গতকাল একটা নোটিশে আমার পিজি হাসপাতালে সাত বছরের যাত্রা আপাতত সমাপ্ত হলো, আমার বন্ড পোস্টিং মেদিনীপুরে হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহেই সেখানে জয়েন করবো। সাত বছর কোনো একটা জায়গায় থাকলে মায়া পড়ে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। নর্দমার পাশেও সাত বছর থাকলে নর্দমার প্রতি মায়া পড়ে যায় একটা, এটা তো পিজি হসপিটাল! অন্তত নর্দমার গন্ধটা নেই এখানে 😝😛
অনেকে ভাবছেন মেদিনীপুরে পোস্টিং একটা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ, প্রতিহিংসার পদক্ষেপ! কেউ বলছেন প্রতিবাদের ফল এসব। কেউ বলছেন অন্য জেলায় নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন রকম হেনস্তা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিছু মানুষের কথা অনুযায়ী পিজি হাসপাতালে সরীসৃপদের ভিড়ে মিশে থাকাটা আমার কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত ছিল, যে একটা ন্যায্য আন্দোলনের শরিক হওয়া আমার পাপ হয়েছে। আমি আমার এই শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলতে চাই, সরকার চাইলে খোদ কলকাতায় আরজিকর হাসপাতালের মধ্যেও মানুষকে খুন করে আত্মহত্যা বলে চালাতে পারে- এর জন্য মেদিনীপুরে নিয়ে হেনস্তা করতে লাগে না। পিজিতে কারো দয়ায় ছিলাম না, যথারীতি পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেয়ে ছিলাম, কারো দাক্ষিণ্যের অপেক্ষায় থাকতে পারছিনা। যদিও একটা কাউন্সেলিং হওয়া উচিত ছিল- কিন্তু এই সরকার কবে কোন নিয়মের তোয়াক্কা করেছে! যেখানে পোস্টিং দিয়েছে, সেখানেই যাবো। কিন্তু যে রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে ভাঙিয়ে বাঙালির দিন কাটে, তারা দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্রিটিশের বিরুদ্ধেও পদে পদে গর্জে উঠেছেন, এ তো সামান্য অশিক্ষিত ঘাসফুল- কিছু তো নিজের জাতের সম্মানটুকু রাখো 🙏🙏
হ্যাঁ, অনুব্রতর বস্তিদেশের চিকিৎসা করতে পাবো না, কালীঘাটের কাকুর বুকে ব্যথার কিনারা করতে পারবো না, পার্থর ইকো করতে পারবো না, টালির ঘরের বোনের ডায়রিয়া সামলাতে কার্ডিওলজি রেসিডেন্ট হয়ে রাত জাগতে পারবোনা, ববির উর্দূ কাগজের চোথায় মূত্রের সংক্রমণের রোগীকে আইসিসিইউ তে ভর্তি করতে পারবোনা, মদনার ডান হাত, মাঝের পা- এদের পুলিশি হেনস্তা থেকে শেল্টার দিতে ভর্তি করতে হয়তো পারবোনা- কিন্তু কলকাতায় নিতম্ব ঠেকিয়ে রাখার জন্য চোখ কান বুজে এসব করে যাওয়া তো জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য হতে পারে না, তাই না!!
২০১১ থেকে ২০১৮- প্রায় এরকমই সময়কাল মেডিক্যাল কলেজে কাটিয়েছিলাম। ‘মাটিয়া’দের মধ্যে একটা জিহাদি ব্যাপার থাকে, তারা মনে করে মেডিক্যাল কলেজের বাইরের পৃথিবীটা পৃথিবীই নয়, অন্য কিছু- এই রোগটা আমারও ছিল। ২০১৮-তে যখন মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন না পেয়ে পিজিতে চান্স পেলাম, ভগবান যেন একটা নতুন পৃথিবীর দরজা আমার সামনে খুলে দিলেন। পিজিতে পিজি, এসএস না করলে কেন জানিনা আমার মনে হয় একটা অপূর্ণতা থেকে যেত!! পিজির কুৎসিততম রূপটাও আমার দেখা, উজ্জ্বলতম মুহূর্তেরও সাক্ষী হতে পেরেছি। সাত বছরের স্মৃতি- সাত বছরে আমার জীবনের খোলনলচে বদলে গেছে পুরো! ব্যক্তিগত স্তরে, পেশাগত স্তরে, এমনকি সামাজিকতার স্তরেও… এসবের সাক্ষী সেই প্রাচীনতম হাসপাতাল- পিজি হাসপাতাল!
তবে সেই ছাতার বাইরে বের করে এনে বিধাতা যেন আবার এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দিলেন…আশা করবো এই নতুন পথ যেমন কিছু দুঃস্বপ্নের আঘাত দেবে, তেমনি নতুন ভাবে বাঁচার রসদও দেবে অনেক। শুভাকাঙ্ক্ষীদের আশীর্বাদ কাম্য 🙏🙏🙏









