১৭ই জুলাই, ১৯৪৮। দিনটি স্মরণীয়। সাতাত্তর বছর আগে আজকের দিনে ভারতে মহিলারা আইএএস এবং আইপিএস হওয়ার দৌড়ে শামিল হওয়ার অধিকার অর্জন করেছিলেন।
আন্না রাজম মালহোত্রা। ভারতের প্রথম মহিলা আইএএস অফিসার। মহারাষ্ট্র ক্যাডারের এই কেরলীয় মহিলা ১৯৫১ ব্যাচের আইএএস।
ভারতের প্রথম মহিলা আইপিএস পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও একুশ বছর। কিরণ বেদী। ১৯৭২ সালের আইপিএস তিনি।
মায়ের মুখে শুনেছি, ১৯৬৯ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ইডেন বিল্ডিংএর লেবার রুমে যখন সদ্যোজাত সন্তানের লিঙ্গ জানানো হয়েছিল মাকে, তার চোখে জল দেখে মহিলা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ধমকে বলেছিলেন –“কাঁদছ কেন? মেয়ে হয়েছে বলে শাশুড়ি কথা শোনাবে, তাই?”
মা উত্তর দিয়েছিল — “না। আমি যে কষ্ট পেয়েছি, পাবোও, সে কষ্ট তো ও-ও পাবে একদিন। তাই ভেবে –”
বিধাতা বোধহয় লেবার রুমে আমাকে ‘প্রেজেন্ট প্লিজ’ বলার জন্য উপস্থিত ছিলেন সেই তপ্ত দুপুরে। সদ্যপ্রসূতির খেদোক্তি তাঁর কানে গিয়েছিল বুঝি। মায়ের আশঙ্কা মিথ্যে করে সন্তানের জন্মদানের অনন্য শারীরিক অভিজ্ঞতা থেকে আমাকে বঞ্চিতই রেখে দিলেন তিনি। মা কি স্বস্তি পেয়েছিল? জানার আর কোনও উপায় নেই আজ।
তবে এটা জানি, আমাকে পৃথিবীর আলো দেখানো সেই মহিলা চিকিৎসককে দেখে মা প্রেরণা পেয়েছিল — মেয়েকেও এঁর মতো ডাক্তার করতে হবে। স্বয়ংসিদ্ধা, আত্মবিশ্বাসী, স্বাবলম্বী একজন ডাক্তার।
পেশাগত মিলটুকু বাদ দিলে ডঃ আরতি রায়ের নখাগ্রও আমি স্পর্শ করতে পারিনি, নতমস্তকে তা স্বীকার করি।
স্বাধীনতার আটাত্তর বছর পরেও মেয়েরা আজ কতখানি আত্মনির্ভর? কতটা উন্নতি হয়েছে তাদের সামগ্রিক সামাজিক অবস্থানের? এক কথায় এর উত্তর হয় না।
যদি আর্থসামাজিক ভাবে অগ্রসর নাগরিক, মফস্বলী, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কথা ধরি, তবে উন্নতি তো হয়েছেই — অন্তত বাহ্যিকভাবে। মেয়েদের শিক্ষার হার বেড়েছে, বহু মেয়ে আজ চাকরিজীবী, নানা পেশায় ছড়িয়ে গিয়েছে তারা। পড়াশোনা বা কাজের সূত্রে রাজ্য এবং দেশের সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছে অনেক মেয়ে। পারিবারিক সহায়তা ছাড়া তা অসম্ভব। সুতরাং পরিবারগুলির মনের আগলও অনেকটাই ভেঙেছে স্বাধীনতার আটাত্তর বছর পরে।
তাই উদয়াস্ত মুখ বুজে একান্নবর্তী শ্বশুরবাড়ির হাজারটা ফরমাশ খাটা, ঘোমটা টানা আমার ছোটমাসির মেয়ে আজ বাঙালির বন্দিত সঙ্গীতশিল্পী জয়তী চক্রবর্তী হয়ে উঠতে পেরেছে — যার মায়ের যৌবনে কোনও সঙ্গী ছাড়া শ্বশুরবাড়ির চৌকাঠ ডিঙোনো অসম্ভব ছিল, সেই মেয়ে একাই পাড়ি জমাচ্ছে ইওরোপ আমেরিকায়। যাত্রাটা সহজ ছিল না, কিন্তু সম্ভব হয়েছে শেষ পর্যন্ত।
তবে এ তো গেল সমাজের উপরের স্তরের মানুষের কথা। নিচের মহলের বাসিন্দা মেয়েদের কাছে সেভাবে পৌঁছেছে কি অগ্রগতির আলো?
স্বাধীনতা যখন বুড়ি হতে চলল, যখন মহাকাশে যাওয়া জলভাত হয়ে গিয়েছে বলে প্রতীতি হয় — তখনও সরকারিভাবে ‘বেটি বচাও, বেটি পঢ়াও’ এর মতো যোজনা কার্যকর করতে কেন্দ্রীয় সরকারকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়, রাজ্যকে নাবালিকা বিয়ে রোধ করতে কন্যাশ্রী আর রূপশ্রীর প্রচার করে যেতে হয় নিরন্তর, অথচ বিপজ্জনক ভাবে বাড়তে থাকে মাতৃমৃত্যুর হার — কারণ এখনও বহু গ্রামাঞ্চলে আঠারো বছর বয়সের নিচে মা হওয়ার ঘটনা ঘটে চলেছে আকছার।
প্রযুক্তিতে দড় হয়ে উঠছে আগামী প্রজন্ম, মুঠোফোনে অক্লেশে রিল বানাতে শিখে যাচ্ছে নিরক্ষর ছেলেমেয়ে, কিন্তু তাদের মনে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বলে উঠছে কি? সে প্রদীপের সলতে পাকাচ্ছেন যাঁরা, তাঁরাও বিলক্ষণ জানেন, দীপের নিচে এখনও গভীর অন্ধকার।
শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নিজের পায়ের দাঁড়ানো কিংবা আর্থিকভাবে পরমুখাপেক্ষী (এখানে নিজের বাবাকেও ‘পর’ ধরছি), মেয়ে যেমনই হোক না কেন, বিয়েই শেষ পর্যন্ত মোক্ষ — এই ধারণায় কি চিড় ধরেছে একটুও? সমাজের উপরের স্তরের ২-৩ শতাংশের কথা বলছি না, সামগ্রিক ভারতীয় সমাজের চিত্র কিন্তু বিশেষ বদলায়নি। সেই একই পণপ্রথা, সাধ্যাতিরিক্ত খরচ করে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ, বিবাহপরবর্তী পুত্রসন্তানের নিরুচ্চার কিংবা সোচ্চার আকাঙ্ক্ষা, শ্বশুরঘরে মেয়েদের শারীরিক অথবা মানসিক নির্যাতন, পোশাকে ফতোয়া, সবই সমানে চলছে। বিপরীত ঘটনা কি নেই? আছে। রাজ ও সোনম রঘুবংশী কিংবা বেঙ্গালুরুর অতুল সুভাষের ঘটনাও রয়েছে। তবে সেগুলি সংখ্যার নিরিখে নগণ্য।
আমি বিয়ের বিরুদ্ধে একেবারেই নই। নারীপুরুষ নির্বিশেষে মানসিক আশ্রয় সকলেরই প্রয়োজন। আমার কেবল দুঃখ হয়, যখন দেখি বিয়েকে স্বাবলম্বনের বিকল্প হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে ভারতীয় সমাজে, এখনও তাই হচ্ছে। এবং মেয়েরাও খুব সক্রিয়ভাবে এর প্রতিবাদ করছেন না। হোমমেকিংকে ছোট না করেই বলি — সামাজিক পরিসরে যাঁরা হোমমেকিংয়ের মাহাত্ম্যকীর্তন করছেন, তাঁরা নিজের পরিবারের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের চোখে প্রাপ্য সম্মানটুকু আদায় করে নিতে পারছেন তো? আমার শিক্ষিত, চাকরি না করা দিদি কিন্তু সুভদ্র, দরদী জামাইবাবুর কাছে ‘হাত পেতে’ ট্যাক্সিভাড়া চাইতে গেলেও মরমে মরে যেত — আজ ষাটোর্ধ্বে পৌঁছেও স্বাবলম্বী না হতে পারার আফশোস তার যায়নি।
আমার কাছে স্বাধীনতার অর্থ লিঙ্গনির্বিশেষে সকল মানুষের নিজের অনুভবকে উদযাপন করার স্বাধীনতা, নিজের এবং অপরের ইচ্ছাকে সম্মান করতে পারার ঔদার্য, যে কোনও বিষয়ে দু’টি মানুষের দ্বিমত পোষণ করার পরিসর — সেইদিক দিয়ে বিচার করলে আমার দেশ সামগ্রিকভাবে এখনও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করি।
দু’টি ছোট ঘটনা লিপিবদ্ধ করে লেখা শেষ করব।
প্রথম ঘটনাটি বছর তিরিশের পুরোনো। কলকাতার এক বিখ্যাত বেসরকারি হাসপাতালে আমার প্লাস্টিক সার্জারির শিক্ষক চিকিৎসককে একটি কেসে অ্যাসিস্ট করতে গিয়েছি। অপারেশনের শেষে ওটি লাগোয়া সার্জেন-রুমে চা খেতে খেতে চমকে উঠে বিষম খেলাম। কানের কাছে, হাসপাতাল চত্বরে বোমা ফাটার মতো বিকট শব্দ। ভয় পেয়ে ঘরের বাইরে বেরোতেই নির্বিকার নার্সিং স্টাফের মুখোমুখি হয়ে জানতে পারলাম, কোনও ধনী অবাঙালি পরিবারের বধূ একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন, তাই তাঁর পরিজনেরা উৎসাহভ’রে হাসপাতালের ভিতরেই শব্দবাজি ফাটিয়ে আনন্দ প্রকাশ করছেন। তাঁরা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছিলেন কিনা, নিয়ে থাকলে কেমন করে অনুমতি পেলেন — সেই গূঢ় তর্কে আর যাইনি।
এই ঘটনার তিন চার বছর পরের কথা। আমি উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ হাসপাতালে কাজ করছি। একদিন সাতমাসের অন্তঃসত্ত্বা একটি মহিলাকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে এলো তার আত্মীয়রা। মেয়েটির ‘প্রিম্যাচিওর লেবার পেইন’ উঠেছে। জেলা হাসপাতালে রেফার করার আর সময় নেই। হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অক্লান্ত চেষ্টার পরে একটি মৃত অপরিণত পুত্রসন্তানের জন্ম দেয় মেয়েটি। খবর জানার পরে লেবার রুমের বাইরে অপেক্ষমাণ পুরো পরিবার হতাশায় ভেঙে পড়ে। উপস্থিত সকলকে অবাক করে দিয়ে পরিশ্রান্ত গ্রাম্যবধূটি হাততালি দিয়ে হেসে উঠেছিল। আমরা ভাবলাম, সন্তান হারিয়ে হয়ত সাময়িক মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছে প্রসূতির। কিন্তু দেখা গেল, তা নয়। সিস্টার দিদিদের সহানুভূতি ও সমবেদনার তোয়াক্কা না করে জড়িয়ে জড়িয়ে মেয়েটি যা বলেছিল, তার সারমর্ম —
এর আগে ছ’বার গর্ভধারণ করেছিল সে। প্রতিবারই জেলা হাসপাতালে নবলব্ধ আলট্রাসোনোগ্রাফি মেশিন এবং কিছু অজ্ঞ চিকিৎসাকর্মীর বদান্যতায় গর্ভস্থ ভ্রূণটি কন্যা জেনে জবরদস্তি গর্ভপাত করানো হয়। এবারেরটি ছেলে জেনে তার খুব আদরযত্ন হয়েছিল শ্বশুরঘরে। যে কষ্ট সে ছ’বার পেয়েছে, সেই সন্তান হারানোর বেদনা অন্তত একবার হলেও তার স্বামী এবং বাড়ির লোকেরা পাচ্ছে, এতেই সে আনন্দিত।
স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম আমরা সকলেই।
অবস্থা খুব একটা পালটেছে কিনা জানা নেই। পরিবর্তন এসে থাকলে তা স্বাগত। তৃণমূল স্তরের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কিন্তু অহরহ অন্য কথাই বলে যায়।










