অনেক মন্দিরের সামনে একটা ঘণ্টা ঝোলানো থাকে। এই ঘণ্টা ধনী গরীব নির্বিশেষে একটা স্টিমুলাসের কাজ করে। কুকুরের গাড়ির টায়ার ল্যাম্পপোস্ট বা তুলসী গাছ দেখলেই পা তোলার অদম্য ইচ্ছা হয়। ঠিক তেমনি মানুষের এই মন্দিরের ঘণ্টা দেখলেই একবার ঢং করে বাজাবার ইচ্ছা হয়। মন্দিরে চল্লিশটা বিগ্রহ থাকলে সবকটা মানুষ মন দিয়ে দেখুক না দেখুক, ঘণ্টা একবার বাজাবেই।
সমাজের তথাকথিত সেকু মাকুদের অবস্থা এখন মন্দিরের ঘণ্টার মতো। যে পারে সে একবার বাজিয়ে যায়।
বাড়িতে বউ ভাত দেবার সময় মুখ ঝামটা দিয়েছে। দে সেকু মাকুদের গাল দে। ছেলে বা মেয়ে পরীক্ষায় রেজাল্ট ভালো করেনি। দে সেকু মাকুদের গাল দে। অফিসে বস কাজ খারাপ করার জন্য ঝাড় দিয়েছে। দে সেকু মাকুদের গাল দে। কাশ্মীরে জঙ্গী হামলা হয়েছে। আর্মি আর গোয়েন্দা বিভাগ এখনো জঙ্গিদের টিকি খুঁজে পায়নি। দে সেকু মাকুদের গাল দে। দুর্নীতিমূলক প্রক্রিয়ায় নিয়োগ হয়েছিল তাই ২৬০০০ চাকরি গেছে। দে সেকু মাকুদের গাল দে। প্রেমে ব্যর্থ স্বামী স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি, ভাড়াটে উঠছে না। দে সেকু মাকুদের গাল দে।
এখন তো শুনছি সহবাসে অক্ষমতা, শীঘ্রপতন, ইন্দ্রিয় শিথিলতা, ছোটো ও বাঁকা হলেও সেকু মাকুদের গাল দিচ্ছে। এমনকি গুপ্তারোগ হলেও সেকু মাকুদের গাল দেয়া শুরু হয়েছে।
এই নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। সেকু মাকুদের গাল দিয়ে যদি যাবতীয় ব্যক্তিগত পরিবারগত রাজ্যাগত দেশগত এমনকি বিশ্ব উষ্ণায়ন মেরুবরফ গলা সেনসেক্স পতন ইত্যাদি সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যায় সেতো বড় আনন্দের কথা। যদি সমাধানের স্থিরতা পাই তাহলে আমিও অষ্টপ্রহর সংকীর্তনের মতো আমিও গাল দেবো। একেবারে পাকা কথা দিলাম।
এবার আসি সমস্যার কথায়।
চারদিকে এক ব্যাপক হাহাকার চলছে। গোরু হারালে শুনেছি মানুষ বউকেও মা বলে ডেকে ফেলে। এ প্রায় সেরকম অবস্থা। হাহুতাশ চলছে যে ব্যাপক হিন্দু সংহতি দরকার। এটাই নাকি এখন দেশের একমাত্র সমস্যা। তা বাপু এর সঙ্গে আমি এক্কেরে একমত। সংহতি প্রায় নেই বললেই চলে। সেদিন গেছিলাম ভাগবত পাঠ শুনতে। ভালোই লাগলো। শেষে বলে কিনা আমিষ ছাড়ুন। আহারের ওপর নাকি সাধনার সিদ্ধি নির্ভর করে। ওদিকে আমি বাড়িতে দেড় কেজি খাসির মাংস দই মাখিয়ে রেখে এসেছি। বাবাজির কথা শুনলে ওটা ফেলে দিতে হয়। আমি সাড়ে তিনঘন্টা বসে থেকে সংহতির চেষ্টা করলাম। বাবাজি খাসির মাংসের বিষয়ে এমন গাঁট হয়ে থাকলো যে সংহতি ভেঙে গেলো।
আমাদের বাড়িতে একজন বৈষ্ণব মহিলা আসেন। ওনার বাড়ির হরি সংকীর্তনের সময় সপরিবার গিয়ে ভোগ খেয়ে এসেছিলাম। কিছুদিন আগে বেতাল কালীর পুজোর ভোগ এসেছিল বাড়িতে। দারুন খিচুড়ি পায়েস। ওনাকে বললাম একটু খেয়ে যান। উনি বললেন ওনারা দীক্ষিত। মহাপ্রভু ছাড়া আর কারুর প্রসাদ ওনারা ছুঁয়েও দেখেন না। আমার সংহতির ব্যাপক চেষ্টা জলে চলে গেলো।
অনেকেই বলে এতো দেবতার পুজো করা হয় বলেই সংহতি হচ্ছে না। কথার মধ্যে যুক্তি আছে। বাস্তবতা কতটুকু আছে সেটা প্রশ্নের মুখে। মুসলিমরা এক আল্লা আর ক্রিশ্চান এক গড নিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে যে মারামারি করেছে, সেটা দেখে একেশ্বরবাদের বিষয়ে বেশ ভয় পেয়েই থাকি।
একেশ্বরবাদ নিয়ে ব্রহ্মরা ইংরেজ আমলে বেশ চেষ্টা করেছিলো। ফল হয়েছে তিনটে ব্রাহ্ম সমাজ আর তাদের লাঠালাঠি। তিনটে সমাজের মধ্যে যিনি সবচেয়ে প্রসিদ্ধ তিনি কেশব চন্দ্র সেন। একেশ্বর খুঁজতে ব্রাহ্মরা বেদেও বিশেষ সুবিধা করতে না পেরে উপনিষদে এসে ঢুকেছিলো। সেখান থেকে ব্রহ্মের ধারণা নিয়ে এসে ধম্ম খাড়া করার চেষ্টা করেছিলো। মুস্কিল হলো এই ব্রহ্ম এবং মানস গোচর। এর সম্মন্ধে একটি শব্দ উচ্চারণ করা সম্ভব নয়। এটা হলে তো আর ধম্ম দাঁড়ায় না। তাই উপায় বেরুলো। ব্রহ্ম নামক বোতলে যাকে পোরা হলো সে উপনিষদের ব্রহ্ম নয়। বোতলে ঢুকলো ক্রিশ্চান এর গড বা মুসলিমের আল্লা। গোঁজামিলের ফল ভালো হয় না। এই ধম্মও টিকলো না। কেশব সেনের একটা সুবিধা ছিলো। উনি সংস্কৃত জানতেন না। ফলে বাইবেলকে ঘষে মেজে ভারতীয় করে চালানো ছাড়া ওনার আর কোনো উপায় ছিলো না। (রবি ঠাকুর এই বিষয়টা ধরে ফেলেছিলেন। গোরা উপন্যাস দেখলেই বোঝা যায়।)
এই চেষ্টা আজকে নয়, আগেও বহুবার হয়েছে। সেন আমলে বাইরে থেকে বামুন আনা হয়েছে। বাংলার ধর্মের জলহাওয়া এমন খারাপ সেই বৈদিক বামুনও দুয়েক প্রজন্ম পরেই কালী অথবা কৃষ্ণ ভজতে শুরু করেছে।
এখন সনাতনী ধর্ম বলে আরেকটা হুজুগ উঠেছে। ধর্মের ইতিহাসের বিচারে বৈদিক ধর্ম নেহাত নবাগত। সনাতনী ধর্ম বলে যদি কিছু থেকে থাকে সেটি আর্য আগমনের আগে ভারতের অধিবাসীদের যে ধর্ম বা ধর্মগুলি ছিলো সেগুলি। বৈদিক ধর্মকে সনাতনী বলা আর সোনার পথরবাটি বলা একই জিনিস। বৈদিক ধর্মের আগে কি ধর্ম ছিলো তার গবেষণার মাল মসলা হরপ্পা মহেঞ্জোদারো খুঁড়ে বামুনের পো রাখালদাস অনেক আগেই আমাদের হাতে পৌঁছে দিয়েছে।
সেই সনাতনী ধর্মের বর্তমান রূপ আজকেও শুধু টিকে আছে তাই নয়, রীতিমতো অনুশীলনের মধ্যে আছে। তার খোঁজ পেতে গেলে, যেতে হবে বেলুচিস্তানের আড়াই লাখ হিন্দুর কাছে, অথবা কাশ্মীরের তাড়া খাওয়া পন্ডিতদের কাছে, অথবা একান্ন পিঠের কাছে।
যেকোনো সত্যিকারের সংহতি তৈরি হয় এক টেবিলে বসে খাবার যোগ্যতা বা অধিকারের ওপরে। সাহেবরা ডিনারের নিমন্ত্রণ এইজন্যই করে। ট্রাম্প যখন হোয়াইট হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে নিমন্ত্রণ করেছিলো, তখন সেখানে শুধু আমেরিকান খাবার নয় সঙ্গে ভারতীয় খাবারের নানা পদ সাজানো হয়েছিলো। এখানেই সংহতির শুরু হয়।
আমি এখনো এক ধর্মীয় ডিনারের স্বপ্ন দেখি। যে ডিনারে তারাপিঠের মায়ের ভোগ তিরুপতি বালাজির ভোগ কামরূপের ভোগ জগন্নাথের ছাপ্পান্ন(ইঞ্চি নয়) ভোগ রামমন্দিরের ভোগ আরো বিখ্যাত মন্দিরের ভোগ সার্ভ করা হবে। সকল রকমের হিন্দু সেখানে গিয়ে নিজেদের ভক্তি অনুযায়ী ভোগ নিয়ে এক টেবিলে বসে খাবে। সব টেবিল সবার জন্য থাকবে। জাতপাত ভিত্তিক কোনো ভাগ থাকবে না।
যেদিন এটা হবে সেদিনই ওই তথাকথিত হিন্দু সংহতির শুরু হবে। ভারতীয় দার্শনিক ট্র্যাডিশন অনুযায়ী ওখানে অবশ্য নাস্তিকদের জন্যও ব্যবস্থা রাখতে হবে। সেকু মাকুদেরও আটকানো যাবে না।
সংহতি চাইলে সংহতির জন্য কাজ করুন। বৃথা গাল দিয়ে কোনো লাভ নেই।
সবাই ভালো থাকুন। আনন্দে থাকুন। আনন্দে ঘাটতি পড়লে সেকু মাকুদের গাল দিন।










