খুপরিতে বসে রোগী দেখছিলাম। মধ্যমগ্রাম হাই স্কুলের একজন প্রাক্তন শিক্ষক ঢুকলেন।
আমি থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। খুপরিতে জায়গা কম। প্রণাম করার জন্য নিচু হতেই স্যার বললেন, ‘থাক বাবা, থাক।’
পঁচাশির উপর বয়স। এখনও ঋজু, সৌম্য চেহারা। ধুতি পাঞ্জাবি ছাড়া কোনও দিন অন্য কিছু পরতে দেখিনি।
স্কুলে পড়ার সময় এনাকে যমের মত ভয় পেতাম। মুখোমুখি কিছু বলার কথা ভাবতেই পারতাম না। এখনও সেই ভয়ের রেশটা রয়ে গেছে।
ইতস্তত করে বললাম, ‘স্যার, আপনি যে আসবেন সেটা একবার ফোন করে বলতে পারতেন! কাকুকে বলে রাখতাম। আপনি আসা মাত্রই ঢুকিয়ে দিত। শুধু শুধু এতক্ষণ বসে রইলেন।’
স্যার হাসলেন। বললেন, ‘ঐন্দ্রিল, এই যে বাইরে বসে ছিলাম, মনটা ভালো হয়ে গেল। কত রকমের অসুখ বিসুখ নিয়ে লোকে তোকে দেখাতে আসছে। তোকে ভরসা করছে। সেসব গল্প বসে বসে শুনছিলাম, আর গর্ব হচ্ছিল। ছাত্ররাও তো আমার সন্তানই।’
স্যার উচ্চ রক্তচাপ আর প্রস্টেট গ্রন্থির সমস্যায় ভুগছেন। সেসব দেখার পর স্যারকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আর কোনও সমস্যা হচ্ছে স্যার?’
স্যার আবার হাসলেন। বললেন, ‘বুড়ো বয়সের যা সমস্যা। ঘুম হয়না। দুশ্চিন্তা হয়। অবসাদও হয়। মনে হয়, জীবনে কত কি করতে চেয়েছিলাম… তার প্রায় কিছুই করা হল না।’
আমি বললাম, ‘কেন স্যার, আপনার হতাশা কিসের? চারিদিকে আপনার এতো কৃতি ছাত্র। মধ্যমগ্রামের অর্ধেক মানুষ আপনাকে দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নত করে।’
স্যার নিজের মনে বললেন, ‘অনেক কৃতি ছাত্র তাই না… আচ্ছা ঐন্দ্রিল, তোদের ক্লাসের কয়েকজন কৃতি ছাত্রের কথা বলত।’
আমি বেশ উৎসাহের সাথেই বলতে শুরু করলাম, ‘স্যার, মধ্যমগ্রাম স্কুলে আমাদের ব্যাচটাকে কোনও শিক্ষকই বিশেষ পাত্তা দিতেন না। কিন্তু আমাদের ব্যাচের রেজাল্ট খারাপ নয়। আমি ছাড়াও আরও দুজন ডাক্তারি পড়েছে। সবাই মেডিকেল কলেজে। তাছাড়া একজন তো আই এ এস পাশ করে একটা জেলার ডি এম। একজন খড়গপুর আই আই টি’র ছাত্র। এখন বিদেশে দারুণ মাইনেতে চাকরী করছে। একজন কেমব্রিজে ফিজিক্স নিয়ে গবেষণা করছে। আর ইঞ্জিনিয়ারের সংখ্যা তো হাতে গোনা যাবে না।’
স্যার হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আর শিক্ষক?’
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, ‘অ্যাঁ….মানে …’
‘তোদের ব্যাচের কেউ শিক্ষক হয়নি?’
আমি ভাবতে আরম্ভ করলাম। কারো কথাই মনে পড়ছে না। অনেক ভেবে একজন বন্ধুর কথা মনে পড়ল। কদিন আগেই জণ্ডিস নিয়ে দেখাতে এসেছিলো। নাহলে জানতামই না সে স্কুলে শিক্ষকতা করে।
স্যার বললেন, ‘মনে পড়ছে না, তাই তো? আসলে শিক্ষকতাকে বর্তমানে কেউ বিশেষ সম্মানের চোখে দেখে না। উচ্চ-মেধার কেউ স্বেচ্ছায় এই পেশায় আসে না। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হতে না পারলে তবেই শিক্ষকতার দিকে ঝোঁকে।’
খানিকক্ষণ থেমে স্যার বললেন, ‘ভালো মাইনের চাকরী ছেড়ে আমরা কিন্তু শিক্ষক হয়েছিলাম স্বেচ্ছায়। সে সময় শিক্ষকদের বেতনে সংসার চালানোই মুশকিল ছিল। তার জন্য কখনও হা-হুতাশ করিনি। আমাদের স্বপ্ন ছিল নিজের হাতে ছোটো ছোটো ছেলেগুলোকে মানুষ করব। তাদের আদর্শ মানুষ তৈরি করব। হাতে ধরে শেখাবো নিয়মানুবর্তিতা কাকে বলে। জীবনে শৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তা কি। নিজের পরিবারকে, দেশকে, দেশের মানুষকে ভালবাসতে শেখাবো। আর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষক তৈরি করব। বলতে বাধা নেই সেই কাজে আমরা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছি।’
আমি বললাম, ‘এমন ভাবে বলবেন না। আমরা যারা সেসময় মধ্যমগ্রাম স্কুলের ছাত্র, কেউই আপনাদের অবদানের কথা ভুলতে পারব না। আর শুধু আমরা কেন, আমাদের বাবা, কাকারাও তো আপনাদের কাছেই পড়েছেন।’
স্যার বললেন, ‘নারে, আমরা কিচ্ছু পারিনি। আজ যখন টিভিতে নেতাদের খিস্তি খেউর শুনি বা রাস্তায় যুবকদের কদর্য ভাষা শুনি, বুঝতে পারি আমরা নিদারুণ ভাবে ব্যর্থ। ভাবতে পারিস, অযোগ্য দলদাসেরা ঘুষ দিয়ে শিক্ষক হয়েছে, আর যোগ্যা শিক্ষকরা চাকরি হারিয়ে রাস্তায় পরে আছেন। অথচ সাধারণ মানুষের বিশেষ তাপ উত্তাপ নেই। কলেজে কলেজে কীভাবে মায়েদের নির্যাতন করা হচ্ছে, আর জি করে কী ঘটল? খাতায় কলমে স্বাক্ষরতার হার বেড়েছে কিন্তু সমাজে অশিক্ষিতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। আমার আজকাল খবরের কাগজ পড়তেও আতঙ্ক লাগে।
এখন পড়াশুনোর একমাত্র উদ্দেশ্য পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া। আর কোনও উদ্দেশ্য নেই। অভিভাবকেরাও চান না তাঁদের সন্তান সত্যিকারের শিক্ষিত হোক। তারা চান, যে ভাবেই হোক পরীক্ষায় আরও দুটো নম্বর বেশি পাক। যাই হোক, এবার আসি। তোকে অনেক জ্বালালাম।’
আমি উঠে দাঁড়ালাম। স্যার বললেন, ‘ঐন্দ্রিল, তুই আমার প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে ছিলিস। তুই ডাক্তার হয়েছিস, আমার খুবই আনন্দ হয়। কিন্তু আমি তার থেকে অনেক বেশি আনন্দ পেতাম, যদি তুই একজন শিক্ষক হতিস।’
স্যার যেতে যেতে আবার দাঁড়ালেন, ‘পড়ানো ছেড়ে দিয়েছিলাম বুঝলি। ছাত্ররা শুধু নম্বর তোলার পদ্ধতি জানতে চায়। কোনও কিছুরই গভীরে গিয়ে শিখতে চায়না। তবে এবছর দুটো ছেলেকে পড়াচ্ছি। পয়সা দিয়ে প্রাইভেটে পড়ার ক্ষমতা নেই। ওদের নিয়েই আর একবার চেষ্টা করে দেখি।’










ঐন্দ্রিল প্রণম্য মানুষটির নাম বলেন নি। তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নি একজন কল্পিত মানুষকে সামনে রেখেই ডাক্তারবাবু তাঁর মনের একান্ত কিছু উপলব্ধির কথা প্রকাশ করেছেন তাহলেও বলতে হয় খুব সত্যি কথাই বলেছেন তিনি। শিক্ষার্থী জীবনে তোমার জীবনের লক্ষ্য শীর্ষক রচনা লিখতে গিয়ে সবাই লিখতাম চিকিৎসক অথবা শিক্ষক। মাস্টারমশাই হয়ে সবাইকে শিক্ষিত করে তুলতে অথবা চিকিৎসক হয়ে গরীব মানুষের রোগমুক্তির জন্য তখনো কিছু ইচ্ছা ছাত্রদের মনে জমা ছিল। পরিবর্তিত সমাজ চিত্রে চিকিৎসকদের নিয়ে টানাটানি এখনও বজায় থাকলেও পেশাগত জীবনে শিক্ষকতার বৃত্তি গ্রহণে আগ্রহী শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া ভার।অথচ একজন চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ,বিচারক, ব্যবসায়ী…. সব ওই শিক্ষকের হাতেই তৈরি। এই নির্মম সত্যকে মেনে নিয়েই শিক্ষককে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে পথ চলতে হয়।
মাস্টারমশাইকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম।
ডাঃ ঐন্দ্রিলের বাকিসব আক্ষেপের উত্তর পরে দেবার ইচ্ছে রইলো ।