
নদী মানেই হলো কলকলিয়ে কথা বলা এক আশ্চর্য কিশোরী যে নিরন্তর কথা বলতে ভালোবাসে, নিজের তরঙ্গ হিল্লোলে মাতিয়ে রাখে তার একান্ত গুণগ্রাহী মানুষজনের মন। সেই দুরন্ত কিশোরী তটিনীকে যদি শাসনের বেড়ি পরিয়ে আটকে রাখা হয়, তাহলে সে কথা কইবে কার সঙ্গে ?
এ্যাঞ্জেলা ওর্টিগারা, নেদারল্যান্ডের WWF এর এক বরিষ্ট আধিকারিক জানিয়েছেন – “ When a river is alive,it has a sound.”– বাধা হীন নদী যখন জীবিত, তখন সে কথা বলে, নিজের সুখ- দুঃখ, আনন্দ -বেদনার কথা। উপল বিছানো পথে চলতে চলতে সে তরঙ্গ ছন্দে মনকে ছুঁয়ে যায়। তাঁর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ বনরাজি সপ্রাণ,ঋজু ভঙ্গিতে তাঁকে অভিবাদন করে। নদী হলো জীবনের ছন্দময় প্রবাহ– It is this flow of life । গোটা ইউরোপ জুড়েই এখন এই হারিয়ে যাওয়া শব্দের অণুরণন শোনা যাচ্ছে নতুন করে। ইউরোপীয় মানুষজনের কাছে এ এক আনন্দের মুহূর্ত।
এনভায়রনমেন্টাল কোয়ালিশন গ্রুপ, যাঁরা ইউরোপে নদীর পথ আগলে থাকা বাঁধগুলোকে সরিয়ে দেবার কাজ করছে, জানিয়েছে ফেলে আসা বছরে সমগ্র ইউরোপ মহাদেশের নদীগুলোর ওপর থেকে রেকর্ড সংখ্যক ৬০৩ টি বাধা ভেঙে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নদীর স্বাভাবিক গতিতে বয়ে চলার ওপর কতটা প্রভাব ফেলছে তা বুঝে নেওয়া সহজ হবে।
পৃথিবীর প্রাচীনতম নদী বাঁধের নির্মাণ হয়েছিল প্রাচীন জর্ডানে, জাওয়া বাঁধ, খৃষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে। তখন তার পরিচিতি ছিল মেসোপটেমিয়া হিসেবে। বিশ্ব যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে নতুন উদ্যমে বিভিন্ন পরিকল্পনায় বড়ো বড়ো নদী বাঁধ তৈরির কাজ শুরু হয় নানা দেশে। স্বাধীনতা লাভের পর এই দেশেও শুরু হলো নদীতে বাঁধ বাঁধার কাজ। দামোদর আর তার সহযোগী নদ নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে দুরন্ত নদকে শান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলো। শতদ্রুর ওপর তৈরি করা হলো সুবিশাল ভাখরা নাঙাল বাঁধ। আর তারপর নাগাড়ে চললো দেশের সব জলধারাকে বাঁধ বন্দী করার খেলা।
বাঁধের বাঁধন শিথিল করে দেবার ফলে নদীগুলো তাদের দীর্ঘ বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে আবার পুরনো ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে। এতোদিন অভিযোগ উঠেছিল যে অববাহিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে এভাবে নদীতে বাঁধ দিতে গিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, বিপন্নতার শিকার হয়েছ ওই সব এলাকায় বসবাসরত বন্যপ্রাণিরা। এরফলে ঐসব প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়েছে, নদীর বয়ে আনা পলি যা নিম্ন অববাহিকার মাটিকে উর্বর, শস্য শ্যামলা করতো তার জোগানে টান পড়েছে, নদীর জলে গা ভিজিয়ে পরমানন্দে বসবাস করতো যে সমস্ত মিঠা জলের মাছেরা তাদের বংশ লোপ পেয়েছে। ইউরোপের নদীগুলোতে বসবাসরত মিঠাজলের পরিযায়ী মাছেদের প্রায় ৭৫% , বিগত সাড়ে পাঁচ দশকের মধ্যে হারিয়ে গেছে। এটা এক বড়ো মাপের ক্ষতি, সন্দেহ নেই।
তবে এই ভেঙে ফেলার কাজটিও যে খুব সহজেই করে ফেলা যাবে তা কিন্তু নয়। বাঁধ ভাঙার ফলে পরিবেশের ওপর তার কী ধরনের প্রভাব পড়বে তার পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। বিশদে খতিয়ে দেখতে হবে প্রযুক্তিগত নানান খুঁটিনাটি বিষয় – কীভাবে ভাঙ্গা হবে, কোন্ উপায়ে ভাঙ্গা হলে তার ক্ষয়ক্ষতি কম হবে, সাশ্রয়ী হবে ইত্যাদি। বাঁধের মালিক ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত মানুষদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করতে হবে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে। এতো আর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া নয়!
পাশাপাশি পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে বাঁধ ভাঙার ফলে নদী খাতে পলির জোগান কতটা বাড়বে? নদী খাত সেই পলল ভার সইতে পারবে কিনা? বাঁধ ভাঙার ফলে নদীগুলোতে জলের প্রবাহ মাত্রা বেড়ে গেলে তা নদীর পাড়ে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে?– এইসব জটিল প্রশ্ন। বাঁধ ভাঙার ফলে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য কতটা বজায় থাকবে বা তার ওপর কী প্রভাব পড়বে সেই সব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ করতে হবে সবাইকে যাতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।
একদল গবেষক সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন যে বাঁধ থাকার ফলে অনেক আগ্রাসী প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণির অনুপ্রবেশকে ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। বাঁধ ভাঙার ফলে এদের বিস্তার সহজ হবে যা কখনোই বাঞ্ছনীয় নয়। নদীর নাব্যতার পরিবর্তন ঘটলে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে অনেক নদীই সুলভ পরিবহন মাধ্যম হিসেবে তাদের সুবিধা হারাবে।
জুন ৭,২০২৬












আমাদের দেশে কাজটি আপনি শুরু করুন, স্যার😃