আজ আপনাদের কোলকাতার এক ডাক্তারবাবুর কথা বলবো। এই মুহূর্তে অবশ্য ঠিক চিকিৎসক হিসেবে নয় , একজন সামাজিক উদ্যোগপতির ভিন্ পরিচয় নিয়ে তিনি আর্ক ল্যাম্পের নিচে এসে দাঁড়িয়েছেন। কলকাতায় থাকলেও তিনি কিন্তু জন্মসূত্রে বাঙালি নন ,পঞ্চনদীর দেশের মানুষ পঞ্জাবি সর্দার। মানুষটির নাম জস্মিত সিং অরোরা, বয়স ৫১ । কলকাতায় বসে তিনি সারা দেশ জুড়ে এক নতুন ধরনের আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। নতুন এক ভাবনার মন্ত্রে দেশের কৃষিজীবী মানুষদের উদ্বুদ্ধ করে , নতুন এক কৃষি বিপ্লবের আহ্বান জানিয়েছেন। আমরা আজ এই মানুষটির ব্যতিক্রমী কাজ কর্মের সাথে পরিচিত হব , জানবার চেষ্টা করবো একজন চিকিৎসক থেকে “গুটলি ম্যান অব ইন্ডিয়া” বা ভারতের আঁটি মানুষ হয়ে উঠলেন কীভাবে? তাঁর এই কর্মপ্রয়াসের সূত্রে অনাদরে পড়ে থাকা আমের আঁটি আজ আমাদের রাজ্যের ও দেশের কোণে কোণে থাকা কৃষক বন্ধুদের নতুন স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে। আভাস পাওয়া যাচ্ছে বড়োসড়ো পরিবর্তনের।
উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তনের বিষয়টি আজ শুধু তত্ত্বকথা নয়, সবাই এই পরিবর্তনের প্রতিফল হারে হারে টের পাচ্ছি। পরিমিত বৃষ্টিপাতের অভাবে একদিকে যেমন বাড়ছে খরার দাপট , অন্যদিকে প্রবল বৃষ্টি হঠাৎ করে ডেকে আনছে বন্যা। আবহাওয়ার এই খামখেয়ালিপনার কারণে ভারতের মতো ক্রান্তীয় মৌসুমী বৃষ্টিপাতের দেশেও জলের জোগানে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই অনিশ্চয়তা দেশের কৃষি ব্যবস্থার পক্ষে মোটেই অনুকূল নয়। দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ ভাগের রাজ্যগুলোতে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি বলে এখানে অতিরিক্ত জলের চাহিদা যুক্ত ধান চাষ করা হয়। অথচ ধানের উৎপাদন তুলনামূলক ভাবে কম। উৎপাদন কমে গেলে কৃষকের জীবনে হতাশা নেমে আসে। কৃষকদের এই অবস্থা থেকে মুক্ত করতে ডঃ জস্মিত আম গাছ লাগানোর কথা বোঝাচ্ছেন কৃষকদের। তাঁর বিশ্বাস এর ফলে কৃষকরা সুনিশ্চিত আয়ের সুযোগ পাবেন, কার্বন নিঃসরণ কমবে, রক্ষা পাবে জীববৈচিত্র্য। কৃষি – বনায়নের আদর্শের সূচনা হলো এই প্রচেষ্টার সূত্রে।

বিগত কয়েক দশকে তিনি রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন কেবলমাত্র সেখানকার ভূমিস্তরে বসবাসকারী কৃষিজীবী মানুষদের দুঃখ দুর্দশা অনগ্রসরতার কারণগুলোকে সরজমিনে দেখে আসতে। সুন্দরবন,পুরুলিয়া, বাঁকুড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে তিনি চাক্ষুষ করলেন ঐসব প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষজনের জীবনসংগ্রামের বাস্তব অবস্থা। কৃষকেরা শুধুমাত্র প্রাকৃতিক অনিয়মের শিকার নন, কৃষি ঋণের সমস্যা, সামান্য আয়ে সারাবছর সংসার প্রতিপালনের সমস্যা, মহাজনদের উৎপাত , উৎপন্ন ফসলের উপযুক্ত দাম না পাওয়া – এমনই হাজারো সমস্যার জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয় দেশের কৃষক জীবন।
এই মুহূর্তে বর্জ্য থেকে সম্পদ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে দিকে দিকে। ডঃ জস্মিত তাঁর এই কর্মপ্রয়াসকে সম্পদ সৃষ্টির প্রচেষ্টা বলেই মনে করছেন। গ্রীষ্মকালীন আমের মরশুমে জস্মিত এবং তাঁর সহযোগীরা বাড়ি, স্কুল, হোটেল, বাজার ঘুরে ঘুরে আমের আঁটি সংগ্রহের কাজে কোমর বেঁধে নেমে পড়েন। এরপর সেগুলোকে যথোপযুক্ত ভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে দু তিন দিন ধরে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয়। আর তারপর আঁটি গুলোকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় দক্ষিণ ২৪ পরগণার আমতলায় পাঁচ একর জমির ওপর গড়ে তোলা কৃষি খামারে।
তবে আমগাছ লাগালেই তো আর তাতে ফল ধরবে , চাষিরা তা পেড়ে নিয়ে বাজারে বিক্রি করে উপার্জন করা শুরু করবেন এমনতো নয়, ফলের জন্য বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করে থাকতে হবে। তাহলে কী উপায়? এই সমস্যার কথা মাথায় রেখে ডঃ জস্মিত দ্রুত ফলনশীল কিছু ফলের চারা বিতরণ করেছেন কৃষকদের মধ্যে যাতে কিছুটা সুরাহা হয়। তবে এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা , জীববৈচিত্রের সংরক্ষণের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটাও কিন্তু খুব কম জরুরি কাজ নয়। কলকাতার বেশ কিছু স্কুলে গাছ লাগানো হয়েছে। তাদের দেখভাল করতে এগিয়ে এসেছে শিক্ষার্থীরা, তৈরি হয়েছে হাতেকলমে পরিবেশ শিক্ষার সুযোগ। ব্যারাকপুর সেনানিবাসেও পরিবেশ বাঁচানোর এই কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামীদিনে এর গভীর সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন ডঃ জস্মিত সিং অরোরা।
ফেলে আসা সাতটি বছরে আমের আঁটি সংগ্রহের এই অভিনব কর্মকাণ্ড এক নীরব বিপ্লবের চেহারা নিয়েছে। ডঃ জস্মিত সিং অরোরার এই অভিযানে সামিল হয়েছে এই শহরের বেশ কিছু নামিদামী স্কুল। স্কুল কর্তৃপক্ষ আম খেয়ে আঁটি গুলোকে ফেলে না দিয়ে জমিয়ে রাখতে অনুরোধ করেছেন তাঁদের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। এভাবেই একটু একটু করে জস্মিত সিং অরোরার স্বপ্ন এক নীরব নিভৃত নিরলস গণ আন্দোলনের চেহারা নিয়েছে। জস্মিত প্রমাণ করেছেন যে সব আন্দোলনের জন্য পথে নামার দরকার নেই।নীরব মন্ত্রসাধনাও অনেক গভীর ও স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
জস্মিতের আক্ষেপ, “মানুষ তাঁর সুবিধার জন্য এই পৃথিবীর অনেক ক্ষতি করে ফেলেছে, বদলে ফেলেছে অনেক সুন্দর সহাবস্থানের আদর্শকে।এর মেরামতের প্রয়োজন । নাহলে এই পৃথিবী আর জীবকুলের বাসযোগ্য থাকবেনা। অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে। এবার সত্যিকারের কাজের সময়।”
ঋণ স্বীকার
সংবাদ পত্রের সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদন।
এপ্রিল ০৭.২০২৫












এইভাবে প্রকৃতি কে সঙ্গে নিয়ে জীব বৈচিত্র্য ও জীবন বৈচিত্র্যের যে মেল বন্ধন ঘটানো যায় লেখকের এই লেখা আমাদের চোখ খুলে দিল। প্রত্যক্ষ ভাবে না হয়ে ও যে পরোক্ষভাবে ও আমরা প্রকৃতি কে বাঁচিয়ে রাখতে পারি ডঃ জস্মিতের এই কর্মকাণ্ড অনেক অনুপ্রাণিত করলো। সামনে ই আমের সিজনে আমরা এই সুযোগে র সদ্ব্যবহার করলে জস্মিতের মতো আরো অনেক মানুষ এই কাজে ব্রতী হবে।
একদম ঠিক কথা। জস্মিতের কাজ হয়তো নতুন করে আমাদের নজর ঘুরিয়ে দিলো। সহজ সুন্দর সার্থক সমাধান।
Mango-ficent initiative 😇❤️🔥😇
Singh Ji ficent as well.
এভাবে ভাবতে পারার মানুষ খুব কম।সফল হোক ডাক্তার বাবুর প্রয়াস।
লেখককে ধন্যবাদ।তিনি ধারাবাহিকভাবে পজিটিভ ভাবনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন।
নেতি নয়নে সব কিছু দেখার অভ্যাস ছাড়তে হবে। কত সহজ সমাধানের উপায় রয়েছে, অথচ আমাদের নজর টানে না। ভাবতে হবে অবশ্যই।
কত জিনিসই আমাদের অজানা থাকে, এ তারই প্রমাণ..সাধুবাদ ওঁনাকে…
সাধুবাদ অবশ্যই প্রাপ্য। আসলে কিছু মানুষ এমনই হন। সবসময়ই তাঁরা নতুন কিছু করার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন। সিংজীর মতো মানুষ আরও প্রয়োজন।
জসমিত সিং এক অসাধারণ কাজ করে চলেছেন।এ সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। এই লেখাটি আমাদের সে সম্পর্কে অবগত করালো। ধন্যবাদ জানাই লেখককে।
যুযুধান পৃথিবীতে এক বিরল প্রয়াস। এখান থেকে আমাদের সজাগ হতে হবে।