৮০০০ এরও বেশি বাংলা মিডিয়াম সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে হয়ে যাওয়ার পথে বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে । শিক্ষক থেকে সাধারণ মানুষ আমরা কেউ প্রতিবাদে নামিনি। আজ মাত্র সাড়ে ৫০০ টাকার জন্য এই শিশুটি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে তা নয়, আসলে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে এই সমাজের বৈষম্য, শোষণ, বঞ্চনা, অমানবিকতার জন্য। এর দায় সমাজের প্রতিটি মানুষের। আমরা আর কবে বিপদটা বুঝবো? নগর পুড়লে সেই আগুনের আঁচে দেবালয়ো ধ্বংস হয়।
আমার পরিচিত এক শিক্ষক, যিনি নিজে তার পড়াশোনার জন্য সোনার মেডেল পেয়েছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে যত বেশি ট্যাক্স দেয়, সমাজে তার সুবিধা ভোগ করার পরিমাণ তত বেশি হওয়া উচিত। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম এই মানসিকতার ওই শিক্ষক স্কুলে গিয়ে পড়ুয়াদের কি শিক্ষা দেবেন? যে সামাজিক পরিকাঠামোর জন্য শিশুটি আজ গরিব, সেই সমাজেরই তো দায় শিশুটিকে সমান অধিকার দেওয়ার, শিশুটির যা যা মৌলিক অধিকার তা দেওয়ার ক্ষমতা এবং দায়িত্ব দুটোই এই সমাজের। এমন কি হওয়ার কথা ছিল ওই বাচ্চাটির সঙ্গে? এবার অন্তত নিজেকে প্রশ্ন করি।
আর্থিক অসঙ্গতির জেরে আজকের এই ছাত্রীটির মৃত্যু নতুন নয়, এরকম মৃত্যু আগেও অনেক দেখেছি। দেখছি- দেখেছি- আগেও দেখব। গা সয়ে গেছে। আসলে বুঝি না আমাদের এই স্বার্থপরতার দাম আমাদের চোকাতেই হবে। ঠিক যেমনভাবে দাম চোকাচ্ছেন ২৬ হাজার তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ। আজকে তারা ভিকটিম, সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে পথে নেমেছেন। আর এই নিষ্পাপ শিশুগুলোর হিসেব? একটা শিশুর বিকাশের দায়িত্ব সমাজের। আর সেই বিকাশ যখন গলায় ‘বিষ ঢেলে’ থেমে যায়! তখন? আপনি- আমি যে প্রত্যেকটি মানুষ, এই সমাজের অংশ, যারা নিজের উঠোনের চৌহদ্দির সুখ টুকু বুঝি! তাদের দিকে আঙুল তোলে নাকি?
আগামী দিনে এই ঘটনা উত্তরোত্তর আরও বাড়বে, এটাই আশঙ্কা। কারণ তখন তো পড়ার জন্য ৫০০ টাকার সরকারি স্কুলগুলোও আর থাকবে না। গরিবের সন্তান কোথায় পড়তে যাবে? উত্তরটা দেওয়ার কথা রাষ্ট্রের। কিন্তু তারা তাদের দায় এড়িয়েছে। সারা দেশজুড়ে এমন ভাবেই দ্রুত গতিতে একের পর এক সরকার স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বদলে যা চকচকে বেসরকারি স্কুল। শিক্ষা ব্যবসায় নেমেছেন পুঁজিপতিরা। ঠিক যেমন ভাবে সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর মৃত্যু হয়েছে। একের পর এক হাসপাতাল গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো ধুঁকছে। ওষুধ নেই, ডাক্তার নেই, আছে শুধু বিল্ডিং। এই ভাবেই সরকারি ব্যবস্থাকে তেল জল না দিয়ে অপুষ্ট করে মেরে ফেলে তৈরি হচ্ছে নবভারত। যেখানে এইসব দরিদ্র শিশুদের একমাত্র ভবিতব্য ‘সস্তার শ্রমিক’ হওয়া। রাষ্ট্র সেটাই চাইছে, কারন শিক্ষিত হলে তারা প্রশ্ন করবে? কি পাচ্ছে আর কি পাওয়া উচিত তার হিসেব চাইবে।
পুনশ্চ: এই ঘটনায় কিন্তু কোন শিক্ষককে প্রতিবাদী মিছিল নামাতে দেখবেন না।












যে যত বেশি ট্যাক্স দেয় তার তত বেশি সামাজিক সুবিধা এনজয় করার দাবি থাকে। এই বক্তব্যকে আমরা একটু অন্যভাবে দেখি না কেন? ট্যাক্স তো আসলে সমাজের প্রতি সার্ভিস। এ সার্ভিস কারা কি পরিমাণে দেয়? বিভক্ত সমাজে সবচেয়ে বেশি ট্যাক্স দেয় দলিত, অতিদলিত ও মহিলারা। তাদের হিউজ সার্ভিসের বিনিময়ে সমাজ তাদের অতি সামান্য মূল্য ফিরিয়ে দেয়। আর তাদের উদ্বৃত্ত শ্রমের মূল্য ভোগ করে সমাজের অলস উচ্চবর্ণের অভিজাত প্রতিনিধিরা। সমাজের প্রতি সার্ভিস যাদের প্রায় শূন্য। যে মানুষটি অন্ধকার খনির গভীরে নামে সভ্যতার চালিকাশক্তি তুলে আনতে, তার সন্তান থাকে অনাহারে, শিক্ষাবঞ্চিত। সে তার জীবন দিয়ে সমাজকে সর্বোচ্চ ট্যাক্স দেয়। অবশ্যই তারই দাবি সর্বোচ্চ হওয়া উচিত।