জম্বু দ্বীপের অথবা ভারতীয় ভূখণ্ডের প্রকৃতি অরণ্যে ভরপুর ছোটনাগপুর অঞ্চল সুদূর অতীত থেকে ছিল আদিবাসী, ভূমিজ, জনজাতি মানুষদের শান্তির নীড়। প্রকৃতির সন্তান তাঁরা অরণ্য, পাহাড়, নদী, সমতলে সহজ সরল শান্তিপূর্ণ এবং সুখী জীবন অতিবাহিত করতেন।অতীতে বিবিধ রাজবংশ, পাঠান ও মোগল সুলতান এবং আঞ্চলিক রাজা, নবাব ও জমিদারদের দ্বারা এই অঞ্চল আক্রান্ত হলেও ঐ শাসকরা বন্য জন্তুতে পূর্ণ এই ঘনজঙ্গলময় পাহাড় মালভূমি অঞ্চল নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না, এর গভীরেও ঢুকতেন না। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা আসার পর সারা ভারতের মত এই অঞ্চলের গভীরে গিয়ে প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদ নিংড়ে নিতে শুরু করলেন।
আরণ্যক সম্পদের পাশাপাশি তারা বিপুল খনিজ ভান্ডারের হদিশ পেলেন এবং সেগুলি উত্তোলন করতে শুরু করলেন। সমস্ত কিছু দখলদারির জন্য তারা রাজস্ব সংগ্রহ সহ প্রবল শোষণ ও অত্যাচারের এক প্রশাসন, ভূমি বন্দোবস্ত, এবং আইন-আদালত চালু করেন। তাদের পথ ধরে এখানে এসে উপস্থিত হন তাদের শোষণ-শাসনের সহযোগী হিন্দু-মুসলমান জমিদার, সিন্ধি-মাড়োয়ারি-পাঞ্জাবি ব্যবসায়ী-ঠিকাদার – সাহু-মহাজন, বাঙালি নায়েব-গোমস্তা-কেরানিকূল। তরাই, ডুয়ার্স ও অসমের চা বাগানে, সুন্দরবনের জঙ্গল হাসিল করতে কিংবা অন্যত্র শ্রম নিবিড় কাজে এখানকার সাঁওতাল, মুন্ডা, কোল, ভিল, ওঁরাও, হো, বিরহর, ভূমিজ, খেড়িয়া, খারোয়ার, গোণ্ড, বেদিয়া, পাহাড়িয়া প্রমুখ জনজাতিদের উৎপাটিত করে বলপূর্বক ক্রীতদাসের মত অন্যত্র নিয়ে যান। এখানকার আদি প্রাকৃতিক দর্শন ও ধর্মে বিশ্বাসী মানুষদের খৃষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করেন। যখন এখানকার প্রাচীন ও স্থায়ী জনজাতিদের অস্তিত্ব একেবারে সংকটগ্রস্ত হয়ে পড়ে তখন তাঁরা বিদ্রোহের পথ বেছে নেন। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগ অবধি আড়াইশো বছরের মধ্যে একের পর এক জনজাতি বিদ্রোহে ব্রিটিশ শাসন কেঁপে ওঠে যার মধ্যে সিধু-কানু-চাঁদ-ভৈরব দের নেতৃত্বে ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’, বিরসা ভগবানের নেতৃত্বে মুন্ডা বিদ্রোহ ‘উলগুলান’ , ওঁরাও বিদ্রোহ ‘তানা ভকত’ আন্দোলন সর্ববৃহৎ।
১৯২৮ এ ‘ছোটনাগপুর উন্নয়ন সমাজ’ এখানকার অধিবাসীদের সমস্যা নিয়ে ‘সাইমন কমিশন’ কে দাবিপত্র পেশ করেন। জাতীয় কংগ্রেসের রামগড় অধিবেশনের সমসময়ে নেতাজী সুভাষচন্দ্র, মানবেন্দ্র রায় প্রমুখের সমর্থনে ১৯৩৯ এ আদিবাসীদের জনপ্রিয় নেতা, ১৯২৮ এর অলিম্পিকে সোনা বিজয়ী ভারতীয় হকি দলের অধিনায়ক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রশাসক, লেখক, সাংসদ, ‘মারাম গোমকে (সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা)’ জয়পাল সিংহ মুন্ডার নেতৃত্বে ‘আদিবাসী মহাসভা’ গড়ে উঠে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের সমস্যাগুলি তুলে ধরে।
এরপর স্বাধীনতা আসে, কিন্তু ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ সবই চলে যায় এক শ্রেণীর রাজনীতিক, বড় শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, আমলা ও মাফিয়াদের হাতে। শোষিত বঞ্চিত দরিদ্র আদিবাসীদের দুর্দশার পরিবর্তন হয়না। জয়পাল সিংহ, রামনারায়ণ সিংহ প্রমুখদের নিয়ে ১৯৪৯ এ ‘ঝাড়খন্ড পার্টি’ গঠন করেন। তখন থেকেই ছোটনাগপুরের আদিবাসীদের স্বায়ত্বশাসন ও নিজের রাজ্যের দাবি ও আন্দোলন। ঝাড়খণ্ড অর্থ অরণ্যের দেশ। ঝাড়খণ্ড পার্টি ১৯৫৫ তে পৃথক ঝাড়খন্ড রাজ্যের দাবি পেশ করে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনকে। ১৯৭২ এ বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা অজিত কুমার রায়, আদিবাসী নেতা শিবু সোরেন এবং কুর্মী – মাহাতো নেতা বিনোদ বিহারী মাহাতোর নেতৃত্ব ‘ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চা’ গঠিত হয়ে আন্দোলনের গতি বৃদ্ধি করে। তাঁরা আদিবাসীদের ঝাড়খন্ড রাজ্যের দাবিতে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি জোতদার, মহাজন, শিল্পপতি, খনি মালিকদের শোষণের বিরুদ্ধেও তৃণমুল স্তরে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলেন।
এরপর নির্মল মাহাতোর নেতৃত্বে ‘ অল ঝাড়খন্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ‘ সহ একের পর এক ঝাড়খণ্ডী খন্ডদল তৈরি হতে থাকে। ফলে জনগণের নতুন নতুন অংশে আন্দোলনের যেমন ব্যাপ্তি হয়, অন্যদিকে আন্দোলনে বিভাজন শুরু হয়। এরপর সমগ্র আন্দোলনটিকে সমন্বয় করে আন্দোলনকে দিশা দেখাতে রাম দয়াল মুন্ডা, বি পি কেশরী, বি বি মাহাতো, সন্তোষ রানা, সুরজ সিংহ বেসরা প্রমুখের নেতৃত্বে ‘ঝাড়খন্ড কো অর্ডিনেশন কমিটি’ গঠিত হয়। বিজেপি ১৯৮৮ থেকে পৃথক বনাঞ্চল আন্দোলন শুরু করে।
এসময় আন্দোলন হিংসাত্মক রূপ নেয়। সমগ্র দক্ষিণ বিহার জুড়ে গত শতাব্দীর আশির দশক থেকে বনধ, অবরোধ, ভাঙচুর ইত্যাদি হিংসাত্মক ঘটনা ঘটতে থাকে। আইন শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ে। অবশেষে ১৭ টি ঝাড়খণ্ডী দল কে নিয়ে এল পি এল প্রসাদ যাদবের নেতৃত্বে ‘অল পার্টি সেপারেট স্টেট মুভমেন্ট’ গড়ে ওঠে। কংগ্রেস ঝাড়খন্ডের দাবিটি পাঁচ দশক ধরে লেজে খেলিয়ে অবশেষে ‘ঝাড়খন্ড অটোনোমাস কাউন্সিল’ উপহার দেয়। এরপর বিজেপির নেতৃত্বে এন ডি এ ক্ষমতায় এসে বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রিত্বে ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড় ও উত্তরাখণ্ড তিনটি ছোট রাজ্য গঠন করে।
অধরা ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠন হলেও আদিবাসীরা যে তিমিরে ছিলেন সেখানেই থাকেন। শিল্পপতি-ব্যবসায়ী-ঠিকাদার-মহাজন-নেতা-আমলা- পুলিশ-মাফিয়া চক্রের শোষণ ও লুঠের নাগপাশ বৃদ্ধি পায়। উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করে পরিবেশ ধ্বংস করে খনি, সড়ক, কারখানা, প্রমোদ কেন্দ্র গড়ে ওঠে। অতীতে মাওইস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার (এম সি সি) প্রমুখ কিছু নকশাল গোষ্ঠীর নৈরাজ্যবাদী কার্যকলাপ থাকলেও একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে এমসিসি ও সিপিআই এমএল (পিপলস ওয়ার) গোষ্ঠী দ্বয়ের সম্মিলিত সিপিআই (মাওইষ্ট) দলের হিংসাত্বক কর্মকাণ্ড ঝাড়খণ্ডকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। বহু মানুষের মৃত্যু হয়। পরে রাষ্ট্রীয় প্রতিআক্রমণ ‘অপারেশন গ্রিন হান্ট’ এ এই আন্দোলনও প্রশমিত হয়ে পশ্চিম সিংভূম জেলার সারেন্ডার শাল জঙ্গলের গভীরে সংকুচিত হয়। আদিবাসী দলগুলি ক্ষমতায় আসে বা সমর্থনকারী কিং মেকারের মর্যাদা লাভ করে, একইসঙ্গে অধঃপতিত হয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং কংগ্রেস – বিজেপির সঙ্গে অনীতিনিষ্ঠ বোঝাপড়ায় চলে যায়। মধু কোরা, শিবু সোরেন একই চিত্র। আবার বাবুলাল মারান্ডি, অর্জুন মুন্ডা, চম্পাই সোরেন রা বিজেপির সঙ্গে সংপৃক্ত থাকেন।
এমনি এক বাঁকের মুখে ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের জীবিত শেষ প্রধান ও জনপ্রিয় নেতা, ‘ দিশম গুরু (দেশের নেতা)’ বা ‘গুরুজী’ শিবু সোরেন (১৯৪৪ – ২০২৫) চলে গেলেন। তিনি ছিলেন আমৃত্যু ঝাড়খন্ডের ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দল জেএমএম এর সভাপতি ও রাজ্যসভার সাংসদ; ২০০৫ (১০ দিন), ২০০৮ – ‘ ০৯ (চার মাস) ও ২০০৯ – ‘ ১০ (পাঁচ মাস) এ তিনবারের ঝাড়খন্ডের মুখ্যমন্ত্রী; দুমকা কেন্দ্র থেকে ১৯৮০, ১৯৮৯, ১৯৯৮ এবং ২০০২ – ‘ ১৯ দীর্ঘদিনের নির্বাচিত সাংসদ; ২০২০ – ‘ ২৫ রাজ্য সভার সাংসদ; ২০০৪ (২ মাস), ২০০৪ – ‘০৫ (৪ মাস) ও ২০০৬ (১০ মাস) কেন্দ্রের কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের কয়লা মন্ত্রী। এগুলি নিছকই পরিসংখ্যান। আদিবাসী জনসাধারণের কাছে ছিলেন প্রিয় ‘দিশম গুরু’ বা ‘গুরুজী’ । রামগড়ে থাকাকালীন কৈশোরে মহাজনের গুণ্ডা বাহিনী তাঁর পিতাকে হত্যা করে, সদ্য যুবা তিনি ‘সাঁওতাল নবযুবক সংঘ’ গড়ে অন্যায়ের প্রতিবাদে মাঠে নামেন। একটি পর্যায়ে নিজে সামনে দাঁড়িয়ে ঝাড়খণ্ড আন্দোলন, জমির দাবিতে ও জমির দখলের আন্দোলন, জমিদার – মহাজন বিরোধী আন্দোলন, ‘দিকু (অ-আদিবাসী) বিতাড়ন’ আন্দোলন সংঘটিত করেছেন। উচ্ছেদ করেছেন আদিবাসী বসতি গুলি থেকে সামন্ত অবশেষ। দিয়েছেন তাঁদের জমির ও রাজনৈতিক অধিকার।
আদিবাসীদের সমর্থনে ক্ষমতায় পৌঁছনোর পর আদিবাসীদের কতটা কি হলো কেউই ফিরে দেখেন নি। তিনিও দেখেননি। ধনী হয়েছেন, ভারতীয় রাজনীতির প্রচলিত ব্যাকরণ মেনে ক্ষমতায় ও দলে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করেছেন। প্রয়াত জেষ্ঠ্য পুত্র দুর্গা ও পুত্রবধূ সীতা বিধায়ক ছিলেন; মেজপুত্র হেমন্ত বিধায়ক ও মাঝে কয়েকমাস দুর্নীতির দায়ে শ্রীঘর যাওয়া বাদে দু বারের মুখ্যমন্ত্রী; পুত্রবধূ কল্পনা বিধায়ক; কনিষ্ঠ পুত্র বসন্ত বিধায়ক ও ক্যাবিনেট মন্ত্রী। ক্ষমতার রাজনীতির পথ ধরে সোরেন পরিবার ঝাড়খন্ডের প্রতিপত্তিশালী রাজ পরিবার হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাঁদের বিতর্ক ও বিড়ম্বনা ছাড়েনি। তার চাইতেও বড় বিড়ম্বনা শিবু সোরেনের ক্ষেত্রে জামতারার চিরুদি গণহত্যা, ব্যক্তিগত সচিব অপহরণ ও হত্যা, কয়লা কেলেঙ্কারি প্রভৃতির অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়া যার জন্য জেলেও যেতে হয়েছে। গুরুজী শিবু দিকু বিতাড়নে একদা নেতৃত্ব দিয়ে পরবর্তীতে নিজেই দিকুসম হয়ে উঠেছিলেন, দিকুদের আইন আদালত কিন্তু তাঁকে শেষ অবধি স্বস্তি দেয়নি ।










