২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে বলেছিল যে, স্বচ্ছতার জন্য প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত তিনজনের একটি দল ইলেকশন কমিশনার নিয়োগ করবেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার সেই রায় উড়িয়ে দেয়। নতুন আইন করে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে সেখানে একজন কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করে। কেন? উত্তরটা সবাই জানে। তিনজনের দুজন যেহেতু শাসক দলের, ফলে এই দল নিযুক্ত কমিশনার হবেন অবশ্যই শাসকের ইয়েসম্যান। অতঃপর সেই ইয়েসম্যান জ্ঞানেশকুমারের নেতৃত্বাধীন ইলেকশন কমিশন শুরু করল অপারেশন SIR ঠিক নির্বাচনের আগে আগে। যাতে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গেলেও তারা বৈধ না অবৈধ এই নিষ্পত্তি হওয়ার আগে তাদের বাইরে রেখেই ভোট শেষ হয়ে যায়।
দেখুন সঠিক ভোটার তালিকা নিয়ে ভোট হোক এটা যে কোনো শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ চাইবেন, আমরাও চাই। কিন্তু বিজেপির লক্ষ লক্ষ ‘ঘুসপেটিয়া’ ‘রোহিঙ্গা’ ইত্যাদি আজগুবি চিল চিৎকারের আবহে ভোটের ঠিক আগে মাত্র কয়েকমাস সময় সম্বল করে ভোটার তালিকা সংশোধনের চেষ্টা যেভাবে ইলেকশন কমিশন চালালো তা পরিষ্কার উদ্দেশ্য প্রণোদিত। পশ্চিমবঙ্গে যেহেতু বাংলাদেশ থেকে আগত ঘুসপেটিয়া, এবং তৃণমূলের নষ্টামির জন্য অবৈধ ভোটার বেশি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি তাই আরও দীর্ঘ সময় নিয়ে কাজটা করা যেত।
ধরা যাক এই কাজ গত এক বা দেড় বছর আগেই যদি শুরু করা হত তাহলে ক্ষতি কী ছিল? তাতে তো সুষ্ঠুভাবে শেষ হত কাজ। আজকের মত লক্ষ লক্ষ নাগরিককে ভোট প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে একটা অসম্পূর্ণ ভোটার তালিকা নিয়ে ভোটে যেতে হত না এই রাজ্যকে। কিন্তু ইলেকশন কমিশন ইচ্ছে করেই এই তাড়াহুড়োর স্ক্রিপ্ট তৈরি করেছে যাতে তালিকা আংশিক হয়। সুপ্রিম কোর্টও যেভাবে ৩৭ লক্ষ ম্যাপড ভোটারের বৈধতা প্রমাণের ফয়সালা হওয়ার আগেই নির্বাচনের পূর্ব নির্ধারিত দিনক্ষণের ওপর কোনো স্থগিতাদেশ দিল না, তা বিস্ময়কর। উল্টে আদালতের মন্তব্য হল এবার ভোট দিতে না পারলেই বা কী, পরবর্তীতে আবার নাম তোলার সুযোগ পাওয়া যাবে। মানে? মামাবাড়ির আবদার? বৈধ ভোটাররা এই নির্বাচনেই অংশ নেবেন না কেন? অসম্পূর্ণ ভোটার তালিকা নিয়ে নির্বাচন হবে কোন সাংবিধানিক যুক্তিতে? গন্ধটা খুব সন্দেহজনক!
আসল স্ক্রিপ্ট হল লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি নামক এক অদ্ভুৎ তত্ত্বের আমদানি করে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাগরিকত্বকে প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলে দিয়ে অঙ্ক কষে তাদেরকে বিশেষ বিশেষ জেলার বিশেষ বিশেষ কেন্দ্রে ভোটার তালিকার বাইরে ফেলে ভোট প্রক্রিয়া শেষ করে দিতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শেষ মুহূর্তে ফর্ম সিক্সের মাধ্যমে নতুন ভোটার সংযোজনের খেলা। সেখানে কারা ঢুকছে, কী ঘাপলা হচ্ছে তা বুঝে ওঠার আগেই নির্বাচন শেষ হয়ে যাবে। এ সবই হল বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার মরিয়া অপচেষ্টা! মনে করে দেখুন প্রথম থেকে নির্বাচন কমিশন নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি বার বার নিজেরাই কেমন যোগবিয়োগ করেছে।
মানুষকে দিনের পর দিন, ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড় করিয়ে কীভাবে নাজেহাল করেছে এই কমিশন। এখনও সেই প্রক্রিয়ে অব্যাহত। সেও না হয় মেনে নেওয়া গেল একটা সঠিক ভোটার তালিকা প্রস্তুতির স্বার্থে। কিন্তু লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারকে সময় ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে, তাদের আবেদনের ফয়সালা না করে, তাদের ভোটার তালিকার বাইরে রেখে একটা নির্বাচন বৈধ হতে পারে? এ অভিযোগ হয়ত ঠিক যে তৃণমূল ভোটার তালিকায় প্রচুর বেনোজল ঢুকিয়ে রেখেছে এবং তাদের তালিকা থেকে বাদ দিতেই হবে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারকে বাদ দেওয়া যায় না। তা যাতে না হয় সে জন্য পর্যাপ্ত সময় দরকার। সুপ্রিম কোর্টই তো বলেছিল যাদের নাম বাদ পড়বে তারা ট্রাইবুনালে অ্যাপিল করতে পারবেন। কিন্ত সেই ট্রাইবুনাল গঠিত হতে না হতেই ভোটার তালিকা ফ্রিজ হয়ে যাচ্ছে, কেন? ধরুণ সমস্ত ডিস্ক্রিপেন্সির ফয়সালা করে যদি আরও দুই বা তিনমাস পরে ভোট হত তাতে দেশের, নাগরিকের, অর্থনীতির, সমাজনীতির ক্ষতি কী হত? কিছুই না! তাহলে? ক্ষতি হত একমাত্র বিজেপির। এই ষড়যন্ত্র ভেস্তে যেত বলে।
কিন্তু এই অন্যায় বিচার বিভাগ মেনে নিচ্ছে কীভাবে? কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিকদের প্রতি এত বড় অন্যায় করতে পারে? এতো গণতন্ত্রকে মাটিতে পুঁতে দেওয়া। আরও দুর্ভাগ্য এই যে অন্যান্য সমস্ত রাজনৈতিক দল এতবড় অপরাধকে মেনে নিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে। অসম্পূর্ণ ভোটার তালিকার এই নির্বাচন কি আসলে অবৈধ নয়? যদি লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারকে গায়ের জোরে বাইরে রেখে বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় আসে তাহলে আগামী দিনে ভারতবর্ষের কোনো নির্বাচন আর সঠিক গণতান্ত্রিক উপায়ে হতে পারবে না। ফ্যাসিবাদ তার দাঁত নখ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে আরো। শেষ হয়ে যাবে গণতন্রের সবটুকু।
মুশকিল হল বাংলায় তৃণমূল গদিতে বসে বিগত বছরগুলোয় এত এত দুর্নীতি আর অপকর্ম করেছে যে জনগণের বিরাট একটা অংশ সঠিকভাবেই মনে করেন তাদের আর একদিনও গদিতে বসে থাকার অধিকার নেই। আর তাই, ইলেকশন কমিশনকে সামনে রেখে বিজেপির এই ক্ষমতা দখলের মরিয়া ষড়যন্ত্র, এত বড় অপরাধও জনমানসের একটা অংশে লঘু হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি এটাও জনপণের বড় অংশ নিশ্চয়ই ভোলেননি এই কেন্দ্রীয় শাসককূল এতকাল সারদা, এসএসসি, গরু-বালু-রেশন-কয়লা ইত্যাদি নানাবিধ দুর্নীতি কিংবা অভয়ার কেসে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে চোখের মণির মত কীভাবে রক্ষা করে এসেছে। আর আজ তারা খুল্লামখুল্লা শেষ করে দিচ্ছে গণতন্ত্রকে যা আমাদের বহু লড়াই, বহু ত্যাগের অর্জন।









