খবর পেলাম, স্যার আর নেই।
স্যার বলতে অধ্যাপক বরুণ কাঞ্জিলাল।
এ পাড়ায় কজন স্যারকে চেনেন জানি না, কিন্তু স্বাস্থ্য-অর্থনীতির ফিল্ডে স্যার দেশের মধ্যে অন্যতম খ্যাতিমান মানুষ।
আমি স্যারের সরাসরি ছাত্র ছিলাম না। আলাপ অদ্ভুতভাবে। স্বাস্থ্য-বিষয়ে আমার পূর্ববর্তী বই – কিনে আনা স্বাস্থ্য : বাজার অর্থনীতি মুনাফা আর আপনি – “এই সময়” কাগজে বড় করে সে বইয়ের রিভিউ করেছিলেন তিনি। রিভিউ পড়ে চমৎকৃত হয়ে আমি স্যারের ফোন নম্বর জোগাড় করি, এবং যোগাযোগ তার পর থেকেই।
স্বাস্থ্য-অর্থনীতি বিষয়ে বিশেষ শিক্ষা না থাকায় স্বল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী হয়ে আলটপকা লেখালিখির প্রবণতা চারপাশেই, যার মধ্যে আমিও পড়ি। তো হেলথ ইকনমিক্স-এর এক-দুখানা স্ট্যান্ডার্ড টেক্সটবই পড়তে গিয়ে, অল্পবিস্তর বুঝতে পারলেও মনে হচ্ছিল, এসব বইয়ে যা লেখা রয়েছে, তার সঙ্গে আমাদের বাস্তবতার বিশেষ মিল নেই। ঠিক এই সময়েই স্যারের সঙ্গে আলাপ। তো স্যার বললেন, না, ওসব বই দিয়ে এদেশের স্বাস্থ্য-অর্থনীতি বুঝতে চাইলে মুশকিল। কী কী বই পড়লে সুবিধে হবে, সেসব স্যারই বললেন – পড়তেও দিলেন দুখানা। তারপর থেকেই, মানে প্রায় বছরপাঁচেক হলো, স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। কোভিডের দিনগুলোতেও হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারে কথা হতো। মোটের উপর অনিয়মিতই, কিন্তু যোগাযোগ ছিল। লেখাপত্র পড়ে মতামত জানাতেন। আমাদের বাসস্থানের মধ্যে খুব দূরত্ব ছিল না – কিন্তু কিছুতেই মুখোমুখি দেখা হয়নি। কারণটা, মূলত, আমার আলস্য – আর দ্বিতীয়ত, আমার সঙ্কোচ হতো, এত বড় একজন মানুষের কাছে গিয়ে কী বলব।
হ্যাঁ, অধ্যাপক হিসেবে যতখানি, মানুষ বরুণ কাঞ্জিলাল ঠিক ততখানিই উঁচু গোত্রের। কথা বললেই সেটুকু বোঝা যেত, আর অন্যের মুখে তো শুনেছিলামই।
গতবছর স্যারের ক্যানসার ধরা পড়ল। আমাদের কথাবার্তার প্রসঙ্গটা খানিক বদলে গেল। কিন্তু স্যারের ভাবনাচিন্তা বা কথাবার্তার ইতিবাচকতার উপর তার কোনও প্রভাব পড়তে দেখিনি। চিকিৎসা যারা করছিল, তাদের অধিকাংশই আমার পরিচিত – বন্ধু বা জুনিয়র। চিকিৎসায় ভালো সাড়া মিলল। তার পর থেকে আর অসুখ নিয়ে কথা বলতাম না – ভালো আছেন এটুকু জেনেই পুরোনো স্বাস্থ্য-অর্থনীতি বিষয়ক প্রশ্নে ফিরে যেতাম।
আমার সর্বশেষ স্বাস্থ্য-বিষয়ক বই – চিকিৎসা : বিজ্ঞান/কাণ্ডজ্ঞান – পড়ে মতামত জানালেন। গত মাসের শেষ দিকে।
.
.প্রিয় বিষাণ, তোমার গ্রন্থটি অত্যন্ত আগ্রহভরে পড়েছি।
একথা বলা দরকার গভীরতা, ব্যাপ্তি, এবং ব্যঞ্জনায় এই গ্রন্থটি আগেরটির তুলনায় অনেক এগিয়ে। নিবন্ধগুলির মধ্যে যে অন্তর্লীন যোগসূত্র তা সবজায়গায় পরিস্কার না হলেও পড়তে খুব অসুবিধা হয় না।
একটা অনুরোধ: এর পরের পুস্তকটিতে চিকিৎসা প্রার্থীদের ‘Righr to dignity and privacy’ নিয়ে একটা লেখা থাকলে ভাল লাগবে। যাই হোক, তোমার লেখার উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি কামনা করে শেষ করছি।
.
.উত্তরে লিখেছিলাম :
জানেন স্যার, এই বইটা বেশ পরিশ্রম আর যত্ন নিয়ে লেখা।
অথচ কেউই বইটা নিয়ে ভালো-খারাপ কিছুই বলছেন না। সেজন্য একটু হতাশ লাগছিল। কেননা চিকিৎসার বিভিন্ন দিক নিয়ে বাংলাভাষায় সেভাবে আলোচনা হতে দেখি না – সেকারণেই, নিজের বই হলেও, এই বইটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়।
আপনার মতামত পেয়ে মন ভরে গেল।
.
.স্যার লিখেছিলেন :
এসব গ্রাহ্য কোরো না। লিখে যাও, এসবের গুরুত্ব ঠিক কিছু মানুষের মাথায় ঢুকবে।
.
.স্যারের সঙ্গে শেষবার কথোপকথন সেদিনই। শরীরের খবর জিজ্ঞেস করা হয়নি – শেষবারের মতো অসুস্থ হয়েছিলেন কিনা, সেটাও জানতে পারিনি। আজ মৃত্যুসংবাদ পেলাম, সে-ও দুদিন পুরনো। মনখারাপের পাশাপাশি বড্ডো ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সঙ্গে অপরাধবোধও।
বরুণ কাঞ্জিলালের সঙ্গে দেখা হলো না। সামনাসামনি প্রণামও করা হলো না।
স্যার বলেছিলেন : কলকাতায় তো দেখা হচ্ছে না, ঝাড়গ্রামে গেলে দেখা হবে। যাবার ইচ্ছা আছে।
মৃত্যুর পর জীবিতের স্মৃতি বাদে আর কোথাও কিছু থাকে বলে বিশ্বাস হয় না। নইলে বলতাম, স্যার, দেখা ঠিক হবেই।










