১৯৭৭ সালে নান্দীকার নাট্যদলের প্রযোজনা ফুটবল নাটক [পিটার টারসন -এর Zigger Zagger অবলম্বনে] সম্পর্কে সে বছরের ১৭জুলাই The Economic Times পত্রিকায় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও চিন্তক বৌধায়ন চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, The children of the scientific age have to be entertained and amused first of all; only then might they agree to witness a play which makes them look at themselves — and not be particularly amused. That was how Brecht had spelt out the premises of his method during a period when Fascism was rising in Europe. A crowd, which is the raw material of Fascism and is also the audience, is a little imbecile, and, therefore, must be coaxed and cajoled to swallow a bitter pill — a play that makes them look at and into themselves.[ Social Fascism at Home /পুনঃপ্রকাশ: অন্যকথা দশম বার্ষিক সংখ্যা ১৪২২]।
ওদিকে সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল শুনে বড়ো হওয়া বাঙালির ফুটবল সম্পর্কে আবেগ সীমাহীন। ফুটবল তার প্রাণের খেলা। কিন্তু ঐ, ফুটবল নাটক যখন parable of Fascism হয়ে উঠছে, তার প্রেক্ষাপটে থাকছে পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক চিত্র, যা সম্পর্কে আলোচক বলছেন, …. a true-to-life allegory of the Social Fascism which has reigned supreme in West Bengal for more than a decade now….। প্রায় অর্ধশতক পরেও আমরা যখন কোনো শাসকদলের পাণ্ডার অবিচলিত ঠাণ্ডা গলায় শুনতে পাই, খেলা হবে, ভয়ঙ্কর খেলা হবে , স্বৈরাচারের স্বরকে তখন হয়তো খেয়াল করি না, উটপাখি সেজে ঝড় এড়াতে চাই।
আধিপত্যবাদ স্বৈরাচার ফ্যাশিজ়ম , রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এদের বৈশিষ্ট্য আলাদা। কিন্তু শাসকের সর্বগ্রাসিতা যখন শিল্প সংস্কৃতি ক্রীড়া সবকিছুকেই দখল করতে চায়, তার সেই উদগ্র আগ্রাসী চেহারায় ঔদ্ধত্য অর্থ পেশিশক্তি সবকিছু প্রকট হয়ে ওঠে — তখন সামাজিক পরিস্থিতি কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে না।
পশ্চিমবঙ্গের ময়দান বেশ কিছুদিন হলো, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির অন্যান্য পরিসরের মতোই দলীয় রাজনীতির পঙ্কিলতার সঙ্গে, সেই আধিপত্যবাদী রাজনীতির আবিলতার সঙ্গে যুক্ত ও সম্পৃক্ত হয়ে গেছে।তারই অবশ্যম্ভাবী প্রতিচ্ছবি রাজ্যবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন 13 ডিসেম্বর যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে।
সাইকেল চেপে বিভিন্ন জায়গায় মাল পৌঁছে দেয় উত্তম,ওর পোশাকী নাম ডেলিভারি বয় , প্রত্যেক ডেলিভারি পিছু তেরো টাকা পায়। প্রতিদিন দশ/বারোটা জায়গায় মাল পৌঁছতে পারলে দিনের শেষে গড়ে দেড়শো টাকা উপার্জন। উত্তর কলকাতার বস্তিতে থাকে,সেখান থেকে সুদূর বেহালা কখনও বা সল্টলেক নিউটাউন — বিভিন্ন জায়গায় ছুটে বেড়ায় উত্তম।ধার করে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড বাইক কিনেছে এবার, যাতে করে ডেলিভারির সংখ্যাটা বাড়ানো যায়।ছোটোবেলা থেকেই উত্তম পাড়ায় ফুটবল খেলতো, ভালোই খেলতো বলে তখন ওর বেশ চাহিদা ছিল খেপ খেলায়, অনেকটা মতি নন্দীর চরিত্রর মতো। ক্লাবে খেলা থাকলে প্র্যাকটিসের পরে কোনো কোনোদিন ভেজিটেবল স্যুপ বা চিকেন স্টু জুটে যায়।একআধদিন এক টুকরো মাংস আর কয়েক হাতা ঝোল ফাউ পাওয়া যায়। কিন্তু একবার পাএ চোট পেয়ে সেই যে দৌড়নোটা বন্ধ হয়ে গেল, ব্যাস — খেলাও বন্ধ তখন থেকে। ফলে বাধ্য হয়েই এখন ও ডেলিভারি বয়। যদিও মাথার বালিশের নিচে মারাদোনা থেকে মেসির ছবি, এখনও, প্রতিদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে মারাদোনার ছবিতে কপাল ঠেকিয়ে আলনায় রাখা আর্জেন্টিনার জার্সির দিকে তাকিয়ে থাকে উত্তম।
২০০৮ সালে তখন ও ইশকুলে পড়তো, কলকাতায় মারাদোনা আসছেন। মনে মনে ভাবছিল যদি কোনোভাবে যুবভারতীতে যাওয়া যায়। কিন্তু তখন ওদের বস্তিতে হাওয়াটা অন্যরকম। সরকার চাষের জমিতে কারখানা তৈরি করবে বলেছে, সে নিয়ে বহুৎ তক্কাতক্কি চলছে প্রতিদিন। টিভির আঁচ বস্তির ঘরগেরস্থালিতেও। পাড়ার এক মাতব্বর দাদা এসে প্রায় চমকিয়ে দিয়ে বলল, গভমেনট শালা আমাদের জমি নিয়ে নিচ্ছে আর ওদিকে মারাদোনাকে এনে খ্যামটা নাচাচ্ছে! কেউ যাবে না ওখানে…. পাড়ার সেই দাদার হুমকিতে চুপসে গেছিল উত্তমের যাবতীয় ইচ্ছে।
তারপর তো গঙ্গা দিয়ে কত জল বয়ে গেছে, চাষের জমি কারখানা চাকরি বাকরি বেঁচে থাকা মরে যাওয়া এসব কিছুই আর আলোচনার বিষয় নয়, এখন শুধু খেলা হয়, ভয়ঙ্কর খেলা খেলা হয়, আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ থেকে কসবা ল কলেজ পার্ক স্ট্রিট থেকে কামদুনি জয়নগর থেকে জয়গাঁ আরও কত জায়গায় প্রায় প্রত্যেকদিন খেলা হয়, আর সব খেলাতেই মাঠ মাটি মানুষ সবার গাএ শুধু রক্ত লেগে থাকে, মরে যাওয়া শরীরে মাছি এসে ভনভন করে, পোড়া গন্ধে ভরে ওঠে শহর গ্রাম মহানগর।
কিন্তু যেহেতু গল্পর উপসংহারে শেষ পর্যন্ত গরিবের ঘোড়া রোগ হয়, তাই মাস গেলে টেনেটুনে হাজার দশেক রোজগার করা উত্তম এবার টাকা জমিয়ে রেখে, দিনে আরও চার পাঁচটা জায়গায় ছুটে ডেলিভারি দিয়ে, মেসিকে দেখবে বলে সাড়ে সাত হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেছিল।
তার পরের কাহিনি তো সকলেরই জানা।
উত্তম সাড়ে সাত হাজার টাকার টিকিট কেটে একশো টাকা পার্কিং বাবদ দিয়ে, যেহেতু জল নিয়ে ঢুকতে পারেনি অথচ কুড়ি টাকার জল একশো টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে তেষ্টা চেপে রেখে শুধু তার জীবন্ত নায়ক মেসিকে দেখবে বলে অপেক্ষা করেছে।আর তারপরে ঐ পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির নায়কের বদলে যাদের দেখেছে, তাদের ও আর দেখতে চায় না।
যখন খেপ খেলায় ডাক পড়ত, মনে মনে স্বপ্ন দেখত যে একদিন , হয়তো একদিন যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সবুজ ঘাসে ফুটবল নিয়ে ছুটবে।সে স্বপ্ন তো চুরমার হয়ে গেছে অনেক কাল আগেই।আর এদিন দেখল ওর স্বপ্নের যুবভারতীকে চুরমার হয়ে যেতে।
গ্যালারির চেয়ারগুলো নয়, এদিকওদিক টাঙিয়ে রাখা ছবি ব্যানার নয়, চুরমার হয়ে গেছে কলকাতার স্বপ্ন, বাঙালির যৌবনের স্বপ্ন। লজ্জায় ভেঙে পড়েছে বাঙালির গর্বের ফুটবলের ইতিহাস আর ঐতিহ্য।
আরজি কর হাসপাতালে খুনের প্রমাণ লোপাট করার জন্য পরিকল্পিত ভাঙচুর নয়, প্রতারিত ক্ষুব্ধ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ — সারদা বা রোজভ্যালির দুর্নীতির সময়ে যা ঘটেনি, এমনকি চাকরি চুরির ঘটনার পরেও নয়,সেটাই ঘটে গেল খেলার মাঠে। যদিও আশ্চর্যজনকভাবে এক রাজনৈতিক দলের প্রশ্রয়পুষ্ট পতাকা ও ধর্মীয় শ্লোগান শোনা গেল ঐ হট্টগোলের মাঝে।
কয়েক বছর ধরে স্বৈরাচারী রাজনীতির প্রশ্রয়ে বাঙালির খেলার মাঠ অনৈতিকতার প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছিল। উত্তম সেটা টের পায়নি।ওর নায়ক মেসি না এলে ও জানতেও পারতো না সেকথা।
ও ফ্যাসিবাদ জানে না। স্বৈরাচার আধিপত্য এসব জানলেও ভাবে না এসব নিয়ে,কারণ ওকে তো সবসময়েই ছুটতে হয়। ডেলিভারি দিতে।
কিন্তু এবার ও আবারও প্র্যাকটিস করবে। একটা খেলা ওকে খেলতেই হবে। একটা থ্রু পাস, তারপর পেনাল্টি বক্সের কোণ থেকে ডজ করতে করতে ঐ ছুটন্ত অবস্থায় শট….বলটা পোস্টের কোণ দিয়ে জালে এসে পড়বে আর আকাশ ছুঁয়ে যাবে গো-ও-ও-ও-ল….
ফাইট…. উত্তম, ফাইট….










ধান ভাঙতে শিবের গীত।ফুটবল থেকে ফ্যাসী সম হয়ে কি যে বল হল বোধগম্য হল না।