ভারতের ইতিহাসে কালো দিনের তালিকায় আর একটি দিন যুক্ত হল – ১৩ এপ্রিল, যেদিন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জোরের সঙ্গে জানিয়ে দিলেন ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষিত হবার আগে ভোটাধিকার দেবার প্রশ্নই উঠছে না। এই বারের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই প্রক্রিয়া শেষ হবার কোন সম্ভাবনা নেই। Under adjudication থেকে ডিলিটেড হয়ে ট্রাইব্যুনালের সামনে অনন্ত লাইনে দাঁড়ানো ২৭ লক্ষের বেশি মানুষকে ছাড়াই ভোট হবে।
১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত খসড়া তালিকা থেকে কোন কারণ না দেখিয়ে যে সাড়ে পাঁচ লক্ষ ভোটারকে বাদ দিয়ে ২৮ শে ফেব্রুয়ারির লিস্ট বেরোল, সেই সাড়ে পাঁচ লক্ষ হাওয়ায় মিশে গেছেন। সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁদের নিয়ে আর লড়াইয়েরও কোন জায়গা নেই। নতুন করে ভোটার হবার ফর্ম ৬ ভরার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তাদের যেতে হবে।
প্রায় তেত্রিশ লক্ষ মানুষ ভোটাধিকার বঞ্চিত হবার পরেও কেন্দ্র ও রাজ্যের দুইটি সরকার এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি ভোটে আগ্রহী। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিলিটেড ভোটারকে ধমকাচ্ছেন – জুডিশিয়াল অফিসারের কর্মপদ্ধতিকে শ্রদ্ধা করতে হবে, প্রশ্ন করা চলবে না। অন্য এক বিচারপতি আগের দিন শুনানিতে এত জন মানুষকে বাইরে রেখে ভোট করার বিপদ নিয়ে আলোচনা করে আশার যে প্রদীপ জ্বেলেছিলেন, তা গভীর ‘সেন্টিমেন্ট’ -এর আর্দ্রতায় নিভিয়ে দিলেন ১৩ তারিখ।
এই মুহূর্তে হাতে আর তেমন কোন অস্ত্র নেই। ২৩/২৯ এপ্রিলের আগে যুদ্ধজয়ের কোন সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয়না। SIR বিরোধী বিভিন্ন সংগঠন, মঞ্চ নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে চলেছে। এর মধ্যে বেশ কিছু অতি উৎসাহী মানুষ আগামী দশ দিনে ভোট বয়কট করে, SIR বাতিল করতে রাষ্ট্রকে বাধ্য করে বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করছেন। এই উৎসাহব্যঞ্জক আহবানে উত্তেজনা থাকলেও কোন বাস্তবতা নেই। যে অনন্য তৎপরতায় মানুষ enumeration form ভরেছেন, অদম্য আশায় ট্রাইব্যুনালের সামনে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর লাইনে এসে দাঁড়াচ্ছেন, এই সব মানুষেরা SIR বাতিলের দাবিতে ভোট বয়কট করে সংসদীয় ব্যবস্থাকে অচল করে দেবেন, এই রকম সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে আছে বলে মনে হচ্ছে না।
একটা দুটো মোথাবাড়ি হলে দিদির পুলিশ তৎক্ষণাৎ গ্রেফতার করে দাদার কাছে মেডেল জিতে নেবে। যদিও এই সব কিছুর পরেও ভাবতে ভাল লাগে যে এই চরম অগণতান্ত্রিকতার আর ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মানুষের কেন্দ্রীভূত ক্ষোভ ক্রোধ থেকে জ্বলে উঠবে বিপ্লবের আগুন, যে আগুনে পুড়ে ছাই হবে শ্রেণীশোষণের উপর প্রতিষ্ঠিত সংসদীয় ব্যবস্থা। কিন্তু দুঃখের বিষয় কোনও দেশে কোনও কালে এত সহজে সমাজবিপ্লব হবার নজির ইতিহাসে নেই। তাই আপাতত এটা ধরে নেওয়াই বাস্তবসম্মত – SIR এর জুজু আমরা আগে তেমন বুঝতে পারিনি, তাই হতে দিয়েছি, মানুষকে SIR প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করতে বিভিন্ন বুথ খুলে সাহায্য করেছি, বিভাজনের রাজনীতি স্পষ্ট হবার পর নানা দিক থেকে বহু প্রচেষ্টা করেও ঠেকাতে পারিনি, কাল আদালতে SIR মোতাবেক ভোট হবার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।
এই মুহূর্তে হেরে যাওয়া ময়দানে কী করে আবার লড়াই শুরু করা যায়, কী ভাবে করা যায়, সেটা ঠিক করেই সময়ের ডাকে সাড়া দিতে হবে। লড়াইয়ের শেষ হয়ে যাওয়া পর্যায়কে মনের মধ্যে বাঁচিয়ে রেখে কাগজের ঢাল তরোয়াল নিয়ে নকল যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা শাসকের শক্তিবৃদ্ধি করা ছাড়া আর কিছুই করবে না।
নতুন করে লড়াই শুরুর আগে ভালো করে পুরোনো হিসাবটা বুঝে নেওয়া দরকার। আমরা অনেকেই প্রায় ৯১ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার চলে যাওয়া নিয়ে আলোচনা করছি। এই ৯১ লক্ষের মধ্যে ৬৩.৩ শতাংশ হিন্দু, ৩৪.২ শতাংশ মুসলিম। অন্যান্য মাত্র ২.৫ শতাংশ। তাহলে বিভাজনের রাজনীতি কোথায়? এই পরিসংখ্যান ঘুরছে প্রায় সর্বত্র। খসড়া তালিকার থেকে বাদ হওয়া সাড়ে পাঁচ লাখ আর under adjudication থেকে বাদ হওয়া সাতাশ লাখের সঙ্গে SIR এর প্রথম পর্যায়ে ‘intensive revision’ এর নিয়ম অনুসারে বাদ হওয়া প্রায় আটান্ন লক্ষ মৃত, স্থানান্তরিত বা দুই জায়গায় নাম থাকা ভোটারকে যুক্ত করে সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৯১ লক্ষ। খুব স্বাভাবিক কারণেই এই ৫৮ লক্ষের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর নাম বেশি, যে নাম বাদের পিছনে তেমন কোন শক্তিশালী চক্রান্তের হদিশ পাওয়া যায়নি। এত বড় জায়গায় করা ইনটেনসিভ রিভিশন (IR ) বা স্ট্যান্ডার্ড রিভিশন (SR ) আগেও কখনও নির্ভুল হয়নি, এবারেও নিশ্চিত ভাবে কিছু ভুল থেকে গেছে। এক মাস সময় দেওয়া হয়েছিল ভুল সংশোধনের। এর পরেও সামান্য কিছু মানুষের নাম ভুল করে বাদ হয়ে থাকতে পারে। সেই অল্প সংখ্যার জন্য পুরো ৫৮ লক্ষ কে জুড়ে দিলে ভুল পরিসংখ্যান আসছে। উত্তরপ্রদেশে মৃত স্থানান্তরিতর সংখ্যা ২ কোটি ৮৯ লক্ষ। আসল সমস্যাটা এখানে নয়। মৃত স্থানান্তরিত মানুষের ভোটাধিকার দাবি করা হাস্যকর, এটা মূল দাবির থেকে চোখ সরিয়ে দিচ্ছে। আসল খেলা শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারির তালিকা থেকে। কারণ ছাড়া ডিলিটেড ভোটার আর under adjudication এ পাঠানো ৬০ লক্ষ ভোটারের পরিসংখ্যান সামনে আনলে ফ্যাসিবাদী শক্তির বিভাজনের ত্রিশূল সরাসরি উন্মোচিত হয়।
এই under adjudication শব্দবন্ধ অন্য কোন রাজ্যের SIR এ ব্যবহার করা হয়নি। এমন কোন ক্যাটেগরি অন্য কোন রাজ্যে দেখা যায়না। এখানে দেখা গেল, কারণ ইলেকশন কমিশনের সঙ্গে দারুণ যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা প্রশাসনের, ফয়সালা চলে গেল সুপ্রিম কোর্টে, সুপ্রিম কোর্টও বসেছিল অধীর আগ্রহে। যেমন ভাবে অভয়া হত্যা মামলা নিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট সুও মোতো করে, তেমনই পরম মমতায় হাতে নিয়ে নিল under adjudication এর ভাগ্যকে। মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর প্রভৃতি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলে ম্যাপড ভোটারের শতাংশ বেশি হলেও under adjudication এর শতাংশ অনেক বেশি। আবার উত্তর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা আর নদীয়ায় আনম্যাপড ভোটার বেশি থাকলেও under adjudication এর হার কম, কারণ এই জেলাগুলি সংখ্যালঘু প্রধান জেলা নয়। Under adjudication থেকে বাদ গেলেন ৪৫ শতাংশের বেশি মানুষ। এঁদের মধ্যে মুসলিম, আদিবাসী, মতুয়া এবং মহিলার ব্যাপক সংখ্যাধিক্য। মালদার মোথাবাড়িতে মুসলিম জনসংখ্যা ৬৯ শতাংশ, নাম বাদের তালিকার ৯৭ শতাংশ মুসলিম, কালিয়াচকে হিন্দু মুসলিম-এর জনসংখ্যা ৫০-৫০, ডিলিটেডদের মধ্যে ৯৭ শতাংশ মুসলিম। মুর্শিদাবাদে শামসেরগঞ্জে ৮২ শতাংশ মুসলিম, বাদ যাওয়া ভোটারের ৯৯ শতাংশ মুসলিম। বহরমপুরে ২৬ শতাংশ মুসলিম, নাম বাদের তালিকায় ৬২ শতাংশ মুসলিম। এই তালিকা আরো দীর্ঘ করে লাভ নেই। আসল কথা,এই বিভাজন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে, ৩৩ লক্ষ অধিকার হারানো ভোটারদের মধ্যে সামাজিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সংখ্যাধিক্যের কথা না বলে শুধু ৯১ লক্ষের কথা বলে আসলে সংখ্যালঘু বা সব ধরণের ক্ষমতাতন্ত্রের নিষ্পেষণের শিকার মেয়েদের লাভ হবে কি? সংখ্যাগরিষ্ঠ ৬৩ শতাংশ মৃত বা স্থানান্তরিত হিন্দু ভোটারকে দেখিয়ে বিভাজনের ফ্যাসিস্ট গল্পের ইতি টেনে দেবে ইলেকশন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় সরকার। মৃত স্থানান্তরিত তালিকার ভুলভ্রান্তিকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে যে তেত্রিশ লক্ষ চরম অগণতান্ত্রিক বিভাজন এবং আগ্রাসনের শিকার হয়ে ডিলিটেড হলেন তাদের উপর থেকে দৃষ্টি সরে যাচ্ছে, তাতে কার্যসিদ্ধি হচ্ছে দুই সরকার, ইলেকশন কমিশন এবং সুপ্রিম কোর্টের।
SIR নিয়ে চিন্তার কারণ নেই, দিদি সব দেখে নেবেন, সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করেও এসেছেন– এই অগাধ বিশ্বাসে ভরসা করে বসেছিলেন অগণিত মানুষ। কিন্তু বিজেপি সরকারের অমানবিক সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে একমাত্র অস্ত্র দিদির অক্ষৌহিনী সেনা – এই চিন্তাটা আর দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না। অন্যান্য সংসদীয় দলগুলিও SIR এর অপ্রতিরোধ্য রথ রুখতে ব্যর্থ। ব্যর্থতা নিয়ে কেউ চিন্তিতও নয় কারণ নমিনেশন জমা পড়ে গেছে। রোড শোতে লোক (বৈধ ভোটার!) জোগাড় করা অনেক বেশি জরুরি।
এই পরিস্থিতিতে বিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তি এবং সংগঠনগুলির বিশেষ দায়িত্ব থেকে যায়। উপেক্ষিত ভোটাধিকার বঞ্চিত মানুষদের হতাশা আতঙ্ক থেকে রক্ষা করার কাজটা করতে হবে গণমঞ্চ ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি গুলিকে। SIR বাতিল না হয়ে, বাংলার ইতিহাসে ৩৩ লক্ষ মানুষকে বাদ রেখে এক নজিরবিহীন ভোট সম্ভবত হয়ে যাবে কয়েক দিন পরেই। কিন্তু এই বঞ্চিত ৩৩ লক্ষ মানুষ যেন এক মুহূর্তের জন্যও ক্ষমা না করেন এই ফ্যাসিস্ট আগ্রাসী শক্তিকে, এক মুহূর্তের জন্যেও যেন না ভোলেন এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে SIR আটকায়নি এই রাজ্যের সরকার। কোন সংসদীয় রাজনৈতিক দল বলেনি আগে ভোটার পরে ভোট, ভোটার ছাড়া ভোট হবে না।
যাঁরা ভোট দেবেন তাঁরাও যেন প্রতি মুহূর্তে মনে রাখেন তাঁদের পরিবার, প্রতিবেশী, সহকর্মী, সহমর্মীদের এক বিরাট অংশ ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেন। বিচারক হাতুড়ি ঠুকে বলে দিয়েছেন পরে এই অধিকার ফিরে পাওয়া গেলেও যেতে পারে!
এই অসম্মান আর বঞ্চনা ধুলোয় মিশে যাবে না। কড়ায় গণ্ডায় হিসাব নিতে হবে। এমন কিছু কাজ করা নয় যাতে শাসকের হাত শক্ত হয়। নির্বাচনের যুদ্ধ দিয়ে সব যুদ্ধ শেষ হয় না। নির্বাচনের আগে পরে এই জনবিরোধী শক্তিগুলির বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করতে হবে। প্রস্তুতি শুরু হোক দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের। পথ দেখাচ্ছে পানিপথ, নয়ডা, নিয়ামগিরি, সিজিমালি। শ্রমিক কৃষক দলিত মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই মশাল জ্বালিয়েছে। এই মশালের আলোয় রাস্তা খুঁজতে হবে।
তথ্য ঋণ: সুগত রায়, সুজাত ভদ্র, সাবির আহমেদ












