বয়স বাড়ছে। শীত করছে। পাতা ঝরছে। টুপটাপ দিনরাত কত কি যে খসছে।
‘অ বৌমা বেলা হল–ভাত বাড়ো’ –আজকাল এমন গৃহস্থ কথার ওম ওড়াউড়ি করে না বাড়িতে।
কত কি যে মনে পড়ে। কোনদিন ছোটবেলায় কারো বাড়িতে এমন করে ভাত খেয়েছিলাম –কার বাড়ি মনে পড়ে না।
চাটাইয়ের আসনে বাবু হয়ে বসা হল। ভাতের হাঁড়ির ঢাকনা খোলা হল। ধোঁয়া উঠল। বাস ছড়াল। হাতায় করে থালায় পড়ল দেশি চালের ভাত। আঙুলের মুদ্রাতে চুড়ো ভেঙে ছোট গর্ত হল। সেখানে গোল হাতা থেকে হলুদবাটা গন্ধ গরম ডাল পড়ছে। ডাল পড়ছে –এক দু পলকের মধ্যে ওই ডালের ধারা কি এক মহাকাব্য রচনা করল। এইসব আপাত তুচ্ছ ছোট ছোট দৃশ্যকল্পও কেমন অলীক লাগে –এসব কি সত্যি ঘটেছিল কখনো। হ্যাঁ, ঘটেছিল কোথাও।
বেলা বাড়ে। কাজ বাড়ে। কাজের গতি কমে আসে। কাজ সেরে ফিরতে দেরি হয়ে যায়। সবজি মাসি বন্ধু রোজ ডাকে –‘আমার লাউমাচাটা দেখবে চল,কেমন ডগা ছেড়েছে’। আজ নয় কাল–দেরি হয়ে যায় রোজ। কলিম খানের অভিধান বলে “ড” শব্দের ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ ঊর্ধ্বমুখে গমন, তাই লাউ ডগা সদাই আকাশের কোলে চড়তে চায়, অবনতা লতা হয়ে থাকা তার ধাতে নেই মোটেও।

আমাদের উত্তরপাড়ার বাড়িতে ঠাকুমা লাউ ডগা কাটতে দিত না–বলত পাতায় পাতায় জালি, ডগা কাটতে নাই। জালি মানে ফলসহ কুঁড়ি।
কুচ কুচ করে কটা কচি ডগা কেটে জোর করে থলেতে ভরে দিল গীতা। বাড়ি ফিরতে বেলা তিনটে। ভাতের মধ্যে পুঁটলি করে সেই লাউডগা, একটা কচি বেগুন আর আলু ফেলে দেওয়া গেল। ভাত ফুটতে ফুটতেই ছোট মিক্সিতে পোস্তবাটা সারা হল। পুঁটলি খুলে সব সেদ্ধগুলো পোস্ত বাটা, কাঁচা সরষের তেল, নুন দিয়ে একটু মোটা করে মাখা হল। শেষে “কলম্বাস এক্সচেঞ্জ” এর সেই জিনিষটি মটকে ডলে ডলে না মেশালে স্বাদটা মোটেই খোলতাই হয় না –কাঁচা লঙ্কা।
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মতো রান্নার ক্ষেত্রেও কানে হাত ছুঁইয়ে গুরুর নাম বলতে হয় –লাউডগা খাওয়ার এই অতি উপাদেয় সোজা পদ্ধতিটি শিখিয়েছিলেন ঘোষালকাকিমা।
পরিতৃপ্তি করে থালাভরা ভাত খেয়ে আমার সেই লাউ মাচাটার কথা মনে পড়ে আর হঠাৎ মনটা হু হু করে ওঠে। কি যে বিচ্ছিরি লগ্নে জন্ম আমার -যত বিষন্ন কথা মনে কোথায় লুকিয়ে থাকে –কোন অনুষঙ্গ পেলেই ঝুপ করে কখন সামনে এসে পড়ে।
দুর্গাপুরে এসেই আনন্দবিহার কোয়ার্টারে তিনতলায় ছিলাম দু বছর ১৯৯০ থেকে ১৯৯২। সেই সময় বিশেষ কারণে একটা বছর আমার হাতে অনেক অবসর সময় ছিল–সারাদিন তিনতলার জানলা থেকে দেখতাম। পাশের ফাঁকা জায়গায় তিন চারটি মাটির ঘর উঠছে। দেয়াল গাঁথা হল, টালি ছাওয়া হল। কি তকতকে মাটি লেপা উঠোন তৈরি হল। উঠোনে নধর পেঁপে চারা বড় হল। কি নিঁখুত সুখের শান্ত পাড়া। শ্রমজীবী মায়েরা তেল চুবচুব চুল টেনে খোঁপা বেঁধে, বেগনি শাড়ি পরে সকালেই কাজে বেরিয়ে যায়। বাবারা বেরোয় আরো ভোরে। একটা বাদামি রঙের কুকুর আর দুটো বাচ্চা উঠোনে খেলা করে। আর –আর–একটা লাউমাচা –বাঁশের খুঁটিতে তার আঁকশি জড়িয়ে সবুজ লাউ গাছটি বেড়ে ওঠে। ডালপালা মেলে। ফন ফন করে নৃত্যের ভঙ্গীতে আকাশে ওঠে লাউ ডগারা। ছোট ছোট সাদা ফুল ফোটে। দু চারটে কচি লাউ ঝোলে মাচা থেকে। গেরস্তরা রোজ কাজ থেকে ফিরে ঘুরে ফিরে দেখে –চোখেমুখে কি তৃপ্তি, যেন ছেলে কেলাসে ফাস্টো হয়েছে। কাজ থেকে ফিরে উঠোনে মাটির উনুনে কিসব রান্না করে, অত উঁচু থেকে অনেক উঁকিঝুঁকি মেরেও বুঝতে পারি না। খুব তৃপ্তি করে এক থালা ভাত খায় দেখি।
হঠাৎ –একদিন সকালে শুনি কিসব চিৎকার ধমক ধামক ঝগড়া। জানলা দিয়ে নীচে তাকিয়ে দেখি পুলিশ ওদের সব ঘর ভেঙে দিচ্ছে, সামান্য যা ঘরগেরস্তালির সামগ্রী সেসব পোঁটলা বেঁধে চলে যাচ্ছে ওরা। কেউ হাতজোড় করে কিছু বলছে, কেউ বা সমগ্র মনুষ্য সমাজের উপর ক্ষোভে গালাগাল উগড়ে দিচ্ছে। ভাবছিলাম –বুঝি কিছু উপায় হবে। নাহ –বাড়িগুলো ধুলো হয়ে গেল। সেই সেমি নোমাডিক যুগ থেকে ঘর বাঁধা যেমন মানুষের প্রবৃত্তি- জবরদখল জমি থেকে ঘর উচ্ছেদও সভ্যতার আইনকানুন। কার পক্ষে ভাবব।
ওরা উনুন ভেঙে চলে গেল। এক বেলার মধ্যে সব ফাঁকা। ওদিকে আর তাকাতে পারা যায় না। বিছানা বন্দী আমার তখন ওই একটিই খোলা জানলা –অসম্ভব মন কেমন করে ওই তিন চারটে গেরস্তর জন্য, বাদামি কুকুরটার জন্য।
শুধু লাউমাচাটা থেকে গেল –পুলিশ আর গেরস্ত দুজনেই ভুলে গেল লাউমাচাটার কথা। স্তব্ধ আঙিনাতে ওই একটা জীবনের উপস্থিতি যেন শূন্যতাকে আরো ভয়ানক ভাবে বাড়িয়ে দেয়। সে রোজ নিয়ম করে ফুল ফুটিয়ে যায়, সাদা ফুল দোলে–যদি কেউ ফিরে আসে।
আমরা এরপর সিটি সেন্টারে বাড়ি বানিয়ে চলে আসি।
হয়তো কেউ আবার ফিরে এসেছিল –“আবহমান” কাল ধরে যেমন যাওয়া আসা চলে , নইলে এসব কবিতা লেখা হত না —
“যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া,
লাউমাচাটার পাশে।
ছোট্ট একটা ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল
সন্ধ্যার বাতাসে।
কে এইখানে এসেছিল অনেক বছর আগে,
কেউ এইখানে ঘর বেঁধেছে নিবিড় অনুরাগে।
কে এইখানে হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে,
এই মাটিকে এই হাওয়াকে আবার ভালবাসে।
ফুরয় না তার কিছুই ফুরয় না,
নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না!
ফুরয় না তার যাওয়া এবং ফুরয় না তার আসা,
ফুরয় না সেই একগুঁয়েটার দুরন্ত পিপাসা।
——–
যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া,
লাউমাচাটার পাশে।
ছোট্ট একটা ফুল দুলছে, ফুল দুলছে—“ –নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী
বয়স বাড়ছে। সংক্ষেপে রান্নার রেসিপি লিখতে লিখতে মনে সান্ধ্যনদীর হাওয়া বয় । সেই হাওয়া মনখারাপ বয়ে আনে।
লাউমাচাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ানো আর হয়ে ওঠে না যে —











স্মৃতিমেদুরতা মনখারাপের সুর বয়ে আনল। অসামান্য মুনশিয়ানায় ভালবাসার তুলিতে আঁকা এক টুকরো জীবনের ছবি আজ সকালের সেরা উপহার।