আগে যে সব খাদ্যকে হেলাফেলার দৃষ্টিতে দেখা হতো, ইদানীং সে সব খাদ্য আবার মানুষের খাদ্য তালিকায় ফেরত আসছে। শুধু ফেরত আসছে তাই নয়, একেবারে হই হই কাণ্ড করে ফেরত আসছে। তেমন একটি খাদ্য হলো কুলেখাড়া শাক। যা ঝোপে ঝাড়ে, ঘরের পেছনে আগাছার জঙ্গলে নিতান্ত অবহেলায় জন্মায়, বড় হয়। যার গাল ভরা বৈজ্ঞানিক নাম হাইগ্রোফিলিয়া অরিকুলেটা।
এক পাঠিকা জানতে চেয়েছেন কুলেখাড়া শাকের খাদ্যগুণ সম্পর্কে। তিনি আরও জানতে চেয়েছেন এই শাক রক্তাল্পতার চিকিৎসায় কাজ দেয় কিনা?
উত্তরঃ এই প্রশ্নের উত্তর জানার আগে আমাদের জানতে হবে কুলেখাড়া শাকের খাদ্যগুণ সম্পর্কে। এটা জানার জন্য আমরা কুলেখাড়া শাককে তুলনা করব সবচেয়ে জনপ্রিয় শাক পালং শাকের সাথে।
যেহেতু কুলেখাড়া শাক সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা এটি রক্তাল্পতার চিকিৎসায় খুব ভালো কাজ দেয় তাই প্রথমে এই বিষয়টা পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। বিশেষ করে এই শাকের নামেই বাজারে রক্ত বাড়ানোর একটি জনপ্রিয় আয়ুর্বেদিক ওষুধ দেদার বিক্রি হয়।
এরপর থেকে যা হিসাব দেওয়া হবে প্রতি ১০০ গ্রামের হিসাব। ১০০ গ্রাম কুলেখাড়া শাকের পাতায় আয়রন থাকে ৭ মিলি গ্রাম, সেখানে পালং শাকে থাকে মাত্র ১ মিলি গ্রাম। তাছাড়া আমরা জানি ভিটামিন সি, আয়রনকে খাদ্যনালী থেকে শোষণে সাহায্য করে, কুলেখাড়ায় ১০০ গ্রামে ভিটামিন সি থাকে ৫০ মিগ্রা, অন্যদিকে পালংশাকে ২৮ মিগ্রা, কুলেখাড়ার প্রায় অর্ধেক। এই ভিটামিন সি বা অ্যাসকরবিক এসিড নিরামিষ খাবারের নন হিম আয়রনের ফেরিক আয়রনকে ফেরাস আয়রনে পরিণত করতে সাহায্য করে, যা খাদ্যনালীতে সহজে শোষিত হয়। কুলেখাড়ায় আয়রন ও ভিটামিন সি দুটোই অন্যান্য শাকের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে থাকে। তাই এটি অন্যান্য শাকের তুলনায় রক্তবাড়াতে অনেক বেশি কার্যকর।
কিন্তু, হ্যাঁ এখানেও একটা বড় কিন্তু আছে। খাদ্যে আয়রন থাকে দুই রকম ভাবে। হিম আয়রন আর নন-হিম আয়রন। আমিষ খাবার যেমন, মুরগী, খাসির মাংস, ডিম, মাছ ইত্যাদিতে মূলত হিম আয়রন থাকে।
অন্যদিকে নিরামিষ খাবারে থাকে নন- হিম আয়রন। এখন আমাদের খাদ্যনালীতে নন-হিম আয়রনের থেকে হিম আয়রনের শোষণের হার অনেক বেশি। উদ্ভিজ্জ নন- হিম আয়রনের শোষণের হার ২- ১৫%, অন্যদিকে প্রাণীজ হিম আয়রনের শোষণের হার ২০- ৩৫%।
তাছাড়া খাদ্যের বিভিন্ন উপাদান নন হিম আয়রনের শোষণের হার পরিবর্তন করে। যেমন ক্যালসিয়াম, ফাইটেট, এন্টাসিড এগুলি কমায় এবং ভিটামিন সি, প্রাণীজ প্রোটিন এগুলি শোষণের হার বাড়ায়।
অন্যদিকে হিম আয়রনের ক্ষেত্রে আয়রন শোষণের হার ফাইটেট বা অন্যান্য খাদ্য দ্বারা খুব বেশি প্রভাবিত হয় না।
তাই একথা সহজেই বোঝা যাচ্ছে শাকপাতার মধ্যে কুলেখাড়া আয়রনের উৎস হিসাবে যথেষ্ট সমৃদ্ধ হলেও রক্তাল্পতা প্রতিরোধে এর থেকে আমিষ খাবার অনেক উন্নত মানের। তবে প্রায় বিনা পয়সায় পাওয়া এই খাবার ভারতবর্ষের মতো একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশে রক্তাল্পতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। যেখানে একবেলা আমিষ খাবার জোগাড় করা এদেশের এক বিরাট অংকের মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
এছাড়াও কুলেখাড়া শাক পটাশিয়াম, কপার, রাইবোফাভিন, বিটা ক্যারোটিন ইত্যাদি মিনারেল ও ভিটামিনে ভরপুর। অন্যান্য জনপ্রিয় শাকের তুলনায় এই সব মিনারেল ও ভিটামিন কুলেখাড়ায় অনেক বেশি পরিমাণে থাকে। তাই একথা বলাই যায়, কুলেখাড়া শাক মোটেও অন্যান্য শাকের থেকে নিম্নস্তরের নয়। এই শাককে অবশ্যই খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ।










