বিংশ শতাব্দীর শেষ এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে পশ্চিমবঙ্গের দাপুটে বিরোধী নেত্রীর কিছু বক্তৃতার রেকর্ডিং বাজানো হত রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় তাঁর দলের তরফে। সেরকম দু’একটা রেকর্ডিংয়ের খানিক অংশ শোনার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য হয়েছিল (তাঁর কোনো সভায় কখনও যাইনি)। বক্তৃতার শেষে তাঁর স্লোগান ছিল “লাল হটাও। লা…আ…আ…ল হটা…আ…আ…ও।”
সেই “লাল হটাও” মন্ত্র জপ করতে করতে তিনি একদিন সিদ্ধি লাভ করলেন, কিন্তু লাল হটে গেলে তারপর কী করতে হবে, তা নিয়ে ভাবার হয়ত সময় পাননি। ফলে ২০১১ সালে মসনদে আসীন হয়ে তিনি সর্বত্র লাল মুছে নীল-সাদা করা, বহু ব্যয়ে ভাঙা রাস্তার ত্রিফলা সজ্জা (কনস্টিপেটেড বাঙালি যেগুলো কদিনের মধ্যেই ভেঙে ত্রিফলা চূর্ণ হিসেবে খেয়ে ফেলেছিল সু-পুরীষের আশায়), বিশিষ্ট নিউরোসার্জেন ডঃ শ্যামাপদ গড়াইকে তাড়ানোর মতো গুটিকয়েক ঐতিহাসিক কাজ সেরে আর কী করবেন বুঝতে না পেরে সুজেট জর্ডনের ধর্ষকদের বাঁচানোর সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করলেন। পতনের সেই শুরু।
হ্যাঁ, শুরুর দিকে একবার কিছু একটা আন্তর্জাতিক শিল্প সম্মেলন করে বিনিয়োগ আহ্বানের চেষ্টা করেছিলেন। সেখানে “চীন, ওঠো” বলা শুনে আমার মনে পড়ে গিয়েছিল জীবনে শোনা শ্রেষ্ঠ মিলিটারি কম্যান্ডটা… “উট উঠো।” (শুণ্ডি অভিযানের সময় হাল্লার সেনাপতি এই মহান কম্যান্ডটি দিয়েছিলেন।) পেশাদারী প্রস্তুতির অভাব আমার মতো গবেটের কাছেও স্পষ্ট প্রতিভাত হচ্ছিল, উপস্থিত প্রতিনিধিদের কাছেও হয়েছিল সম্ভবত।
২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবার পর এক সফল (প্রাক্তন) বিরোধী নেত্রী ভুলে গিয়েছিলেন যে তিনি স্বয়ং শাসক পদে আসীন। ভুলে গিয়েছিলেন যে অপরকে দোষারোপ করার কাজ ছেড়ে এবার গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করা এবং ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে নেওয়া তাঁর দায়িত্ব।
৯ মে ২০২৬ আরেক সফল বিরোধী নেতা (যিনি সেই নেত্রীর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন) মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন। তিনি কি মনে রাখবেন যে তিনি আর বিরোধী নেতা নন, শুধু তাঁর দলের নন, বরং সরকারের প্রধান পরিচালক? তিনি কি মনে রাখবেন যে দল কিছু মানুষের কিন্তু সরকার সবার? “হ্যাঁ” বা “না” তে আগাম উত্তর খুঁজছি না, আমি বাস্তব দেখায় বিশ্বাসী।
যে রামের নাম বিজেপি সর্বক্ষণ উচ্চারণ করে, সেই রামচন্দ্র রাবণ বধের পর অযোধ্যার সিংহাসনে বসে ‘প্রজানুরঞ্জন’ রাজা হিসেবে ‘রাজধর্ম’ পালন করার ওপর জোর দিয়েছিলেন এবং তার জন্য ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। ২০০২ সালে গুজরাতের এক সংকটমুহূর্তে সেই প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এবং ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী ‘রাজধর্ম’ পালন করার অনুরোধ করেছিলেন। প্রতিটি পেশার ধর্ম আছে (‘রিলিজিয়ন’ নয়, ‘ধর্ম’)। শাসকের কর্তব্য ‘রাজধর্ম’ অনুধাবন এবং পালন করা।
যেহেতু বলেছি এবং বিশ্বাস করি যে “সরকার কোনো দলের নয়, সরকার সবার”, তাই সরকারের নতুন মুখ্যমন্ত্রী তথা মন্ত্রীসভাকে শুভেচ্ছা জানাতে কোনো নীতিগত বাধা নেই। ভাবী মুখ্যমন্ত্রী যে একদা তাঁর প্রাক্তন নেত্রীর মতোই মঞ্চে দাঁড়িয়ে “বিজেপি হটাও, দেশ বাঁচাও” স্লোগান দিয়েছিলেন, সেসব মনে করিয়ে অকারণে বিদ্রূপ করার দলে নাম লেখানোর ইচ্ছা নেই এই সময়ে। সবকিছু জেনেও বিজেপি যখন তাঁকে এই মর্যাদা দিয়েছে, তখন তিনি নিশ্চয় নতুন দলের কাছে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছেন। আমি মানুষকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেওয়ায় বিশ্বাসী। ক্লাস এইটের হাফ ইয়ার্লির মার্কশিটে পাস মার্কস ছিল না বলে আর পড়াশোনাই করতে দেবো না… এই মানসিকতা নেই।
সুতরাং বিদ্রূপের বদলে শুভেচ্ছা। শুভ ইচ্ছা। অর্থাৎ শুভ হোক, এই ইচ্ছা। মানুষের জন্য যা শুভ, সেটাই সরকারের শুভ, এই ধারণার ভিত্তিতে নির্মিত ইচ্ছা। মানুষের জন্য যা অশুভ, তা হতে না দেবার ইচ্ছাও বটে।
আমি বেগানা দলহীন মানুষ। যেকোনো দলের যেকোনো সরকারের ক্ষেত্রে আমার নীতি একই। ভালো কাজ করলে সক্রিয়ভাবে পাশে আছি, খারাপ কাজ করলে সক্রিয়ভাবে বিরোধিতায় আছি। যেমন “স্বচ্ছ ভারত” (পরিচ্ছন্ন ভারত) স্লোগান পছন্দ হয়েছিল বলে দিল্লির রাস্তা ঝাঁট দিয়েছিলাম, ফালতু বিরোধিতা করিনি। আবার যা নৈতিকভাবে পছন্দ হয়নি, তার বিরোধিতায় সেই রাস্তাতেই নেমেছি প্রায় বেশিরভাগ বড় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই। ভবিষ্যতেও তাই হবে। মিথ্যাশ্রয়ী বিরোধিতা বা অন্ধ স্তাবকতা, কোনোটাই আমার দ্বারা হবে না।











ভালো লেখা। গতকালই এ বিষয়ে আমি লিখছি, অন্য আঙ্গিকে।
“অভয়া আন্দোলন”, “অভয়া”র মা-র নির্বাচনী জয় এবং এবারের নির্বাচন https://thedoctorsdialogue.com/the-abhaya-movement-abhayas-mothers-electoral-victory-and-the-current-election/
“এবারের নির্বাচনে বিজেপি-র অশ্বমেধের ঘোড়াকে পশ্চিমবঙ্গবাসী নিজেদের রাজ্যে স্থান দিয়েছেন বিপুল সমাদরে। এই নির্বাচনে “অভয়া”র মা-ও একজন প্রার্থী ছিলেন বিজেপি-র হয়ে এবং যথেষ্ট সংখ্যক ভোটে বিজয়ীও হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য – মেয়ের সুবিচারের আশায় তিনি এই অবস্থান নিয়েছেন।… কেমন ছিল এবারের নির্বাচন? সবাই জানে এবং অনেকেই বোঝে যে একদিকে SIR এবং অন্যদিকে একেবারে নতুন ও আগন্তুক শব্দবন্ধ “logical discrepancy”-র ফাঁসে কয়েক লক্ষ মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন। এদের ভবিষ্যৎ কী হবে, আমরা এখনও অনুমান করে উঠতে পারছিনা।…
আমরা এতই সাধারণ যে একটি ভোটদানের অধিকার ছাড়া আমাদের অবলম্বন হিসেবে বিশেষ কিছু নেই। এজন্যই আজা নতুন সরকার তৈরি হচ্ছে তাদের কাছে আমাদের কিছু চাওয়া আছে।
(১) একটি সুস্থ, স্বাভাবিক, ভালো প্রশাসন – যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক বিশ্বাস, সামাজিক অবস্থান কী এগুলো নিরপেক্ষভাবে সরকার এবং প্রশাসন কাজ করবে।
(২) সমস্ত পরীক্ষা এবং কর্মনিয়োগ – এসএসসি থেকে শুরু করে ডাক্তারি সহ সমস্ত স্তরে মেধা-ভিত্তিক নিয়োগ হোক।
(৩) সবার যেন মুক্ত পরিসরে নিজের মত প্রকাশের অধিকার থাকে।
(৪) প্রাক-নির্বাচনী সমস্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হোক।
(৫) কোন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিশ্বাস যেন আক্রান্ত না হয়, যতক্ষণ সেটা অন্যের পরিসরে হস্তক্ষেপ করছে। প্রতিহিংসা যেন প্রশাসন, প্রশাস্ক এবং রাজনীতির সুর না হয়।
(৬) বাংলায় সবার জন্য খোলা পরিসর এবং মুক্ত চিন্তা বিরাজ করুক। সর্বোপরি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা উৎকরষ কেন্দ্র যেন আক্রান্ত বা চোরাগোপ্তা আক্রমণের স্বীকার না হয়।
যে বিপুল জনসমর্থন নতুন সরকার তৈরি হয়েছে তার কাছে এই সামান্য প্রত্যাশাগুলো করতেই পারি। সাদা যেন সাদা থাকে, এবং কালো যেন ধূসর না হয়। আমরা প্রত্যাশায় রইলাম।”
পড়ুন। কমেন্ট বক্সে মতামত দিন।