শিরা ওঠা হাতে ধরা কফির কাপটা অল্প অল্প কাঁপছিল। চামড়ায় অজস্র ভাঁজের কাটাকুটি। হলুদ হয়ে যাওয়া ভঙ্গুর নখগুলো যত্ন করে নেলকাটার দিয়ে কাটতে কাটতে সপ্তদশী মেয়েটি লক্ষ্য করেছিল, মিসেস স্মিথের কনুইয়ের ভাঁজে জমাট বাঁধা নীলচে দাগ। কেমন শিরশির করে উঠেছিল গা-টা। তখন জানত না মেয়েটা, এখন জানে, ওগুলো রক্ত পাতলা হওয়ার ওষুধ খাওয়ার লক্ষণ — হয়ত সেদিন নিয়মমাফিক হেলথ চেক আপের রক্ত নেওয়া হয়েছিল মিসেস স্মিথের।
”তুমিও একটু কফি খাও না—”,
ঘাড় নেড়ে বৃদ্ধার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল সে। মাথার মধ্যে টিকটিক করছিল, একটা চল্লিশের রাণাঘাট লোকাল মিস করলে আবার দুটো পঁচিশের নৈহাটি — অনেক দেরি হয়ে যাবে বাড়ি পৌঁছতে। রবিবার কয়েকটা ট্রেন ক্যানসেলড থাকে যে।
ওদিকে পিয়ানোয় বেজে উঠেছে অচেনা সুর। বাজনা ঘিরে তখন ফুলছাপ সুতির ফ্রক বা হাঁটু পর্যন্ত ঝুলের কাফতান পরা কিছু কাঁচাপাকা মাথাদের ভিড়। কনভেন্ট ইস্কুলে পড়েও পাশ্চাত্য সঙ্গীতের অআকখ না জানা মেয়েটাকে চিনিয়ে দিতেন মিসেস স্মিথ — এটা ক্লিফ রিচার্ডের গান, এটা এলভিস প্রেসলির।
বারো ক্লাসের এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিতে বাধ্যতামূলক ছিল সোশ্যাল সার্ভিস। দস্তুরমত গ্রেড দেওয়া হত তাতে। গ্রেড সি হলে হায়ার সেকেন্ডারির টেস্ট পরীক্ষায় বসা ছিল না-মুমকিন।
মিশন্যারিজ অফ চ্যারিটি বা প্রেমদান লেপ্রসি সেন্টারে সেবাকাজে সাহায্য, প্রাইমারি সেকশনের ক্লাস নেওয়া, পথশিশুদের আঁকা বা অক্ষর পরিচয় করানো — ইত্যাদি নানা অপশনের মধ্যে থেকে মেয়েটা বেছে নিয়েছিল বৃদ্ধাবাসের অধিবাসিনীদের সঙ্গদান। কারণ আর কিছুই নয়, লরেন্স ডিসুজা হোম শিয়ালদা-র খুব কাছে। তার বাড়ি তো আর কলকাতায় নয়, সেই শ্যামনগরে।
প্রতি রবিবার যেতে হত সেখানে। ঘন্টা দুয়েক থাকার কথা। এক ঘন্টা পেরোলেই উসখুস করত মন। দায় সেরে কতক্ষণে রওনা দেবে বাড়ির পথে! মিসেস বুশার্ড, মিসেস স্মিথ, মিস ইসাবেল-রা কি বুঝতে পারতেন তার অনীহা? এখন ভাবলে, ছায়ারা দীর্ঘতর হয় চোখের পাতায়।
উচ্চ মাধ্যমিকের পাশাপাশি চলছিল জয়েন্টের প্রস্তুতিও। তার উপর ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেলছিল টেস্ট। কয়েকটা সপ্তাহ হোমে একটু অনিয়মিত হয়ে পড়েছিল সে।
সপ্তাহ তিনেক পরে এক শীতের আলগা কুয়াশামাখা সকালে, মৌলালি পেরিয়ে, ইউনিয়ন চ্যাপেলের পাশে পুরোনো ভাঙাচোরা বাড়িটার ক্যাঁচক্যাঁচে কাঠের গেটটা খুলতে খুলতেই মেয়েটার চোখ পড়েছিল দোতলার বারান্দায়। সেখানে কয়েকজোড়া উৎকন্ঠিত চোখ দৃষ্টিপ্রসাদে অভিষিক্ত করছিল তাকে। আদ্যিকালের উঁচু উঁচু সিঁড়িগুলো ভয়ে ভয়েই ভেঙে দোতলায় উঠেছিল সে। এবার কি ভর্ৎসনা অপেক্ষা করছে তার জন্য? তিন সপ্তাহের অনুপস্থিতি! গ্রেড সি নাচছেই কপালে!
তাকে অবাক করে দিয়ে একরাশ উৎকন্ঠিত কলরব এগিয়ে এসেছিল তার দিকে।
কেমন আছে সে? বাবা মা সবাই ঠিক আছেন তো? আত্মীয়স্বজনের খবর ভাল তো? কোনো অসুবিধার কারণেই যে সে আসতে পারেনি এই ক’দিন, তা বেশ বুঝতে পেরেছেন তাঁরা।
কৃতজ্ঞতায় চোখ ছলছল করে উঠেছিল মেয়েটার। নিজের দায়সারা মনোভাবের মানসিক দৈন্যের লজ্জায় মাথাটা নুয়ে পড়েছিল তার। নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা করেছিল, শেষ কয়েকটা সপ্তাহ আর কোনো ফাঁকিবাজি নয়। এখানে দু’ঘন্টা সময় বেশি কাটালে তার জয়েন্ট প্রস্তুতির মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।
ওখানে কাটানো শেষ রবিবারটা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে তার।
ফিলোমিনা গ্র্যানি প্যানকেক তৈরি করেছিলেন। সে নিয়ে গিয়েছিল ফ্লুরিজের পেস্ট্রি। আর মায়ের তৈরি মাছের চপ। খেয়ে জরাজীর্ণ মুখগুলোর আহ্লাদ আজও চোখে ভাসে মেয়েটার।
”সার্ভিস শেষ হলো তো কী হয়েছে? আসবে তো মাঝে মাঝে?”
সারা আন্টির প্রশ্নের উত্তরে সে বলেছিল —”আমার স্কুল থেকে আবার কেউ আসবে আন্টি। আপনাদের একা লাগবে না একটুও, দেখবেন!”
”তুমি? তুমি আসবে না?” মিসেস স্মিথের দু’চোখে কি আকুল, কি তীব্র জিজ্ঞাসা ছিল সেদিন।
অল্প বয়সের দায়িত্বজ্ঞানশূন্য আবেগে ভর করে সে বলে উঠেছিল —
”আসব গ্র্যানি! নিশ্চয় আসব!” বলে ফেলেই জিভ কেটেছিল মনে মনে। অনেকক্ষণ ঘোলাটে চোখে তার দিকে চেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন মিসেস স্মিথ। তাঁর ফিসফিসে কন্ঠস্বর আজও শুনতে পায় সেদিনের সপ্তদশী।
”আসবে না, জানি। কেউ আসেনি। কেউ আসে না। ফ্যানি, লিজা, ডেভিড — কেউ আসবে না!”
তারা কারা, সঠিক না জানলেও আন্দাজ করতে অসুবিধে হয়নি তার। কেউ মেয়ে, কেউ ছেলে, কেউ বোনপো, কেউ ভাগ্নে!
সেদিন শিয়ালদা-র দিকে হাঁটতে হাঁটতে পায়ে পা জড়িয়ে আসছিল মেয়েটার। কি এক অপরাধের ভারে ডুবে যাচ্ছিল কিশোরী হৃদয়!
তারপর কেটে গিয়েছে প্রায় তিরিশ বছর। একটা কাজে লেনিন সরণি দিয়ে আসতে আসতে সেই ভাঙাচোরা গেটের গায়ে লটকানো ফলকটায় চোখ আটকেছিল। কালোর উপর সাদা অক্ষরগুলো হলদেটে হয়ে এসেছে!
”লরেন্স ডিসুজা হোম।”
হুড়মুড় করে স্মৃতিরা এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার কোলে।
না, যাওয়া হয়নি আর কখনো ওখানে। এমনকি, তার ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পাওয়ার সুখবরটুকুও তুলে দেওয়া যায়নি সেই অনাত্মীয় শুভাকাঙ্ক্ষীদের কানে। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত আর ঘটনাবাহুল্যের অভিঘাতে কখন যেন বিস্মৃতির চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়েছিল লরেন্স ডিসুজা হোম।
গাড়ির জানলা দিয়ে ভাল করে চেয়ে দেখল সে। সময় যেখানে থমকে দাঁড়িয়ে আছে, হাতছানি দিচ্ছে ভবিতব্য।
একবার ভাবল, নেমে পড়বে, যাবে না কি একবার?
তারপরেই ভাবলো, নাঃ, থাক। যেতে তো হবেই একদিন। এখানে না হোক, অন্য কোনো ”হোমে”, যেখানে ভোরবেলাতেও গোধূলি ঘনাবে, বারোমাস হবে পাতাঝরার মরসুম, কুঁচকে যাওয়া চামড়া অপেক্ষায় থাকবে কোনো কচি হাতের স্পর্শের।
যেতে তো হবেই একদিন। আজ থাক।









