যেহেতু পেশাপরিচয়ে আমি চিকিৎসক – এবং এমন চিকিৎসক যে সরকারী কর্মীও – তাই সরকারী স্বাস্থ্যপরিস্থিতিটাই সর্বপ্রথম নজরে আসে।
দেখে যারপরনাই খুশী হলাম যে মাননীয়া মন্ত্রী ডা শশী পাঁজা হেরে গেছেন। যাঁকে মাথায় বসিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তরবঙ্গ-লবি-পরবর্তী সময়ে নতুন একটি তৃণমূলপন্থী চিকিৎসক-সংগঠন তৈরী করেছিলেন। এবং বলাই বাহুল্য, সরকারের ধামাধরা চিকিৎসককুলের বড় অংশই গত বছর সেই সংগঠনে যোগ দিয়েছেন – যাঁদের মধ্যে এমনকি অনেক মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ প্রমুখ আধিকারিকরাও পড়েন।
গতবছরও প্রাণপণে-চটি-চাটতে-থাকা চিকিৎসককুলের অনেকেরই মুখ আজকে দুপুরের পর থেকে, বেশ খুশী খুশী দেখছি – তাঁদের অনেকেই তৃণমূলের অপশাসন অত্যাচার বিষয়ে দুপুরের পর থেকে অত্যন্ত সরব। বলাই বাহুল্য, এঁদের দলবদল – মানে জামা বদলানো – স্রেফ সময়ের অপেক্ষা (বা বদল হয়তো হয়েই গেছে)। স্বাস্থ্যভবনের হর্তাকর্তাদের ক্ষেত্রেও অন্য কিছুর আশা করি না।
প্রশ্ন হলো, চূড়ান্ত দুর্নীতিপরায়ণ একটি দুর্বৃত্তদের দল ক্ষমতা থেকে সরে যাবার পর, যাঁরা সামনাসামনি সেই দুর্নীতির অংশ হওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে পরোক্ষে আড়ালে-আবডালে ক্ষীর খেয়ে চলেছিলেন, তাঁরা যদি নতুন সরকারের আমলেও একইভাবে ক্ষীর খেয়েই চলতে পারেন – তাহলে মানুষ তিতিবিরক্ত হয়ে যে পরিবর্তন আনলেন, সেই উদ্দেশ্য সফল হবে তো?
কেননা, আমার মোটামাথায় যা বুঝি তাতে, এই জনাদেশের পেছনে বিজেপির পক্ষে মানুষের সমর্থন যতখানি প্রবল, তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিরক্তি তার চাইতেও অধিকতর প্রবল কারণ (তৃণমূলকে সরাতে পারার মতো একমাত্র ভরসাযোগ্য বিরোধীদল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারার কৃতিত্ব, অবশ্যই, বিজেপির প্রাপ্য – এবং নিজেরা কেন বিকল্প হয়ে উঠতে পারলেন না, সেই আত্মানুসন্ধান আত্মসমীক্ষাও বাকি দলগুলোর করে দেখা উচিত)।
কথাগুলো স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রসঙ্গে বললাম, কেননা কর্মসূত্রে এই বিষয়েই বেশী খবরাখবর রাখি – কিন্তু পুলিশ-প্রশাসন থেকে শুরু করে যাবতীয় সরকারি দফতর বিষয়ে এই একই কথা বলা যায়।
আরও একটা কথা। নিজে যেহেতু বামপন্থী, সেই হিসেবে বিজেপির জয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কারণ দেখি না। বিধানসভায় আমাদের আসন শূন্য রইল না, রেজাল্টের মধ্যে এটা একটা পজিটিভ দিক। ভোট-শতাংশ বেড়েছে কিনা, তা এখনও জানি না। বাড়লে অত্যন্ত খুশীর খবর, অবশ্যই। কিন্তু সবকিছুর মধ্যে অন্তত একটা ব্যাপার স্বস্তির। প্রত্যেক ভোটের আগে একশ্রেণীর তথাকথিত বামপন্থী নইলে-কিন্তু-বিজেপি-এসে-যাবে জাতীয় জুজু দেখিয়ে প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে তৃণমূলের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাতেন, এবারের পর থেকে অন্তত সেই দশা থেকে মুক্তি পাওয়া গেল। আশা করি, এই ‘বামপন্থী’-রা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর এবারে কার মধ্যে লেনিন খুঁজবেন, সে নিয়ে গভীরভাবে ভাবনাচিন্তা শুরু করে দিয়েছেন। বিজেপি একটি আইডিওলজি-ভিত্তিক দল (সে আইডিওলজি আপনার পছন্দ হোক বা না হোক – বলাই বাহুল্য, বাম ভাবাদর্শের সঙ্গে তার যোজন ব্যবধান – কিন্তু আইডিওলজি রয়েছে, এটা অনস্বীকার্য), চোর-চিটিংবাজ- সমাজবিরোধী- দুর্নীতিপরায়ণ-দুর্বৃত্তদের নিয়ে গড়ে তোলা একটি ক্লাব দিয়ে যে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় না, এটুকু বুঝতে পারার জন্য বিবিধ ইউরোপীয় তাত্ত্বিকের রচনাবলীর চাইতে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানই বেশী কার্যকরী।
এবং এই সহি-বামপন্থীদের ধারণা ছিল যে তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভটা শুধুই উন্নাসিক শহুরে মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্তর – গ্রামের মানুষ তৃণমূলের জনকল্যাণ ও উন্নয়নে মন্ত্রমুগ্ধ – এমন বার্তাসহ বিভিন্ন শ্লেষাত্মক মন্তব্য/পোস্ট সমাজমাধ্যমে দেখেছি। আশা করি, বাড়িতে আয়না থাকলে, এই উচ্চমার্গীয় বামপন্থীরা মানবেন, তত্ত্বজ্ঞানের দাপটে তাঁরা এতখানিই সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন যে তাঁদের প্রিয় তৃণমূল সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের এই বিপুল বিরক্তির ন্যূনতম আভাসটুকুও তাঁরা পাননি।
সরকারী কর্মচারী যেহেতু, সরকারের কার্যপ্রণালীর সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে চলার ব্যাপার থাকে। যে দলই চালাক, সরকারটা রাজ্যের সবার। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা এইটুকুই – সরকার যেন দলমতজাতিধর্মনির্বিশেষে রাজ্যের সকলের সরকার হয়ে ওঠে। এবং দুর্নীতিপরায়ণ দুর্বৃত্ততুল্য আধিকারিকদের বিচার করতে পারুন বা না পারুন, এটুকু অন্তত নিশ্চিত করবেন যাতে জামা বদলে তাঁরাই যেন পুনরায় ক্ষমতাবান হয়ে না উঠতে পারেন।












একদম সময়োপযোগী বক্তব্য। সহমত। মোটের উপর এখন লড়াইটা আবার বাম ভাবাদর্শ বনাম দক্ষিণপন্থার লড়াই হয়ে উঠল।