পুরনো কথা
ব্যক্তি ‘অভয়া’র হাসপাতালে ডিউটি চলাকালীন অবস্থায় কর্মস্থলে নৃশংসতম উপায়ে খুন ও আরও ঘৃণ্যতম অবস্থায় ধর্ষণ (কিংবা ঘটনাক্রম আগে পরেও হতে পারে, যদিও এখনও প্রমাণের অপেক্ষায়) ভারতের ‘অমৃত মহোৎসব’ কালে একটি বিরলের মধ্যে বিরলতম অপরাধের ঘটনা। সঙ্গতভাবেই এ ঘটনা প্রায় সমস্ত সহপাঠী এবং সর্বস্তরের জুনিয়র ডাক্তারদের মধ্যে বিপুল ক্ষোভ, পবিত্র ক্রোধ এবং চোয়াল শক্ত রেখে লড়াইয়ের জন্ম দিয়েছে। পাশে দাঁড়িয়েছে দলমত নির্বিশেষে সরকারি-বেসরকারি সিনিয়র ডাক্তারেরা। শুধু বাংলায় নয়, এ প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল ভারত ও বিশ্বের চিকিৎসক সমাজের মাঝে।
ঘটনার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছিল বিভিন্ন স্তরের নাগরিক সমাজের মধ্যে। জনপ্লাবনের মতো রাস্তায় নেমে এসেছে নাগরিক সমাজ – কেঊ এসেছেন তার সারাদিনের চা বিক্রি করার পুঁজিকে আন্দোলনকারী ডাক্তারদের দেবার জন্য, কেউ এসেছেন হুইলচেয়ারে বসে, কেউ তার জন্মদিনের পায়েস খেয়েছেন ওদের সাথে ভাগ করে, কোন বৃদ্ধা এসেছেন অনেক মাইল পথ অতিক্রম করে ওদের সাথে প্রতীকী অনশনে অংশগ্রহণ করবেন বলে, স্কুলের খুদে পড়ুয়ারা তাদের পিগি ব্যাংকের সঞ্চিত ধন কিংবা চকোলেট নিয়ে এসেছে ওদের দেবে বলে, বাড়ি থেকে পালিয়ে এক কিশোর চলে আসে ওদের অনশনের সঙ্গী হবে বলে। এ নজিরও স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের ইতিহাসে বিরলতম।
জুনিয়র ডাক্তারদের এ আন্দোলন এক অর্থে ইতিহাস-সৃষ্টিকারী এবং সমাজতত্বে ভাবনার উপাদান সরবরাহ করার মতো বিষয় ছিল। কেন?
আমরা প্রায় সবসময়ই রাষ্ট্রের বা শাসকদলের তৈরি করা অ্যাজেন্ডার প্রতিক্রিয়া জানাই। সে অর্থে আমাদের তথা জনসমাজেরর প্রতিক্রিয়া চরিত্রের বিচারে অনুবর্তী বা reactive। কিন্তু এ আন্দোলন এমন এক পরিস্থিতি ও সন্ধিক্ষণের জন্ম দিয়েছে যা শাসকদলকে (এবং কিছু পরিমাণে রাষ্ট্রকেও) দিশেহারা করে দিয়েছিল। হয়তো বা প্রথমবারের জন্য প্রায় এক মাস ধরে একটি আন্দোলন চলেছিল যা স্ব-উদ্যোগী অগ্রবর্তী আন্দোলন, যাকে আমরা বলি proactive movement।
এ আন্দোলনের ফলে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যে শাসকদল এবং সরকারকে এর প্রতিক্রিয়ায় নিত্যনতুন কৌশল ভাবতে হয়েছে। জুনিয়র ডাক্তারদের proactive movement সরকারকে reactive position-এ ঠেলে দিয়েছে। এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এরা বিভিন্ন স্তরে গণ অংশগ্রহণের flood gate খুলে দিয়েছিল।
শুধু এটুকুই নয়, এ আন্দোলনের অভিঘাতে নারীরা সামাজিক সুরক্ষা এবং ব্যক্তি নারীর স্বাতন্ত্র্যচিহ্ন খুঁজে পেয়েছে। সমস্ত নাগরিক সমাজ – সবরকমের দলীয় প্রভাবকে দূরে সরিয়ে রেখে – একটি নতুন পরিসর তৈরি করেছিল। এরকম তৃতীয় পরিসর বা নাগরিক পরিসর স্মরণীয় কালের মধ্যে উন্মোচিত হয়নি।
আমার মনে হয়, এ কথা আজ জোর দিয়ে বলার প্রয়োজন আছে যে, apart from everything, junior doctors are fighting against ‘legalized lawlessness’ of the state and government.
শুধু এটুকুই নয়, এদের আন্দোলন এক অর্থে ডাক্তারদের এবং বৃহত্তর সমাজের চিত্তশুদ্ধির আন্দোলনও ছিল। আমরা যে মেরুদণ্ড, সততা, নির্ভীকতা এবং সত্যিকে সত্যি বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম সেগুলো খানিকটা হলেও আমাদের কাছে ফেরত এসেছে। এ কোন সমাজ বদলের আন্দোলন নয়। স্বচ্ছতার সঙ্গে ন্যায়ের দাবীতে আন্দোলন, পরস্পর “বেঁধে বেঁধে” থাকার আন্দোলন।
জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনকে অন্ন-বাসস্থান-পানীয়-ছাউনি দিয়ে পুষ্টি দিয়েছিলেনন এই অনামা অসংখ্য মানুষ। কোন মা তার জন্মদিন পালন করেছিলেন অবস্থান মঞ্চে, সবাইকে পায়েস খাইয়ে। কেউ খাইয়েছিলেন কেক। হৃদয়ের ওম দিয়ে লালন করেছিলেন এই আন্দোলনকে। এদের সবাইকে আমার, জুনিয়র ডাক্তার এবং ডাক্তার সমাজের তরফ থেকে প্রণাম, ভালোবাসা এবং অভিনন্দন।
আন্দোলনের প্রাপ্তি
প্রথমত, আমার মধ্য-ষাট অতিক্রান্ত জীবনে আজ অব্দি দেখিনি, পার্টি নিয়ন্ত্রণের বাইরে একেবারে অহিংস এবং সুদৃঢ় এরকম আন্দোলন যা সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছে আভ্যন্তরীণ প্রেরণায়। সময়ের সাথে সাথে দুর্বল হবার পরিবর্তে আন্দোলন আরও শক্তি সঞ্চয় করেছে। এখানে কোন পার্টি প্রভাব নেই, নিয়ন্ত্রণ ছিলনা। কোন ঝাণ্ডা ছিলনা, কোন ‘আগুন ঝরানো’ পার্টিজান শ্লোগান ছিলনা। এ এক ঐতিহাসিক সময় যখন ভারতের সমাজে তৃতীয় পরিসর তথা নাগরিক পরিসরের নতুন ইতিহাস তৈরি হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, নারীরা এক নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল এক শক্তি হিসেবে এ আন্দোলনের সহযোগী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। হাজারে হাজারে নারী প্রশ্ন তুলেছে – কেন নারী হবার জন্য আমাকে অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে হবে? কিসের সুরক্ষা? আমার দেহের এবং জীবনের সুরক্ষা?
কেন এই “পবিত্র” পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত সমাজ আমার সুরক্ষা সুরক্ষিত করতে ব্যর্থ হবে বারংবার?
উত্তর দিতে হবে, কেন আমাদের বেলাতেই কেবল সুরক্ষার প্রসঙ্গ আসবে?
কেন আমাদের সামাজিক মানসিকতা আমাকে নিজের চারিত্র্যলক্ষ্মণ নিয়ে বাঁচা একজন “মানুষ” হিসেবে গ্রহণ করবেনা? কেন?
আর কত ধর্ষণ, হত্যা, রক্তাক্ত শরীর আর ছিন্নভিন্ন দেহ দেখতে চায় “সমাজ”? ঠিক কতটা দেখলে তৃপ্তি হবে সমাজের চোখের, মনের, ধর্ষকামিতার?
এই “ইতরের দেশ” কী সভ্য হবে? উত্তর কী কেবল বাতাসেই ভেসে বেড়াবে?
কারো ফুটফুটে মেয়ে, সক্ষম যুবতী কিংবা গৃহবধু, কামদুনির পড়ুয়া মেয়েটি কিংবা পার্ক স্ট্রিট কাণ্ডের যুবতী। নির্ভয়া, কাশ্মীমেরর বাচ্চা মেয়ে আসিফা, হাথরাস, তারও আগে ২০০৪ সালে মণিপুরের মনোরমা – ধর্ষণ এবং নৃশংসভাবে খুন হবার মিছিল চলছে। এখন অব্দি সর্বশেষ সংযোজন আর জি করের ডাক্তার মেয়েটি।
অন্য কারো পরিচয়ে আমাদের চিনবেন না। আমাদের পরিচয়ে আমাদের চিনতে হবে। চিনতেই হবে।
আমাদের বিবশ হয়ে যাওয়া সামাজিক বোধকে স্মরণীয়কালে এভাবে আর কোন আন্দোলন বিদ্ধ করেনি। এও এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
তৃতীয়ত, আরজি করের ঘটনার প্রতিবাদে “ইতরের দেশে” বাস করা আরজি কর-এর জুনিয়র ডাক্তারেরা পবিত্র ক্রোধ থেকে তীব্র আন্দোলন শুরু করে পরদিন সকাল থেকেই। এতে যুক্ত হয়েছে ডাক্তারদের সংগঠন ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম, ডাক্তারদের জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম, কলকাতা শহরের প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজ, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব জেলার মেডিক্যাল কলেজ, ভারতের নামী ডাক্তারি প্রতিষ্ঠানগুলো – দিল্লীর এইমস, চণ্ডীগরের পিজিআই, বিএইচইউ, তামিলনাড়ুর একাধিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান, গুজরাত রাজস্থান মহারাষ্ট্র দিল্লী পাটনা সহ ভারতের প্রায় সব প্রান্তের ডাক্তারদের সংগঠন। সর্বভারতীয় সংগঠন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনও অংশগ্রহণ করেছে।
ভারত ছাড়িয়ে এ প্রতিবাদের ঢেউ পৌঁছচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে – অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশেও। এমনকি গার্ডিয়ান বা বিবিসি-র মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও এসমস্ত খবর প্রকাশ করেছে। ১৫.০৮.২০২৪-এ নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মতো প্রভাবশালী সংবাদপত্রের খবরটি নজরে আসার মতো – “মেডিক’স কিলিং ফুয়েলস প্রোটেস্টস অ্যান্ড ওয়াকয়াউটস ইন ইন্ডিয়া”। এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে – “ডাক্তারদের এই ক্রোধ আরও প্রসারিত হয়েছে … এরকম হিংসা থেকে মুক্ত থাকার জন্য অধিকতর সুরক্ষিত কাজের পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে।”
ল্যান্সেট-এর মতো মান্য মেডিক্যাল জার্নাল-এ ২৪ আগস্ট, ২০২৪-এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে “রেপ অ্যান্ড মার্ডার অফ ডক্টর স্পার্কস আউটরেজ ইন ইন্ডিয়া” শিরোনামে। সমধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল-এ। এরকম আন্তর্জাতিক চাপের একটা দেশীয় প্রভাব তো থাকবেই। কোথায় যাবে ‘অভয়া’-র সাথীরা? কার কাছে বিচার চাইবে? কোথায় যাবে সাধারণ মানুষ – কার কাছে সমাধান খুঁজবে? এরকম সময়ে জলকে ঘোলা করে রাজনৈতিক মুনাফার মাছ ধরার খেলা শুরু হয়েছে।
চতুর্থত, আমাদের কাছে একটি উদ্বেগের বিষয় ছিল, গণধর্ষণ এবং বীভৎসতম খুনের মামলা সরে যাচ্ছে সন্দীপ ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানির আর্থিক দুর্নীতির নিকৃষ্ট স্বরূপ উদ্ঘাটনের দিকে। মামলা এবং আমাদের দাবীর মূল ভরকেন্দ্র সরে যাচ্ছেনা তো? দাবী তো খুব সরল – আমরা বিচার চাই (We Want Justice) এবং চাই নারীদের সামাজিক সুরক্ষা সুনিশ্চিত হোক।
এ কথা আজ জোর দিয়ে বলার প্রয়োজন আছে যে, জুনিয়র ডাক্তারেরা সরকার ও রাষ্ট্রের তরফে সযত্নে তৈরি করা “আইনসিদ্ধ আইনহীনতা (legalized lawlessness)”-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। এবং একটি সিস্টেমের মধ্যেকার নীরব “সন্ত্রাস সিন্ডিকেট”, সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনৈতিকভাবে টাকার বিনিময়ে ছাত্রছাত্রীদের পাস-ফেল করানো বা নম্বর বাড়ানো, মর্গের মৃতদেহ বিক্রী থেকে নিম্ন মানের ওষুধ (কোন কোন ক্ষেত্রে ওষুধই নয়, গায়ে দেবার পাউডার) সরবরাহের ঠিকাদারি থেকে কয়েক শ’ কোটি টাকা কামানো, ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল এবং মেডিক্যাল শিক্ষাবিভাগের অভ্যন্তরের অবর্ণনীয় দুর্নীতি – সমস্ত কিছুর ক্লেদাক্ত আবরণকে একটানে খুলে ফেলে দিয়েছিল আমজনতার সামনে।
আমজনতার কাছে নগ্নভাবে প্রশ্নটি উচ্চারিত হয়েছিল – রাজা তোর কাপড় কোথায়?
জুনিয়য়র ডাক্তারদের দশ দফা দাবিগুলো ছিল –
১। দ্রুত এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্যাতিতার বিচার।
২। স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমের অবিলম্বে অপসারণ।
৩। হাসপাতালগুলিতে কেন্দ্রীয়ভাবে ‘রেফারেল’ (রোগীকে অন্যত্র স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া) ব্যবস্থা চালু করা।
৪। প্রতিটি হাসপাতালে কত বেড ফাঁকা, কেন্দ্রীয়ভাবে তার ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা, যাতে একেবারে দূরের রোগীর স্বজনও জানতে পারে কলকাতার কোন হাসপাতালে কোন ডিপার্টমেন্টে কত বেড ফাঁকা আছে এবং কোথায় ভর্তি করা সম্ভব। এর ফলে কলকাতার হাসপাতালের ওপরে অহেতুক রোগীর অসম্ভব চাপ এড়ানো সম্ভব। রোগীদেরও এ হাসপাতাল থেকে ও হাসপাতালে ছুটোছুটি করতে হয়না। রোগীর প্রাণ, ডাক্তারদের প্রাণের মতোই অতি মূল্যবান।
৫। কলেজভিত্তিক টাস্কফোর্স গঠন। সিসিটিভি, ডাক্তারদের জন্য অন কল রুম, শৌচালয়, হেল্পলাইন নম্বর, প্যানিক বোতাম চালু করতে হবে।
৬। নিরাপত্তায় সিভিক ভলেন্টিয়ারের বদলে পুলিশকর্মী নিয়োগ। সঙ্গে মহিলা পুলিশকর্মীও নিয়োগ করতে হবে।
৭। হাসপাতালগুলিকে দ্রুত শূন্যপদে নিয়োগ করতে হবে।
৮। ‘ভয়ের রাজনীতি’-তে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৯। মেডিক্যাল কলেজগুলিতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং রেসিডেন্ট ডাক্তারদের সংগঠনকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
১০। রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল এবং রাজ্যের হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ডে দুর্নীতি ও বেনিয়মের অভিযোগগুলির প্রসঙ্গে দ্রুত তদন্ত শুরু করতে হবে।
লক্ষ্য করবেন, এই দাবীগুলোর একটিও ডাক্তারদের মাইনে বাড়ানোর জন্য ছিলনা। কেবল একটি সম্ভাবনাময় তরুণী চিকিৎসসকের নারকীয় হত্যা, হত্যা-পূর্ববর্তী ধর্ষণ এবং রাষ্ট্রের তরফে একে ঠাণ্ডাঘরে পাঠিয়ে দেবার অমানবিক চেষ্টার বিরুদ্ধে ছিল। “অভয়া”র মা-বাবাও সেদিন এ আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন। একে কুর্নিশ জানিয়েছিলেন।
২০২৬-এর বিধানসভার নির্বাচন এবং ওঁর মা
এবারের নির্বাচনে বিজেপি-র অশ্বমেধের ঘোড়াকে পশ্চিমবঙ্গবাসী নিজেদের রাজ্যে স্থান দিয়েছেন বিপুল সমাদরে। এই নির্বাচনে “অভয়া”র মা-ও একজন প্রার্থী ছিলেন বিজেপি-র হয়ে এবং যথেষ্ট সংখ্যক ভোটে বিজয়ীও হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য – মেয়ের সুবিচারের আশায় তিনি এই অবস্থান নিয়েছেন। আবার সেদিন যারা (বিশেষ করে বামশক্তি) কোন ব্যক্তিগত বা পার্টিগত প্রত্যাশা ছাড়া আন্দোলনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন তাদের ক্ষেত্রে কটূক্তিও করেছেন – যেমনটা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে টুকরো টুকরো খবর পাওয়া গিয়েছে। এ নিয়েও বলার কিছু নেই, কারণ একজন সন্তানহারা মা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন।
কেমন ছিল এবারের নির্বাচন? সবাই জানে এবং অনেকেই বোঝে যে একদিকে SIR এবং অন্যদিকে একেবারে নতুন ও আগন্তুক শব্দবন্ধ “logical discrepancy”-র ফাঁসে কয়েক লক্ষ মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন। এদের ভবিষ্যৎ কী হবে, আমরা এখনও অনুমান করে উঠতে পারছিনা।
বিদেশের সংবাদপত্রগুলোও এ বিষয়ে খবর করেছিল। লন্ডনের গার্ডিয়ান সংবাদপত্র ২২.০৪.২০২৬-এ প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম করেছিল – “Millions in India stripped of vote before critical state election, as government seeks to ‘purify’ electoral roll”। এই সংবাদে মন্তব্য করা হয়েছিল – “Millions of people in the Indian state of West Bengal have been stripped of their vote ahead of a critical state election this week, after a controversial electoral revision described by critics as a “bloodless political genocide” and mass disenfranchisement of minorities.”
৫ মে, ২০২৬-এ নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মতো খ্যাতনামা সংবাদপত্রের একটি খবরের শিরোনাম ছিল “Where Have Modi’s Rivals Gone? India Under One Party”। এই মুহূর্তে ভারতের রাজ্যগুলোর গ্রাফিক চিত্র কী রকম?
(এই ছবিটি News18 থেকে নেওয়া)
এই ছবি দুটি থেকে বোঝা যায়, রাজনৈতিক বিজয়ের অশ্বমেধের ঘোড়া কীভাবে ভারতবর্ষ নামক দেশটিকে একদলীয় শাসনের আওতায় নিয়ে এসেছে – যেমনটা নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ বলেছে – “This week, with election defeats for both Ms. Banerjee and Mr. Stalin, Mr. Modi finds himself at the helm of an India in which his opponents hold virtually no political power.”
গার্ডিয়ান-এর আরেকটি খবরের শিরোনাম ছিল (৪.০৫.২০২৬) “নরেন্দ্র মোদির বিজেপি প্রথমবারের জন্য পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে জয়লাভ করলো”। তারপরে শিরোনামের নীচেই ছিল – “Result in key Indian state is set to have significant implications for the country’s political landscape”।
যাহোক, স্বয়ং ট্রাম্প মোদিকে জয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ২০২৬-এর নির্বাচন? শুধু এটুকুই নয়, হাসিমুখে মোদি-ট্রাম্প যুগলের ছবি ফলাও করে ছাপাও হয়েছে। এবার আমাদের কথায় আসি। বিগত ১৫ বছর ধরে আমরা পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিংসা, প্রায়-শূণ্য কররমসংস্থান, মতের অমিল হলেই সমাজের সর্বস্তরে প্রতিহিংসার বিভিন্ন নগ্ন চেহারা আমরা দেখে এসেছি। আমাদের অনেকের গা-সওয়াও হয়ে গেছে। ইংরেজিতে যাকে বলে ennui সেটাও ঘটেছে।
কিন্তু আমরা তো সাধারণ মানুষ। তাই শিখে গেছি –
আমরা তো অল্পে খুশি; কী হবে দুঃখ করে?
আমাদের দিন চলে যায় সাধারণ ভাত-কাপড়ে।
আমরা এতই সাধারণ যে একটি ভোটদানের অধিকার ছাড়া আমাদের অবলম্বন হিসেবে বিশেষ কিছু নেই। এজন্যই আজা নতুন সরকার তৈরি হচ্ছে তাদের কাছে আমাদের কিছু চাওয়া আছে।
(১) একটি সুস্থ, স্বাভাবিক, ভালো প্রশাসন – যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক বিশ্বাস, সামাজিক অবস্থান কী এগুলো নিরপেক্ষভাবে সরকার এবং প্রশাসন কাজ করবে।
(২) সমস্ত পরীক্ষা এবং কর্মনিয়োগ – এসএসসি থেকে শুরু করে ডাক্তারি সহ সমস্ত স্তরে মেধা-ভিত্তিক নিয়োগ হোক।
(৩) সবার যেন মুক্ত পরিসরে নিজের মত প্রকাশের অধিকার থাকে।
(৪) প্রাক-নির্বাচনী সমস্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হোক।
(৫) কোন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিশ্বাস যেন আক্রান্ত না হয়, যতক্ষণ সেটা অন্যের পরিসরে হস্তক্ষেপ করছে। প্রতিহিংসা যেন প্রশাসন, প্রশাস্ক এবং রাজনীতির সুর না হয়।
(৬) বাংলায় সবার জন্য খোলা পরিসর এবং মুক্ত চিন্তা বিরাজ করুক। সর্বোপরি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা উৎকরষ কেন্দ্র যেন আক্রান্ত বা চোরাগোপ্তা আক্রমণের স্বীকার না হয়।
যে বিপুল জনসমর্থন নতুন সরকার তৈরি হয়েছে তার কাছে এই সামান্য প্রত্যাশাগুলো করতেই পারি। সাদা যেন সাদা থাকে, এবং কালো যেন ধূসর না হয়। আমরা প্রত্যাশায় রইলাম।













দাবী বা আশাগুলির সাথে সহমত।
তার আগের প্রাককথন উপযুক্তভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। SIR এর নাম না থাকলেও সন্তোষজনকভাবে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করলে নাম তোলার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সংস্কার হোক, কিন্তু তা যেন নিয়ম মেনে করা হয় সর্বসাধারণের স্বার্থে।
সময়োপযোগী লেখাটির জন্য ডঃ জয়ন্ত ভট্টাচার্যকে ধন্যবাদ জানাই।