এই মুহুর্তে পৃথিবীতে অন্তত 28 কোটি মানুষ ডিপ্রেশনে ভুগছেন। আর ভারতবর্ষে এই সংখ্যা সাড়ে চারকোটির একটু বেশি। মানুষের সব থেকে মূল্যবান জিনিস হোল তার মন। প্রচন্ড গতিশীল নানা আবেগে পূর্ণ এই মনই তাকে অন্যান্য জীবজন্তু থেকে আলাদা করেছে। এই মন খারাপ হয়না এরকম মানুষ নেই। মন খারাপ হলেই কি অবসাদ বা ডিপ্রেশন হয়েছে বলব। তা কিন্তু নয়। তাহলে ডিপ্রেশন কি বা কখন এসব নিয়ে এই আলোচনা।
উপসর্গঃ
রোগ চেনার উপায় বা কি কি উপসর্গ দেখে বোঝা যায় ডিপ্রেশন হয়েছে। মূল সমস্যা হোল মন খারাপ বা বিষন্ন মন। মন থেকে সব আনন্দ চলে গিয়ে বেরঙীন মন হয়ে যায়। মানসিক যন্ত্রণা এমন হয় অনেক সময় কাঁদার ক্ষমতাও চলে যায়। নিজেকে একটা অপদার্থ ভাবতে শুরু করে। এক চরম হতাশা গ্রাস করে। নিদ্রাহীন রাত কাটিয়ে যখন সকাল হয় মনে হয় আবার একটা দিন শুরু হোল, কিভাবে কাটাবে। ভীষণ শ্লথ হয়ে যায়, কাজে কোন উৎসাহ পায়না। কারর কারর ছটফটানি বেড়ে যায়। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। তারপর সমাজ সংসার বন্ধুবান্ধব থেকে ক্রমশ গুটিয়ে নেন। শতকরা 90 ভাগ ক্ষেত্রে উদবেগ রোগ থাকে। ক্ষিধে এবং যৌন ইচ্ছা কমে যায়। এরপর মনে হয় এই দুর্বিষহ জীবন রেখে কি হবে। দুই তৃতীয়াংশ মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। শতকরা 10 থেকে 15 ভাগ লোক আত্মহত্যা করেন। সবার সব উপসর্গ থাকবে এরকম নয়। তবে অন্তত চারটে উপসর্গ অন্তত দু সপ্তা থাকতে হবে অবসাদ রোগ ডায়াগনসিস হতে গেলে।
রোগের কারণঃ
ডিপ্রেশান একটা সাইকোবায়োসোস্যাল রোগ। আগে দেখা যাক সাইকোলজিক্যাল বা মনোবিদ্যাজনিত কি পরিবর্তন হয়:নিজের সম্পর্কে, পরিবেশ সম্পর্কে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এর পেছনে যে ‘ফ্যাক্টর’ গুলো হচ্ছে,
1. মহিলাদের বেশি হয়।
2. সব লিংগের ক্ষেত্রেই বয়সটা 20 থেকে 40 বছর বয়সীদের বেশি হয়। তবে ষাটোর্ধদের ডিপ্রেশন খুব হয়।
3. বিবাহ বিচ্ছিন্ন বা আইনত ডিভোর্সিদের বেশি হয়।
4. কোনো আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে বেশি থাকলে.
5. কম বয়সে বাবা মা মারা গেলে বা অবহেলিত বা যন্ত্রণাদায়ক শৈশব হলে।
বায়োলজিকাল বা জৈবনিক :
1. জীনগতভাবে রোগ প্রবাহিত হতে পারে। বাবা বা মায়ের একজনের থাকলে সন্তানের হবার সম্ভাবনা 10- 25% আর দুজনেরই থাকলে এই সম্ভাবনা 20 – 50%।
2. এছাড়া আছে নিউরোট্রান্সমিটার বা মস্তিষ্কে সংযোগকারী রাসায়নিক পদার্থের ভারসাম্যহীনতা। যেমন সেরটনিন, নর অ্যাড্রিনালিন, ডোপামিনের ভারসাম্যহীনতা।
আর্থসামাজিক:
1. নানারকম চাপের জন্য ডিপ্রেশান হয়। নিকটজন কেউ মারা গেলে, পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, নিরাপত্তাহীনতা, যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা। টেকনলোজি সর্বস্ব দৈনন্দিন জীবনের চাপ যেমন, কম্পিউটার ব্যবহার করা, অনলাইন ফর্ম ভরা বা অফিসিয়াল কাজ কর্ম অনলাইনে করা।
2. আগে ছিল যৌথ পরিবার অনেক মানূষ একসাথে থাকায় নানারকম চাপ সবাই মিলে সামলে নেবার উপায় ছিল কিন্তু বর্তমানের নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে সেই সুযোগ কম।
3. ভারতবর্ষ বা সমগ্র দুনিয়া অনেক ঝলমলে উন্নয়নের সাক্ষী হলেও প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মত বিরাট সংখ্যক লোক বেকার ও দরিদ্র। এদের অবসাদ হবার সম্ভাবনা বেশি।
4. জাতপাত, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক এবং লিংগ বৈষম্য মানুষের অবসাদের একটা বড় কারন।
কোভিড পরবর্তী পৃথিবীঃ কোভিডের সেই দিনগুলো ভাবলে এখনো মনে তীব্র ভয়ের সঞ্চার হয়। কোভিডের প্রথম দিকে সোস্যাল ডিসটেন্সিং, আইসোলেসান বা রোগ হলে করেন্টাইন করতে অন্য জায়গায় তুলে নেওয়া যাওয়ার ভীতি। তারপর যখন রোগ মহামারীর আকার ধারণ করল, মৃত্যু মিছিলের খবর, নিজের রোগ হবার ভয়, প্রিয়জনের মৃত্যুশোক সব মিলে এক তীব্র আতংক সৃষ্টি করেছিল মানুষের মনে। যার জন্যে মানুষের মধ্যে অবসাদ রোগ বেড়ে যায়।
ডিপ্রেশনের চিকিৎসা আছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞের কাছে যাবার আগে নিজে কি কি করবেনঃ
- শরীর ও মন পরস্পরের সাথে সংপৃক্ত। তাই একটি খারাপ হলে অন্যটিও খারাপ হয়। শরীর সচল থাকলে মনও সচল থাকে। তাই প্রত্যেকদিন অন্তত আধ ঘন্টা মর্নিং ওয়াক করতে হবে। এছাড়া খালি হাতে শরীর চর্চা একটা অভ্যাসে পরিনত করতে হবে। ইচ্ছে করবে না তাও করতে হবে।
- খাবার হবে বাড়িতে তৈরি হালকা এবং স্বাস্থ্যকর। বাইরের ফাস্টফুড এড়িয়ে চলতে হবে।
- আনন্দদায়ক কিছু করতে হবে। বইপড়া, সিনেমা দেখা বা গান শোনা।
- বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখা। আড্ডা মারা। সম্ভব হলে সরাসরি কাছে গিয়ে যোগাযোগ করা। নাহলে অন্তত ফোন করে কথা বলা।
- প্রকৃতির মাঝে যাওয়া। নদী পাহাড় জংগলে কিছু না কিছু সময় কাটান।
- যত হতাশাই আসুক মনে রাখতে হবে আজকের দিনটাই শেষ নয়। কালকেই হয়ত অন্য দিন হবে।
- জীবনের লক্ষ্যটা ছোট ছোট ভাগে ভাগ করতে হবে। সবথেকে সামনে যেটা সেটার প্রতি মনোনিবেশ করতে হবে। পরেরগুলো আগে থেকে ভেবে চাপ নিলে হবে না।
- যে চিন্তাগুলো কুরেকুরে খায়, তার পালটা আনন্দদায়ক চিন্তা করতে হবে।
এর পরেও সমস্যা না কমলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
চিকিৎসাঃ
মনে রাখতে হবে ডিপ্রেশান কোনো সাদামাটা রোগ নয়। চিকিৎসা না করলে 6 থেকে 13 মাস রোগটি থাকে। আর অন্তত 3 মাস চিকিৎসা করলে মানুষটি সুস্থ হয়। প্রথম চিকিৎসার পর শতকরা 25 ভাগ রুগী 6 মাসের মধ্যে পুন: আক্রমণের শিকার হয়। 30 থেকে 50 ভাগ 2 বছরের মধ্যে এবং 50 থেকে 75 ভাগ 5 বছরের মধ্যে। আর যারা নিয়মিত ওষুধ এবং মনশ্চিকিৎসা করান তাদের এই পুনরাক্রমণ অনেক কম।
দুভাবে চিকিৎসা হয়।
1.ফারমাকোথেরাপি বা ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা। নানারকম ওষুধ আছে। আগের ওষুধের সাথে বর্তমান ওষুধগুলোর মূল পার্থক্য হচ্ছে এখনকার ওষুধে পার্শ্বক্রিয়া অনেক কম। কয়েকটি অবসাদরোধী ওষুধ যেমন এসসিটলোপ্রাম, সার্ট্রালিন, অ্যামিট্রিপটিলিন, বুপ্রোপায়ন, ডুলক্সেটিন, ভেনলাফ্যাক্সিন ইত্যাদি। আর ঘুমের সমস্যার জন্যে ক্লোন্যাজিপাম, লোরাজেপাম, জলপিডেম ইত্যাদি ওষুধ ব্যবহৃত হয়।
2. মনোশ্চিকিৎসাঃ অনেক রকম পদ্ধতি আছ। ডিপ্রেশানে মনোশ্চিকিৎসা বা সাইকোথেরাপি খুব কার্যকরী। কগনিটিভ এবং বিহেভিয়ার থেরাপি,ইন্টারপার্সোনাল থেরাপি, ফ্যামিলি থেরাপি এগুলো কার্যকরী।
***










