সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরে যে রাতে হাওড়ার পাঁচপাড়া-রাধাদাসীর ইঁটভাটার পরিযায়ী শ্রমিক বউ তার জমাদার সুপারভাইজ়ারকে মুখের উপর বলে দিতে পারবে — ‘তুকে আরাম দিবার কাম লয়, কাঁচা ইঁট পুড়ানোর কাম আছে আমার — আমি আর তুর সঙ্গে শুতে লারব’ —
যেদিন ঝাঁ চকচকে বেসরকারি আপিসে হকের ঋতুকালীন ছুটির দরখাস্ত করতে গিয়ে পুরুষ সহকর্মী আর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের শ্লেষ এবং ট্রোল বিব্রত করবে না শহুরে আধুনিকাকে —
যেদিন উচ্চশিক্ষিতা মেধাবী নারীটিকে স্ব-ইচ্ছায়, ভালবেসে, চাকরি/গবেষণা প্রত্যাখ্যান করে সংসার এবং সন্তান প্রতিপালন করতে দেখলে গঞ্জনা দেবে না সমাজ এবং পরিজনেরা —
যেদিন শুধু নারী হয়ে জন্মানোর জন্য কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা রাষ্ট্রের প্রথম নাগরিকের কাজের আলোচনা বাদ দিয়ে গণপরিসরে কেবল তাঁর বাহ্যিক রূপ আর বৈবাহিক স্ট্যাটাস নিয়ে কুৎসিত আলোচনা বন্ধ হয়ে যাবে চিরতরে —
যেদিন বলিউডের ক্ষমতার অলিন্দে হোক বা দেশের প্রত্যন্ত এলাকার বিড়িশিল্পে — নারী এবং পুরুষ অভিনেতা/কর্মীর পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে ঘুচে যাবে লিঙ্গবৈষম্য —
যেদিন সমানাধিকার চাওয়া কোনও মেয়েকে ভিড়ে ঠাসা বাস/মেট্রোর লেডিজ সিটে বসার জন্য কুণ্ঠিত হতে হবে না —
যেদিন সব উপার্জনক্ষম মেয়ে নিজের বিয়েতে তাদের বাবার উপর কোনওরকম অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হতে দেবে না, রুখে দাঁড়াবে ‘দেনাপাওনা’ নামক ব্যাধিটির বিরুদ্ধে —
যেদিন থেকে শরীরে যোনি বহন করার অপরাধে রাতপথে হাঁটতে ভয় পাবে না কোনও বয়সের কোনও মেয়ে —
যেদিন সব পুত্রসন্তানের মা তাঁর কন্যা এবং পুত্রবধূর মধ্যে আচরণের দৃষ্টিকটু পার্থক্য মুছে দেবেন সযত্নে —
যেদিন থেকে নির্ভয়া, অভয়া, তিলোত্তমার নামহীন অবয়ব ঘুচিয়ে বেরিয়ে আসবে সেইসব শহিদ মেয়েরা — সত্যেন্দ্র দুবে, গৌরী লঙ্কেশ, বরুণ বিশ্বাসের সঙ্গে একই বন্ধনীতে উচ্চারিত হবে তাদেরও নাম —
যেদিন সকল মেয়েরা তাদের বাবা-জ্যাঠা-কাকা-মামা-ভাই-স্বামীদের সংস্পর্শে নিরাপদে থাকবে, কালশিটে বা রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত যৌনাঙ্গ লুকিয়ে ফিরতে হবে না কাউকে —
যেদিন কোনও নারীর মৌলিক মানবিক অধিকারের প্রশ্নে, সনাতন সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে ভারতের যে কোনও প্রদেশের কোনও আদালত অবাস্তব/হাস্যকর/অসম্ভব কোনও রায় দেওয়া থেকে নিবৃত্ত হবেন —
যেদিন ভারতীয় নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক সূচকে আমি দেখতে পাবো দেশে নারী ও পুরুষের অনুপাত সমস্ত
রাজ্যে প্রায় সমান হয়ে এসেছে —
সেদিন হবে আমার নারীদিবস।

না, একটু ভুল হলো। নারীদিবস নয়, আন্তর্জাতিক ‘মানুষ দিবস’এ আমার দীক্ষা হবে সেইদিন।
অত্যাচারিত, অসুস্থ, অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া, শিক্ষার আলো না পাওয়া, যুদ্ধবিধ্বস্ত, শরণার্থী, উদ্বাস্তু, অবমানবের জীবন যাপন করা মানুষের কোনও লিঙ্গভেদ হয় না, তার একমাত্র পরিচয় সে মানুষ।
যখন ৮ই মার্চের কোনও আলাদা গুরুত্ব থাকবে না, তখনই এই দিনটি আমার কাছে সার্থক হয়ে উঠবে।
জানি, কষ্টকল্পনা। এমন হয় না, হবার নয়। তবুও, আশা মরে না — এই আর কি!
আসলে আমি বিশ্বাস করি, কোনও গল্পই শুধু মেয়েদের নয়, সব গল্পই সকলের।
ছবি : আন্তর্জাল
রচনাকালঃ ৮ মার্চ, ২০২৬









