অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম, হিন্দু ধর্ম এবং হিন্দুত্ব নিয়ে একটা লেখা লিখবো । কিন্তু ধর্ম নিয়ে আমার পড়াশোনার সীমাবদ্ধতার জন্য লিখে উঠতে পারছিলাম না । আজ এই ব্যপারে খুব ভাল একটা লেখা (অরিজিৎ মুখার্জী) পাওয়াতে , তার থেকে কিছুটা বাদ দিয়ে, অনেকটা সংযোজন করে লেখাটা পোস্ট করলাম ।
হিন্দু ধর্ম এবং হিন্দুত্ব
হিন্দুধর্ম একটা প্রাচীন এবং বহুত্ত্ববাদী বিশ্বাস, একটা বড় নদীর মত যেখানে বহু ধারা এসে মিশে যায়। নিরাকার ঈশ্বরে বিশ্বাসী থেকে নীল চামড়ার রাখালকে পুজো করা লোক; শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব, অদ্বৈতবাদী, সংশয়বাদী, নিরীশ্বরবাদী, ভক্তিবাদী, মিস্টিক সাধক। আবার, এই একই ধর্মে অসংখ্য মানুষকে অচ্ছুৎ করে রাখা হয় জাতপাতের নামে। নারীরা শক্তিশালী দেবতা, এমনকি সবচেয়ে শক্তিশালী দেবতাও । অন্যদিকে নারী নরকের দ্বারও । আক্ষরিক অর্থেই হিন্দু ধর্মের গঠন বেশ জটিল ।
শুধূ তাই নয়, ভারতবর্ষের রাজ্যগুলো দেখুন এবং সেই রাজ্যগুলোতে হিন্দু সম্প্রদায়ের পালিত প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলো খেয়াল করুণ – আসামে বিহু, পশ্চিমবঙ্গে দুর্গা পূজা, বিহারে ছট, উড়িষ্যাতে রথযাত্রা; এমনি করে, গণেশ চতুর্থী, বৈশাখী, দেওয়ালি, নবরাত্রি, পঙ্গাল, ওনাম ইত্যাদী হচ্ছে বিভিন্ন রাজ্যের হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। প্রসঙ্গত এই সব উৎসবে অন্য ধর্মের বহু মানুষও নিজেদের উৎসব মনে করেই অংশগ্রহণ করেন।
একই সাথে এটা মনে রাখা দরকার বেদ, উপনিষদ, গীতা, এমনকি কোনো পুরাণেও হিন্দু শব্দটি নেই । প্রাচীন কোনো সংস্কৃত বই এ ‘ হিন্দু’ শব্দটাই নেই। এটা এখন সবারই জানা যে সিন্ধু নদের এই পাড়ে যারা বাস কোরতেন, প্রাচীনকাল থেকেই তাদের ‘হিন্দু’ বলা হতো । খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে সংস্কৃত ‘সিন্ধু’থেকে পার্সিয়ান ‘ হিন্দু’ হয়ে পঞ্চম শতাব্দীতে গ্রীক ‘ ইন্ডাস’ । তারপর ইসলামিক ( ১৩ -১৮) এবং ব্রিটিশ ( ১৮- ২০) শাসনে ‘হিন্দু’ শব্দটি ধীরে ধীরে ভৌগোলিক থেকে ধর্মীয় পরিচিত পেতে শুরু করে- মুসলিম জনগোষ্ঠী ছাড়া যে অন্যান্য জনগোষ্ঠী ভারতবর্ষে বসবাস করেন, তাঁদেরকে ‘ হিন্দু’ নামে অভিহিত করা শুরু হয়। বাংলাতে খুব সম্ভবত রামমোহনই প্রথম ( ১৮১৬) Hinduism শব্দটি ব্যবহার করেন, এই ভূখণ্ডের সমগ্র ধর্মীয় ঐতিহ্যকে এক শব্দের মধ্যে আনার জন্য । ব্রিটিশ চিন্তাবিদরাও “বিভিন্ন সম্প্রদায়, মতবাদ ও রীতিনীতির এক বৈচিত্র্যময় সমষ্টির ওপর একটি একক ধারণাগত শ্রেণি আরোপ করেছিলেন”; ফলে “হিন্দুধর্ম” ইউরোপীয়দের দ্বারা নির্মিত হওয়ার পরই ভারতীয়রা নিজেরাও এই ধারণা গ্রহণ করতে শুরু করেন যে তারা একটি অভিন্ন ধর্মের অন্তর্ভুক্ত। বাস্তবে কিন্তু তখনও, সেই সময়ের হিন্দুরা নিজেদের সাধারণত ‘হিন্দু’ না বলে বরং সনাতন-ধর্মী, আর্য সমাজী, বৈষ্ণব, শৈব ইত্যাদি পরিচয়ে চিহ্নিত করতেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৭২ এর সেন্সাস এ ‘ হিন্দু’ শব্দটিতে অফিসিয়াল ছাপ পড়ে গেল; এবং বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র, অরবিন্দ, গান্ধীর মতন সব বড় বড় মানুষরা ‘ হিন্দু’ পরিচিতি গ্রহণ করতে শুরু করলেন। তারপর ধীরে ধীরে হিন্দু ধর্ম তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
উল্টোদিকে, হিন্দুত্ব তৈরী হয়েছে আধুনিক যুগে, ১৯২৩ সালে, সাভারকরের হাতে। যদিও ‘ হিন্দুত্ব’ শব্দটি প্রথম আমরা পাই, ১৮৯০ সালে চন্দ্রনাথ বসুর লেখায়। তিনি ছিলেন বঙ্গীয় রেনেসাঁর চিন্তাবিদদের একজন। তিনি এই শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর বাঙলায় সংস্কৃতিক,ধর্মীয় পুনর্জীবন এর পরিপ্রেক্ষিতে। সাভারকার এতে রাজনৈতীক রং লাগালেন। সাভারকরের নিজের লেখাতেই রয়েছে — “Hindutva is different from Hinduism” — প্রার্থনা বা দর্শন নয়, হিন্দুত্বের জন্ম ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে। কল্পিত, এক ছাঁচে তৈরী, মনোলিথিক, উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্য সকলকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা।
1939 সালে সঙ্ঘের দ্বিতীয় সঙ্ঘচালক গোলওয়ালকর তার WE পত্রিকায় লিখলেন “লড়াই টা ব্রিটিশ ও মুসলমান বিরোধী। দুটোকেই দেশ থেকে তাড়াতে হবে। এটাই আমাদের লক্ষ্য “।বিশ্বাসের মন্দির নয়, ঘৃণার সুতো দিয়ে সেলাই করা গেরুয়া পতাকা।
ফারাকটা স্পষ্ট দেখতে চাইলে ফিরে তাকান কাদের বাদ রাখা হল সেইদিকে। হিন্দুধর্ম কখনো বলেনি যে আপনার জন্মভূমিকে “পুণ্যভূমি” বা দেবতা হিসেবে পুজো করতে হবে। সাভারকরের হিন্দুত্ব আর বিজেপির হিন্দুত্বের সংজ্ঞা — ভারত যাদের জন্মভূমি, কর্মভূমি এবং পুণ্যভূমি, তারাই একমাত্র হিন্দু। এবং তারাই এই দেশের আসল নাগরিক, বাকি সবাইকে তাদের প্রভূত্ব মেনেই, তাদের আজ্ঞাবহ দাসানুদাস হয়ে থাকতে হবে। মুসলমান, ক্রিশ্চান — যাদের ভগবান এ দেশীয় নয়, তারা এ দেশে বাস করলেও হিন্দুদের সমান অধিকারের দাবী করতে পারে না, কারণ তারা আসল নাগরিক নয়।
প্রসঙ্গত ভারতের সংবিধান রচনার সময়ে যে jus soli ( right of soil) -র কথা বলা হয়েছিল — বর্ণ, ধর্ম, বাপমায়ের জন্মভূমি নির্বিশেষে ভারতীয় ভূখন্ডে যারা জন্মেছে, সকলেই ভারতীয় নাগরিক, Citizenship by Birth— সেই jus soli -র সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন সর্দার প্যাটেল। হ্যাঁ, সেই বল্লভভাই প্যাটেল, যাঁকে লৌহমানব বলে বিজেপি পুজো করে।
সাভারকরের হিন্দুত্ব এই jus soli-কে মানেনি কোনওদিনও। এই হিন্দুত্ব বলেছে অহিন্দুদের নাগরিকত্ব শর্তাধীন।গোলওয়ালকরের নিজের ভাষায়, এই অহিন্দুরা “may stay in the country wholly subordinated to the Hindu nation, claiming nothing, deserving no privileges, not even citizen’s rights”, অর্থাৎ, এদের সকলকে হিন্দু জাতির অধীনস্থ হয়ে থাকতে হবে, কোনো দাবি করতে পারবে না, কোনো সুযোগ‑সুবিধা নয়, নাগরিক অধিকার তো দূরের ব্যপার।”
আরএসএস আজ অবধি এই তত্ত্বকে অস্বীকার করেনি। তাদের জাতিবিদ্বেষের ব্লুপ্রিন্ট এটাই।
আজ কয়েক দশক ধরে প্রমাণিত — আরএসএস আর তার শাখা সংগঠন — বিজেপি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, দুর্গা বাহিনী — এদের হিন্দুত্বের বিপদটা জাস্ট থিওরি নয়। আমরা নিরন্তর দেখে আসছি; গরু পাচার, লাভ জিহাদ, বাড়িতে মাংস রাখার অভিযোগে মুসলমানদের পিটিয়ে মারার ঘটনা; মসজিদ ভাঙা; ঐতিহাসিক শহরের নাম বদলানো; স্কুলছাত্রদের শেখানো যে মধ্যযুগের ইতিহাসে মুসলমান শাসক মানেই দানব, আর নায়করা সকলেই হিন্দু; মেয়েদের শারীরিক শিক্ষা দেওয়ার নামে শেখানো যে তার আসল শত্রু বিধর্মী মুসলমান, গার্হস্থ্য হিংসা তো নর্মাল ঘটনা।
ধীরে ধীরে আপনি বজরঙবলীর পূজা, রামনবমীতে অস্ত্র নিয়ে মিছিল, কপালে হাত ঠেকিয়ে রামরাম বাবুজীর উত্তরে জয় সিয়ারাম আর জয় রামজীকি-এর বদলে গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করে জয় শ্রীরাম বলছেন, দুর্গাপুজোর সময় নিরামিষ খাচ্ছেন নিয়ম করে, সকাল সন্ধ্যে ভাবছেন কী করে ওই মোল্লা আর নীচু জাতের ছোটলোকগুলোকে টাইট দেওয়া যায়, সেদিন বুঝবেন আপনি হিন্দু থেকে হিন্দুত্ববাদীতে উন্নীত হয়েছেন।
একে নিজের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে ভালোবাসা বলে কিনা সেটা আপনিই ঠিক করবেন। আপনার সহনাগরিককে বাবর কি আওলাদ বলে শয়তান হিসেবে দাগিয়ে দেবেন কিনা; রোহিত ভেমুলার মত দলিতদের প্রতিদিন সমাজে তাদের আসল জায়গা দেখিয়ে দেবেন কিনা; মেয়েদের কোন চোখে দেখবেন; আর ধর্ম নিরপেক্ষতা, গণতন্ত্রকে পাশ্চাত্য বিষ বলবেন কিনা।
একটা কথা কখনো ভেবে দেখেছেন – মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী – এঁরা যাদের হাতে খুন হয়েছেন, তাদের একজনও কি সেই ধর্মের, যে ধর্মের মানুষদের এরা ঘৃণা করতে শেখায়?
মৌলালা আজাদ, সীমান্ত গান্ধী, আসফাকুল্লা খান, হবিবুর রহমান, শাহনওয়াজ খান, আবিদ আলী-এঁদের ধর্ম কি ?
মুঘল সংস্কৃতি বাদ দিয়ে ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিয্যের প্রতুলতা ভাবতে পারেন?
আজ যখন বিংশ শতাব্দীর মনীষীদের কথা ব্যবহার করে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে , হিন্দুত্বের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলে ব্যাপারটাকে সাম্প্রদায়িক করে ফেলার চেষ্টা করা হয়, তখন সেই জাতীয়তাবাদ এর মধ্যে হিন্দু ছাড়া অন্য ধর্মের মানুষকে প্রবেশাধিকার থাকে না। অথচ সেই সময়টা খেয়াল করুন। তখন ব্রিটিশ বিরোধী অন্দোলনে অজস্র জাতপাতে, ধারায় বিভক্ত এবং প্রায় ৬০০ করদ রাজ্যে বসবাসকারি দেশবাসীকে একত্র করা প্রয়োজন। জাতীয়তাবাদ হাওয়া থেকে আসেনা বা আকাশ থেকে ঝুপ করে পড়েনা। এতো বিচিত্র এবং বিভক্ত একটা জনগোষ্ঠীকে কি মন্ত্রে উজ্জীবিত করা যায়? কি হতে পারে, সেই gluing factor? পরবর্তীকালে গান্ধী, প্যাটেল, নেহুরু, সুভাষ, মৌলানা আজাদ এর কাছ থেকে কি আমরা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ এর কথা শুনেছি? আর রবীন্দ্রনাথ? তিনি তো এই ধরনের ধার করা পাশ্চাত্য জাতীয়তাবাদ কে ঘৃণাই করতেন ।তিনি বলতেন স্বাদেশিকতার কথা। আজ যখন দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে, যে জাতীয়তাবাদ, যা সময়ের এবং প্রয়োজনের নিয়মে অচল হয়ে গেছে, তাকে টেনে নিয়ে এসে hunger index এ যে দেশ পেছোতে পেছোতে ১২৩ টা দেশের মধ্যে ১০২ এ নেমে ‘ serious’ তকমা পেয়ে গেছে, দেশটাকে আবার ভাগ করার কি প্রয়োজন আছে?
ভাবুন, আপনারা।











