আমি তখন পিজি -ওয়ান ক্লাসের ছাত্র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ক্যাম্পাসে আমাদের ক্লাস নিতে আসতেন অধ্যাপক সুনীল মুন্সী মশাই। কলকাতার নগর বিকাশ ও তার নানান খুঁটিনাটি বিষয় ছিল তাঁর পড়ানোর ক্ষেত্র। মাঝে মাঝেই টানা লেকচার থামিয়ে নানান আকর্ষণীয় বিষয়ে আলোচনা করাই ছিল তাঁর মুন্সীয়ানা। আমরা অনেকেই তাঁর এমন ধারার পাঠদানের শৈলীর গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলাম। একদিন ক্লাসে পুরনো কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলের নামকরণের বিষয়ে আলোচনা চলছিল। বিষয়টি আকর্ষণীয়, তাই ক্লাসের শেষেও আমাদের নানান প্রশ্ন মনের মধ্যে টগবগিয়ে ফুটছে। রিসেস্ এর সময় স্যারের কাছে ভিড় করলাম কয়েকজন। স্যারের ঘরে ঢুকতেই তিনি এক গাল হেসে বললেন – “তোমরা আসতে পারো ভেবে আমি তোমাদের জন্য নায়ারের উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখে রেখেছি। কাছেই থাকেন – ভবানীপুর । যা যা প্রশ্ন আছে ওনাকে জিজ্ঞাসা করলেই উত্তর পেয়ে যাবে। খুব পণ্ডিত,নিরভিমান মানুষ। গেলেই বুঝতে পারবে।”
স্যার কি আমাদের এড়িয়ে গেলেন? নিজে উত্তর দিলেই তো বিলকুল ল্যাঠা চুকে যেত। তৃতীয় পক্ষের কাছে যাব কি যাবনা, এই সব দোনোমনায় দিন দুই কাটিয়ে একদিন চললাম ভবানীপুর। উদ্দেশ্য শ্রী পরমেশ্বরন থাঙ্কাপ্পান নায়ার মশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয় হয়। খুঁজে পেতে বাড়িটিকে পেয়েও গেলাম। তারপর সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যা হয়। দরজায় টোকা কে আগে দেবে এই নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ততার শিকার আমরা। শেষ পর্যন্ত আমিই আলতো করে টোকা দিলাম দরজায়। খুবই সাধারণ বাড়ি। সামান্য পরেই ভেতর থেকে প্রত্যুত্তর ভেসে আসে – “কে ? ওহ্ তোমরা? এসো এসো। ভেতরে এসো। প্রফেসর মুন্সী তোমাদের কথা বলে রেখেছেন।”
যেন কতকালের চেনা। রাস্তার ওপরেই ঘর।লাল টুকটুকে সাবেকি কায়দার মেঝে। আসবাবপত্রের বালাই মাত্র নেই। ঘরের এক কোণে ছোট একটা জল চৌকির ওপর রাখা রয়েছে রেমিঙ্ টন কোম্পানির আদ্দিকালের মডেলের এক টাইপ রাইটার , দেয়ালে ঠেস দিয়ে মেঝের ওপর রাখা স্তূপীকৃত বই। কোথায় বসবো ভাবছি, দেখি নায়ার স্যার একটা আসন পেতে দিব্যি মাটিতে বসে পড়েছেন। দ্বিধা কাটিয়ে আমরাও মাটিতে রাখা মাদুর কাঠির আসনগুলো পেতে বসে পড়লাম। 

মাত্র ১২৫ টাকা মাস মাইনের এক প্রাইভেট ফার্মে টাইপিস্টের চাকরি দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের শুরু। কিন্তু কলকাতা শহরের দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের নানান ঘটনা তাঁকে প্রবল ভাবে আকর্ষণ করতো। তাই অফিসের ছুটির পর পায়ে হেঁটে হেঁটে তিনি শুরু করলেন ইতিহাসের খোঁজ। নায়ার স্যার বারবার নানা প্রসঙ্গে কলকাতা শহরের ওপর তাঁর দুর্বলতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করেছেন এক বিপুল ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের অধিকারী এই নগরী কীভাবে নব্য ভারতীয় বিদ্যা চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এই গরিমার ভার বহন করেও কলকাতা কেমন করে উচ্চ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের অনন্য বাসভূমি হয়ে উঠেছে তা নায়ার স্যারকে ভীষণভাবে আকর্ষিত করতো। নিজের মতো করে এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তিনি কালে কালে হয়ে উঠলেন একজন “নগ্নপদ ঐতিহাসিক”।
এই খোঁজের তাগিদ প্রবলভাবে অনুভব করায় টাইপিস্টের চাকরি তাঁর কাছে ক্রমশই একঘেয়ে এবং অর্থহীন মনে হতে থাকে। কলকাতার চাকরি ছেড়ে পরবর্তী সময়ে তিনি চাকরি করেন গুয়াহাটি ও মুম্বাই শহরে , কিন্তু তাঁর মন বাঁধা পড়ে গিয়েছিল কলকাতার অলিগলিতে, তার ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের বিপুল বৈভবে, কলকাতার বিচিত্র স্মারক, স্মৃতিসৌধে, তার প্রশাসনিক ব্যবস্থার ক্রমবিকাশের কাহিনির সঙ্গে। 
অত্যন্ত সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন নায়ার স্যার। দু কামরার এক ভাড়া বাড়িতেই কাটিয়ে দিলেন দীর্ঘ ছয় দশক সময়। জীবনের চাহিদা বলতে ছিল বই। বইপাড়া ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছিলেন কলকাতা নিয়ে লেখা নানান দুষ্প্রাপ্য সব বই। এইসব বইয়ে ধরা ছিল হুগলি নদী পারে তিলতিল করে গড়ে ওঠা এক আশ্চর্য জনপদের অগণিত কাহিনি। নায়ার স্যার সব কিছুকেই পূর্বজদের কথকতা বলে দ্বিধাহীনভাবে মেনে নিতে চাননি, বরং তাকে নিজের মাঠ ময়দান, অলিগলি ঘুরে আহৃত অভিজ্ঞতার কষ্টিপাথরে ঘষেমেজে যাচাই করে নিতে চেয়েছিলেন। এখানেই তাঁর কৃতিত্ব , স্বকীয়তা। আর এই কারণেই তাঁর দুয়ারে ভিড় জমাতেন বহু জ্ঞানীগুণী মানুষ, সরকারি আমলা, শিক্ষক, গবেষক, ছাত্রছাত্রীরা। 

দীর্ঘদিন ধরে কৃচ্ছসাধনের ফলে শরীর একটু একটু করে অশক্ত হয়ে পড়ছিল। দেশ থেকে স্ত্রী সীতা দেবী, সন্তান ও অন্যান্য পরিজনেরা বারবার তাঁকে কেরালায় ফিরে যাবার অনুরোধ জানাচ্ছিল। নিজেও বুঝতে পারছিলেন এবার দেশে ফিরে যাওয়াই শ্রেয়। অবশেষে ২০১৮ সালে কলকাতার সঙ্গে এতোদিনের শরীরী সম্পর্ককে এড়িয়ে নায়ার স্যার তাঁর দেশে ফিরে গেলেন। মন ও আত্মা অবশ্য বাঁধা পড়ে রইলো কলকাতায়, ভবানীপুরে, ৮০/ সি, কাঁসারি পাড়া লেনের সেই দুই কামরার ছোট্ট অতি সাধারণ বাসা বাড়িতে। 
তথ্যসূত্র ও ছবি
উইকিপিডিয়া মুক্ত নিবন্ধ
বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্রের রিপোর্ট।
সকলের কাছে ঋণ স্বীকার করছি।
মধ্যমগ্রাম
জুন ১৯, ২০২৪.












