‘অভয়া সুবিচার’ কেন পাওয়া যায় নি? কারণ, উনি চান নি। ‘অভয়া’র মৃত্যুর সমস্ত evidence কেন যত্ন সহকারে ধ্বংস করা হয়েছিল কারণ উনি চেয়েছিলেন, যেন সত্য কিছুতেই সামনে আসতে পারে।
আসলে, উনি প্রতি মুহূর্তে মানুষকে বুঝিয়ে দিতে চান, ওনার কথাই শেষ কথা। ঐ যে হিন্দি সিনেমা ‘কভি খুশি কভি ঘম্’ এ অমিতাভ বচ্চন ( শেষে জয়া বচ্চনও) বলে ওঠেন,”ব্যস, বোল দিয়া না, না” !! এও তাই, উনি বলেছেন, শুধু সঞ্জয় রায় সমস্ত অপকর্মের একা এবং একমাত্র দায়ী, আর কেউ না, এটাই চূড়ান্ত সত্য বা absolute truth ! এই নিয়ে আর কোনো কথা নয়।
ওনার আবার এক অসাধারণ magical ক্ষমতা আছে, উনি যা বলেন তাকে সত্য প্রমাণ করার জন্য সবাই উঠে পড়ে লাগে। সেই Paolo Coelho এর লেখা Alchemist এর একটা বিখ্যাত লাইন ছিল না, “….. whole universe conspires to make it happen..”, এ প্রায় সে রকমই।
রাজ্য, কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় অনুসন্ধানকারী সংস্থাগুলি মায় দেশের শীর্ষস্থানীয় আদালতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব, সবাই নেমে পড়ে কিভাবে কি করে ওনাকে সাহায্য করবে !! ‘Justice for RG Kar’ আন্দোলন যখন দেশে বিদেশে উত্তাল হয়ে প্রায় তুঙ্গে পৌঁছেছে, হাইকোর্টে সরকার পক্ষ প্রায় দিশেহারা অবস্থায়, তখনই এগিয়ে এলো দেশের শীর্ষ বিচার ব্যবস্থা, নিজে নিজেই কেউ না চাইতেই ! গোটা দেশ নয় সমগ্র দুনিয়ার দৃষ্টি টেনে নিয়ে আর অযথা কালক্ষেপ করে একটা মামলাকে কিভাবে ‘ন যযৌ ন তস্থৌ’ অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া যায়, তা সত্যিই শেখার আছে, অন্ততঃ academic interest এ !! পিছনের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে ভাবি, এও সম্ভব!! বিভিন্ন চিকিৎসক সংগঠন এবং অচিকিৎসক সংগঠন নিয়োজিত করে ফেলে সুপ্রিম কোর্টে সরকার পক্ষের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য পরিচিত যত আইনজীবী আছেন, তাদের একটা বড় অংশকে। জনগণের কাছ থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে অর্থ সংগ্রহের কাজ তো কমদিন করছি না, কিন্তু এতো অকাতরে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে সত্যিই কোনো দিন দেখিনি। একটাই কারণ, আইনী লড়াইয়ে অর্থ যেন কোনো সীমাবদ্ধতা আনতে না পারে।
সবচেয়ে হতাশাজনক performance হলো CBI এর। জানিনা ‘বস’এর হুকুম তামিল করতে গিয়ে, নাকি, শীর্ষ পদগুলিতে পরের পর পছন্দের লোক বসানোর কারণে এমনিতেই, এরকম চরম অপদার্থ অবস্থা !! যাই হোক, সারা পৃথিবীতে সরকারি অনুসন্ধানকারী সংস্থাগুলির মধ্যে এর থেকে খারাপ কার্যকারিতা সম্ভবতঃ কারুর আছে বলে মনে হয় না।
আরো, বিস্ময়কর কাণ্ড ঘটতে লাগলো শিয়ালদহ আদালতে। CBI উকিল, মৃতার বাবা-মায়ের উকিল প্রায় একযোগে চেষ্টা করে গেল দ্রুত সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করতে। সঞ্জয় রায়ের বক্তব্য, যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেটা তো জানাই হলো না। সাজা ঘোষণার সময়, জজসাহেবকে বলতে শুনলাম,’আপনাকে আগে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ‘। সঞ্জয় কী সুযোগ পেয়েছিল আর পেয়েও কেন কিছু বলেনি, তা তো আর আমাদের জানার কোনো উপায় নেই। অথচ, সঞ্জয় এই মামলায় খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কোন পরিস্থিতিতে তাকে আসামি হতে হলো, সেটা তো গভীর রহস্য!! এখনও পর্যন্ত অনেক সুগভীর রহস্যের সঙ্গে এটাও সম্পূর্ণ অজ্ঞাত রয়ে গেল আমাদের কাছে।
‘অভয়া’র মৃত্যুর পর প্রায় এক বছর কেটে গেছে। একটা সময় বিশেষ করে গত বছরের আগস্টের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, এই প্রথম হলেও শাসকের অবস্থান গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন, probably days are now numbered..
ওনার কৃতিত্ব এখানেই, সে গৌরবের বা চরম অগৌরবের যাই বলুন,অতো ব্যাপক জনমত, আবেগ সব কিছুকে পিছনে ফেলে নিজের narrative কেই প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন, অন্ততঃ আইনী ভাবে তো বটেই! জানিনা কোন ম্যাজিকে ?!তবে, ২০১৩ সালে জয়পুর সাহিত্য সভায় একটি প্যানেল ডিসকাশনে সমাজবিজ্ঞানী আশীষ নন্দীর বক্তব্য নিয়ে বিরাট বিতর্ক হয়। উনি বলেছিলেন সমাজের নীচের স্তরের লোকেরা সরাসরি আর্থিক দুর্নীতিতে জড়ায় ও সহজে ধরাও পড়ে, কিন্তু উপরের স্তরের মানুষদের আর্থিক দুর্নীতিতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা অনেক কম, কারণ সাধারণ ভাবে তারা যেটা করে সেটা হলো quid pro quo অর্থাৎ favor against favor ! আশীষ নন্দীর এই কথাগুলো নিশ্চিত ভাবে সর্বৈব সত্য নয়, তাও এই exchange of favor এর অধ্যায়টাও আমাদের সম্পূর্ণ অজানা !!
যেমন, অজানা আর জি কর হাসপাতালে সেদিন কারা খুন করছিল, কেন করেছিল আর সঠিক কী কারণেই বা তাদের বাঁচাতে অনেক বড়ো ঝুঁকি নেন মাননীয়া ! নাকি তাদের নাম সামনে আসার ঝুঁকিটাই ছিল আরো ভয়ঙ্কর!!
আসলে, ওনার সমস্ত কিছুই রহস্যজনক, ধোঁয়াশাচ্ছন্ন, কোনো কিছুই স্বচ্ছ নয়। তাই, বোঝা একান্তই অসম্ভব আদৌ সত্য কি কোথাও আছে ; নাকি পুরোটাই মিথ্যা, অপরিসীম চটকদারী আচরণ ও অভিনয় ক্ষমতার আড়ালে?? একটা মিথ্যা ঢাকতে আর একটা মিথ্যা.. গত কয়েক বছরে আমরা ক্রমশঃ তলিয়ে যাচ্ছি মিথ্যার অতল গহ্বরে, ক্রমশঃ অভ্যস্ত হয়ে উঠছি ‘living within the lies’, জীবনযাত্রায়!!
সত্যি করে বলতে গেলে এই মুহূর্তে মানুষও কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত যে আদৌ কি কোনো দিন সম্ভব ‘অভয়ার সুবিচার’ পাওয়া?! কোনো বিশেষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়াই আপামর জনগণ শুধু শহর কোলকাতা নয় গ্রামেগঞ্জে এমনকি রাজ্য ও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্দোলনের যে তীব্রতা এনেছিল, তা কি মাঝখানের সাময়িক বিরতির পর আবার সেই পুরোনো মেজাজে আগেকার তীক্ষ্ণতায় শাসকের দিনে রাতের ঘুম কেড়ে নিতে পারবে ? সত্যি, সম্ভবপর হবে অতি অনিচ্ছুক শাসক ও তার একনিষ্ঠ সাহায্যকারীদের কাছ থেকে ‘justice’ ছিনিয়ে নিতে?
অথবা, যে CBI এতো দিন চুপচাপ বসে ছিল, তারা হঠাৎ সক্রিয় হয়ে উঠে উল্লেখযোগ্য কোনো supplementary chargesheet জমা দেবে, আর পুরো আইনী লড়াইটাই একটা অন্য মাত্রা পেয়ে যাবে? এটা বোধহয় এখন বেশ পরিষ্কার যে তা আদৌ ঘটবে না।
সহযোগিতা করবে না যারা ঠিকই করেছে, হাজার অনুরোধ বা কান্নাকাটি করলেও কি তাদের বিবেক কোনো দিনই জাগ্রত করা যাবে? কী মনে হয়?
তাই খুব সহজ কথা, একদিকে আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি যেমন ভীষণ ভাবে প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন তথ্যানুসন্ধানের দায়িত্বও মানুষের নিজের হাতে নেওয়া। এ ছাড়া তো আর কোনো গত্যন্তর নেই।
যে সব এজেন্সির কাজ ছিল তথ্যানুসন্ধানের, তারা যখন ইচ্ছাকৃতভাবেই চাইছে না, তাহলে তার দায়িত্ব তো জনগণকেই তুলে নিতে হবে। এজেন্সিগুলোকে বাধ্য করতে গেলেও প্রয়োজন সত্যের আংশিক ভাবে হলেও উন্মোচন। একমাত্র তখনই এরা সক্রিয় হবে, যখন এটা পরিষ্কার হবে যে মানুষ নিজের উদ্যোগেই সত্যের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম।
১৯ বছর আগে, যে ভাবে মানুষ বাধ্য করেছিল ‘জেসিকা লাল মার্ডার কেস’ review করাতে, আর আসামি মনু শর্মাকে শাস্তির আওতায় আনতে। দীর্ঘ সময় মামলা চলার পর, জেসিকার মৃত্যুর সাত বছর পরে, trial court সমস্ত আসামিকে বেকসুর খালাস করে দিয়েছিল প্রমাণাভাবে এবং একের পর এক সাক্ষীর বয়ান পাল্টানোতে। পরের দিন Times of India তে ছিল সেই ঐতিহাসিক headline,” No one killed Jessica Lal”..। মিডিয়া সেই সময়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল মানুষের ক্ষোভ ও প্রতিবাদকে সামনে আনতে। ‘তেহেলকা’র সাংবাদিকদের ‘স্টিং অপারেশন’এ জানা যায় কিভাবে সাক্ষীদের টাকা দিয়ে বয়ান পাল্টানো হয়েছিল, এমনকি ব্যালিস্টিক এক্সপার্টও ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্ত করেছিল আদালতকে। অবশেষে,মনু শর্মা সাজা পায়, সুপ্রিম কোর্টও সেই সাজা বহাল রাখে।
ভারতের বিচার ব্যবস্থায় জাগ্রত জনমত ও ‘অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতা’ (investigative journalism) কতদূর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, ‘জেসিকা লাল মার্ডার কেস’ তার অবশ্যই একটা উদাহরণ বা মাইলস্টোন হিসাবে গণ্য হবে। এটা ঠিক, দুটো সময় এক নয়, মিডিয়ার স্বাধীন ভূমিকাও অনেকাংশে সীমাবদ্ধ। কিন্তু, তা সত্ত্বেও মানুষের আন্তরিক ইচ্ছা ও অনমনীয় মনোভাব এবং অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মিডিয়ার অন্ততঃ এক অংশের সক্রিয় সাহায্য, নিশ্চিত ভাবে এখনো পারে শাসকের অন্যায় জেদ ও কারসাজিকে পরাস্ত করতে।
সেই হিসেবে দেখতে গেলে, ‘অভয়া মৃত্যু রহস্যের’ প্রকৃত ঘটনার পরম্পরা জানার সব রাস্তাও কি এখন বন্ধ হয়ে গেছে? একটা হাসপাতালের মধ্যে একজন ডাক্তার ডিউটিতে থাকাকালীন খুন হলেন, আর নার্সিং স্টাফ, গ্রুপ ‘ডি’ কর্মী, অন্যান্য ডাক্তার, ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা বহু রোগী, তাদের জন্য অপেক্ষারত অসংখ্য বাড়ির লোক কেউ কিছু জানবে না, এ কখনো সম্ভব?? তাও আবার আর জি কর মেডিকেল কলেজের মতো হাসপাতালে? CBI তো সেভাবে কাউকে জেরাই করেনি, সেদিনের ডিউটিতে থাকা বিভিন্ন স্তরের কর্মী ও ডাক্তারদের! নিশ্চয়ই ইচ্ছে করেই করেনি, কী দরকার আবার যদি ‘একমাত্র সঞ্জয় রায়’ ছাড়া অন্য অপরাধীদের নাম কেউ বলে ফেলে।
খুব পরিষ্কার কথা, আন্দোলনকে তীব্রতর করার সঙ্গে সঙ্গে মানুষকেই দায়িত্ব নিতে হবে, সত্যিকারের অপরাধীদের চিহ্নিতকরণের কাজ। দুটো কাজই সমান গুরুত্বপূর্ণ, অন্ততঃ বর্তমান প্রেক্ষিতে, যদি আপাত অসম্ভবকে সম্ভবপর করে তুলতে হয়।
এটা মেনে নেওয়া ভালো, পশ্চিম বঙ্গের শাসককুল পুরো বিষয়টাকে এই মুহূর্তে অনেকটাই নিজেদের আয়ত্তের মধ্যে নিয়ে এসেছে। তাদের কাছে, এটা অনেকাংশেই settled fact..
১২০ বছর আগে, লর্ড কার্জনের ‘Partition is a settled fact and what is settled can not be unsettled’ এই দম্ভোক্তির উত্তরে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত উক্তিটা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি “.. will unsettle the settled fact”………
১৯০৫ সালে ৭ই আগষ্ট টাউন হলের এক সভা থেকে জন্ম নিয়েছিল বাঙালির সংঘবদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের এক নতুন অধ্যায়।
১২০ বছর ধরে চলমান আন্দোলনের সেই ধারা নিশ্চয়ই এতো সহজে হারিয়ে যাওয়ার নয়, বিপরীতের দাম্ভিকতার নাম যাই হোক না কেন………….











