রক্তকরবী নাটক দেখতে গিয়েছিলাম ২৭ মে একাডেমিতে। জয়রাজ ভট্টাচার্যের পরিচালনায় এই নাটকের কথা শুনছিলাম কিছু দিন ধরে। সংগ্রামী কমরেড কুশল দেবনাথ এবং বন্ধু উর্বীর ফেসবুক পোস্টে নাট্যপ্রতিক্রিয়া পড়েছিলাম। তাই এই নাটকের ব্যাপ্তি, রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং সময়োপযোগী নির্মাণ বিনির্মাণ সম্পর্কে একটা ধারণা নিয়েই গিয়েছিলাম। বিভিন্ন বয়সে রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীর কাছে ফিরে ফিরে যাওয়া, বহুরূপীর নাটক দেখার সৌভাগ্য না হলেও শ্রুতিতে ধরে রাখার চেষ্টা, খালেদ চৌধুরীর কিংবদন্তি মঞ্চসজ্জাকে ছবির মাধ্যমে কল্পনা করা – এই সব অনুষঙ্গ জড়িয়ে ছিল রক্তকরবীর সঙ্গে বহু বহু বছর ধরে। কিন্তু আজ রক্তকরবীর উপস্থাপনা এই নাটকের সঙ্গে পরিচিতি, এই নাটকের থেকে প্রত্যাশা – সব কিছু ওলটপালট করে দিল।
এ নাটক রূপকধর্মী। পুঁজিবাদ আর ধনতন্ত্রের জনক যন্ত্রসভ্যতার প্রতীক যক্ষপুরীর আলো আঁধারি আর জালের ওপারে দৃষ্টিগ্রাহ্যতার বাইরে ক্ষমতার অমোঘ নিয়ন্ত্রক – জালের এপারে ‘অগম পারের দূতী’, স্বতস্ফূর্ত আনন্দ, অপার ভালবাসা আর শক্তির নির্ঝরিণী নন্দিনী। যক্ষপুরীর মাটির নিচের সোনা তুলে আনার জন্য পাতালে সুড়ঙ্গ খোদাই করে খোদাইকররা। এই বিরাটপুরীর খাদ্য জোগায় কর্ষণজীবীরা। দুর থেকে ফসল কাটার গান ভেসে আসে। নাটকের প্রস্তাবনায় লেখক বলেন “কৃষিকাজ থেকে হরণের কাজে মানুষকে টেনে নিয়ে কলিযুগ কৃষিপল্লীকে কেবলি উজাড় করে দিচ্ছে।” রক্তকরবীর নাট্যপরিচয়ে লেখকের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি “নাট্যঘটনার সমস্তটাই এই রাজমহলের জালের জানলার বাহির – বারান্দায়। …প্রাসাদের সেই জালের আবরণ এই নাটকের একমাত্র দৃশ্য।”
জয়রাজের রক্তকরবী বাহির বারান্দা থেকে সরে এসে আলো দেখায় খনির অন্ধকারে। মাঠের পাকা ফসলকাটার গানে মিশে থাকে যৌথশ্রমের শক্তি। চারদিক ঘিরে মঞ্চসজ্জার মাঝে দর্শকরা নাট্যদৃশ্যের চরিত্র হয়ে ওঠে।
নাটক শুরু হয় খনিশ্রমিক ফাগুলালের দেহাতি হিন্দিতে তার দিন গুজরানের গল্প দিয়ে। তীব্র সাইরেনের আওয়াজ ঢেকে দেয় ফাগুলালের কণ্ঠ। প্রথম দৃশ্যেই বোঝা যায় জালের আড়াল ছিঁড়ে দেবে এই নাটক। ধনতন্ত্রের নির্লজ্জ লোভ, শোষণজীবী সভ্যতার অবিরাম লুণ্ঠনকে প্রথম দৃশ্য থেকে প্রকট করে দেওয়াই পরিচালকের উদ্দেশ্য।
“মাটির উপরিতলে যেখানে প্রাণের যেখানে রূপের নৃত্য, যেখানে প্রেমের লীলা”, “সেই সহজ সুখের সেই সহজ সৌন্দর্যের” নন্দিনী কুর্তি জিন্স আর স্নিকার পরে বব ডিলানের গান করে “Hey Mr Tambourine Man, play a song for me/ I am not sleepy and there is no place I am going to” । এই গানের রেশ ধরে বিশুপাগলের গলায় গুমরিয়ে ওঠে দুখ জাগানিয়ার সুর -“বুঝি আমার ব্যথার আড়ালেতে দাঁড়িয়ে থাকো… ওগো ঘুম ভাঙানিয়া তোমায় গান শোনাবো।”
বিশু পাগলের Jamaican farewell-এর পাশাপাশি নন্দিনীর কণ্ঠে “এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায়/ বাজায় বাঁশি ভালোবাসি ভালোবাসি” – এই সাংস্কৃতিক সমন্বয় এবং নাটকের সমকালীন পুনর্নির্মাণ দর্শকের কাছে সহজ স্বাভাবিক মনে হয়।
বিশু পাগল খনির শ্রমিক। খনি প্রতিনিয়ত তার ফুসফুস থেকে হরণ করছে প্রাণবায়ু। তাই বিশু পাগল খানিক কথা বলে পকেট থেকে বার করে ইনহেলার নেয়। গানের মূর্ছনায় স্পষ্ট হয় শ্বাসাল্পতা।
নিপুণভাবে গোঁসাইকে ব্যবহার করা হয়েছে এই নাটকে। গেরুয়া উত্তরীয় পরিহিত দীর্ঘদেহী পুরুষ মঞ্চে এলেই এক অদ্ভুত সুর বাজতে থাকে, যে সুরে মিশে আছে ধর্মের তীব্র মদিরা। সর্দার প্রভুপাদকে প্রণাম করে ‘হের হিটলার’-এর ভঙ্গিতে। কখনো পিছনে বাজে’ঘুসপেটিয়া’ তাড়ানোর হুঙ্কার। কখনো সমস্ত মঞ্চ আর দেওয়াল জুড়ে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের ছবি। এক অনিবার্য অতীত আর এক আসন্ন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত শ্বাসরোধ করে দর্শকদের।
নন্দিনী গোঁসাইকে ভয় পায় না। প্রাণের সহজ শক্তি দিয়ে খনি শ্রমিক আর কৃষকদের মধ্যে বেঁচে থাকার ইচ্ছা আর স্পর্ধা সঞ্চারিত করে নন্দিনী । অপেক্ষা করে রঞ্জনের, যে এসে সবার ভয় ভাঙ্গিয়ে দেবে, মাথা উঁচু করে বাঁচার মন্ত্র শেখাবে সকলকে। রক্তকরবীর মঞ্জরী দিয়ে রঞ্জনের কাছে বার্তা পাঠায় নন্দিনী। এক প্রকাণ্ড কাঠের মই নিয়ে জালের আড়াল ভেঙে বেরিয়ে আসে ক্ষমতার নেশায় মত্ত রাজা। মই এর উপরে রক্তকরবীর মঞ্জরী হাতে রঞ্জনের নিথর দেহ এক ঝলক যেন মনে করিয়ে দেয় নব্বই এর দশকের গোড়ায় ছত্তিশগড়ের খনি অঞ্চলে পুঁজিবাদী চক্রের হাতে নিহত শ্রমিক নেতাকে, শ্রমিক, কৃষক এবং অসংখ্য মানুষকে জিয়ন কাঠির স্পর্শে জাগিয়ে তুলেছিলেন যিনি। মনে হয় এখনই যেন কেউ বলে উঠবে ‘জেল কা তালা টুটেগা/ হামারা সাথী ছুটেগা …।’
রঞ্জনের মাথায় নীলকণ্ঠ পাখির পালক পরিয়ে জয়যাত্রা শুরু করে নন্দিনী, রঞ্জনের রক্তে রাঙা পথ দিয়ে বরণ করে নেয় শেষ মুক্তিকে। যক্ষপুরীর সব মানুষ লুটেরা ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য এক হয়। ক্ষমতার দাসত্ব থেকে মুক্তি নিয়ে জালের আড়াল থেকে বেরিয়ে রাজাও যোগ দেন এই ভাঙনের উৎসবে–
“শেষ যুদ্ধ শুরু আজ কমরেড / এস মোরা মিলি একসাথ”
অভিনেতা দর্শক সমবেত ভাবে ইন্টারন্যাশনাল গাওয়া এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
গান, নাচ, পেশিসৌষ্ঠব, শারীরিক কসরৎ – এই সব কিছু নিয়ে মঞ্চ দাপিয়ে অভিনয় করেছেন নন্দিনী- শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য। বিশু পাগলও অনবদ্য। রাজা, অধ্যাপক, সর্দার, ফাগুলাল, চন্দ্রা, কিশোর এবং অন্যান্য প্রত্যেকের অভিনয় যথাযথ।
বহুদিন পর বাংলা নাটকের মঞ্চে এত বিবিধ প্রতিভার সম্মেলন।
ক্রান্তিলগ্নে এই সাংস্কৃতিক লড়াই বাঁচার রসদ জোগায়। নাটক শেষে পরিচালক বলেন এই লড়াই কারোর একার লড়াই নয়। মনে করিয়ে দেন নাটকের শেষে দেবতার ধ্বজাদণ্ড ভেঙ্গে ফেলে নিজের তৈরি বন্দীশালা ভাঙ্গার পথে রাজার উক্তি -“তোমাতে আমাতে দুজনে মিলে কাজ করতে হবে। একলা তোমার কাজ নয়”।
ভয়কে জয় করে ক্ষমতার শিকড়কে টেনে উপড়ে ফেলতে পথে নামে যক্ষপুরীর সব মানুষ। এ কাজ সকলে মিলে করার কাজ। নাটকের মাধ্যমে আরো একবার সোচ্চারে যৌথলড়াই ঘোষণার জন্য জয়রাজ আর থিয়েটার ফর্মেশন পরিবর্তক এর টিমকে সংগ্রামী অভিনন্দন।
“জাগো জাগো জাগো সর্বহারা/ অনশনবন্দী ক্রীতদাস/ শ্রমিক দিয়াছে আজ সাড়া / উঠিয়াছে মুক্তির আশ্বাস”











