ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে। চারদিকের অন্ধকার ক্রমশ ফিকে হয়ে আসায় বাড়ছে আলোর আভাস। পাখপাখালির দল গাছের পাতার আড়ালে থেকে কিচিরমিচির শব্দ করে জেগে উঠতে শুরু করছে সবে মাত্র। এমন সময় মঞ্চে প্রবেশ করে শামুক। অত্যন্ত ধীরে হাঁটতে হাঁটতে মঞ্চের প্রায় মাঝামাঝি এসে দাঁড়ায়। তারপর খানিকটা ক্লান্ত স্বরে বলে ওঠে।
শামুক: পথ যেন আর শেষ হয়না। সেই কোন্ ভোরে বাড়ি ছেড়ে বার হয়েছি।হাঁটছি ত হাঁটছিই। আবার পথ ভুল করলাম না ত ? কী জানি! আজকাল আর আগের মত সব কিছু পষ্ট ঠাওর করে উঠতে পারিনে (চারিদিকে ভালো করে দেখে) না, পথ তো ঠিক আছে। ওই তো দীঘির পুব পাড়ে তার দীঘল চেহারাটা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের গেছোদাদা। তা সব এত শুনসান কেন? আবার কোন অঘটন ঘটলো না ত? দু’পা এগিয়ে একটু হেঁকে ডেকে দেখি (ধীর পায়ে কয়েক পা এগিয়ে তারপর চড়া গলায় হেঁকে বলে) বলি ও গেছো দাদা! গেছো দাদা, সকাল গড়িয়ে যে দুকুর হতে চললো, এখনো ঘুম ভাঙে নি নাকি?
গাছ: আরে আমাদের শামুক খুড়ো যে। সুপ্রভাত শামুক খুড়ো , সুপ্রভাত,তা এই সাত সকালে এমন হন্তদন্ত হয়ে চললে কোথায়? বলি, শরীর গতিক ভালো তো?
শামুক: না রে গেছো দাদা। আজকাল শরীরে আর আগের মত জুৎ পাইনে। বয়স হয়েছে। শরীরের কলকব্জা গুলো আর আগের মত সচল নেই রে দাদা; সময়ের সাথে সাথে সব যেন কেমন ঢিলে ঢালা হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর সেদিন হলো এক বিপত্তি……
গাছ: আবার নতুন কি বিপত্তি হলো শুনি?
শামুক: আর বল কেন? সেদিন সকাল থেকেই চড়চড়িয়ে রোদ উঠেছে দেখে ভাবলেম, যাই কাজলা দীঘির জলে একটু নেয়ে আসি। শরীরে জ্বালা জুড়োতে বেশ আয়েস করে জলে নেয়ে উঠে দেখি, সারা শরীর জুড়ে লাল চাকা চাকা দাগ বেড়িয়েছে। সব্বাঙ্গ জুড়ে ব্যাথা ।তাই ভাবলেম আমাদের ব্যাঙ ডাক্তার কে একবার দেখিয়ে আসি। শরীরের এই কষ্ট বুড়ো বয়সে আর সইতে পারিনে
গাছ: ভালোই করেছ। তবু ব্যাঙ ভায়ার কাছে আসার ছুতোয় একবার দেখা হয়ে গেল। তাছাড়া কতকাল ধরেই ত আমরা একঠাঁয়ে সবাই মিলে মিশে বাস করছি। সুখে আর দুঃখে একে অন্যকে জড়িয়ে থেকেছি। সেই অদৃশ্য বাঁধনের টান জড়িয়ে যাবে কী করে?
শামুক: সেটা বেড়ে বলেছ গেছো দাদা, বেড়ে বলেছ। আমার দা মশাইয়ের কাছে শুনেছি, তার বাপের আমলে এ গাঁয়ের জমিদার মশাই দীঘির ধারে এই পুব পাড়ে তোমায় এনে ঠাঁই দিয়েছিলেন। সেই থেকে তুমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছো ।অত ঝড় ঝাপটার দাপট সহ্য করে তুমি এতকাল আমাদের আগলে রেখেছো ।ছোট বেলায় আমাদের ওই কাঁকড়া খুড়োর পাঠশালায় পড়েছিলাম না –নিশিদিন দাঁড়িয়ে আছো মাথায় লয়ে জট……. একেবারে সন্ন্যেসি ঠাকুর ……
(এমন সময় খেনোগলায় গাছের নীচে মেঠো বাড়ি থেকে গলা বাড়িয়ে কেঁচো বুড়ি কথা বলে ওঠে)
কেঁচো বুড়ি: (হাই তুলে আড়ামোড়া ভেঙে খানিকটা ঘুমমাখানো কন্ঠে) কী গো গেছো দাদা! এই সাত সকালে এমন হেঁকে ডেকে কথা কইছো কার সাথে? (শামুকের দিকে নজর পড়তেই আবেগভরা বিস্মিত কন্ঠে প্রশ্ন করে) ওমা! এযে আমাদের শামুক খুড়ো!কী গো খুড়ো? কেমন আছো? তা বলি পথ ভুলে আমাদের এই গাছতলির গরিবখানায় বেড়াতে এলে নাকি?
শামুক: এতটা বয়স হলো তোর ওই ফোড়ন কাটার স্বভাবটা গেলো না । পথ ভুলতে যাবো কেন?এই তো গেছোদাদাকে সে কথাই বলছিলাম। কতকাল আমরা সবাই মিলে মিশে ওই গাছতলীর পাড়াতে একসাথে আছি। নেহাৎ এই পুবপাড়াতে ঠাঁই নিয়ে একটু ঠোকাঠুকি লাগলো তাই নিরিবিলিতে দক্ষিণপাড়ায় নতুন আস্তানা গেড়েছি।
কেঁচো বুড়ি : ঠোকাঠুকি বলছো কেন খুড়ো? সবাই মিলে একসাথে থাকতে গেলে মাঝে মাঝেই এমনটা হয়। আবার নিজের নিয়মেই ঠিক হয়ে যায় সবকিছু। এই নিয়ে হৈ চৈ করার ত কোন কারণ দেখি না।
গাছ: তাই তো হক কথা বলেছো খুড়ি, হক কথা বলেছো। আসলে কি জানো আমাদের এই পরস্পরকে জড়িয়ে রাখার নিয়মটা ঠিক যেন এক বিনি সুতোর মালা। আমাদের আকৃতি, অবয়ব, আচার আচরণ সব আলাদা অথচ দেখ, আমরা সবাই কেমন আষ্টে পৃষ্ঠে নিজেদের জড়িয়ে থাকছি। (একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে) তবে আর কতকাল সবাই আমরা এমন গলাগলি করে থাকতে পারবো জানিনা?
(গাছের নীচের থেকে গলা বাড়িয়ে ব্যাঙ কথা বলে ওঠে)
ব্যাঙকাকা: কেন? সাতসকালে এমন অলুক্ষণে কথা কইছ কেন?
শামুক: ওমা তুমি আবার কখন এলে?
কেঁচো বুড়ি: এলো বলছো কি গো খুড়ো? ব্যাঙ দাদা যে এখন এখানেই তার দাতব্য চিকিৎসালয়ের নতুন শাখা খুলেছে।
শামুক: তাই নাকি? ভালোই হলো। এই শক্ত খোলা বয়ে আর আমাকে অতদূরে যেতে হবে না।
ব্যাঙকাকা: টুকটুক করে এতদূর যখন হেঁটে এয়েছিস তখন নিদেনের ব্যবস্থা একটা করে দেবো। এখন একটু আয়েস করে আড্ড দিয়ে নিই। কতকাল বাদে তোর সাথে দেখা। তা ‘কী যেন কইছিলে গেছো দাদা!
গাছ: যে কথা বলছিলাম সেকথা শুনলে এই মিঠে রোদ মাখা সকালটা কালবোশেখীর মেঘের মত কালো হয়ে উঠবে। তাই তো, সেদিন বেনে বউ এসেছিলো আমরা কে কেমন অছি তার খবর নিতে। সে বললো দাঁড়কাক দ্রিঘাংচু নাকি ওদের বলেছে আমাদের এই তল্লাট জুড়ে এক মস্ত কারখানা হবে। মাটি ফুঁড়ে উঠবে আকাশ ছোঁওয়া চিমনি। সেখান থেকে গলগলিয়ে উঠবে কালো ধোঁয়া। কতলোকের কাজ মিলবে সেখানে। কত বাড়ি হবে, দোকান হবে। হরেকরকম পশরা সাজিয়ে কত ব্যাপারীরা আসবে এখানে। চারিদিক গমগম করবে ……
ব্যাঙকাকা: (দুকান ঢেকে আর্তনাদ করে উঠবে) থামো, গেছোদাদা থামো। ওই দু’পেয়ে গুলোর গুণপণার কথা আর অমন সাজিয়ে গুছিয়ে কইতে হবেনা। (বিকৃত ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠে) কল হবে, চিমনি হবে, দোকান হবে। ওদের ওই দস্যিপণার দাপটে আমাদের সুজলা সুফলা বসুন্ধরা ছারখার হয়ে যেতে বসেছে।
শামুক: এই যে আমার সুখে শান্তিতে এতকাল ধরে মিলে মিশে বাস করছি সেটা ওরা চায় না।
কেঁচো বুড়ি: চাইবে কেন? ওই হিংসুটে মানুষ গুলো নিজেরা ঠোকাঠুকি করে নিজেদেরই ভাঙছে প্রতিদিন। এক হেঁসেলের যৌথ পরিবারগুলোকে টুকরো টুকরো করে সব অণু পরিবার গড়ে তুলেছে। আমাদের মত একে অন্যকে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে বাঁচতে শেখেনি ওরা।
ব্যাঙকাকা: আমাদের এই গেছোদাদাকেই দেখ। ওকে জড়িয়েই ত আমরা সকলে একঠাঁই রয়েছি। গেছোদাদার পায়ের কাছের জটপাকা শিকড়ের ছোট ঘুলঘুলিতে আমার বাসা। পায়ের কাছের মেঠো ফাঁকফোকড়েই রয়েছে পিঁপড়ে আর উইভায়াদের ঘর গেরস্থালী। ওই মগডালের কাছের নরম ডালে বোলতা ভায়াদের সাহেবীকেতার অ্যাপার্টমেন্ট -হেক্সাগোনিকা, শৌখিন দোয়েল কর্তা আর দোয়েল গিন্নির দোলনা অ্যাপার্টমেন্ট – তাও দুলছে এই মৃদু হাওয়ায় এই গেছোদাদার ডালে।
কেঁচো বুড়ি: শুধু কি তাই? এই গেছোদাদাকে আশ্রয় করেই মর্কট বন্ধুরা কাঠবেড়ালি ভায়া তাদের আবাসন গড়ে তুলেছে। আমরা আমাদের এই লিকলিকে শরীর নিয়ে গেছোদাদার শক্তপোক্ত কাষ্ঠল শরীরে হুটোপুটি করি না বটে তবে খসেপড়া শুকনো পাতা আর ডালগুলোকে আচ্ছা করে জারিয়ে আমরাই ত তৈরি করা হিউমাস।তাতেই মাটি হয়ে ওঠে সপ্রাণ ,গাছেরা হয়ে ওঠে সবল।
গাছ: ঠিক বলেছ খুড়ি। আমরা গাছেরা তোমাদের মত নড়ে চড়ে বেড়াতে পারিনে বটে, তবে আমাদের এই সবুজ দেহকে আশ্রয় করেই না তোমরা সকলে বেঁচে আছো। সৃষ্টির আদিকাল থেকেই তো আমরা ধারণ করে আসছি সমস্ত জীবকুলকে। প্রকৃতির রাজত্বে একমাত্র সবুজ উদ্ভিদেরাই হলো উৎপাদক। আর তোমরা সকলে হলে খাদক। তোমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে গাছেদেরকেও যে বাঁচিয়ে রাখতে হবে একটা নির্দিষ্ট অনুপাতে। এই অবস্থার সামান্য পার্থক্য হলে সবকিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। আসলে বিগত কয়েক শতাব্দীর সভ্যতার নাম করে, বিজ্ঞানের নাম করে আমাদের দু’পেয়ে মানুষ বন্ধুরা যে জীবন প্রণালী অনুসরণ অরে চলেছে তাতে অনেক ক্ষেত্রেই সভ্যতার মূল অর্থ ই রক্ষিত হয়নি। সৃষ্টিকর্তার তৈরি মূলসূত্রগুলিই পালিত হয়নি যথাযথভাবে।
ব্যাঙকাকা: ঠিক বলেছ গেছো দাদা ও। ওদের থেকে আমরা অনেক সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করি। কেবল বড়াই না করে মানুষদের উচিত আমাদের অণুসরণ করা।
(এমন সময় হুল বাগিয়ে মঞ্চে ঢোকে বোলতা সেনাপতি)
বোলতা: গেছোদাদার ডালে বসে আমি তোমাদের আলোচনা সব মন দিয়ে শুনছিলাম।সব কথা শুনতে শুনতে প্রচন্ড রাগে কেঁপে উঠছে আমার শরীর। গেছো দাদা তুমি হুকুম কর, আমি আমার বোলতা বাহিনীকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি ওই দু’পেয়েদের ওপর। এমন কষে খোঁচা দেবো যে বাছাধনেরা আর পালাবার পথ পাবে না।
গাছ: রোসো, রোসো, বোলতা ভাই। উত্তেজনার বশে কোন কিছু করা ঠিক হবে না। সৃষ্টিকর্তা যে আত্মীয়তার বাঁধনে এতকাল আমাদের একঠাঁয়ে বেঁধে রেখেছেন তা’ কি এতই পলকা? ভঙ্গুর ভেবেছো?মোটেই না। মর্ত্যের এই রঙ্গমঞ্চে মানুষেরা ত এই সেদিনের অতিথি, অথচ আমাদের সকলের সাথে এই ধরিত্রী মায়ের সম্পর্ক কতকালের, কত যুগযুগান্তরের। পৃথিবীর এই বৈচিত্র্যময় প্রাণ ভান্ডারের ওরাও যে মস্ত শরিক। সে কথা যে ওদের বুঝিয়ে বলতে হবে।
শামুক: মানুষেরা যদি আমাদের এই নিয়মেরই অধীন হবে তা’হলে ওদের আচরণ এমন ছন্দহীন ছন্নছাড়া কেন?
গাছ: এটাই যে একটা ট্র্যাজেডি শামুক খুড়ো। যতদিন মানুষ আমাদের মত স্থূল জৈবনিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলো, ততদিন সে ছিলো সেই আদি প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন। মানুষের মস্তিষ্কের মধ্যে যেদিন বুদ্ধির বিকাশ ঘটলো,ভিসেই দিনই এই তাকে জীবনের ক্রমবিকাশের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ,মূল কক্ষপথ থেকে উৎক্ষিপ্ত করে এক নতুনতর বক্ষে স্থাপন করেছে।
(এমন সম লাফাতে লাফাতে লেজ উঁচিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করে বানর।রীতিমত উত্তেজিত সে)
বানর: গেছোদাদা, গেছোদাদা! সেই রাখাল ছেলেটা আজো আসছে এদিক পানে। তুমি হুকুম কর। আজ ব্যাটাকে লেজে বেঁধে আচ্ছা করে ধোলাই দিই।
গাছ: ছিঃ, বানর ভাই, ও কথা বোল না। ও যে আমাদের অতিথি।
(গান গাইতে গাইতে মৃদু নাচের ছন্দে ঢোকে রাখাল)
রাখাল: আরেব্বাস, গেছোদাদা! আজ যে তোমায় ঘিরে একেবারে চাঁদের হাট বসেছে। বলি আজ কোনো উৎসব নাকি? আজ বানর কাকা রয়েছে, বোলতা সেনাপতি রয়েছে, ব্যাঙকাকা রয়েছে, শামুক খুড়ো রয়েছে, শামুক আর……
কেঁচো বুড়ি: আমিও আছি!
রাখাল: ওমা তাইতো, বটেই তো! আমাদের কেঁচো বুড়িও আছেন। কি সৌভাগ্য আমার। তোমাদের সকলকে দেখে আজ যে আমার কী আনন্দ হচ্ছে তা বলে বোঝাতে পারবো না। আজ তাহলে আর কোথাও যাবো না। সারাদিন তোমাদের সাথে খেলে কাটাবো আজ আমাদের ছুটি ও ভাই আজ আমাদের ছুটি …………।কইগো বানর ভাই চুপ করে বসে রইলে কেন?
সকলে একসাথে: আজ আর খেলা হবে না।
রাখাল ম: খেলা…….খেলা হবে না! কেন?
সকলে একসাথে: আমরা ….. তোমার ……সাথে ……খেলবো…… না
রাখাল: খেলবে না? আমার সাথে খেলবে না? কেন? কী অন্যায় করেছি আমি?বলো,তোমরা চুপ করে থেকো না।
সকলে একসাথে: তুমি অন্যায় করোনি, তোমার মতো অন্য দু’পেয়েরা করেছে।
রাখাল: (গাছকে জড়িয়ে ধরে) গেছো দাদা তুমি কিছু বলছো না কেন? তুমিও কি আজ অন্যসবার মতো মুখ ফিরিয়ে নেবে। আমি যে আর সইতে পারছিনা।
বানর: গেছো দাদা কিছু বলবে না। আজ আমরা সবাই মিলে তোমাকে শাস্তি দেবো। তোমাদের দৌরাত্ম্যে আজ গোটা দুনিয়া জুড়ে হাহাকার নেমে এসেছে। কেবল নিজেদের উন্নয়নের কথা ভাবতে গিয়ে এই পৃথিবীর প্রাণের বৈচিত্র্যকে তোমরা লোপাট করে দিতে চাইছো। বড় বড় অট্টালিকা আর গুটিকয় কলকারখানা তৈরি করেই ভাবছো তোমরা সবাইকে ছাপিয়ে গেছো ,, মোটেও তা নয়।
বোলতা: তোমাদের অন্যায় আগ্রাসনে আজ আমরা হারিয়ে যেতে বসেছি। যুগযুগ ধরে সৃষ্টিকর্তা নানারূপে, নানা অবয়বে নির্মাণ করেছেন আমাদের।নানা বিবর্তন আর পরিবর্তনের পথ বেয়ে আজ তৈরি হয়েছে যে বহু বিচিত্র প্রাণীজগৎ তার অস্তিত্বের ভিতটাই তোমরা নাড়িয়ে দিতে চাইছো। একবারও ভেবেছে আমরা হারিয়ে গেলে তোমাদের কি হাল হবে?
কেঁচো বুড়ি ম: পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব আর বিকাশ যে পাঁচটি উপাদানের ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল সেই রসময় পঞ্চভূত আজ তোমাদের দৌরাত্ম্যে কলুষিত হয়ে উঠেছে। তিল তিল করে নিজেদের নিঃশেষ করে যে মাটিকে উর্বর করে তুলি আমরা সেই মাটিতেই আজ তোমরা মিলিয়ে দিচ্ছো বিষ। যে মাটি আমাদের সকলকে এতকাল লালন করেছে সেই মাটির আশ্রয় থেকে আজ আমাদের উৎখাত করছো তোমরা।
শামুক: এই দ্যাখ! আমার কি হাল হয়েছে? জলেতে মেশানো বিষে আজ আমি পঙ্গু, অথর্ব হয়ে পড়েছি ও। তোমাদের খামখেয়ালী কার্যকলাপের জন্য আমাদের মত অন্ত্যজবর্গের অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের অস্তিত্ব আজ বিলুপ্তির পথে।
ব্যাঙকাকা: আমরাও কী সুখে আছি! এতকাল ধরে পোকামাকড় সাবাড় করে তোমাদের ফসল বাঁচিয়েছি আমরা আর তার প্রতিদানে তোমরা আমাদের উড়োজাহাজ ভর্তি করে বিদেশে পাঠাচ্ছো। ঘেমে নেয়ে দুদন্ড জিরোবো তার উপায় রাখোনি। আমাদের ছাতাগুলোকেও খেয়ে সাবাড় করে দিয়েছো তোমরা
বানর: এই গেছোদাদার কথাই ধর। কতকাল ধরে এই একঠাঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই গেছোদাদাকে জড়িয়ে যেমন আমরা সবাই টিকে রয়েছি তেমনই তোমরাও ত এই গেছোদাদার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছো, অথচ নিছক উন্নয়নের নামে তোমরা বন কেটে বসত তৈরি করছ। একবারও ভেবেছো আমাদের কী হাল হবে?
বোলতা: এই যে দুকুর রোদে ঘেমে নেয়ে অস্থির হয়ে গেছোদাদার শীতল ছায়ায় এসে ঠাঁই নাও তখন কেমন লাগে?
রাখাল: ভালো লাগে, সত্যি বলতে খুব ভালো লাগে। মনে হয় যেন আমার হারিয়ে যাওয়া মায়ের কোলে এসে বসেছি। আর তাইতো প্রতিদিন এখানে আসি তোমাদের সাথে খেলবো বলে। আর তাছাড়া এই তোমাদের মত অত বিচিত্র সঙ্গী কোথায় পাবো বল?
ব্যাঙকাকা: তোমার মতো বইপড়ো মানুষদের আমি একদম বিশ্বাস করিনা।তোমরা বইতে যেসব কথা লেখ তাকে বাস্তবে অনুসরণ করতে চাওনা। এতই যদি দিগগজ তোমরা তাহলে আমাদের এই হাল হবে কেন? পৃথিবীর প্রাণসম্পদের এমন অবক্ষয় হবে কেন?
সকলে একসাথে: ঠিক বলেছ, মানুষেরা কথার খেলাপ করে। ওদের জন্যই আজ পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে, ওদের শাস্তি চাই।
গাছ: তোমরা সকলে একটু শান্ত হও। রাখাল ভাইকে একটু বুঝতে দাও আমাদের এই সমস্যাটাকে। জানো রাখাল ভাই, এই পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীরাই হলো এক পরিবারের সদস্য। তোমার বাড়ির প্রত্যেক সদস্য যেমন একএকটা বিশেষ দায়িত্ব পালন করেন, সৃষ্টি কর্তার এই সংসারে আমাদের প্রত্যেকেরও এক একটা দায়িত্ব আছে, সবসময় টের না পেলেও বুঝতে হবে আমরা প্রত্যেকেই কোন না কোনভাবে একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবীতে অনন্তকাল ধরে টিকে থাকবার অধিকার কারোরই নেই। প্রাকৃতিক নিয়মেই এ কারণেই পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে অসংখ্য প্রাণী, আর তাদের জায়গায় ঠাঁই পেয়েছে উন্নততর প্রজাতির প্রাণীরা যাদের মানিয়ে নেবার ক্ষমতা তাদের পূর্বসূরীদের থেকে অনেক বেশি। কিন্তু মানুষের হাতে যেসব প্রাণী আজ হারিয়ে যাচ্ছে তারা নিঃশব্দে চিরতরে বিদায় নিচ্ছে পৃথিবীর পটভূমি থেকে। এই হারিয়ে যাবার বেদনা যে বড় করুণ তা’ বুঝতেই হবে। সৃষ্টিকর্তার তৈরি এই সহাবস্থানের নিয়মটাকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলেরই-একথা যেন আমরা কখনোও ভুলে না যাই
রাখাল: গেছোদাদা, আমি এসব কথা স্কুলের বইতে পড়েছি। আমি চাই তোমাদের সকলকে নিয়ে বাঁচতে। তোমাদের ছাড়া এই পৃথিবীর সব আনন্দ মিথ্যে হয়ে যাবে আমারই কাছে। পৃথিবীর এই বিপুল বিচিত্র প্রাণভান্ডারের আমিও যে একজন সদস্য। এতকাল তোমাদের ওপর যে অবিচার করেছি এবার তা’ সংশোধনের সুযোগ দাও আমাদের। আমাকে তোমাদের এই লড়াইয়ের শরিক করে নাও।
(দোয়েল মঞ্চে প্রবেশ করে)
দোয়েল: গেছোদাদা, রাখালভাই কিন্তু ঠিক কথাই বলেছে। বিশ্বময় যে প্রাণের মাতন রাখাল ভাইও যে তার শরিক। তাকে দূরে সরিয়ে রাখলে আমাদের এ লড়াই কখনো সফল হবে না। আমাদের এই বিপন্নতার কথা তোমাকেই যে পৌঁছে দিতে হবে সকলের কাছে।
রাখাল: (দোয়েল কে জড়িয়ে ধরে) দোয়েল ভাই এতক্ষণ কোথায় ছিলে তুমি, আমি যে সেই থেকে তোমাকেই খুঁজছিলাম। তোমার কন্ঠের যে সুর সেই সুরের দোলায় আজ যে সকলকে ডেকে বলতে হবে -সৃষ্টিকর্তার এ সংসারে প্রাণের যে অফুরান বৈচিত্র্য তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের। আমি যে তোমাদেরই একজন একথা যে ভুলো না তোমরা।
গাছ: খুব ভালো বলেছ রাখালভাই,কিতুমিও যে আমাদের মই একজন সেকথা ভুলে গিয়েছিলাম। আমাদের মনে তাই অবিশ্বাস এসে বাসা বেঁধেছিলো। তোমাকে তাই হয়ত চিনতে ভুল করেছিলাম।
রাখাল: না গো গেছোদাদা, অমি সত্যিই কিছু মনে করিনি, তোমাদের জায়গায় থাকলে আমিও ঠিক এমনটাই করতাম।
সকলে একসাথে: রাখাল ভাই আমরা তোমাকে বুঝতে ভুল করেছিলাম। তুমি অন্য মানুষের মত নও। তুমি আমাদের সত্যিকারের বন্ধু।
রাখাল: ব্যাঙকাকা, কেঁচো বুড়ি, শামুক খুড়ো, বোলতা সেনাপতি- তোমাদের কথায় আমি একটুও দুঃখ পাইনি ।তোমরা সত্যি কথাই বলেছ। আত্মগর্বে গর্বিত হয়ে আমরা ভুলে গিয়েছি – যে এই পৃথিবী কেবল মানুষের জন্য নয়, এই সুন্দর পৃথিবী তোমার, আমার আমাদের সকলের।
সকলে একসাথে: হ্যাঁ হ্যাঁ আমাদের সকলের।
রাখাল: তোমাদের সাথে থেকেও এতকাল তোমাদের দুঃখের কথা টের পাইনি। একথা ভেবে আমারই ভীষন লজ্জা করছে।
দোয়েল: এই বিশ্বের আনাচে কানাচে লক্ষ্য প্রাণের যে ঐকতান নিয়ত ধ্বণিত হচ্ছে, এসো আজ সকলে তাকে সমস্ত প্রাণমন দিয়ে নিবিড়ভাবে অনুভব করি। এই আনন্দধ্বণিই হোক আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় পাথেয় ।
গাছ: কইগো দোয়েল ভায়া! তোমার গান শুরু কর আজ যে আমরা সবাই তোমার সুরে সুর মেলাব বলে অধীর হয়ে অপেক্ষা করছি।
দোয়েল: গেছো দাদা, আমি শুরু করছি গান, তোমরাও সেই সুরে সুর মেলাও।
একঠাঁয়ে সব আছি মোরা একঠাঁয়ে
ভালোবাসার তিথিডোরে রাখি বেঁধে পরস্পরে
জপি যাই ঐক্যবাণী অন্তরে
এক ঠাঁয়ে সব আছি মোরা এক ঠাঁয়ে
প্রাণেরই এই বহুধারা চিরজীবি রাখব মোরা
ভরপুর আনন্দেতে রইবো চিরকাল ধরে
একঠাঁয়ে সব আছি মোরা একঠাঁয়ে।
নাটকটির রচনাকাল ২০০৭ সাল। আমাদের স্কুলের ছাত্রদের জন্য লেখা হয়েছিল এই নাটকটি। বেশ কিছুদিন কেটে গেলেও নাটকটি কখনোই তার প্রাসঙ্গিকতা হারায় নি, বরং সবাই মিলে একসাথে থাকার গুরুত্ব আজ আরও আরও বেড়েছে। এক কবি একসময় লিখেছিলেন — ছোট যে হায় অনেকসময়,বড়োর দাবি দাবিয়ে চলে।
এই নাটকের ক্ষেত্রেও এই কথাগুলো সমভাবে প্রযোজ্য।
নাটকের অভিনয়ে কেউ আগ্রহী হলে অবশ্যই নাটককারের অনুমতি নিতে হবে। এই দাবি সাধারণ সৌজন্যের। পড়ুন ও পড়ান।














Khoob bhalo laglo. Erokom lekha ajker projonmer jonnoo bises gurutto rakhe.
অনেক শুভকামনা রইলো তোমার জন্য। আজকের প্রজন্মের আগামী দিনগুলো আরও কঠিন হয়ে পড়বে। সর্বত্রই ঠাঁই নিয়ে প্রবল ঠোকাঠুকি চলছে। এই পরিস্থিতিতে এক ঠাঁয়ে বেঁধে বেঁধে থাকার বার্তা অন্যরকম তাৎপর্য বহন করে।
ছড়িয়ে পড়ুক সচেতনতার জন্য। ভালো থেকো।