অভ্যাস এক অদ্ভুত জিনিস। মানুষকে দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নেয়। এই যেমন আমার মত একজন খুপরিজীবী ডাক্তার রোজ নিয়ম করে রাত্রে বসে লিখতাম, দিব্যি টুকটুক করে কয়েক হাজার শব্দ লিখে ফেলতাম। কিছু ভেবেও লেখা শুরু করতাম না। তবু লেখা তরতর করে এগিয়ে চলত।
বছর খানেক লেখালিখি থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর বিপদ হয়েছে। এখন লিখতে বসে সাতপাঁচ ভাবি। বহু ঘটনা মনে পড়ে। কিন্তু কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখব ভেবে পাই না। চুপচাপ বসে ভেবে যাই। লেখা হয় না।
বাকি সময় খুপরিতেই কেটে যায়। তেমনই খুপরিতে বসে রোগী দেখছিলাম দোলের আগের দিন। এক ভদ্রলোক তাঁর আঠারো বছরের ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। বললেন, দেখুন তো ডাক্তারবাবু, বড্ড জ্বালায় পড়েছি ছেলেকে নিয়ে।
ছেলেটিকে জিজ্ঞাস করলাম, কী রে , কী হয়েছে তোর?
ছেলেটি ভয়ানক গম্ভীর মুখ করে বলল, সেটাই তো বুঝতে পারছি না। খারাপ কিছু একটা হয়েছে সেটা নিশ্চিত। কিন্তু সেটা ধরা পড়ছে না।
বললাম, কী হয়েছে না হয়েছে, সেটা ডাক্তার ঠিক করবে। আগে বল তোর কষ্ট টা কী?
ছেলেটি ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ডাক্তাররাও যে রোগ ধরতে পারছেন না। এর আগে কতজন ডাক্তার যেন দেখিয়েছি বাবা?
ভদ্রলোক ছেলেকে ধমক দিয়ে বললেন তুই ডাক্তারবাবু যা বলছেন সেই প্রশ্নের উত্তর দে। বাজে বকিস কেন?
ছেলেটি বলল, বিস্তারিত ভাবে ডাক্তারবাবুকে না বললে উনি বুঝবেন কী করে? তাছাড়া সমস্যা কি একটা?
আমি বললাম, এক এক করে বলে ফেল।
ছেলেটি বলল, নিঃশ্বাস ঠিক ঠাক নিতে পারিনা। সবাই যেমন প্রতিটা শ্বাস একই রকমের নেয়, আমার কোনোটা ছোটো, কোনোটা বড়। মনে হয় বাতাস ঠিক ঠাক ভেতরে ঢুকছে না। তার উপর ব্যথা। কখনো পেটের ডানদিকে। সেটা কমলে বাঁ দিকের বুকে চিনচিন করে। মাঝে মাঝে কোমরে ব্যথা হয়।
ভদ্রলোক বললেন, দেখেন তো ডাক্তারবাবু, এমন ব্যথা সর্বস্ব ছেলে শেষে আমার ভাগ্যে জুটল।
এর মধ্যে বাইরে থেকে গৌর উঁকি মারল- শিগগিরি বাইরে আসেন ডাক্তারবাবু। একটা মেয়ে কেমন যেন করছে।
রোগীরা গলির মধ্যে চেয়ারে লাইন করে বসে আছেন। তাড়াহুড়ো করে বেরোতে গিয়ে দু- তিনজনের পা মাড়িয়ে দিলাম। অন্য কেউ পা মাড়ালে এতক্ষণে ঝগড়া বেঁধে যেত। ডাক্তারকে কিছু বলতেও পারছেন না।
বাইরে গিয়ে দেখি হুলুস্থূল কাণ্ড। একটি কুড়ি একুশের মেয়ে দাঁত টাত লেগে চিতপাত। দোলের আগেরদিনই তার মুখ, হাত, জামায় রঙের ছড়াছড়ি। লাল, নীল, বেগুনী- জামা সপসপে ভিজে। আর তাকে ঘিরে গোটা পাঁচেক যুবক ছেলে।
কেউ হাওয়া করছে। কেউ গালে চাপড় মেরে ডাকছে মৌ, এই মৌ… চোখ খোল।
বললাম, কী হয়েছে?
কলেজে দিব্যি রঙ খেলছিল। হঠাত এমন হয়ে গেল।
বাড়ির লোক কেউ আছে? তোমরা কারা?
আমরা ওর কলেজের দাদা। আপনি আগে জ্ঞানটা ফিরিয়ে দিন। তারপর বাড়ির লোককে খবর দিচ্ছি।
এবার আমিই দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, এ যন্ত্রণা কখন শেষ হবে কে জানে? এখনই খিদে পাচ্ছে।
একজন স্বঘোষিত দাদা জিজ্ঞাসা করলো, কী হয়েছে ওর? রোগ ধরতে পারলেন কিছু?
এতগুলো সিনিয়র দাদা একসাথে রঙ মাখাতে এলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। কিন্তু তা তো আর বলা যায় না। কাজেই গৌর কে বললাম, এখানেই একটা পরিষ্কার জায়গায় শোয়াও। এই দুটো ইনজেকশন দাও। আর বাড়িতে ফোন করতে বলো।
আবার বদ্ধ খুপরিতে ঢুকলাম। এবার আমার নিজেরই মনে হচ্ছে নিঃশ্বাস ঠিক ঠাক পড়ছে না। কোনোটা ছোট, কোনোটা বড়।
আরও ঘন্টা খানেক কাটল। বেশ ছন্দ চলে এসেছে। ফটাফট রোগী দেখছি। এর মধ্যে একজন ঢুকল। মুখে অযত্নের দাড়ি। চুল গুলো খাড়া খাড়া। খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কিন্তু কোথায় দেখেছি, মনে করতে পারছি না।
কীরে চিনতে পারছিস না তো? বিশু পাগলার কথা ভুলে গেছিস?
সাথে সাথে মনে পড়ল। স্কুলে আমাদের এক ক্লাস সিনিয়র বিশ্বনাথদা বা বিশুদা। কবিতা লিখত। আমরা যখন মিল দিয়ে এলেবেলে কবিতা লিখছি, বিশুদা তখন প্রেমের কবিতা লিখছে।
আমাদের কবিতা ছিল স্কুল, শিক্ষক, ছাত্রজীবনের কর্তব্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি এই সব নিয়ে। সপ্তম শ্রেণীতে স্কুলের দেওয়াল পত্রিকায় একটা কবিতা লিখেছিলাম
পুরনো বছর গেল চলে, নতুন বছর আসে
তারই মধুর সুবাস যেন শীতের হাওয়ায় ভাসে
বদমাইশি করব না আর, পড়ব তো মন দিয়ে
মানুষের মত মানুষ হব এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে
নতুন বছর করব শুরু দেশের জন্য লড়ব
আমাদের ভারত ভূমি- সোনার ভারত গড়ব…
পড়ে হেড স্যার স্বয়ং বলেছেন, কবিতাটা তো খাসা লিখিছিস। ছাত্র জীবনের কর্তব্য, দেশপ্রেম, নববর্ষ সব একসাথে চেপে চুপে ঢুকাই দিছিস।
তারপর থেকে নিজেকে বেশ কবি মনে হচ্ছিল। সেদিন রাতেই গোটা দশেক কবিতা নামিয়ে দিলাম। তার মধ্যে একটি কবিতা ছিল পেয়ারা নিয়ে।
একদিন টিফিন পিরিয়ডে পেছনের মাঠে দৌড়চ্ছি। এক দাদা ডাকল। এই শোন।
অর্জুন গাছটার তলায় দুজনে দাঁড়ালাম। দাদাটি বলল, আমার নাম বিশ্বজিত। ক্লাস এইটে পড়ি। প্রবীর স্যার আমাকে বিশুপাগলা বলে ডাকেন। তুই বিশুদা বলতে পারিস। ওয়াল ম্যাগাজিনের ঐ অখাদ্য কবিতাটা তুই লিখেছিস?
আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, ওটা অখাদ্য?
হ্যাঁ, কেন অখাদ্য বলতো। ওতে প্রেম নেই। প্রেম ছাড়া কবিতা হয় না।
প্রেম তখন নিষিদ্ধ শব্দ। মাথা নীচু করে আছি দেখে বিশুদা বলল, ওরে এই প্রেম শুধু ছেলে মেয়ের প্রেম নয়। বিশ্বের সাথে নিজের আত্মার প্রেম। ভাষার সাথে প্রেম। কবিতা থেকে ভালোবাসা উপচে পড়বে। যারা পড়বে তারা ভাষা বুঝুক না বুঝুক ভালোবাসায় সিক্ত হবে। তবেই তো কবিতা। না হলে শব্দ গুণে গুণে আর আসের সাথে ভাসে মিলিয়ে জন্মেও কবিতা হবে না।
তারপর থেকে মাঝে মাঝেই বিশুদা কবিতা নিয়ে বলত। বিশুদার লেখা কবিতা শুনতাম। অর্ধেক বুঝতাম, অর্ধেক বুঝতাম না। বিশুদার কল্যাণে জীবনানন্দ পড়লাম, সুভাষ মুখোপাধ্যায় পড়লাম, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, এমন কি বিনয় মজুমদারও পড়ে ফেললাম। একবার আমি আর বিশুদা মিলে স্কুল পালিয়ে ঠাকুরনগর গেছিলাম ওনাকে নিজের চোখে দেখার জন্য। শুনেছিলাম তখন বিনয় বাবু ঠাকুর নগর স্টেশনে বসে সারাদিন অংক করেন। আমিও তখন অংকের প্রেমে পড়েছি। দিনরাত অংকই করে যাই। যে বই পাই। অংক দেখলেই হাত নিশপিশ করে। মাথার মধ্যে এড্রিনালিন ক্ষরণ হয়।
কিন্তু দুঃখের ব্যাপার ওনাকে দেখা আমাদের ভাগ্যে ছিল না। প্ল্যাটফর্মে নেই। একে ওকে জিজ্ঞেস করে জানলাম তিনি বাড়িতেও নেই। হাসপাতালে নাকি ভর্তি হয়েছেন। কোন হাসপাতাল জানেন না।
ঠাকুর নগর প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে বিশুদা বলল, বিড়ি খা। বিনয়বাবুও বিড়ি খান।
সত্যি মিথ্যা জানিনা। ঠাকুরনগর স্টেশনের পাশের রাস্তায় কম্পিত হাতে বিড়ি ধরিয়ে টান দিলাম। সে কী অবস্থা। না টানলে নিভে যায়। আর টানলেই শ্বাস বন্ধ হয়ে কাশি শুরু হয়।
সেই বিশুদা এতদিন পরে। একগাদা রোগ বাধিয়ে বসেছে। প্রেশার, সুগার, হার্টের অসুখ, চোখের সমস্যা কী নেই। আর্থিক অবস্থাও ভালো না। পৈতৃক সূত্রে খালধারের যে ছোট্ট বাড়িটায় থাকত সেটা ভাইকে দিয়ে নিজে ভাড়া বাড়িতে থাকে। বিয়ে করেনি। নীচু ক্লাসে কয়েকটা টিউশন করে। তাই দিয়ে কোনরকমে চলে যায়।
কবিতা এখনও লেখে। কিন্তু কোথাও পাঠায় না। ছাপেও না। তবে মুখে সবসময় হাসি লেগে আছে।
দেখে বেরিয়ে যাচ্ছিল। আবার ফিরে এলো। বলল, আরেকটা সমস্যায় পড়েছি। তুই একটু সাহায্য করবি?
বল।
বিকালের শেষ আলোকে সহজ বাংলায় কী বলে রে?
কনে দেখা আলো?
না না, তা কেন হবে। প্রতি বিকেলের আলো কি কনে দেখা আলো? বর্ষাকালের বিকালে বর্ষা হয়ে যাওয়ার পর যে হলুদ আলোয় পৃথিবী মাখামাখি হয়, সেটাই কনে দেখা আলো। কিন্তু এই বসন্তে একটা ধূসর আলো অদ্ভুত ভাবে সন্ধ্যার সাথে মেশে। একদিন দেখিস। সেটার আলাদা একটা নাম হওয়া দরকার।
মনে হল, সত্যি তো কতদিন বিকালকে সন্ধ্যে হতে দেখিনা। জানলা ছাড়া একটা খুপরিতে কাটিয়ে দি। মনে হল, সুখে থাকার জন্য অনেক টাকা, বাড়ি গাড়ির দরকার নেই। অল্পেতেই দিব্যি ভালো থাকা যায়। বিশুদাকে করুণা করার কিচ্ছু নেই। সে নিজের মতো আছে। ভালো আছে।
বললাম, ঠিক আছে, তুমিও ভাবো। আমিও ভাবব। তার আগে একদিন ভালো করে সন্ধ্যে হওয়াটা দেখতে হবে।
ছবি ঋণঃ সুস্মিতা মজুমদার

নারী ও শ্রম: ছক ভাঙ্গা গল্প
ঊনবিংশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ রবার্ট আওয়েন আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম এবং আট ঘণ্টা খুশি মত সময় কাটানোর দাবি তোলেন যা শ্রমিক









