দিন কয়েক আগেই ফ্যাসিবাদের রথ গৈরিক বিজয়কেতন উড়িয়ে ঢুকে পড়েছে আমাদের নিজস্ব আঙ্গিনায়। গ্রহণের অন্ধকার আপাতত গ্রাস করেছে আশার সৌরজগৎ। সাম্রাজ্যবাদের বিজয় সৌধ অভ্রভেদী হিংস্র অহংকারে ঢেকে দিতে চাইছে আমাদের সমস্ত আকাশ। তবে অন্ধকার গাঢ় হলে পশ্চাৎপটে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে দিশারী তারার আলো। এমনই এক নক্ষত্র বিভা আমাদের বিধ্বস্ত মন ও চেতনাকে আগুনের পরশমনির ছোঁয়ায় জাগিয়ে তুলল গত দশই মে সন্ধ্যায় মধুসূদন মঞ্চে সীমা মুখোপাধ্যায় নির্দেশিত এবং অভিনীত ‘ভালো পাহাড়’ নাটকের অসাধারণ অভিঘাতে।
Timberlake Wertenbeker এর ‘Winter Hills’ এর অনুপ্রেরণায় সমসাময়িক সমাজ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে রচিত এই নাটকের কেন্দ্রেও এক নির্মীয়মান হোটেলের উচ্চ সৌধ, যা আগ্রাসী পুঁজিবাদ ও ক্ষমতা তন্ত্রের গর্বিত প্রতীক। এখানে সমবেত হয়েছেন পাঁচ মহিলার একটি দল, যাদের আপাত উদ্দেশ্য সাহিত্যচর্চা। কিন্তু এই দলের কেন্দ্রীয় চরিত্র দীপালি আচার্য ( সীমা মুখোপাধ্যায় অভিনীত) আর তাঁর সহযোগী ভ্রামরী আসলে হোটেলের রাক্ষুসে প্রকল্পটিকে বানচাল করতে চাইছেন। সেই উদ্দেশ্য প্রকাশ্যে আসার পর নাটকের গতি দ্রুত লয়ে এক বিস্ফোরক মুহূর্তে পৌঁছয় আর দীপালি সহ দলের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য প্রাণ হারান। নাটকের মূল সময় অক্ষের নিরিখে অতীতে স্থাপিত এই ঘটনাকে দীপালির প্রবাসী কন্যা এনাক্ষী পুনরুদ্ধার করতে চাইছেন, সেদিনের জীবিত সদস্য ইলিনা, ভ্রামরী আর ভারতীর কাছ থেকে জানতে চাইছেন তার মায়ের মৃত্যুর প্রকৃত সত্য। 
হোটেলের আলাপচারিতায় একদিকে প্রাচীন উপকথার আদলে পুঁজিবাদী লোভ আর লুণ্ঠনের ধ্রুপদী ইতিহাস বুনে চলা, আর সেখান থেকে দীপালির দলের অন্য সদস্যদের সমকালের মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য করা – যাতে প্রশ্নবিদ্ধ হয় পুঁজিবাদ, পুরুষতন্ত্র ও ক্ষমতার অন্য সবকটি প্রকরণ। Brechtian theatre এর সার্থক প্রয়োগে প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের সজাগ রাখে। চরিত্রদের ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব আর বিতর্কের মাধ্যমে নাটক চূড়ান্ত মুহূর্তের দিকে এগোয়। আমরা যেন চিনতে পারি ইলিনার মতো আপোষকামী বামপন্থীকে, যার সংগ্রামী অতীতকে গ্রাস করে নিয়েছে ক্ষমতা তন্ত্রের ভেতরে টিকে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। পাশাপাশি ভারতীর মতো আপাতভাবে রাজনীতি থেকে গা বাঁচিয়ে চলতে চাওয়া মানুষও দোলাচল কাটিয়ে দীপালির বিপ্লবী আদর্শবাদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পারেন। কিন্তু অন্তিম লগ্নে এনাক্ষীর কাছে উন্মোচিত হয় ইলিনার বিশ্বাসঘাতকতার কথা। ভ্রামরীর অগ্নিময় অতীতও অজানা থাকেনা। কিন্তু এনাক্ষির সামনে আপাতভাবে রুদ্ধ হয়ে গেছে প্রতিবাদ তথা প্রতিকারের সব কটি দরজা। তবু সে ইলিনার দেয়া আপোষের প্রস্তাবকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। পথ তাকে খুঁজে নিতে হবে, পথ সে খুঁজে পাবেই। বর্তমানের হতাশা- ধূসর বাস্তবকে ছাপিয়ে দুরগামী দৃঢ় প্রত্যয়ে সে যেন তার শহীদ মাতার আহ্বান শুনতে পায়, “এখনই অন্ধ, বন্ধ করোনা পাখা”।












