নুটু ঢালি গোড়া বাঁধানো বকুল গাছটার নীচে বসে আছে। মহকুমা আদালত চত্ত্বর। চারিদিকে লোকজন ইতস্ততঃ ঘুর ঘুর করছে। বেশির ভাগই হত দরীদ্র মানুষ জন। মুখ ঘুরিয়ে যে ‘মেয়ে-ছেলেটা’ বসে আছে প্রায় তার পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে, সে ফুলি। আগে ছিল বিশ্বেস এখন ঢালি। নুটুর দশ বছরের পুরোনো বউ। সে মুড়ি চিবুচ্ছে আর ফোঁস ফোঁস করে গোমরাচ্ছে।
– তখনি বল্লাম আজ হবেনি, আমার লাল ধাড়ির বাচ্চা বিয়োনর সময় হয়ি এসিছে। আজ কাল-ইর মধ্যি হবে।
– মোক্তার যে বললে, তার হাতে সময় কম। আজকের পরে আর ডেট নেই।
– রাখো তোমার মোক্তার, দেখলাম ঐ টালির চালের নীচি দাঁইড়ে বিড়ি টানচে। আমারে দেখে কয়, নুটু আসিনি, নুটু ?
এখানে আসার ইচ্ছে যে নুটুর খুব ছিল তেমন নয়।কে আর শখ করে এই কেস কাবারিতে জড়ায়? কারসাজিতে পড়ে আর জেদাজেদি করে এই অধোগতি।
মহিলানেত্রী আসমিরা বলেছিল , – এ আমাদের মহিলাদের অপমান। ভোটার তালিকার সংশোধনিতে গিয়ে তোর পরিচয় জানতে চাইলে তোর স্বামী বললে, আমার ‘মেয়ে-ছেলে’। এ আবার কি কথা?
– ওর কথা ধরুনি দিদি ও এক গোমুখ্যু।
নুটু দুপুরে মাঠ থেকে মজুর খেটে বাড়ি এসে বৃত্তান্ত শুনে থ, বললে ,- তা সেদিন যে ওদের হাল চাষ করতে গিয়ে দেখলাম, গফুর মিঞা তোর আসমিরা দিদিরে খুব পাঁচন পেটা করছে।
কি কারণে যে আসমিরার স্বামী গফুর তার বিবিকে পেটাচ্ছিল সে আর শুনতে চায়নি ফুলি।
এরপর নেত্রী আসমিরা বানু আর পার্টির কিছু লোকজন মিলে সালিশি বসিয়ে, কি সব শাসানি,ধমকানি ! সেই সালিশিতে উপস্থিত ছিল মোক্তার যতীন পোদ্দার। সে ফস করে বলে বসল, – দাও গো মেয়ে একখান ডিভোর্সের মামলা ঠুকে। বাপ বাপ বলে সব শিখে যাবে ।
ঘটনার জল গড়াল অনেক দূর। নুটুও জেদ ধরে বলল, – বিয়ে ইস্তক ‘মেয়ে-ছেলে’ই বলি-ই এসিছি। দুই ছেলের বাবা হয়ি গ্যালাম। এখন আর ওসব বদল হবেনি।
– হবে না বললে তো চলবে না । দেশে আইন কানুন বলে কি কিছু নেই ?
বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়ে এলে ক্লান্ত হয়ে একটা সময় ফুলি গাছ তলাতে কাৎ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। মাঝে যতীন মোক্তার এসে বললে, – কাগজ তৈরি হচ্ছে, ছেপে বেরুলেই সই হবে। আর ডিভোর্সের কেস ফাইল হবে।
নুটু ভাবে সইটা করবে কে, ফুলি তো টিপছাপও ভালো করে দিতে পারে না।
এমন সময় ঘড়র্ ঘড়র্ করে একটা পুলিশ ভ্যান কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে কোর্ট চত্ত্বরে ঢুকলো। সবাই চিৎকার করে বলছে, নাড়ু ডাকাত, নাড়ু ডাকাত। নুটু শুনেছে আড়ংঘাটায় ব্যাংক ডাকাতিতে নাকি নাড়ু জড়িত। লোকজন নাড়ুকে একবার চোখে দেখতে ছুটলো। ক্যামেরা নিয়ে ছবিও তুলতে গেল ছোটখাটো ফালতু কাগজের লোকজন।
ফুলি রোদ বাঁচিয়ে একদিকে মুখ করে ঘুমোচ্ছে বটে, তবে একটা নীল মাছি তার মুখের ওপরে ভন ভন করে উড়ছে। নুটু দেখল এই সুযোগ। কোন রকমে ফুলির মাথায় আস্তে করে হাত বুলিয়ে গায়ে হালকা করে ধাক্কা দিয়ে বলে, -ওঠ, ওঠ চল পালাই, কেউ দেখতি পাবে না।
(শেষ)









