কালিয়াগঞ্জ হাসপাতালে সেকেন্ড এমও হয়ে তিন সাড়ে তিন বছর কাটিয়ে দেওয়ার পরে ডক্টর কোলে হঠাৎ রায়গঞ্জ জেলাসদরে ডিসট্রিক্ট মেটার্নাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ অফিসার হিসেবে বদলি হয়ে গেলেন।
আমি হলাম কালিয়াগঞ্জের নতুন ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক বা বিএমওএইচ। মাছ যেন বন্ধনহীন হয়ে জলে পড়ল।
ফিল্ডের কাজকর্মের সঙ্গে ভালভাবে পরিচিত হওয়ার ফলে এই নতুন দায়িত্ব কাঁধে চাপায় আমার কিছুমাত্র অসুবিধে হয়নি। ডক্টর কোলের ছায়াসঙ্গী হয়ে ঘুরতাম বলে অফিস চালানোর প্রশাসনিক খুঁটিনাটির বিষয়েও মোটামুটি অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছিলাম ততদিনে। তবু প্রতিটি মানুষের একজন ‘ফ্রাইডে’-র প্রয়োজন হয় – সে ম্যান বা উওম্যান যেই হোক না কেন! ডক্টর কোলের ছিলাম আমি। সোজাসুজি চিকিৎসার ব্যাপারে আমার কোনো উদগ্র আকুলতা ছিল না, কিন্তু হাসপাতালের অন্যান্য ডাক্তারদের তো তা ছিল। তাদের কাছে তো ডাক্তারিটাই প্রথম, দ্বিতীয় এবং অনন্ত প্রেম। আমার মতো লক্ষ্মীছাড়া এমবিবিএস তো আর কেউ নয়। আমার তাই ‘ফ্রাইডে’ হওয়ার জন্য অন্য কোনো ডাক্তারকে ব্যস্ত করতে ইচ্ছে করল না।
কালিয়াগঞ্জ হাসপাতালের একটি নিজস্ব জিপগাড়ি ছিল – মাঠে ঘাটে ধুলো কাদা মেখে ঘুরে বেড়ানোর জন্য আমার একমাত্র একনিষ্ঠ বাহন। সেই জিপের ড্রাইভার কালীদা, অফিসের অর্ডার-নোটিস-কাগজপত্র সম্পর্কে রীতিমত ওয়াকিবহাল গ্রুপ ডি দাদা সুরেশদা, কিছু সিনিয়র হেলথ সুপারভাইজার যেমন নিরঞ্জনবাবু, শীতল আচার্যিদা, বিজনবাবু, পিএইচএন দিদি ইতিদি, পরে অনুপমাদি, ডিলিং ক্লার্ক মহিমবাবু – এঁদের নিয়ে তৈরি করলাম আমার নিজস্ব প্রাইমারি হেলথ কেয়ার টিম। পরে সে টিমে যোগ দিলেন ডক্টর জীবেশ সাহা, আমার নতুন সেকেন্ড এমও। এমন একজন মানুষ যাঁর মুখে কোনো কাজে, কোনো সময় আমি ‘না’ শব্দটা শুনিনি। সে কোনো দূরবর্তী প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কোনো অনুপস্থিত ডাক্তারের হয়ে ডিউটি দেওয়াই হোক বা কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মীদের স্মারকলিপি দেওয়ার হাঙ্গামা সামলানোর ক্ষেত্রেই হোক, জীবেশদা হামেহাল হাজির।
বিএমওএইচ হওয়ার পরে আমি কিন্তু হাতে কলমে চিকিৎসার ব্যাপারটা একেবারে ছেড়ে দিইনি। অফিস ও ফিল্ডের কাজ সামলেও কালিয়াগঞ্জ হাসপাতালে সপ্তাহে তিনটি করে শিফটে ডিউটি আমি জারি রেখেছিলাম।
এই সময়ের দুটি ঘটনার কথা ভীষণভাবে মনে পড়ছে।
বিষক্রিয়া-র রোগী প্রচুর আসত কালিয়াগঞ্জ হাসপাতালে। এখানে বিষক্রিয়া বলতে আমি খাদ্যে বিষক্রিয়ার কথা বলছি না, বলছি অরগ্যানোফসফরাস পয়জনিং এর কথা।
অর্গ্যানোফসফেট এক ধরণের যৌগ যা মূলত চাষের ফসলে কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ক্ষেতে বিষ ছড়াবার সময় অসাবধানে এই যৌগ অধিক পরিমাণে নাকে মুখে ঢুকে গেলে সাংঘাতিক বিষক্রিয়া হয়। রোগী মুখে গ্যাঁজলা তুলে অজ্ঞান হয়ে যায় — তৎক্ষণাৎ বিষক্ষয়ের চিকিৎসা আরম্ভ না করা গেলে রোগীর মৃত্যু হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়।
একদিন বিকেলের দিকে আমার ডিউটি চলাকালীন একটি নেতিয়ে পড়া রোগীকে নিয়ে হল্লা করতে করতে জনা পাঁচ ছয় লোক ইমার্জেন্সিতে ঢুকল। অন ডিউটি সিস্টার দিদিকে নিয়ে আমি ছুটলাম ডক্টরস রুম থেকে। গিয়ে দেখি, অল্পবয়সি পুরুষ, ঠোঁটের কষে সাদাটে ফেনা জমে আছে, হাত পা ঠান্ডা, জ্ঞান নেই। টর্চ মেরে দেখলাম, চোখের তারা আলপিনের মাথার মতো সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছে — পিন পয়েন্ট পিউপিল। বাড়ির লোকেদের দিকে ফিরলাম। ইতিহাস সংক্ষিপ্ত। মাঠে বিষ ছড়াচ্ছিল, অসাবধানে মুখে গামছা বেঁধে নিতে ভুলে গিয়েছিল।
মাঠেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে,পড়শি কৃষকেরা কালবিলম্ব না করে হাসপাতালে নিয়ে চলে এসেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মুখে ঘটনার বৃত্তান্ত শুনতে শুনতেই দেখলাম সিস্টার ড্রিপ আর অ্যাট্রোপিন ইঞ্জেকশন রেডি করে ফেলেছেন। অ্যাট্রোপিন – অর্গ্যানোফসফরাস পয়জনিংএর একমাত্র অ্যান্টিডোট।
তারপর সারারাত ঘড়ি ধরে চলল রোগীর বিষ নামাবার পালা। নাইট শিফটের ডাক্তার হিমাদ্রিও যথাসাধ্য সহযোগিতা করেছিল, মনে আছে। সকালে গিয়ে দেখলাম রোগীর চক্ষুতারকা যথেষ্ট স্ফীত হয়েছে, জ্ঞানও ফিরেছে। চিঁ চিঁ করে খাবার খাওয়ার আবদার জানালো সে। স্যালাইন খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিলাম। কিন্তু নাক দিয়ে খাবার খাওয়ানোর নল পরাতে হলো রোগীকে — কারণ এই রকম অবস্থায়, মুখে খাবার দিলেই তা শ্বাসনালিতে চলে গিয়ে ‘চোক’ করে দিতে পারে পেশেন্টকে। চাষী মানুষটি নল পরতে আপত্তি না করলেও, মুখে খাবার খেতে পারবে না জেনে আমার উপর অসন্তুষ্ট হলো। নল থাকে থাকুক, মুখে খাবার জন্য সে খুবই পীড়াপীড়ি করতে লাগল দুর্বল কণ্ঠে।
প্রশাসনিক দায়িত্ব নেবার পর থেকেই কাজের চাপে বড্ড দুর্মুখ হয়ে উঠেছিলাম আমি, হম্বিতম্বি সাধারণ কথাবার্তার অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর জন্য ‘ডেপুটেশনে’ জবাবদিহি পর্যন্ত করতে হয়েছে আমাকে কখনো কখনো। এখন সে সব কথা ভাবলে লজ্জা করে! তবে আমি কখনো অসুস্থ চিকিৎসাপ্রার্থীর উপর মেজাজ দেখাইনি, আমার অধৈর্য রাগের ঝাপটা-টা পড়ত তাদের বাড়ির লোকেদের উপর। সেটাও অন্যায় বৈকি। যত অযৌক্তিক কথাই বলুক তারা, বোঝাবার দায় তো আমাদেরই। সবসময় মনে থাকত না কথাটা। তবে পরে তাদের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে নিজের ধৈর্যহীনতার জন্য ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছি অনেকবার।
যাই হোক, রোগীর এ হেন আবদার শুনে বিষক্রিয়ার রোগীদের মুখে খাবার খাওয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করার অপকারিতার বিষয়ে বাড়ির লোককে ওয়াকিবহাল করে, খুব খানিকটা স্বভাবসিদ্ধ তর্জনগর্জনের পরে আমি কোয়ার্টারে ফিরে এলাম। সাধারণত সন্ধেবেলা আমরা আরও একবার রাউন্ডে যেতাম হাসপাতালে, ভর্তি রোগীদের দেখতে। শরীরটা সেদিন একটু খারাপ ছিল আমার, যাওয়া হয়নি তাই। এক সতীর্থকে বলে দিয়েছিলাম, অ্যাডমিটেড পেশেন্টদের দেখে নেবার জন্য।
পরের দিন সকালে আউটডোরের আগে অভ্যাসমতো হাসপাতালে ঢুকেছি টহল দিতে। মেল ওয়ার্ডে পেশেন্ট এমনিতেই কম থাকত, আগেই লিখেছি। একবার ওয়ার্ডে চোখ বুলিয়েই চমকে উঠে দেখলাম ঐ পয়জনিংএর রোগীর বেড খালি – প্লাস্টিকের ন্যাড়া তোশকটা পড়ে আছে কেবল।
আমি সবিস্ময়ে সিস্টার দিদিকে জিজ্ঞাসা করলাম –“আমি ডিসচার্জ লিখিনি তো ওর। কে লিখল তাহলে? রিস্ক বন্ডে সই করে বাড়ি চলে গেছে নাকি?”
দিব্যশ্রীদি গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন — “কাল আপনি চলে যাবার পরে দুপুরে আমাদের কিছু না জানিয়েই ওর বাড়ির লোক ভাত খাওয়াতে বসেছিল। ব্যস! যা হয়! ডক্টর ঘোষ সাকার মেশিন টেনে এনে অনেক চেষ্টা করেছিলেন, সিপিআর দিলেন – কিন্তু কিচ্ছু করা গেল না। পুলিশ কেস তো, রাতেই সুশীলকে দিয়ে থানায় খাতা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। ভোরের দিকে ওরা এসে বডি নিয়ে গেছে পিএম-এর জন্য। আপনার শরীর খারাপ, তাই আর ডাকিনি।”
দ্বিতীয় ঘটনা এক শীতের রাতে। আমার নাইট ডিউটি ছিল সেদিন। হাসপাতালেই ছিলাম। রাত বারোটা নাগাদ বাইরের কোল্যাপসিবল গেট ধরে ঝাঁকানোর শব্দ ছড়িয়ে পড়ল হাসপাতাল জুড়ে। গিয়ে দেখি একটি সাতাশ আটাশ বছরের অর্ধচেতন বৌকে মাটিতে নামিয়ে রেখে সজোরে গেট ঝাঁকিয়ে চলেছে এক আকুল রাজবংশী যুবক।
করিডরের একজামিনেশন টেবিলে, মেয়েটিকে তুলে শোয়ানোর পরে দেখলাম, পিন পয়েন্ট পিউপিল, মুখে গ্যাঁজলা — আততায়ী সেই একই, অর্গ্যানোফসফেট বিষ।
তবে ঘটনাটি আত্মহত্যার চেষ্টা। রাতে খাবার সময় স্বামীর সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করে ঘরের কোণে রাখা কীটনাশকের শিশি গলায় উপুড় করে দিয়েছে অভিমানী স্ত্রী!
তারপর সেই একই প্রক্রিয়া — ড্রিপ, অ্যাট্রোপিন, পাকস্থলি পর্যন্ত নল।
তবে গতবারের ঘটনার স্মৃতি তখনো দগদগে থাকায় একটু বেশি সাবধানতা অবলম্বন করেছিলাম এবারে। একজন আয়ামাসিকে সর্বক্ষণ পাহারায় রেখেছিলাম মেয়েটির কাছে। অবশ্য পরের দিন সন্ধ্যেবেলায় হাসপাতালে পৌঁছে দেখলাম, তার কোনো প্রয়োজন ছিল না। দু’টি শিশুসন্তানকে নিয়ে মেয়েটির বেডের পাশে সারাক্ষণ বসে রয়েছে স্বামীটি। ফিমেল ওয়ার্ড বলে সিস্টারদের বকাবকিও শুনছে বিস্তর। যখন বাক্যবাণ অসহ্য হচ্ছে, উঠে পালাচ্ছে গেটের বাইরে – মিনিট পাঁচ-দশের মধ্যে ফেরত আসছে ফের। যেটুকু সময় ছিলাম রাউন্ডে, একবারের জন্যও তাকে স্ত্রীর মুখের উপর থেকে চোখ সরাতে দেখিনি। লোকটি যেন জীবনের বড় আশ্রয় হাতছাড়া করতে চলেছিল আগের রাতে। এখন প্রায়শ্চিত্ত করছে।
নিয়ম মেনে দিন তিনেক পরে ছুটি হয়ে গেল বৌটির। নানা কাজের চাপে ব্যস্ত হয়ে পড়ায়, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমার মন থেকে মুছে গেল ঘটনাটা।
বেশ কিছুদিন পরে একদিন দুপুরের খাওয়ার জন্য কোয়ার্টারে ফিরেছি, শোবার ঘরের জানলা দিয়ে দেখতে পেলাম, বাঁশের বেড়ার আগল খুলে এক জোড়া মেয়ে পুরুষ ঢুকছে। বিরক্ত হলাম। সারা কালিয়াগঞ্জ জানে, আমি প্রাইভেট প্র্যাক্টিস করি না – এরা কোথা থেকে উদয় হলো কে জানে! দেখেই মনে হচ্ছে পেশেন্ট দেখাতে এসেছে। মিনিট খানেক পরে বাইরের বারান্দায় খুব কুণ্ঠিত ডাক শুনলাম -“দিদি! দিদি আছেন?”

এই গ্রাম্য লোকগুলোর এক অদ্ভুত ছুঁতমার্গ ছিল – দরজায় কলিং বেল থাকলেও, প্রথমে সেটা বাজাত না মোটেই।
আমি ভুরুতে বিরক্তি জড়িয়েই বাইরে গেলাম। পুরুষটির মুখে লজ্জিত হাসি। হাতে একটা বড় সাইজের মাটির হাঁড়ি।পিছনের জড়সড় বৌটির পরণে নতুন মেটে রঙের ছাপা শাড়ি,
কপালে সিঁদুর।
“চিনল্যান না দিদি?” – গলায় মৃদু অনুযোগ আমায় মনে পড়িয়ে দিল কিছুদিন আগের নাইট ডিউটির রাতটা।
“আরে, তোমরা? কেমন আছো?”
খুশি খুশি গলায় উত্তর দেয় লোকটি – “ভালো আসি দিদি, ও-ও অনেক ভালো! আপনে সেইদিন না বাসাইলে-“বলতে বলতে গলা বুজে আসে তার।
আমি ব্যস্ত হয়ে বলি – “ও আবার কি কথা! আমি কে বাঁচাবার? তুমি সময় মতো হাসপাতালে না নিয়ে এলে, সিস্টার দিদিরা সাহায্য না করলে, আমার সাধ্য কি ছিল যে বাঁচাই? আর তুমি কি সেবাটাই না করেছিলে বৌয়ের–”
“রাখেন দিদি, ঐ সমস্ত কথা”, এবার আরও সঙ্কুচিত শোনায় পুরুষটির গলা।
আমি চোখ পাকিয়ে ব্রীড়াবনত মেয়েটির দিকে তাকাই – “এই মেয়ে, ঝগড়া ঝাঁটি কার বাড়িতে না হয়? তা বলে কেউ বিষ খায়? তোমার না ছোটো ছোটো দুটো বাচ্চা আছে?”
“বলেন দিদি, ভাল করে বলেন তো! কেমন বুঝ আমার বৌয়ের, দ্যাহেন দিকি – দু’টা ঘ্যানা বাসসা রইসে ঘরে – হুশ নাই! কিসু হইলে আমার কি হইত, ভাইবতে গেলি দিশা পাই না–“,
স্বামীর গলা আবার ধরে আসছে দেখে বৌটি মুখ তুলে তাকায়। আমি দেখি, ওর ভীরু চোখে টলটল করছে জল আর অনেকখানি নির্ভরতা।
হেঁকে বলি -“দেখছ তো, তোমায় নিয়ে তোমার স্বামীর কত চিন্তা! খবরদার, আর কক্ষনো এমন ছেলেমানুষি করবে না, বুঝলে?”
পাড়াগেঁয়ে হাসপাতালের “পাতি এমবিবিএস”- এর চেয়ে বেশি কাউন্সেলিং করতে পারলাম না আমি, দরকার ছিল যদিও।
বড় হাঁড়িটা এবার বাড়িয়ে ধরে লোকটি।
“এসব কি?” -ছদ্ম রাগে ধমক দিই আমি। যদিও ভালই বুঝতে পারছি, ওতে কি আছে।
চওড়া হাসে লোকটি -“এট্টু রসগোল্লা আনসি। হাসপাতালে যাই নাই, ও লজ্জা পাইতাসে।আপনের আউটডোর শ্যাষ হইসে দ্যাখলাম, তাই কোয়াটারে চইলা আসলাম। সবাই মিলে খায়েন!”
দরিদ্র, কিন্তু কৃতজ্ঞতা জানাতে জানে এই মেঠো, গ্রাম্য রাজবংশী মানুষটি। দারিদ্র্য, অনেক কিছু না পাওয়ার কষ্ট তার হৃদয়ের প্রসারণের ক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় হয়নি।
দাতা আর গ্রহীতার সম্পর্ক তো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে — পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এমন কি পারমার্থিক ক্ষেত্রেও।
দাতাকে আড়ম্বর এবং অহং ত্যাগ করে,বিনয়ের সঙ্গে দান করতে হবে – সে সেবা, বিদ্যা,অনুদান যাই হোক না কেন। আবার গ্রহীতাকেও মেরুদণ্ড ঋজু রেখেই প্রাপ্য বুঝে নিতে হবে। অধিকারবোধের অমার্জিত প্রকাশে নয় – বিনয়ের সঙ্গে, তবেই সে দান সার্থক।
আমি হাত বাড়িয়ে নিলাম রসগোল্লার হাঁড়িটি। অস্ফুটে শুধু বলতে পারলাম –“ভালো থেকো তোমরা।”
কালিয়াগঞ্জে প্রশাসনিক দায়িত্বভার নেবার পরে আমাকে পদাধিকার বলেই এমন কিছু কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়েছিল, যার সঙ্গে ডাক্তারির কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না।
যেমন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলাকালীন যে স্কুলগুলি পরীক্ষাকেন্দ্র হয়েছিল, প্রত্যেক লিখিত পরীক্ষার দিন সেগুলি ভিজিট করা, অঙ্গনওয়াড়ি সহায়িকা পদের জন্য হওয়া মৌখিক পরীক্ষায় ইন্টারভিউ বোর্ডের মেম্বার হওয়া, মিউনিসিপ্যালিটি বা পঞ্চায়েতের ইলেকশনের ব্যালট কাউন্টিংএর সময় গজ-ব্যান্ডেজ-তুলো-আয়োডিন আর টিটেনাস টক্সয়েড নিয়ে গণনাকেন্দ্রে হাজির থাকা ইত্যাদি। বাদ যেত না কোনো বড়, মেজো, সেজো রাজনৈতিক নেতার নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চও। এই ভাবেই দেখা হয়ে গিয়েছিল কালিয়াগঞ্জ কলেজের মাঠে জ্যোতি বসু আর প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির সুবিশাল জনসভা। দ্বিতীয় জনকে পরে সামনাসামনি অনেকবার দেখেছি, কথাও বলেছি। ওঁর আদি বাসস্থান যে ছিল কালিয়াগঞ্জেই।
এছাড়া যুক্ত থাকতে হয়েছে কালিয়াগঞ্জের স্টুডেন্টস হেলথ হোমের কর্মকাণ্ডেও। হাসপাতাল বা ফিল্ডের প্রথাগত কাজকর্মের বাইরের এই ‘অ-কাজ’ গুলো আমার ভালই লাগত।
এই রকমই এক অ-কাজের ডাক এলো একবার পৌরসভার সর্বজনশ্রদ্ধেয় চেয়ারম্যানের কাছ থেকে। আমাকে কালিয়াগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত বারোয়ারি দুর্গাপুজোর বিচারক হতে হবে।
শুনতে যতটা ব্যাপক লাগছে, ততটা ব্যাপ্তি ছিল না কাজটার। পৌরসভা অঞ্চল ছোটো, তার বাইরে বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে দুর্গাপুজো হলেও, তা এতই সাদামাটা যে প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জাঁকজমক সেগুলোর ছিল না। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলাটা সীমাবদ্ধ ছিল শহরাঞ্চলের কয়েকটি ক্লাবের পুজোর মধ্যে।
ষষ্ঠীর সন্ধ্যেবেলা কালিয়াগঞ্জ থানার সামনে থেকে থানারই জিপে উঠে ওসি, বিডিওসাহেব, সিডিপিও সাহেব, শহরের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ম্যানেজারবাবু আর একটি বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক মশায়কে সঙ্গী করে দেখে বেড়াতে হতো সর্বসাকুল্যে গোটা দশেক পুজো মন্ডপ। আলো, মন্ডপসজ্জা এবং প্রতিমা — বিচার্য কেবল এই তিনটি বিষয়। পরিক্রমা শেষ হলে নম্বরের তালিকাসহ থানায় পৌঁছতে হতো। ওখান থেকে কালীদা আমাকে কোয়ার্টারে ফিরিয়ে নিয়ে আসত।
পরের দিন পৌরসভার পক্ষ থেকে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হতো।
অলিখিত নিয়মে আমরা সব ‘বিচারক’রাই জানতাম যে প্রথম হবে শেঠকলোনির পুজো। কারণ নাগরিক সাজসজ্জার ধারে, ভারে একমাত্র ওরাই কলকাতা না হোক, অন্তত কাছাকাছির মফস্বলের পুজোর সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার মতো শারদোৎসবের আয়োজন করত। যদিও শেঠ কলোনির ঠাকুর আমার একটুও দৃষ্টিনন্দন লাগেনি কখনো — এই নিয়ে বহু কালিয়াগঞ্জবাসীর সঙ্গে আমার দস্তুরমত মতানৈক্য হয়েছে, যার মধ্যে ডক্টর কোলে ও মঞ্জুদিও পড়েন।
আমার ভালো লাগত দাসমুন্সী বাড়ির বিশাল একচালার ডাকের সাজের সাবেক প্রতিমা, কেমন বাগবাজারের ঠাকুর দেখার অনুভূতি হতো তার সামনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু সেই ঠাকুরকে নম্বর দিয়ে ফার্স্ট করার অধিকার আমার ছিল না। সেই পুজো ছিল প্রতিযোগিতার বাইরে।
দুর্গাপুজোয় আমি কলকাতা আসতাম না। মা বাবা আসত আমার কাছে। আমি বাড়ি ফিরতাম লক্ষ্মীপুজোর পরে, বাবা মায়ের সঙ্গে। আমার ছুটি ফুরোত ভাইফোঁটার দিন।
বাবা মা আমার কালিয়াগঞ্জে থাকা নিয়ে একটু নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় ভুগতে আরম্ভ করেছিল। কারণ উত্তরবঙ্গে পাঁচ বছর কাটিয়ে দেওয়ার পরেও আমি বাড়ির কাছাকাছি কোনো হাসপাতালে ট্রান্সফারের জন্য দরখাস্ত করিনি, এটা ওদের কাছে একটু অপ্রত্যাশিত ঠেকছিল।
একটু ভয়ও পাচ্ছিল হয়ত, যে আমি বোধ হয় শেষ পর্যন্ত কালিয়াগঞ্জেই থেকে যাবো। স্বাধীন সংসারে এতদিন এককভাবে কাটিয়ে বাবা মায়ের শাসনের বন্ধনে আমি যে আর ধরা দেবো না, এটা ওরা বুঝতে পেরেছিল সম্ভবত।
বাবা তখন অসুস্থ, পেসমেকার বসেছে বুকে। মা সব সামলালেও, কোথাও একটা ভাঙন ধরেছিল শরীর স্বাস্থ্যে — আমি হয়ত নজর করিনি সেভাবে।
সেই দুর্গাপুজোয় বিচারক সাজার দিনটি আজও স্পষ্ট মনে পড়ে আমার। বেশ অনেকগুলো ঠাকুর দেখার পরে, জিপ ফিরছিল থানার দিকে। হাসপাতালের পিছনদিক দিয়ে রাতন গ্রামের রাস্তা – সেই রাস্তা ধরে যাচ্ছিল গাড়িটা। হঠাৎ ওসি সাহেব হাত তুলে দেখালেন –“ম্যাডাম, হাসপাতালের পিছনের রাস্তা ঘুরে যাচ্ছি – ঐ যে, আপনার কোয়ার্টারের আলো দেখা যাচ্ছে”—-
আমি আগ্রহভরে জিপের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলাম দূরে, কাঁটাঝোপ আর আগাছার বন পেরিয়ে আমার আস্তানা দেখা যাচ্ছে। বসার ঘরে টিউবলাইট জ্বলছে। বাবা চেয়ারে বসে চোখ বোলাচ্ছে কোনো ম্যাগাজিন-টিনে। শেষ আশ্বিনের হিম, বাবার গায়ে একটা হাল্কা চাদর জড়ানো। ঐ তো মা ঢুকল ঘরে, হাতে একটা কাপ। ওহ্, বাবার আটটার কফি তৈরি করে আনল বোধ হয়। পর্দা সরানো জাফরির ফাঁক দিয়ে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো একটা বায়োস্কোপ দেখছি যেন। কয়েকটা মুহূর্ত, আমার নিজস্ব পৃথিবীর ছবি – ব্যস, তারপরেই আবার অন্ধকার। গাড়ি ঘুরে গিয়েছে অন্য রাস্তায়।
সেই মুহূর্তে আমি যেন আমার অন্তর থেকে একটা টান অনুভব করলাম — বিপরীতমুখী টান! এই মায়াবী শহর আর তার বাসিন্দারা আমায় আমার অভিকর্ষের থেকে, আমার জাগতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু থেকে টেনে বের করে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমার জীবন, আমার সবকিছু যে ওখানে, ঐ দুটো মানুষ আর তাদের একান্ত নিজস্ব ‘বেহালার বাড়ি’-র মধ্যে, আর কোথাও নয়, কোত্থাও নয়, এটা ঐ সন্ধ্যের আগে তেমন করে তো বুঝিনি!
কালিয়াগঞ্জ, আমার হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা, তোমার অমোঘ আকর্ষণে আমার আর থেকে যাওয়া হলো না। আমাকে যে ফিরতে হবে, ফিরতেই হবে, ফেরা ছাড়া পথ নেই।
সেবার পুজোর পরে কলকাতায় ফিরে, রাইটার্সে গিয়ে এডিএইচএস (অ্যাডমিন) ডক্টর স্বপন চক্রবর্তীর সঙ্গে দেখা করলাম, বদলির দরখাস্ত নিয়ে।
স্যার পুরোটা পড়ে বললেন -“হুঁ, হয়ে যাবে। ফার্স্ট চয়েস হোম ডিসট্রিক্ট রেখেছ ঠিক আছে, সেকেন্ড চয়েস হিসেবে উত্তর চব্বিশ পরগণা কেটে হাওড়া লিখে দাও।”
এই ঘটনার তিন মাস পরে ফেব্রুয়ারির এক মনখারাপি বিকেলে, কালিয়াগঞ্জ হাসপাতালের অফিসে আমার নামে একটি সরকারি লেফাফা এলো — শেষবারের মতো।
হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়া মহকুমার বৃন্দাবনপুর ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আমার বদলির অর্ডার হয়েছে। উত্তর দিনাজপুরের সিএমওএইচকে যথাসম্ভব শীঘ্র আমার রিলিজের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেই চিঠিতে।
(আগামী পর্বে সমাপ্য)










