একটা বয়সের পর মেয়েরা খুব তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে যায়। কিছুদিন পর দেখলে চেনা মুশকিল হয়। এই মেয়েটিকে দেখেও সেই সমস্যায় পড়লাম। চেনা চেনা মনে হচ্ছে। খুবই চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কিন্তু কোথায় দেখেছি মনে পড়ছে না।
তবে তাই নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার সময় নেই। আরও জনা ত্রিশেক রোগী লাইন দিয়ে বসে আছেন এবং অপেক্ষা করতে করতে অধৈর্য হয়ে উঠছেন।
তবে মেয়েটির মা মুখ খুলতেই মেয়েটিকে চিনতে পারলাম। তিনি বললেন, চিনতে পারছেন ডাক্তারবাবু? গোবিন্দ কর্মকারের মেয়ে। আপনার বড় মেয়ের সাথে একই প্রাইমারি স্কুলে পড়ত।
সাথে সাথেই চিনতে পারলাম। বললাম, কত্ত বড়ো হয়ে গেছিস! চিনব কি করে? আচ্ছা, গোবিন্দ দোকান খোলে না কেন? ও আছে কেমন?
মহিলা ছলছল চোখে বললেন, আপনি খবর শোনেন নি? উনি তো গত মাসে মারা গেছেন।
বেশ একটা ঝটকা খেলাম। অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল। তখনও আমি প্রাকটিস শুরু করিনি। হাতে সময় ছিল। সুযোগ পেলেই বড়ো মেয়েকে স্কুলে দিয়ে আসতাম আর নিয়ে আসতাম। ওখানেই গোবিন্দর সাথে পরিচয়। সে নিজেই বকবক করত। বলত, ডাক্তারবাবু, আমি তো স্কুল জীবন ফাঁকি মেরে কাটিয়েছি। তাই ফুটপাতে প্লাস্টিকের মাল বিক্রি করে দিন চালাই। কিন্তু মেয়েটাকে মানুষ করব। আপনি একটু গাইড করে দেবেন।
লম্বা চেহারা। মুখে দাড়ি। সবসময় ঝকঝকে হাসি। যে হাসিতে কোনো হীনমন্যতা নেই। মানুষটিকে বেশ ভালো লাগত।
বাজারের কাছেই রাস্তার ধারে দোকান। হরেক রকম প্লাস্টিকের জিনিস বিক্রি করে। কিছু লাগলে টুকটাক কিনতাম। ততদিনে বড়ো মেয়ে অন্য স্কুলে ভর্তি হয়ে গেছে। জিজ্ঞাস করত, ঐশী কেমন আছে? কেমন পড়াশুনো করছে। তারপর বলত মেয়ের জন্য একদিন আপনার কাছে যাব। কী ভাবে পড়লে ভালো হয়, কোন স্কুলে ভর্তি হলে ভালো হয়। আমি তো মুখ্যসুখ্য মানুষ।
করোনাকালে প্রথম লকডাউনের সময় এলো। তবে মেয়ের জন্য নয়। নিজের জন্যই। মাথা ঘুরছে। ঘাড় ব্যথা করছে। প্রেশার মেপে দেখি সিস্টোলিকটা দুশোর উপর।
ওষুধপত্র লিখে বললাম, নিয়ম করে খেতে হবে। না হলে বিপদে পড়বেন।
গোবিন্দ বলল, নতুন করে আর কী পড়ব? যা বিপদে পড়েছি তার থেকে আগে উদ্ধার পাই। দোকান এদ্দিন ধরে বন্ধ। কবে সব স্বাভাবিক হবে কে জানে? এভাবে কিছুদিন চললে না খেয়ে মরতে হবে। চিন্তাতেই আমার প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে।
তারপর অত্যন্ত সংকোচে বলল, ওষুধের কেমন দাম হবে?
বললাম, বেশি দাম না। টাকা না থাকলে আপাতত আমার কাছ থেকে নিয়ে নিন।
না না, ছি ছি। সে হয় নাকি। এখনও অতটা খারাপ অবস্থা হয়নি। তার উপর আপনি আমার মেয়ের বান্ধবীর বাবা। আমি যে করে হোক কিনে নেব।
বললাম, কিনতে হবে না। কাল ভোরে ক্লাবে মেডিকেল ক্যাম্প আছে। চলে আসুন। দিয়ে দেওয়া যাবে।
করোনার সময়ে পাড়ার মিলন সংঘ ক্লাবে শুক্রবার ভোরে একটা মেডিকেল ক্যাম্প শুরু হয়েছিল শ্রমজীবী মানুষদের জন্য। কমদামে জেনেরিক ওষুধ কিনে বিনামূল্যে যারা ওষুধ কিনতে পারছে না তাঁদের দেওয়া হত। সেসময় সরকারি হাসপাতাল গুলি রাতারাতি করোনা হাসপাতালে রূপান্তরিত হওয়ায় শ্রমজীবী মানুষেরা ব্যাপক অসুবিধার মধ্যে পড়েছিলেন। তাছাড়া যানবাহন বন্ধ থাকায় অনেকেই হাসপাতাল অবধি পৌঁছাতে পারছিলেন না। বহু মানুষ সেসময় আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। এবং পাঁচ বছর কেটে যাওয়ার পরও তাঁদের সহযোগিতায় আমাদের মেডিকেল ক্যাম্প এখনও নিয়মিত চলছে।
ওষুধের ব্যবস্থা হলো। কিন্তু গোবিন্দর প্রেশার কমে না। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ধরা পড়ল, তার ক্রিয়েটিনিন অত্যন্ত বেশি। কিডনির সমস্যার জন্যই প্রেশার কমছে না।
বললাম, আপনার একটু বড় জায়গায় গিয়ে দেখানো উচিৎ। পিজি অথবা আর জিকর হাসপাতালের নেফ্রোলজি আউটডোরে যান। দেখিয়ে আসুন। কিডনির সমস্যা ঠিক না হলে প্রেশার কমা মুশকিল।
কিছুতেই যায় না। শুক্রবার করে আসে। ওষুধ নেয় আর চলে যায়। প্রেশারও কমে না। শেষে একদিন রেগেমেগে বললাম, পিজিতে না দেখিয়ে আসলে আর ওষুধ দেওয়া যাবে না।
তখনও ট্রেন চালু হয়নি। পাবলিক বাস চালু হয়েছে। রাগারাগি করাতে একদিন বাসে করে আর জিকর হাসপাতালে গেল। সেখানে মেডিসিন ও নেফ্রোলজি ডিপার্টমেন্টে দেখিয়ে এলো। প্রচুর পরীক্ষা করতে দিয়েছে।
আমাকে জিজ্ঞাস করতে এসেছে, এতো পরীক্ষা করতে হবে কিনা? কীরকম খরচ পড়বে?
বললাম, বাইরে থেকে করবেন কেন? সরকারি হাসপাতালেই করুন। ওখানে ডেট নিন।
গোবিন্দ বলল, ডাক্তারবাবু, সামনের সোমবার থেকে মনে হচ্ছে লকডাউন উঠবে। এক পয়সা আয় নেই। এখন দোকান না করলে খাব কী? মেয়েটাকে পড়াশুনো শেখানোর খুব ইচ্ছা ছিল। লকডাউনে স্কুলও বন্ধ। ওর পড়াশুনোও বন্ধ। কী যে করব?
অতএব গোবিন্দ আর কোথাও গেল না। শুক্রবার করে ক্যাম্পে আসে। আমি গালাগালি করি। গোবিন্দ হাসি হাসি মুখ করে ভক্তি ভরে শোনে। যেন আমি গালি দিচ্ছি না, উপনিষদ থেকে কোনো মন্ত্র পাঠ করছি।
পরের দিকে গোবিন্দ নিজে না এসে স্ত্রীকে পাঠাতে শুরু করল। গালাগালি খেলে স্ত্রী খাক। স্ত্রী এসে ওষুধ নিয়ে যেত। আমি বলতাম, এবার গোবিন্দ না এলে কিন্তু কোনো ওষুধ দেব না।
ওর স্ত্রী জিজ্ঞাসা করত, আপনার মেয়েরা কেমন আছে? পড়াশুনো কেমন করছে? আমি কোনোদিনও ওর মেয়ের খবর নিতাম না।
দ্বিতীয় ঢেউ যখন চলছে, গোবিন্দের বাড়ি শুদ্ধু সকলের করোনা হল। তখন রেড ভলেন্টিয়াররা আক্ষরিক অর্থেই মাঠে ময়দানে নেমেছিল। তারা প্রচুর মানুষের বাড়ি বাড়ি খাবার, অক্সিজেন, ওষুধ পৌঁছে দিত। কম বয়সী ছেলেমেয়ে গুলোর মুখ সবসময়ে উৎসাহে ঝকমক করত। তাকিয়ে থাকতে এতো ভালো লাগত।
গোবিন্দকে একদিন ভ্যানে করে ওরাই নিয়ে এল। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৮০ থেকে ৮৫ এর মধ্যে। একদানা খাবার খেলেই বমি হয়ে যাচ্ছে। মাথা তুলে বসতে পারছে না।
তখন হাসপাতালে ভর্তিও করা যাচ্ছে না। ফোন করে রোগীর নাম আর শারীরিক অবস্থার বর্ণনা দিলে ওনারা লিস্টে নাম লিখে নিচ্ছেন। বলছেন নাম্বার এলেই ফোন করে ডেকে নেবেন। ওনাদের ডাক আসার আগেই রোগীদের পরপারের ডাক চলে আসছে।
মানুষ আশ্চর্য ভাবে মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছেন। একজনের আঠারো বছরের ছেলে মারা গেছে। তিনি একেবারে নির্লিপ্ত গলায় বলছেন, ডাক্তারবাবু, ওর মৃত্যুর কারণ করোনা ছাড়া অন্য কিছু লেখা যায় কী? তাহলে শ্মশানে অন্তত চোখের সামনে পোড়াতে পারতাম।
ডাক্তার হিসাবে আমার হাত পা বাঁধা। মানুষের চোখের জল দেখে বিদ্রোহী হতে ইচ্ছে করত। পারতাম না। আমার সাহস কম।
আশ্চর্যজনক ভাবে খারাপ কিডনি নিয়েই গোবিন্দ বাড়িতেই সেরে উঠল। যদিও শুকিয়ে প্রায় অর্ধেক হয়ে গেল। সেসময় বিধানসভা ভোট চলছে। মানুষ হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে পোকামাকড়ের মতো বাড়িতেই মরছে। আর চারদিকে মাইক লাগিয়ে অশ্লীল ভাবে ভোটের প্রচার চলছে। এই দেশে সবই সম্ভব।
ভোট হওয়ার পর পর আবার লকডাউন। গোবিন্দ একদিন নিজেই ক্যাম্পে এলো। চেহারা প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। কথা বলতে গেলে হাঁপাচ্ছে। বলল, এ কী অবস্থা হলো আমার। আর পারা যাচ্ছে না। এর চেয়ে মরে গেলেই বেশি ভালো হতো।
গৌরকে দিয়ে কটা রক্তপরীক্ষা করা হলো। ক্রিয়েটিনিন বেড়ে প্রায় সাত হয়ে গেছে। পটাশিয়াম বেশি। হিমোগ্লোবিন কম। আমি হাত তুলে দিলাম। বললাম, আপনি বড়ো জায়গায় দেখান। কিডনির যা অবস্থা, ডায়ালাইসিস লাগতে পারে।
গোবিন্দ চুপচাপ চলে গেল। জানিনা সে কি ভাবছিল। মেয়ের কথা ভাবছিল? নাকি ভাবছিল আমি একজন দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলা সুবিধাবাদী চিকিৎসক।
তারপর গোবিন্দ আর আসেনি। ওর দোকান মাঝে মাঝে খোলা দেখেছি। সামনা সামনি হইনি। দূর থেকে ওকে একঝলক দেখেছি। মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছি। নিশ্চয়ই বড় কোথাও দেখাচ্ছে। নিশ্চয় সুস্থ হয়ে যাবে। আমি আসলে নিজেকে সান্ত্বনা পেতে চেয়েছি। পরিস্থিতি থেকে পালাতে চেয়েছি।
কিন্তু গোবিন্দের মৃত্যুর খবর সব কিছু এলোমেলো করে দিল। নিজের মেয়ের বয়সী মেয়েটির দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারছিলাম না। তবে এটাও বুঝতে পারছিলাম, এভাবে পালিয়ে বাঁচা যায় না। একদিন না একদিন ঠিক সত্যের মুখোমুখি হতে হবেই। গলার স্বর যথাসাধ্য স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বললাম, মারে, তোর কবে থেকে জ্বর? স্কুলে যাচ্ছিস?










