ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় খুবই খারাপ লাগছে, রাগ হচ্ছে। তাই না? আপনি অবশ্য জানিয়েছেন – আপনি নাকি হারেন নি, আপনার ওপর জোর করে হার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে; তাই আপনি ইস্তফা দেবেন না। এ এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি! দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। পারলে, বিজেপিকে এখুনি ভারত ছাড়া করতেন নিশ্চয়ই!
রাজনৈতিক ধান্দাবাজির স্বার্থে আপনি নিজেই – ১) দেশের বিপুল রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে কয়েকজন ব্যক্তির হাতে বিক্রি করে দেওয়া দেশবিরোধী, ২) ঘোষিত ভাবে কমিউনিস্ট ও ইসলাম বিরোধী, ৩) বাংলা ভাগের সময় থেকেই বাংলা ও বাঙালি বিরোধী, ৪) সংখ্যালঘুদের গণহত্যাকারী ও দাঙ্গাবাজ, ৫) সমাজে বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে ঘৃণার চাষ করা, – বিজেপির মতো শক্তিকে হাত ধরে পশ্চিমবাংলার মাটিতে নিয়ে এসেছিলেন। ভুলে গেছেন সেকথা? “ভালো আরএসএস” খুঁজে পেয়েছিলেন, তাই তো? দাঙ্গা ও গণহত্যার প্রধান কুশীলবকে বহুমূল্য উপহার পাঠিয়েছিলেন, সেকথাও নিশ্চয়ই মনে আছে? নানা কু-যুক্তি হাজির করে বারবার লোকসভায় যে এঁদের বাঁচিয়েছিলেন আপনারা, তা-ও নিশ্চয়ই ভুলে যান নি? পশ্চিমবাংলা থেকে এতোগুলো লোকসভা আসনে জয়লাভ, সাম্প্রদায়িক বিজেপি দুঃস্বপ্নেও কখনও ভাবেনি। আজ যখন সেই বিজেপি নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে আপনাকে গদিছাড়া করেছে, তখন এতো গোঁসা করলে চলবে? একসময়ে যাঁরা কমিউনিস্টদের বিরোধিতা করার জন্য অর্থবল ও লোকবল যুগিয়ে (১৯৯৮) আপনার তথাকথিত ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ তৈরি করতে সাহায্য করলো, তাঁরা আপনার কাছে ন্যূনতম কৃতজ্ঞতাটুকু তো আশা করতেই পারে। তাই না?
যাঁরা আপনাকে গ্যাস খাইয়ে আকাশে তুলেছিলো, সীমাহীন স্তাবকতা করে আপনার চোদ্দটা বাজিয়েছে, আপনার এই দুর্দিনে তাঁরা কী বলছে? সেইসব হতাশ ‘বিপ্লবী’ বাহিনী; দুর্নীতির দায়ে বহিষ্কৃত সিপিআই (এম); আপনাকে ‘বামপন্থী’ আখ্যা দেওয়া মার্কসবাদী (!) সেনারা; দুর্নীতিবাজ আমলারা; সুবিধাবাদী বিদ্বজ্জনেরা; অত্যাচারী ও ঘৃণ্য পুলিশ অফিসাররা; – অর্থাৎ যাঁরা নিজেদের স্বার্থে নিজেদের আখের গোছানোর জন্যেই আপনাকে এতোদিন কাজে লাগিয়েছিলেন, সেইসব হঠাৎ তেড়েফুঁড়ে ওঠা ‘বাঙালি’ স্বার্থের ঠিকাদারবৃন্দ এখন কোথায়? যেসব বামপন্থী (!) বাহিনী আপনাকে উদ্বাহু সমর্থন জানানোকেই প্রগতিশীল কাজ মনে করেছিলেন, তাঁরা এখন কী ব্যাখ্যা দিচ্ছেন? সুবিধামতো রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করা এইসব হঠাৎ-বাঙালি নিশ্চয়ই আপনাকে রবীন্দ্রনাথের এই কথাটা মনে করিয়ে দেয়নি, “দুর্লভ জিনিসের সুখসাধ্য পথকেই বলে ফাঁকির পথ।” আপনারা সকলেই ভেবেছিলেন, ভোটের সময়ে হঠাৎ হৈহৈ করে ‘বাঙালি অস্মিতা’-র কথা বলতে শুরু করলেই বোধহয় ‘বাঙালির প্রতিনিধি’ হিসাবে নিজেদের জাহির করা যাবে! কিন্তু এ যে নেহাতই ‘ফাঁকির পথ’, তা কেউই আপনাকে বোঝায় নি। আপনিও ভেবেছিলেন কিছু জঘন্য ‘কবিতা’, অতি নিম্নমানের ‘সাহিত্য’ নিজের নামে প্রকাশিত হলে আর কিছু উদ্ভট ‘ছবি’ এঁকেই বোধহয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যথার্থ উত্তরসূরি হিসাবে বাঙালি সমাজে আপনি মান্যতা পাবেন! এই ছ্যাবলামোর ফল যা হবার, শেষপর্যন্ত তা-ই হয়েছে।
‘বাংলাভাগ’-এর মাধ্যমে সমগ্র বাঙালি জাতির যে সর্বনাশ শুরু হয়েছিলো ১৯৪৭ সালে, অনেক বাঙালি রথী-মহারথী তাতে মদত জুগিয়ে চলেছেন যুগযুগ ধরে! শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর বাংলা-ভাগের দাবিকে সমর্থন করে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসু ও রতনলাল ব্রাহ্মণ। ‘ইসলামী’ পূর্বপাকিস্তান থেকে বহু কমিউনিস্ট নেতা তখন জন্মভূমি ছেড়ে চলে এসেছিলেন ‘হিন্দু’ পশ্চিমবাংলায়! বাঙালি-বিরোধী যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষিক আগ্রাসন চলে আসছে চল্লিশের দশক থেকেই, কোনও রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াই-সংগ্রাম চালান নি। আপনিও না। পশ্চিমবাংলার ‘জন্মদিন’ পালন নিয়ে যখনই আপনি কথা বলেন, তার মানে যে অবিভক্ত বাংলার মৃত্যুকে মেনে নেওয়া হয়, তা বুঝতেও পারেনি নি! সব বাঙালি-বিরোধী শক্তিই তাতে আপনাকে আশীর্বাদ করেছে। বিজেপি-ও।
ভোটের বাজারে আপনার চ্যালাচামুন্ডারা হঠাৎ “গণতান্ত্রিক অধিকার” নিয়েও ভীষণ মুখর হয়ে উঠেছিলো! বিজেপি সারা ভারত জুড়ে জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষার নামে কী ধরণের নারকীয় তাণ্ডব চালাচ্ছে, তা সকলেই দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু আপনি যে পশ্চিমবাংলার বুকে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছিলেন বছরের পর বছর, তা সারা ভারতের মানুষ হয়তো ততটা পরিস্কার বুঝতে পারছেন না। ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’তার তাণ্ডব পশ্চিমবঙ্গবাসী হাড়ে হাড়ে বুঝেছেন অনেকদিন যাবৎ! পুরো প্রশাসনটাকেই যে কীরকম ভাবে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার দুমড়েমুচড়ে শেষ করে দেবার কাজে লাগিয়েছেন, তা কী এখন ভুলে যাবার চেষ্টা করছেন? শিক্ষক, চিকিৎসক, সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে কীভাবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন, তা কী সকলেই ভুলে গেছে? টাকা বিলিয়ে আপনি মানুষকে চুপ করাতে চেয়েছিলেন! হাজার হাজার বাঙালি সন্তানকে লক্ষলক্ষ টাকার বিনিময়ে চাকরি জালিয়াতির শিকারে পরিণত করেছেন। সরকারি কর্মচারীদের প্রতি কদর্য নোংরা ভাষা ব্যবহার করেছেন। আপনার স্তাবকের দলও এসব ব্যাপারে কখনোই আপনার বিরোধিতা করেনি; বরং আপনাকে লজ্জাজনকভাবে মদত জুগিয়েছে। তারা আপনার কোনও অসভ্যতা, আস্পর্ধা, দুষ্কর্মের বিরোধিতা না করে, শুধু ‘বিজেপি জুজু’-র ভয় দেখিয়ে সবাইকে চুপ করাতে চেয়েছিলো। তপ্ত চাটু থেকে জ্বলন্ত উনুনে পড়া কখনোই কাম্য না। কিন্তু তপ্ত চাটুতে আপনাকে বসালেও বুঝবেন, সেটাও মানুষকে ঝলসে মারার পক্ষে যথেষ্ট। কোনও ‘শাসক’ কখনোই এই সহজ সত্যটা বুঝতে চায় না! আপনিও চান নি। আপনার স্তাবকের দলও আপনাকে তা বোঝানোর চেষ্টাও করেনি।
হাথরাস বা উন্নাও কান্ডের কথা বলে আপনারা বিজেপিকে কোনঠাসা করতে চেয়েছিলেন। ধর্ষকদের মালা পরিয়ে অমানুষগুলোর উল্লাসের কথা প্রচার করেছিলেন। ঠিকই করেছিলেন। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের মধ্যে ডাক্তার ‘অভয়া’-কে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় দায়ী ডাক্তার-পুলিশ-রাজনৈতিক নেতাদের ক্লেদাক্ত বিষচক্রকে আপনার প্রশাসন যে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁচিয়ে দিয়েছে, তথ্য-প্রমাণ লোপাট করে দিয়েছে, তাদের নিদেনপক্ষে গ্রেপ্তার হতেও দেয়নি, লক্ষলক্ষ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ ও ঘৃণাকে উপেক্ষা করেছেন, সেকথা সকলেই জানে! আপনি স্বয়ং যে বারবার ধর্ষিতাদের প্রকাশ্যেই অপমান করেছেন, তা বুঝি মানুষের মন থেকে মুছে গেছে! ধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে কামদুনির প্রতিবাদী মহিলাদের আপনি যেভাবে চরম মিথ্যাশ্রয়ী হুঙ্কার শুনিয়েছিলেন, তা-ও বুঝি মানুষ ভুলে গেছে? জেলখাটা জালিয়াতকে যে আপনারাও গলায় মালা পরিয়ে ‘বীর’ হিসাবে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, ইতিহাস থেকে কী সেকথা মুছে ফেলা যাবে?
‘সুলভ শৌচালয়’ থেকে মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন, বাসযাত্রীদের প্রতীক্ষালয় থেকে ‘সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল’-এর সাইনবোর্ড টাঙানো, আপনার ভক্তদের মতে সবই নাকি “মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায়” তৈরি হয়েছে! কিন্তু পশ্চিমবাংলার বিপুল জনতা যে আপনাকে ‘মিথ্যাশ্রী’ বলতেন, সেকথা কী আপনার কানে পৌঁছায়নি?
বাংলায় একটা কথা চালু আছে, “পাপ ছাড়ে না বাপকে।” বিজেপিকে বাংলায় ডেকে নিয়ে আসার পাপ; ধর্ষকদের বাঁচানোর আর ধর্ষিতাদের বারবার অপমান করার পাপ; ন্যায্য দাবি উত্থাপনকারি জনগণের উপর লাগাতার আক্রমণের ও অসম্মানের পাপ; বছরের পর বছর পঞ্চায়েত বিধানসভা ও লোকসভা, সমস্ত নির্বাচনকে বাহুবলী-শিল্পে পরিণত করার পাপ; অকল্পনীয় চুরি ছ্যাঁচড়ামি জালিয়াতি ইত্যাদির পাপ; সরকারি কোষাগারের (অর্থাৎ জনগণের পকেটের) শতশত কোটি টাকা জনস্বার্থের বিরুদ্ধে নয়ছয় করার পাপ; চরম ঔদ্ধত্য ও অনর্গল মিথ্যাচারের পাপ; – এই পুঞ্জিভূত পাপ শেষপর্যন্ত আপনাকেও ছাড়লো না। আপনি যদিও বলছেন, আপনি মোটেও হারেন নি!
অমুক ‘ভাণ্ডার’, তমুক ‘শ্রী’, অমুক ‘ভূষণ’, তমুক ‘বিভূষণ’ ইত্যাদির ভিত্তিতে কিন্তু আপনি ২০১১ সালে জেতেন নি। বামফ্রন্টের অপশাসন-বিরোধী ভোটে বীতশ্রদ্ধ জনগণ আপনাদের জিতিয়েছিলেন। আজও আপনার চরম জনবিরোধী অপশাসনের বিরুদ্ধেই জনগণ বিজেপি দলকে জেতালেন। চৈতন্যদেব, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, লালন ফকির, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের পশ্চিমবাংলার সংস্কৃতি কখনোই সাম্প্রদায়িক হিংসা-ঘৃণার পক্ষে ছিলো না; আজও নেই। অতিষ্ঠ মানুষ আপনার অপশাসন থেকে পরিত্রাণ চেয়েছিলেন। এখন থেকে পশ্চিমবাংলায় যা কিছুই অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটবে, সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সুস্থতার পরিস্থিতি যতটাই নষ্ট হবে, তার দায় থেকে কিন্তু আপনারও রেহাই নেই। কারণ আপনি নিজেই বিজেপি দলকে পশ্চিমবাংলায় ডেকে এনেছেন; তাদের শক্তিশালী করতে বছরের পর বছর নানাভাবে মদত জুগিয়েছেন। প্রতি মুহূর্তে মনে রাখবেন সেকথা। আপনি শাসন ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন, পুঞ্জিভূত পাপের দায় থেকে পালানোর কোনও পথই নেই আপনার।










