারী) হিসাবেই পরিচিত। ডাইয়ান ফসি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ধৈর্যশীল প্রচেষ্টায় গরিলাদের মত হাঁটাচলা করে, গা চুলকিয়ে, তাদের অঙ্গভঙ্গি নকল করে, তাদের ডাক ডেকে ক্রমশ তাদের ঘনিষ্ট হন। এরপর তিনি সারাদিন তাদের দলগুলির মধ্যে তাদের একজন হয়েই থাকতেন। তাদের যা খাদ্য তাই খেতেন, তাদের সঙ্গে ভাব বিনিময় করতেন, তাদের শুশ্রূষা ও চিকিৎসা করতেন। Mount Bisoke এর ঢালে ৯,৮০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প করে একাকী থাকতেন। তাঁকে স্থানীয় জনজাতিরা Nyirmachabelli অর্থাৎ পাহাড়বাসী একা নারী বলত।
ডাইয়ান ফসির জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রানসিসকো শহরে। বাল্যে পিতা – মাতার বিচ্ছেদ তাঁকে পীড়া দেয়। এর উপর তাঁর মা তাঁর বাবার সঙ্গে কিছুতেই দেখা করতে দিলেন না। অন্যদিকে তাঁর প্রতি সৎ পিতা ছিলেন কঠোর। শান্ত লাজুক স্বভাবের ডাইয়ান পশু পাখিদের নিয়ে থাকতেন। পরবর্তীকালে তিনি একজন দক্ষ ঘোড়সওয়ার (Equestrienne) হয়ে ওঠেন। একটু বড় হলে মা ও সৎ বাবা তাঁকে দূরে পাঠিয়ে দেন। সেইসময় তাঁর বাবার সঙ্গে যোগাযোগ হলে তিনি তাঁকে বিজনেস স্কুলে ভর্তি করার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ডাইয়ান পছন্দের বিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হলে বাবার সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ নষ্ট হয়। পরবর্তী সময়ে নানারকম কাজ করে নিজের খরচ চালিয়ে কৃতী ছাত্রী ডাইয়ান Occupational Therapy নিয়ে সান জোস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫০ এ স্নাতক হন। তারপর তিনি শিশু হাসপাতাল, টিবি হাসপাতাল সহ বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পেশায় বহুদিন যুক্ত থাকেন।
প্রাণী বৈচিত্রে ভরপুর অরণ্যময় আফ্রিকা তাঁকে ডাকছিল। কিন্তু অর্থাভাবে কিছুতেই তিনি যেতে পারছিলেন না। শেষে ৮০০০ ডলার ধার করে ১৯৬৩ তে কেনিয়ার নাইরোবি তে পৌঁছন। কঙ্গো, নর্দা্ন রোডেশিয়া (১৯৬৪ থেকে জাম্বিয়া), রোডেশিয়া (১৯৭৯ থেকে জিম্বাবুয়ে) ঘুরে, প্রাণভরে সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রাণীবৈচিত্র্য উপভোগ করে, যখন তাঙ্গানিকা এলেন তখন সেরেঙ্গেটির Olduvai George এ গবেষণারত লেকির সঙ্গে যোগাযোগ এবং জীবনের পথ খুঁজে পাওয়া। এরপর দেশে ফিরে পত্রপত্রিকায় লিখে ঋণ শোধ করে আট মাস প্রাইমেটসদের বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিলেন এবং পূর্ব আফ্রিকার lingua franca সোয়াহিলি ভাষা শিখলেন। ভিসা সংক্রান্ত কিছু বিষয়ও ছিল। ১৯৬৬ তে তিনি পুনরায় কেনিয়ায় পৌঁছলেন। ফটোগ্রাফার রুট দম্পতীর সহায়তায় কঙ্গোর ভিরুঙ্গা পর্বতের কাবারা অঞ্চলে পৌঁছে পাহাড়ি গরিলাদের এলাকায় তাঁর টিনের আস্তানা তৈরি করে থাকতে ও পাহাড়ি গরিলাদের নিরীক্ষণ করতে শুরু করলেন। আসার পথে তিনি গম্বে স্ট্রিম ন্যাশনাল পার্কে গিয়ে জানে গডালের বন্য চিম্পাঞ্জিদের উপর গবেষণা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সেই সময়ে মধ্যযৌবনা ডাইয়ান উৎসাহে টগবগ। একাএকাই কঙ্গোর ঘন পাহাড়ি জঙ্গলে পাহাড়ি গরিলাদের কাছাকাছি থাকতেন। মাসে একবার তাঁর ল্যান্ডরোভার ‘লিলি’ কে চালিয়ে পাহাড়ের নিচে কিকুম্বা জনজাতি গ্রামে গিয়ে প্রয়োজনীয় রেশন ইত্যাদি নিয়ে আসতেন। তিনি জর্জ স্ক্যালারের কঙ্গোর পাহাড়ি গরিলাদের উপর পূর্বতন গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে চললেন এবং অনেক নতুন ও অজানা তথ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করলেন। ।
সেইসময় সমগ্র আফ্রিকা জুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধ চলছিল যার অন্যতম কেন্দ্র ছিল কঙ্গো। দীর্ঘ সংগ্রামের পর কঙ্গো বেলজিয়ামের থেকে স্বাধীন হয় ১৯৬০ সালে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়াম প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর কঙ্গোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে চাইছিলনা। তারা ১৯৬০ থেকেই কঙ্গো সঙ্কট (Congo Crisis) তৈরি করে ভাড়াটে বিদ্রোহীদের দিয়ে কাটাঙ্গা প্রদেশ বিচ্ছিন্ন করে, জনপ্রিয় নেতা ও দেশের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুলুম্বা কে হত্যা করে এবং অত্যাচারী সেনানায়ক জোসেফ মোবুতুর মাধ্যমে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসন জারি করে (১৯৬৫ – ‘৯৭, ১৯৭১ – ’৯৭ DRC এর নাম হয়ে যায় Zaire)। ঐ সময় কঙ্গোর জঙ্গলাকীর্ণ কিভু প্রদেশেও সেনাবাহিনীর অত্যাচার শুরু হয় সাধারণ জনজাতি গ্রামগুলির উপর এবং ১৯৬৭ এর জুলাই এ একদিন মোবুতুর সেনারা ডাইয়ান এর জঙ্গলের ক্যাম্পে এসে তাঁকে ধরে নিয়ে যায় এবং বন্দী করে রাখে। ১৫ দিন বাদে কয়েকজন সান্ত্রীকে ঘুষ দিয়ে কোনরকমে তিনি বিপজ্জনক জঙ্গলপথে পার্শ্ববর্তী উগান্ডাতে পালাতে সক্ষম হন। উগান্ডার অবস্থাও তখন খুব খারাপ (Mengo Crisis)। কয়েক বছর বাদেই ১৯৭১ এ নরপিশাচ ইদি আমিন ক্ষমতা দখল করে ১৯৭৯ অবধি গণহত্যার এক কলঙ্কময় অধ্যায় রচনা করবেন। এরপর ডাইয়ান উগান্ডা থেকে কেনিয়া গিয়ে লেকির সঙ্গে দেখা করে তাঁর নতুন গবেষণার ক্ষেত্র হিসাবে Rwanda – র Ruhengiri জেলার অন্তর্গত দুর্গম Virunga Volcanic Mountain Range এর Mt. Karisimbi এবং Mt. Bisoke এর মধ্যবর্তী Volcanic National Park কে নির্বাচিত করলেন। নাইরোবির মার্কিন দূতাবাস প্রবল আপত্তি জানিয়ে তাঁকে দ্রুত দেশে ফিরে যেতে বলে। কারণ কঙ্গো ও উগান্ডা সীমান্তবর্তী Rwanda – র পরিস্থিতিও খারাপ। ১৯৬২ তে Rwanda বেলজিয়ামের থেকে স্বাধীন হলেও অশান্তি ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ চলছে, সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে একের পর এক স্বৈরাচারী দুর্নীতিগ্রস্ত শাসক ক্ষমতায় বসছে এবং চলছে হুটু ও তুতসি দুই প্রধান জনজাতির মধ্যে ভয়ঙ্কর সঙ্ঘাত। কিন্তু ব্যতিক্রমী চরিত্রের নির্ভীক বিজ্ঞান সাধক ডাইয়ান ফসি ছিলেন কর্তব্যে অবিচল।
তিনি সমস্ত বাধা অতিক্রম করে তাঁর গন্তব্যে পৌঁছলেন এবং খুব কঠিন পরিস্থিতিতে বছরের পর বছর লেগে পড়ে থেকে অসাধ্য সাধন করলেন। পরে ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক্’ প্রভৃতির মাধ্যমে বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে দেখল সাধারণের নাগালের বাইরে দুরূহ দুর্গম প্রত্যন্ত জন্ মানবহীন অঞ্চলে থাকা এই ভয়াল পাহাড়ি গরিলারা, ভয় ও অতিকথার কারণে স্থানীয় জনজাতিরাও যাদের ধারেকাছে যান না, আসলে শান্ত স্বভাবের সম্পূর্ণ এক পারিবারিক ও সামাজিক, সুশৃঙ্খল এবং প্রকৃতিবান্ধব জীব। আরও অবাক হয়ে দেখলেন এক একাকী মানবী তাদের মধ্যে কতটা সাবলীল, স্বছন্দ এবং জনপ্রিয়। এরপর বহু অভিযাত্রী, বন্যপ্রাণ ফটোগ্রাফার, গবেষক তাঁর ক্যাম্পে আসতে ও থাকতে শুরু করলেন। এদের কয়েকজনের সঙ্গে ক্রমশ তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠলেও ঐ কঠিন জীবনযাত্রায় সেই সম্পর্ক কোনটিই টিকল না। অন্যরা একেএকে ফিরে এলেন। শুধু থেকে গেলেন ডাইয়ান তাঁর মেঘে ঢাকা পাহাড়ি গরিলাদের সঙ্গে মানুষের দূষণহীন প্রকৃতির জগতে। ততদিনে তিনি পার্কের একাংশে ‘Karisoke Research Centre’ গড়ে তুলেছেন গবেষণাকে আরও বিস্তৃত ও সংগঠিত করতে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর গবেষণামূলক কাজের জন্য পি এইচ ডি প্রদান করে ১৯৮০ তে এবং তাঁর লেখা ‘Gorillas in the Mist (1983)’ বইটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয় যা নিয়ে তাঁর মৃত্যুর পরে ১৯৮৮ তে সিনেমা তৈরি হয়।
কিন্তু বিপদ অন্য দিক থেকে ঘনিয়ে এল। Rwanda এবং পার্শ্ববর্তী Zaire বা DRC, Uganda, Burundi প্রভৃতি দেশগুলিতে প্রবল অরাজকতা, দারিদ্র ও রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির আবহে গাছ কাটা, অরণ্য নিধন (Deforestation), বন্য প্রাণীদের হত্যা ও চোরা শিকার (Poaching) এবং অরণ্যের মধ্যে প্রাণীদের আবাসে পর্যটন (Tourism in Wildlife Habitats) বেড়েই চলল। তিনি এর তীব্র প্রতিবাদ করলেন। কিন্তু কেউ তাঁর কথা শুনলনা। গৃহযুদ্ধ ও চরম দারিদ্রের সমাজে এগুলির মাধ্যমে যে কড়কড়ে ডলার প্রাপ্তি হয়। ন্যাশনাল পার্কের ওয়ার্ডেন থেকে কর্মীরাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ল। কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা গেল প্রচুর টাকার বিনিময়ে তাঁর নিজের সংস্থার কর্মীরাও যুক্ত হয়ে পড়ছেন। আরও দেখা গেল তাঁর নামে বিভিন্ন দেশ থেকে যে প্রচুর অর্থ সাহায্য আসে সব মাঝপথে আত্মসাৎ হয়ে যায়। ধনী দেশ ও ব্যক্তিদের চিড়িয়াখানার জন্যও শিশু গরিলা ধরা বেড়ে গেল। গরিলারা খুব সমাজবদ্ধ জীব। একটি শিশু গরিলাকে ধরতে অন্তত ১০ টি প্রাপ্তবয়স্ক গরিলাকে হত্যা করতে হয়। ব্যথিত ডাইয়ান ফসি এবার গরিলা হত্যা বন্ধের কাজে নিয়োজিত হলেন যার ফলে তাঁর গবেষণায় যথেষ্ট ব্যঘাত ঘটল। সারাদিন ঘুরে ঘুরে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা গরিলা ধরার ফাঁদগুলি নষ্ট করতেন। প্রায়ই চোরা শিকারী দের সামনাসামনি হয়ে গেলে সংঘাত ও অশান্তি ছিল অবধারিত। সরকার ও প্রশাসনের সাহায্য পেতেন না। এরমধ্যে তাঁর প্রিয়তম গরিলা Digit কে হত্যা করা হল। তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হলেন। বছরের পর বছর ঐ উচ্চতায় এবং স্যতস্যতে পরিবেশে শ্বাসকষ্টের সমস্যা শুরু হয়েছিল। ধূমপান ও মদ্যপান বেড়ে গেল। তারমধ্যেও তিনি অরণ্য ও জীবজগৎ রক্ষায় আপ্রাণ চেষ্টা করে গেলেন। চোরা শিকার আটকাতে কর্মী নিয়োগ করলেন। এরকম পরিস্থিতির মধ্যে ২৭ ডিসেম্বর ১৯৮৫ তে ভিরুঙ্গা পাহাড়ে পাহাড়ি গরিলাদের সান্নিধ্যে অবস্থিত তাঁর কেবিনে আততায়ীরা ঢুকে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী পাহাড়ি গরিলাদের ঐ মেঘের রাজ্যে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তাঁর দেখানো পথ ধরে ‘Dian Fossey Gorilla Fund International’ আজও Rwanda এবং অন্যত্র গরিলা ও অন্যান্য বন্য প্রাণ সংরক্ষণ ও গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বিরুটে গালডিকুস (Birute Galdikas, 1946 – ): বিশিষ্ট নৃবিজ্ঞানী, প্রাইমেটস বিশেষজ্ঞ, প্রাণী আচরণ (Ethology) বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশ সংরক্ষক। তিন সন্তানের জননী। ৪০ বছরের বেশি দক্ষিণ – পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার ক্রান্তীয় বৃষ্টি অরণ্যে ওরাংওটানদের উপর গবেষণালব্ধ কাজ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই লিথুনিয়ান শরণার্থী কন্যার জন্ম জার্মানিতে। শৈশবে বাবা – মায়ের সঙ্গে কানাডা পাড়ি। ক্যানাডার কুবেক এবং টোরন্টো তে অভিবাসন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রাণীবিদ্যা (Zoology) ও মনস্তত্ব (Psychology) নিয়ে উচ্চশিক্ষা। পরবর্তীকালে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার Simon Fraser University – র অধ্যাপক। ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক্’ এ জানে গুডাল এবং ডাইয়ান ফসির কর্মকাণ্ড পড়ে প্রচণ্ডভাবে অনুপ্রাণিত হন। আফ্রিকায় গিয়ে লুই লেকির সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর পরামর্শে স্বামী ফটোগ্রাফার রড ব্রেন্ডামর কে নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার বোরনিও দ্বীপপুঞ্জের (Indonesian part of Borneo Archipelago) Tanjung Putting Reserve অরণ্যে জাভা সমুদ্রের সন্নিকটে Camp Leaky বানিয়ে সেখানে গভীর অরণ্যের মধ্যে থেকে বোরনিওর ওরাংওটানদের কাছে ক্রমে গ্রহণযোগ্য হয়ে তাদের উপর গবেষণা শুরু করেন। ১৯৮৬ তে ওরাংওটানদের সংরক্ষণের জন্য তৈরি করেন ‘Orangutan Foundation International (OFI)’। প্রথমবার বিবাহ বিচ্ছেদের পর তাঁর দ্বিতীয় স্বামী স্থানীয় কৃষিজীবী ডায়াক জনজাতির পাক বোহাপ এটিকে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেন। কাঠ, খনি এবং পাম তেলের চাষের জন্য ব্যাপক হারে অরণ্য ধ্বংস এবং ওরাংওটানদের শিকার ও চোরা শিকারের বিরুদ্ধে বিরুটে গালডিকুস প্রতিবাদ জারি রাখেন এবং ওরাংওটানদের পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা করেন। তাই নিয়ে বিতর্কও হয়। বেশ কিছু বই লিখেছেন যার মধ্যে ‘Reflections of Eden’ প্রসিদ্ধ। অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। লিথুয়ানিয়ার অবশিষ্ট প্রাচীন অরণ্য রক্ষায় ২০২১ এ ‘Ancient Woods Foundation’ সংস্থা গড়ে তোলেন।
২০.১০.২০২৫
















অপূর্ব! অভিনন্দন 🌹