পুরোনো লেখা
চুনকাম করা সাদামাটা দেওয়ালটার এবড়ো খেবড়ো গায়ে একটা ক্যালেন্ডারও দুলছে না। অবশ্য দোলবার মতো তেমন হাওয়াবাতাসও খেলে না এই বিশ ফুট বাই বিশ ফুটের বিশালায়তন ঘরটায়। অতবড় ঘরে একখানা মাত্র রোগাভোগা ফ্যান – এখানে এসে ইস্তক একবারও মেরামতি হতে দ্যাখেননি শ্যামলী। ক্যাঁচকোচ আওয়াজে প্রবল অনীহা জানিয়ে, ঠেলে ওঠা পাঁজরের মতো ব্লেডগুলো বাধ্য হয়ে ঘোরে। শ্যামলীর মনে হয় ওটা এখানকার বাসিন্দাদের মতোই অসহায়।
ক্যালেন্ডার নেই, তবু রোদের ধরণ দেখে শ্যামলী আন্দাজ করতে পারেন আশ্বিন পড়ে গেছে নিশ্চিত। কেমন রাঙা রাঙা রোদ, বাইরে বেরোলে গা চিড়বিড় করে, আবার ঢাকা বারান্দাটায় এসে বসলে খানিক পরেই ঠান্ডা বাতাসে শিরশিরানি ধরে যায়। এ বছর কবে যেন পুজো? ছেলে এসেছিল সেই পয়লা বৈশাখে – কি যেন বলেছিল, আশ্বিনের কত তারিখে যেন অষ্টমী পড়েছে এবার? ইস, হাতের কাছে একটা পাঁজি থাকলে বেশ হতো – দেখে নেওয়া যেতো তিথিটা।
বুক নিংড়ে গভীর গরম শ্বাস বেরিয়ে আসে শ্যামলীর। পাঁজি! এরা একটা ঘড়ি পর্যন্ত রাখেনি পুরো তল্লাটে।
জায়গাটা পাহাড়ি। প্রায় পাহাড়তলি বলা যায়। যে ব্যারাকঘরটা শ্যামলী আর তাঁর মতো আরও ন’জনের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল, তার একেবারে গা ঘেঁষে উঠে গিয়েছে লালচে পাহাড়। পিছনের জানলা দিয়ে তার চূড়া দেখা যায় না। ঘরের সামনে টানা বারান্দা, সেখান থেকে দু’পা সিঁড়ি ভেঙে নামলে ঢালা মাঠ। চৌদিকে আরও অনেক ব্যারাক বাড়ি – আটটা, ন’টা, দশটা – কতগুলো কে জানে! আগে গুনতে চাইতেন, আজকাল আর ভালো লাগে না।
একদিকে পুরুষদের ব্যারাক, অন্যদিকে মেয়েদের। দুইয়ের মাঝে শক্ত খুঁটি পুঁতে তার উপর তিন মানুষ উঁচু কাঁটাতারের বেড়া লাগানো রয়েছে। কাঁটাগুলো বড্ড ধারালো – কিছুদিন অন্তর এক আধবুড়ো কম্পাউন্ডারকে গজ, ব্যান্ডেজ, ব্যথাহর বড়ি আর টিটেনাসের টিকের বাক্স হাতে আসতে দেখেন শ্যামলী। এত ঘা খেয়েও আধমরা মানুষগুলোর অদম্য আবেগ দেখে আর অবাক লাগে না তাঁর। শুধু বুক ঠেলে আরো একটা গরম শ্বাসের সঙ্গে দু’ফোঁটা গরম জলও বুঝি গড়িয়ে পড়ে তোবড়ানো গাল বেয়ে।
বারান্দার দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে তিনি দেখেন, দূরে সাদাটে ঘাসের মাঠ পেরিয়ে টিউবওয়েলের সারি। ব্যারাকের কোনও মেয়ে বুঝি জল ভরতে গিয়েছে। তার রঙিন ছাপা শাড়ির আঁচল উড়ছে এতোলবেতোল হাওয়ায়। পরিযায়ী বাতাসের চেয়েও উদাসী চোখ মেলে শ্যামলী দেখেন, টিউবওয়েলের সারির ওপাশে কমিউনিটি কিচেনের জানলা দিয়ে বেরিয়ে পাক খাচ্ছে উনুনের ধোঁয়ার কুণ্ডলী। আর আশ্বিনের সকালবেলার প্রথম কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে এসেছে কালচে পাথরের দীর্ঘ পাঁচিলটা – সামনে খুদে খুদে জলপাই রঙা পুতুল-জওয়ানরা পায়চারি করে চলেছে আপন মনে। পাঁচিলের প্রান্তে রয়েছে লোহার মস্ত সিংদরজা। তার মাথায় ঘন্টাঘর। পিতলের বিশাল ঘন্টা চারবেলা বাজে – যখন খাবার সময় হয়, তখন। তবে সেটা অনেক দূরে । শ্যামলী যেখানে বসে থাকেন, সেখান থেকে ঘন্টাঘরের তোরণ দেখা যায় না। বাসিন্দাদের ওদিকে যাওয়া নিষেধ। যেদিন এসেছিলেন, সেদিনই কেবল দেখেছিলেন।
তাঁদের চব্বিশ জনের দলটিকে পুলিশের গাড়ি থেকে নামিয়ে, লাইন করে হাঁটিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল এই পাঁচিল ঘেরা জায়গাটার মধ্যে। মূল অফিসের বারান্দায় বসে সামরিক বাহিনীর বড় অফিসার তখন সামনে রাখা কম্পিউটারে খটাখট টাইপ করে চলেছেন – ‘১০৭ নম্বর আসিয়া বিবি, উমর চালিস সাল, ১০৮ নম্বর গুলাবী খাতুন, উমর উন্নিস, ১০৯ শামলি দাস, উমর পঁয়সট – ক্যা মাজি, ঠিক তো? উমর পঁয়সট হি হোগা তো?’
কেউ স্বাগত জানায়নি, শুধু এখানকার রুক্ষ পাথুরে মাটির মতো ভাবলেশহীন মুখে তাঁর শীর্ণ বাহুতে তাবিজের মতো একটা লোহার চাকতি বেঁধে দিয়েছিল আরেকজন জওয়ান। ইনমেট নম্বর ১০৯, ডিটেনশন ক্যাম্প নং ৩, পুরুলিয়া, পশ্চিমবঙ্গ।
“একাত্তরের মার্চের আগে দাদুর হাত ধরে এসেছ বলছ – কোনো পেপার্স নেই কেন?” অসহায় চোখে ছেলের অসহিষ্ণু পা ঠোকা দেখেছিলেন শ্যামলী।
“দশ বছর বয়স থেকে এদেশে, এখানকার ইসকুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করলেন, সেও তো ছিয়াত্তরের কাগজ। বিয়ে করেছেন এদেশের মানুষকে, অথচ ম্যারেজ রেজিস্ট্রি হয়নি। কি প্রমাণ রয়েছে বলুন তো?” –ব্লক অফিসের স্থানীয় নেতাটি হাত উল্টে জিজ্ঞাসা করেছিল। নিরুত্তর ছিলেন শ্যামলী।
“সহি বাত, আপনার নাম লিস্টে না উঠলে, বেটা কা নাম ভি নহী উঠনা চাহিয়ে, সহি বাত! লেকিন কেয়া হ্যায় মাজি, আপকা লড়কা সরকারি নোকরি করে তো – উও অগর সিটিজেন নহী থা, তো সরকার নোকরি দিয়া ক্যায়সে? সরকার কে উপর সে তো সব কা এইতবার উঠ জায়েগা না? ইসি লিয়ে শায়দ বচ জায়েগা উও” — নাগরিকপঞ্জি দপ্তরের অবাঙালি জেলা আধিকারিকটি বড় যত্ন নিয়ে বোঝাচ্ছিলেন তাঁকে। শ্যামলী দাঁড়িয়ে শুনছিলেন চিত্রার্পিতের মতো।
“ফরেনার্স ট্রাইবুনালে যাবো মা, তুমি চিন্তা কোরো না একটুও” –
ফাইনাল লিস্ট বেরোবার পরে উদভ্রান্ত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে নির্বাক বসেছিলেন তিনি, সতৃষ্ণ চাহনি দিয়ে শুষে নিতে চাইছিলেন সন্তানের মুখচ্ছবি। কেন? স্মৃতিপত্রে ধরে রাখবেন বলে?
এরা বছরে বার দুয়েক দেখা করতে দেয় বাড়ির লোকের সঙ্গে, তাও জওয়ানদের কড়া পাহারার সামনে। আগের বার ছেলে এসে বলেছিল, বড্ড লজ্জা করে তার, দেখা করতে দেবার আগে অন্তর্বাস পর্যন্ত খুলিয়ে পরীক্ষা করে এরা। শুনে অস্বস্তিতে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন শ্যামলী। পরে ভেবেছেন, নাড়ি ছেঁড়া ধন, তার কাছেও অস্বস্তি? অদর্শন কি মা ছেলের মধ্যেও দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়?
প্রথম প্রথম ফরেনার্স ট্রাইবুনালে কেসের গতিপ্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন করতেন খুব। ছেলের হতাশ, কালো হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে ইদানীং আর করেন না। দিন, মাস, বছরের হিসেবও আর স্পষ্ট করে মনে থাকে না তাঁর। কত বছর হলো যেন? তিন না চার? গোড়ার দিকে হিসেব রাখতেন। কবে কোনকালে স্বামীর মুখে শুনেছিলেন কোন দেশের এক বন্দীর জেলখানার দেওয়ালে ঢ্যাঁড়া দিয়ে দিয়ে দিন গোনার গল্প। কয়েকদিন করেওছিলেন অমন – তারপর এক উর্দিধারী এসে সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করার জন্য খুব ধমক দিয়ে গেল তাঁকে। সেই থেকে আর করেননি।
বাহুতে বাঁধা পরিচয়ের খোদাইটায় ‘পশ্চিমবঙ্গ’ শব্দটার উপর আদর করে হাত বোলালেন শ্যামলী। তাবিজটা এখন ঢলঢলে হয়ে গিয়েছে। খুব অনেকটা রোগা হয়ে গিয়েছেন কি তিনি? কই, যাদের সঙ্গে এক ছাদের তলায় আছেন এতদিন, সেই ছায়া, খোদেজা, মুনিয়া-রা তো কিছু বলেনি। আসলে রোজ রোজ দেখলে বোধ হয় বোঝা যায় না তেমন। যে অল্পবয়সি ডাক্তারটি কিছুদিন অন্তর এসে চেক আপ করে, প্রেশারের বড়িগুলো ঠিক করে খাবার নির্দেশ দিয়ে যায় যান্ত্রিক ভাবে, সেও তো ইঙ্গিত দেয়নি কোনো গুরুতর অসুস্থতার! এবার পুজোর সময় ছেলে এলে শুধোবেন তাকে – খুব কি ভেঙে গিয়েছে তাঁর শরীর? কোনও আটক মানুষ বেশি অসুস্থ হলে ক্যাম্পের বাইরে স্বাধীন দেশের, স্বাধীন রাজ্যের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দেয় এরা। এই ক’ বছরে গিয়েছেও কয়েকজন। কেউ ফিরেছে, কেউ মুক্তি পেয়ে গেছে।
ঈশ্বরকে ডাকেন না বহুকাল। আজ হাত দু’টি জোড় করে মনে মনে প্রাণের দেবতার পায়ে শত কোটি প্রণাম জানিয়ে প্রার্থনা করলেন শ্যামলী।
“আমায় একটা কঠিন, খুব কঠিন রোগ দাও ঠাকুর। জীবনে নিজের জন্য কিচ্ছু কখনো চাইনি তোমার কাছে – আজ চাইছি। আমার মরণ যেন জেলখানার বাইরে হয়। সাকিন না থাক, একটু স্বাধীন রোদ, স্বাধীন হাওয়া, স্বাধীন বৃষ্টির মাঝে যেন মরতে পারি ঠাকুর – এইটুকু তুমি দেখো।”
তেলচিটে বালিশে নির্ঘুম চোখের পাতায় হানা দেয় দোলায়মান কাশের গুচ্ছ, গর্জনতেল মাখা মায়ের মুখ, সন্ধিপুজোর নৈবেদ্যর থালা – শ্যামলী জেগে জেগে স্বপ্ন দেখেন, ছেলের দেওয়া গরদখানি পরে নন্দীবাড়ির দুর্গামন্ডপে অঞ্জলি দিতে চলেছেন তিনি, তাঁর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নীল আকাশে ভেসে চলেছে নিষ্কলঙ্ক মেঘের দল। কানে আসছে ঢাকের আওয়াজ – মন্ডলদের পুকুর উপচে জল এসে ভাসিয়েছে নাবাল জমি। পথের পাশের বর্ষাস্নাত আগাছাগুলো পর্যন্ত চকচক করছে শরতের নির্মল রোদ্দুরে – মনের কোণে অনুরণন তুলছে কবেকার ভুলে যাওয়া কবিতার চরণ – ‘ঢাকিরা ঢাক বাজায় খালে বিলে’ –
ডিটেনশন ক্যাম্পের নতুন গার্ড বিনয় গোলদার অধৈর্য আঙুলে মোবাইলের স্ক্রিন ঘাঁটছিল। সদ্য কেনা স্মার্টফোনটা তার সড়গড় হয়ে ওঠেনি এখনো। রেডিয়ো কানেকশন ধরতে অসুবিধে হচ্ছিল। একবার ভাবল বলবে নাকি হাবিলদার শক্তি সিংকে? তার সঙ্গেই আজ ডিউটি পড়েছে ওর। তারপর ভাবল, থাক। কি দরকার? শক্তি ব্যাটা অবাঙালি, মহালয়া নিয়ে ফালতু সেন্টিমেন্ট ওর না থাকারই কথা। তার উপর ডিউটিতে থাকাকালীন ট্রানজিস্টরে কান পেতেছিল বলে উপরতলায় রিপোর্টও করে দিতে পারে। তার চেয়ে নিজেই না হয় চেষ্টা করবে।
যতই আর্মির লোক হোক, আদতে তো সে বাঙালিই – মহিষাসুরমর্দিনী শুনবে না?
সাত নম্বর ব্যারাকটা একবার পাক দিয়ে এসে, বারান্দার এক কোণে বসে মোবাইলটা নিয়ে ফের চেষ্টা আরম্ভ করল বিনয় গোলদার।
বিছানায় জেগে জেগেই সেই পরিচিত শঙ্খধ্বনি কানে এলো শ্যামলীর। ধড়মড় করে উঠে বসলেন তিনি। স্বপ্ন দেখছিলেন না কি?
না তো! ঐ তো স্পষ্ট কানে বাজছে সেই মন্দ্র কন্ঠের চিরপরিচিত স্তোত্রপাঠ –
‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর’ –
এ গলা তো ভুল হবার নয়, মাঝের তিন-চারটে বছরে শুধু হারিয়ে গিয়েছিল তাঁর জীবন থেকে। মলিন শয্যা থেকে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় নেমে এলেন শ্যামলী। বিস্রস্ত জামাকাপড়েই প্রায় দৌড়ে বেরোলেন বারান্দায়। যত শীঘ্র সম্ভব ছুটে গিয়ে পৌঁছোতে চাইলেন সেই স্তোত্রের উৎসের কাছে।
হতভম্ব বিনয় গোলদার দেখল সাত নম্বর ব্যারাকের স্বল্পালোকিত বারান্দা দিয়ে ছুটে আসছে এক রুক্ষ এলোকেশী – তার পরনের কাপড় অগোছালো, নগ্ন পা দু’টি যেন মাটি স্পর্শ করছে না।
তিন নম্বর ডিটেনশন ক্যাম্পের কুয়াশামাখা ভেপার ল্যাম্পের অনুজ্জ্বল আলোয় স্তম্ভিত বিনয় দেখতে পেল আঁধারের চাদর ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে আকাশের মুখ থেকে, পাথুরে নিষ্করুণ পৃথিবীর মাটিতে আলোর বেণু বেজে উঠছে, অচিন্ত্য রূপমাধুরী সর্ব অঙ্গে মেখে জগজ্জননী মা আসছেন।










