জীবনের প্রথম যখন ভোট দি, তখন আমার ভোট দেওয়ার বয়সই হয়নি। ১৯৮৯ সালের মার্চ মাস থেকে কার্যকরী হয় ৬১তম সংবিধান সংশোধন যেখানে ভোটারের ন্যূনতম বয়স ২১ থেকে কমিয়ে করা হয় ১৮ বছর। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন রাজীব গান্ধী।
‘৬৭ এর নির্বাচনে কোলকাতার কাশীপুর কেন্দ্র থেকে জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে জয়ী হয়েছিলেন আমার পিসেমশাই সুশীল কুমার পাল। পরাজিত প্রার্থীদের ছিলেন CPIM এর পীযুষ দাশগুপ্ত এবং ফরোয়ার্ড ব্লকের হেমন্ত কুমার বসু(যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয়)। পিসেমশাই পরে বলেছিলেন, ‘যেভাবে কংগ্রেসের বড় বড় নেতারা হারছিল, ধরেই নিয়েছিলাম মিনিমাম একটা state minister (রাষ্ট্রমন্ত্রী) তো হবোই’। ভাবতেই পারেননি, কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে চলেছে, ২৮০ টি আসনের মধ্যে জাতীয় কংগ্রেস পেয়েছিল ১২৭ টি আসন। কংগ্রেস হারতে পারে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, এটা সেই যুগে সত্যিই ভাবা যেতো না। যাহোক, তৈরি হয় যুক্ত ফ্রন্ট, কিন্তু দু বছরের মধ্যেই আবার নির্বাচন।
আমাদের বাড়ি চিরকাল ঘোর কংগ্রেসী। দেশের বাড়ি আরামবাগে হওয়ায় ও অন্যান্য কিছু কারণে আমাদের বৃহত্তর পরিবার প্রফুল্ল সেনের কাছের বলেই বিবেচিত হতো এবং তৎকালীন কংগ্রেসের সবচেয়ে ক্ষমতাশীল ব্যক্তি অতুল্য ঘোষ থাকতেন কোলকাতায় আমাদের বাড়ির ঠিক সামনের একটি বাড়িতে, ভাড়াটে হিসাবে। কোলকাতায় কারবালা ট্যাঙ্ক লেনে আমাদের বাড়ি কারবালার পুকুর (ট্যাঙ্ক) বুজিয়ে প্রথম বাড়ি, সুতরাং বহু দিনের বাড়ি আর জনসংখ্যাও বেশ ভালোই। তাদের অনেকেই গেছে পিসেমশাইকে ভোট দিতে, যদিও কারুরই নাম কাশীপুর কেন্দ্রে থাকার কথা নয়। আর আমার তো ভোটার হতে তখনো চার বছর দেরি আছে, সবে মেডিকেল কলেজে ঢুকেছি। মফস্বলে বড় হয়ে ক্লাস ফোর থেকে ক্লাস ইলেভেনে ৬ বার স্কুল পাল্টিয়ে কোলকাতায় সবে এসেছি। হ্যাঁ, আমি স্কুলে ভর্তি হয়েছি একেবারে ক্লাস ফোর এ, তখন এ সব চলতো!!
যাহোক, কাশীপুরে পৌঁছাতেই অন্যদের সঙ্গে আমার হাতেও একটা স্লিপ দিয়ে একটা বুথে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। কেউ চ্যালেঞ্জ করেছিল’ বলে তো মনে পড়ছে না, যদিও তখন দাড়ি কেন গোঁফও ভালো করে গজিয়ে ছিল কিনা সন্দেহ। আমার প্রথম ভোট যদিও জালি, সেখানে আমি আরও জালিগিরি করলাম। গেছি পিসেমশাই মানে কংগ্রেসকে ভোট দিতে, কিন্তু ছাপটা দিলাম কে. জি. বসুকে কাস্তে হাতুড়ি তারা চিহ্নে। কেন করেছিলাম ঠিক বলতে পারবো না, কারণ তখনো রাজনীতি নিয়ে আমার কোনো ভাবনা চিন্তা তৈরি হয়নি। হয়তো আমাকে দিয়ে ভোট দেওয়ানোর পদ্ধতিটা আমার ভালো লাগে নি, এটা তারই প্রতিক্রিয়া মাত্র। সেবার কে. জি. বসু জিতেছিলেন ২০১ ভোটে, তার মধ্যে আমারও অবদান ছিল। বস্তুতঃ, কে. জি.বোস (সেই ভাবেই পরিচিত ছিলেন) কে বা কী, এ সব জেনেছি অনেক পরে। আরও পরে পরিচয় হয় তাঁর ছেলে বাবুর (দীপঙ্কর) সঙ্গে।
এরপর ‘৭১,’৭২ ভোটে জোরদার কর্মী, যদিও তখনো বৈধ ভোটার নয়। তখন বোধহয় এই সবে এতো কড়াকড়ি ছিল না। পুরুলিয়ায় ‘৭২ এর ভোটে জেলা স্কুল কেন্দ্রে CPIM পোলিং এজেন্টকে খাওয়ার বিরতি দিতে আমি ঢুকেছি বিকল্প হিসাবে। মনে হয় না আগে থেকে ঠিক ছিল, কারণ আমি একটা সাদা পাঞ্জাবী পড়েছিলাম, যার দুদিকে কে যেন কাস্তে হাতুড়ি তারার স্ট্যাম্প মেরে দিয়েছিল’। কংগ্রেসের এজেন্ট আপত্তি তুললো সিম্বল নিয়ে ভিতরে আসা যায় না। প্রিসাইডিং অফিসার বললেন, ‘যান, জামা পাল্টিয়ে আসুন ‘। আমি বললাম,’আমার আর জামা নেই’। প্রিসাইডিং অফিসার তো মহা ফাঁপরে, যাহোক শেষমেশ সমাধান হলো, দুটো সাদা কাগজ পিন দিয়ে লাগিয়ে চিহ্নের উপর ঢেকে দেওয়া হলো!!
যদিও এটা ঠিক যে আমার প্রথম ভোটে (সে যার নামেই দিয়ে থাকি) যাকে ছাপ দিয়েছিলাম, তিনি জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী কালে সেই সৌভাগ্য আর প্রায় কাজই করেনি, শুধু একবার ছাড়া ‘৭৭ এর লোকসভা নির্বাচনে, যেবার বিজয়ী হয়েছিলেন জনতা দলের বিজয় সিং নাহার। এ ছাড়া নিজের বা অপরের নামে যতবার যাকেই ভোট দিয়েছি, সেই পরাজিত হয়েছে। না, সে রকম কোনও গৌরবান্বিত ভূমিকায় নয় যে বেশ কায়দা করে বলতে পারবো,’আমি রব চিরকাল পরাজিতের দলে’। প্রতিবার যে CPIM এর পক্ষে ভোট দিয়েছি তাও নয়, কাটোয়ায় হরমোহন সিংহ যখন নির্দল প্রার্থী হলেন, আমি একমাস ছুটি নিয়ে চেম্বার বন্ধ করে ওনার সপক্ষে কাজ করার চেষ্টা করেছি এবং যথারীতি ওনাকে ভোটও দিয়েছি। ফলতঃ, আমার পছন্দের প্রার্থীর বেশ ভালোভাবেই পরাজয়!!
জীবনে আর কতোবার ভোট দিতে পারবো জানি না। কিন্তু আমার যা ট্র্যাক রেকর্ড, মনে হয় না কোনো প্রার্থী এর পরেও আমাকে ভোট দিতে বলবে!!
যাক, কী করা যাবে?! আমি বরং আগে ভাগেই মাফ চেয়ে নি এবার যাকে ভোট দিলাম তাঁর কাছে।
একবার ভেবেছিলাম, বিপক্ষ দলের প্রার্থীকে ভোট দি, তার হার নিশ্চিত করতে।
কিন্তু, পারলাম না!
কী করা যাবে!!











