৮ই মার্চ নারী দিবস আরও পরিষ্কারভাবে বললে বিশ্ব নারী দিবস। প্রথমে এই নারী দিবস নিয়ে একটু গৌরচন্দ্রিকা সেরে নেওয়া যাক। তারপর আসছি, মূল প্রসঙ্গে। দেখুন কোনও দিবস পালনের অর্থ সংরক্ষণ করা। মানে নারীদের বাঁচাতে হবে বা নারী সংরক্ষণ করতে হবে। আপনার হাসি পাচ্ছে তো? যে নারীদের কেন সংরক্ষণ করতে হবে? বিন্দাস তো বেশ ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। ভাল করে চিন্তা করে বলুন তো, নারীকে কী মানুষ ভাবা হয়? না মানে রক্তমাংসের মানুষ কাউকে মনে করা হলে তো তার নিজস্ব বক্তব্য থাকে। অস্তিত্ব থাকে। নিজস্ব চাহিদা, ও ইত্যাদি প্রভৃতি থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সমাজ কী এই মানদণ্ডে নারীকে মানুষ ভাবে?? আমি আপনাকে বলছি ‘ভাবে না’।
এবার আমরা ছোট্ট করে এই নারী দিবসের ইতিহাসটা একটু জেনে নেই। নারীদিবস শুরু হয়েছিল, ১৯০৯ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক শহরে। এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন সোশালিস্ট পার্টি অফ আমেরিকা। এই পরিকল্পনার মূল মাথা ছিলেন Theresa Malkiel.
এরপর ১৯১০ এর আগস্ট মাসে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে ইন্টারন্যাশনাল সোসালিস্ট উইমেন্স কনফারেন্স আয়োজিত হয়। এখানে ১৭ টি দেশের থেকে ১০০ জন প্রতিনিধি আসেন। এই সভায় বা এই কনফারেন্সে নারীরা সমানাধিকারের প্রশ্নে সবাই সহমত পোষণ করেন। এরপর পরের বছর উনিশে মার্চ প্রথম বিশ্ব নারী দিবস অনুষ্ঠিত হল। রাইট টু ভোট এবং সেক্স ডিসক্রিমিনেশনের বিরুদ্ধে তারা আওয়াজ তোলেন। প্রথম থেকে নারী দিবস হিসেবে সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে বা মার্চ মাসের প্রথম রবিবার দেখে ঘোষণা করা হত। এভাবে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে লাগল। ১৯১৭ সালের ৮ই মার্চ রাশিয়ায় বলশেভিক দল থেকে বিশ্ব নারী দিবস হিসেবে চিহ্নিত করা হল এবং এই আন্দোলনের আকার তীব্রতর রূপ ধারণ করল। তাই ভ্লাদিমির লেলিন ১৯২২ সালে ১৯১৭ সালের রাশিয়া বিপ্লবের নারীদের ভূমিকাকে সম্মান জানিয়ে আটই মার্চ বিশ্ব নারী দিবস ঘোষণা করেছিলেন।
সিমোন বোভেয়ার তাঁর দ্য সেকেন্ড সেক্স বা দ্বিতীয় লিঙ্গ বইতে আমরা পাই “… তার (নারীর) কোনও কিছুতে মালিকানা নেই সে একজন মানুষের মর্যাদাও পায় না। সে নিজেই হয়ে ওঠে পুরুষের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির অংশ – প্রথমে পিতার পরে স্বামীর।… আরবদের মধ্যে শিশু হত্যা ছিল ব্যাপক; জন্মের সাথে সাথেই কন্যা শিশুদের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হত। কন্যা শিশুকে বাঁচিয়ে রাখা ছিল পিতার বিশেষ বদান্যতা। এমন সমাজে নারী বেঁচে থাকতে পারে শুধু পুরুষের বিশেষ অনুগ্রহে। পুরুষের মত বৈধভাবে নয়।…
এবার ভারতের কথা এলে আমরা নারীকে ওই দ্বিতীয় লিঙ্গ বা সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন হিসেবে সমাজের প্রতিটি স্তরে দেখতে পাই। তার চিত্র অবশ্যই সব ভাষা সাহিত্যেই পাওয়া যায়। মান্টোকে তো এরকম চিত্র উন্মুক্তভাবে লেখার জন্য বারবার আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। তার সমকালীন নারী লেখক ইসমত চুগতাই কেও তার গল্পের জন্য আদালতের কাঠগড়ায় উঠতে হয়েছিল। আমাদের বঙ্গ দেশের শরৎচন্দ্রকে এরকম ব্যথা সহ্য করতে না হলেও সমাজ তাকে চরিত্রহীন আখ্যা দিয়েছে। শুধুই তার নারীবাদী মানসিকতার জন্য। শরৎচন্দ্রের নারীর মূল্য প্রবন্ধে আমরা পাই তিনি বলেছেন ” নারীত্বের মূল্য কি? অর্থাৎ কি পরিমাণে তিনি সেবা পরায়ণা স্নেহশীলা সতী, এবং দুঃখ-কষ্টে মৌনা। অর্থাৎ তাহাকে লইয়া কি পরিমাণে মানুষের সুখ ও সুবিধা ঘটিবে। এবং কি পরিমানে তিনি রূপসী। অর্থাৎ, কী পরিমাণে তিনি পুরুষের লালসা ও প্রবৃত্তি কে কতটা পরিমাণে তিনি নিবন্ধ ও তৃপ্ত রাখিতে পারিবেন। দাম কষিবার এছাড়া যে আর কোন পথ নাই সে কথা আমি পৃথিবীর ইতিহাস খুলিয়া প্রমাণ করিয়া দিতে পারি। ” এই প্রবন্ধেরই আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন “মনু বলিয়াছেন এক পতি সেবা ব্যতীত স্ত্রী লোকের আর কোন কাজ নাই। সেই ইহকালে পুরুষের সেবা করিয়াছে পরকালে গিয়েও করিবে।… পুরুষ যে কেবলমাত্র নিজের সুখ ও সুবিধা ব্যতীত – সেটা সত্যই হোক আর কাল্পনিকই হোক— আর কোন দিকে দৃষ্টিপাত করে নাই, সে কথা চাপা দিয়া গর্ব করিয়া প্রচার করিয়াছে “যেদেশে নারী হাসিতে হাসিতে চিতায় গিয়ে বসিত, স্বামীর পাদপদ্ম ক্রোড়ে লইয়া প্রফুল্ল মুখে নিজেকে ভস্মসাৎ করিত ইত্যাদি ইত্যাদি…”
কিন্তু তাই যদি হয় তবে স্বামীর মৃত্যুর পরেই তাহার বিধবাকে এক বাটি সিদ্ধি ও ধুতরা পান করিয়া মাতাল করিয়া দেওয়া হইত কেন? শ্মশানের পথে কখনো বা সে হাসিত কখনো কাঁদিত কখনো বা পথের মধ্যেই ঢুলিয়া ঘুমাইয়া পড়িতে চাহিত। এই তার হাসি এই তার সহমৃত হইতে যাওয়া! তারপর চিতায় বসাইয়া কাঁচা বাঁশের মাচা বুনিয়া চাপিয়া ধরা হইত। পাছে সতী-দাহ যন্ত্রণা আর সহ্য করিতে না পারে! এত ধুনা ও ঘি ছড়াইয়া অন্ধকার ধোঁয়া করা হইত যে কেহ তাহা যন্ত্রণা দেখিয়া যেন ভয় না পায়! এবং এত রাজ্যে ঢাক ঢোল কাঁশি শাঁখ সজোরে বাজানো হইতো যে, কেহ যেন তাহার চিৎকার কান্না বা অনুনয় বিনয় না শোনে! এইতো সহ মরণ।” শরৎচন্দ্র যে সহমরণের কথা বর্ণনা করে গেছেন তা আমরা ১৯৮৭ সালে রাজস্থানে ঘটে যাওয়া রূপ কানোয়ারের ঘটনায় সাক্ষী রয়েছি। ভেবে দেখুন শরৎচন্দ্র লিখেছিলেন স্বাধীনতার আগে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও নারীর স্থান বোধ হয় সেই একই জায়গায় রয়ে গেছে।
আপনারা ভাবতে পারছেন একটা রক্ত মাংসের জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। কেন না তার স্বামী নামক মালিকটি বৃদ্ধ হয়েছে বলে পরলোক গমন করেছেন। তাই এই সম্পত্তি নষ্ট করে ফেলতে হবে। অর্থাৎ নারীর মানুষ হওয়া হইল না।
আজকের অনেকের মুখে শুনি আমি মানুষবাদী নারীবাদী নই। কথাটা শুনলে হাসি পায়। নারীবাদ তো এজন্যই জন্ম নিয়েছে। কারণ নারীকে মানুষ মনে করা হয় না। গত দশকেও হয়নি আজও হয় না। শরৎচন্দ্র, আম্বেদকার, রামমোহন, ফুলে, প্রমুখ বিদ্বজনেরা নারীবাদী ছিলেন বলেই এই পোড়া দেশে নারীবাদ প্রচলিত হয়েছে। না হলে এই আদর্শ নারীর দেশে কেউ বোধহয় সাহস করে বলতে পারতো না আমিও রক্তমাংসের মানুষ। বা গুইলিয়া টোফানার মত মারের বদলে মার দিতে জানতো না। তবে প্রথম নারী ডাক্তার কাদম্বিনী কে যখন সাংবাদিক পতিতা বলতে ছাড় দেননি। তখন কিন্তু এই প্রথম বঙ্গ অশ্বিনী তনয়া আইনিপথে নিজের সম্মান উপার্জন করেছিলেন। সাংবাদিকটি লিখিত ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। এটা বড় কথা নয় কথাটা হল। আমরা নারীরা এখনও উপলব্ধি করতে পারছি না, যে নারীবাদের প্রয়োজন কতটা!? ? কতটা কষ্ট সহ্য করার পর মেয়েটি চিৎকার করে জানাতে চায় আমাকে নারী নয় মানুষ বলো। আসলে আমরা মুখস্থ করার জন্য পড়ি, ডিগ্রির জন্য পড়ি, অনুভবের জন্য পড়ি না।
তাই রোকেয়া বেগমের সুর ধরে কথাটা বলে শেষ করব “যখনই কোনও ভগিনী মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন, অমনি ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচনরূপ অস্ত্রাঘাতে তাহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। আমরা প্রথমত যাহা মানি নাই, তাহা পরে ধর্মের আদেশ ভাবিয়া শিরোধার্য করিয়াছি। আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ওই ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রচার করিয়াছেন। এই ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষ রচিত বিধি-ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে।”
এই ২০২৫ সালের ৮ মার্চে তাই একটাই আবেদন ভগিনীগণ মানুষ হও।











সমৃদ্ধ হলাম। অশেষ ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা।
ধন্যবাদ🙏
ক্লারা জেটকিন-এর নামোল্লেখ না করে ৮ মার্চ বিষয়ে আলোচনা করা যায়, সেটা এ লেখা না পড়লে জানা যেত না। লেনিন অকারণে অতিরিক্ত ল-যুক্ত হয়েছেন, এটা নিশ্চয়ই টাইপো!
সবচেয়ে বড়ো কথা, ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস। কর্পোরেট পুঁজির এজেন্টরা নিজেদের স্বার্থে ও ইতিহাসকে বিকৃত করতে ‘শ্রমজীবী’ শব্দটা মুছে ফেলার চেষ্টা করে।
সব ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য অস়ংখ্য ধন্যবাদ।
আর শ্রমজীবী শব্দটা আমি ব্যবহার করিনি, তার পেছনে আমার কিছু বক্তব্য রয়েছে। এভাবে কাউকে বোঝানো যায় না, যে নারীটির শ্রমের দাম আছে। শুধু লেখা হয়ে রয়ে যায়।
আরেকটা কথা না বললেই নয়, সেটা হল, ক্লারা, বা রোজা বা আরও যাঁরা এই পথপ্রদর্শক রয়েছেন, তাদের সবার নাম উল্লেখ করতে হলে সেটা হাজার শব্দ ছাড়িয়ে যেত। শুধু লেখা হয়ে রয়ে যেত। কেউ পড়ত না। তাই এখন যারা ই ম্যাগে লেখেন। তারা বলেন পাঁচশো শব্দ ছাড়ানো যাবে না। এরকম সবজায়গায় সীমা বদ্ধতা থেকে যায়। তাই নামগুলো নেওয়া যায় না। দুঃখিত ক্ষমাপ্রার্থী 🙏