রাতে ফেরার সময় দেখলাম ঢাকুরিয়া এবং বাঘাযতীন স্টেশনের ছোট দোকানদারদের (‘হকার’ শব্দটা ব্যবহার করলাম না) মধ্যে চাপা উত্তেজনা এবং বেশ খানিকটা ভয়। এঁদের কয়েকজনের সঙ্গে নিয়মিত কথাবার্তা হয় বহু বছর ধরে, তাই কিছু কিছু কথা জানতে পারি। যতটুকু তাঁরা জানাতে চান, ততটুকুই। বেশি জানার জন্য অতিরিক্ত খোঁচানো আমার স্বভাব নয়।
যাইহোক, মুখচেনা মানুষগুলোর আতঙ্ক দেখে খারাপ লাগলো। শুনলাম, এঁদের নেতারা কয়েকবার সরকারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে সফল হননি। এককভাবে নিজেদের রক্ষা করা বা নিজেদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার ক্ষমতা এঁদের নেই। যাঁরা এঁদের বসিয়েছিলেন (সম্ভবত পয়সা খেয়ে), তাঁরা স্রেফ কেটে পড়েছেন। দালালদের চরিত্র এটাই। এই মানুষগুলোর কী হবে, তা অনিশ্চিত।
গত কয়েকদিনে ‘হকার’ শব্দের ব্যাকরণ সম্বন্ধে অনেককিছু শুনেছি। সেই ব্যাকরণের ভুল ধরার মাধ্যমে বিদ্বজ্জনেরা প্রমাণ করেছেন, এই মানুষগুলোর পরিচয়ের ব্যাকরণগত ভিত্তি নড়বড়ে, তাই এঁদের নিয়ে ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই৷ জীবনটা ভার্চুয়াল রিয়ালিটি হলে বা নিছক ভাষাতত্ত্বের ব্যাপার হলে অবশ্যই সমস্যা নেই। বিদ্বজ্জনেরা ভাগ্যবান, তাঁরা সিসিডিতে কফি খান। নিদেনপক্ষে যে দোকানে চা খান বা যেখান থেকে সবজি কেনেন, তার দোকানির সঙ্গে গল্পগাছা করেন না, তাই সবকিছু নৈব্যক্তিক থাকে। আমি যেসব দোকানে পাউরুটি, চা ইত্যাদি খেয়ে জিন্দা আছি, সেই দোকানদারদের “গোপালদা”, “ধর্মদা”, “সোনাদা”, “সূরয” বলে ডেকে অভ্যস্ত। (চারজনেই বাস্তব চরিত্র।) ফলে আমাদের পক্ষে বিশুদ্ধ ব্যাকরণবিদ হওয়া অত সহজ নয়।
অনেকদিন আগে একটা হিন্দি সিনেমা দেখেছিলাম, “আ ওয়েডনেসডে” নামে। মুম্বাইয়ের রেল বিস্ফোরণের স্মৃতির প্রেক্ষিতে তৈরি সিনেমা। একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক মুম্বাই শহরতলীর ট্রেনে যাতায়াত করতেন। অনেক মানুষ মুখচেনা হয়ে গিয়েছিল, সবার নামও জানতেন না, কিন্তু অন্যরকমের এক পরিচয় ছিল। একদিন সন্ত্রাসবাদীরা বিস্ফোরণ ঘটালো। পরদিন তিনি দেখলেন, মুখচেনা মানুষগুলো আর নেই। এক নিদারুণ বেদনার অনুভূতি হল তাঁর। আমারও সেরকমই হচ্ছে।
হ্যাঁ, আমি মনে করি, দেশে আইনের শাসন থাকা উচিত। আমি মনে করি দোকান, অফিস ইত্যাদি রেগুলারাইজ করা দরকার, আইনসঙ্গত ব্যবস্থা করা দরকার। নেতা আর পুলিশকে তোলা দেবার বদলে রেল, পুরসভা বা সরকারকে ভাড়া বা ট্যাক্স দেওয়া অনেক ভালো এবং সেটাই ঠিক পদ্ধতি। তারপরেও আমি মনে করি, গরীব এবং দুর্বলকে রক্ষা করা রাজার বা সরকারের কর্তব্য। এটা রাজধর্ম। বেআইনিভাবে যারা এদের বসিয়েছে এবং তোলা উসুল করেছে, তাদের ধরে ঘানি পেষানো হোক এবং তাদের পকেট ছিঁড়ে সরকারের ক্ষতিপূরণ আদায় করা হোক। কিন্তু গরীব দোকানিদের আইনসম্মত দোকানি হবার সুযোগ দেওয়া হোক, পথ বাতলে দেওয়া হোক এবং এমনভাবেই সেটা করা হোক, যেটা তাঁদের পক্ষে বাস্তবে সম্ভব। এটুকু করার ক্ষমতা সরকারের আছে বলেই মনে হয়।
একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না, কিন্তু সেই সম্ভাবনা সম্বন্ধেও আমি সচেতন যে কিছু অবৈধ দোকানে সাধারণ ব্যবসার আড়ালে গুরুতর অপরাধমূলক কাজ হতে পারে। সেসবের তদন্ত অবশ্যই হোক এবং তেমন কাজে জড়িতদের শুধু উচ্ছেদ নয়, কয়েদ করা হোক। কিন্তু ঠগ বাছা জরুরি হলেও গাঁ উজাড় করা জরুরি নয়।
রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি একেবারেই ভালো নয়। অবশ্যই তার দায় অনেকাংশে পূর্বতন সরকারের বা সরকারগুলোর। কিন্তু এই মুহূর্তে রাজ্যবাসীর অভিভাবক বর্তমান সরকার। রাজ্যে শিল্পায়ন হতে অন্তত কিছুটা সময় তো লাগবেই। এ রাজ্যে শিক্ষার যা হাল এবং বিশ্বব্যাপী যে মন্দা, এআইয়ের বাড়বাড়ন্ত, কর্মসংকোচন/ ছাঁটাই ইত্যাদি চলছে, তাতে সরকারের পূর্ণ সদিচ্ছা থাকলেও অর্গানাইজড সেক্টরে বিপুল কর্মসংস্থান করা বেশ কঠিন কাজ হবে। এমতাবস্থায় ছোটখাটো স্বনির্ভর মানুষদের উপার্জনহীন করা বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে বলে মনে হয় না৷ একটা বাফার পিরিয়ড প্রয়োজন। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে জবরদখল উচ্ছেদ করলে কোনো প্রতিবাদ আন্দোলন বা হুজ্জুতের প্রয়োজন হয় না।
একটা সরকার মসনদে বসেই প্রথম কোন কাজে মন দেয়, তা তাদের প্রায়রিটি সম্বন্ধে অনেককিছু বলে। তৃণমূল ক্ষমতায় এসেই পড়েছিল নীল-সাদা রঙ আর ত্রিফলা আলো নিয়ে, যা ভালো সংকেত ছিল না। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে কিছু অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে, যা ভালো এবং তার জন্য প্রশংসাও পেয়েছে /পাচ্ছে। পাশাপাশি এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী উচ্ছেদ, যেটা একেবারে প্রথম ধাপের কাজ হওয়া সঙ্গত নয় বলেই আমি মনে করি। (ধনী এবং নটোরিয়াস প্রোমোটারদের বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াকে আমি এর সঙ্গে মেলাচ্ছি না একেবারেই।) বরং এই ক্ষুদ্র দোকানিদের হয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের রেল দপ্তরের সঙ্গে নেগোসিয়েশন রাজ্য সরকার করলেই সবচেয়ে ভালো হয়। রেলমন্ত্রক নিজেদের জায়গা উদ্ধারের চেষ্টা করুক আর রাজ্য সরকার নিজের রাজ্যের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রক্ষা করার চেষ্টা করুক। সেভাবেই দুকূল রক্ষা করে একটা সমঝোতা হওয়া সম্ভব। শেষ অব্দি পশ্চিমবঙ্গের এই ছোট দোকানিরা ভারতেরও নাগরিক। সুতরাং এদের সম্ভাব্য অনাহার ভারত মাতার পক্ষে গৌরবের নয়।
অ্যাডাম স্মিথ বা কার্ল মার্ক্স কী বলেছিলেন, সেসব কচকচি আমি বিশেষ জানি না। মানুষের দুর্দশাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সংগঠনের প্রতাপ বা কলেবর বৃদ্ধিতেও আগ্রহ নেই, কারণ কোনো সংগঠনই নেই আমার। কিন্তু পরিচিত মুখগুলো ভ্যানিশ হয়ে গেলে শূন্যতার অনুভূতি হবে, বুকের ভেতর অভিশাপ তৈরি হবে, কারণ আমার মতো স্বল্পশিক্ষিত মানুষেরা বইপত্র অবলম্বন করে তো বাঁচতে পারে না, অনেকগুলো চেনামুখ, চেনা হাসিকে অবলম্বন করেই বাঁচে৷











