বউবাজারের মুখুজ্যেবাড়িতে বিয়ে হয়ে আসা ইস্তক মঞ্জুরানী নিয্যস জানে এ ভিটেয় ভূত আছে। তবে কিনা জানলেও তার বড় একটা কিছু যায় আসে না।
বিয়ের অল্প কয়েকদিন পরে শ্বশুরবাড়ির ঠাকুরদালানের উঠোনে তুলসীমঞ্চে সন্ধের মুখেই প্রদীপ জ্বালাতে গিয়েছিল সে। ছেলেমানুষ বৌ, তার খেয়ালই ছিল না যে সেদিন সকালেই শুরু হয়েছে মাসিক ঋতুস্রাব। যত বার প্রদীপ জ্বালাতে যায়, ততবারই নিভে যায় দেশলাই কাঠি – কি গেরো!
আচমকা নির্মেঘ আকাশে কেমন গুরুগম্ভীর গর্জন শুনে ওপরপানে চেয়ে হাঁ হয়ে গিয়েছিল মঞ্জুরানী। ঘাড় উঁচু করে সে দেখেছিল তেতলার কার্নিশে বসে এক পাকাচুলো ঝুঁটিবাঁধা বুড়ি আনমনে সিড়িঙ্গে পা দুটো দোলাতে দোলাতে কটমট করে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। ভির্মি খাবো খাবো করেছিল বটে মঞ্জু, কিন্তু খনখনে গলায় জম্পেশ ধমক শুনে আর অজ্ঞান হতে প্রবৃত্ত হয়নি।
“এএঃ, আবাগী নেকির ঠ্যাকার দ্যাখো, যেন উড়োজাহাজ চড়ে বিলেত থেকে এলেন – জম্মে কোনোদিন পেত্নি দেখিসনি নাকি লা? খবদ্দার বলচি, অজ্ঞান হবিনি কিন্তু – যত্তসব ন্যাকামো! ইদিকে সকড়ি শরীলে তুলসীমঞ্চ ছুঁয়ে ফেললি? বলি, তোর বাপ বেম্ম ছিল না কি রে মাগী?”
সেই ইস্তক গত তিরিশ বছরে ঊনকোটি চৌষট্টি বার সরোজবাসিনীর দাঁতখিঁচুনি হজম করে আসছে মঞ্জুরানী। এখন গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। বরং ক’দিন তাঁকে তেতলার ঘরের দেওয়াল ছেড়ে নামতে না দেখলে তার মন উচাটন হয়, ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয়, রক্তচাপ মনুমেন্টের মাথায় চড়বো চড়বো করে – যেমন আজ করছিল।
পাকশালের কোণে জলভর্তি পিতলের ঘড়াটা নামিয়ে, কোমর থেকে আঁচলটা খুলে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে মুখফোড় বাসন্তী যখন বলে উঠল –“ম্যাগোঃ, আজ দুপুরেও কুমড়োর ছক্কা আর পুঁটির ঝাল দিয়ে সারলে মা?”, তখন মৃদুভাষী মঞ্জুরানীরও সহ্য হয়নি। মুখ ঝামটা দিয়ে বলেছিল, “কে মাথার দিব্যি দিয়েছে বাপু তোমায় এখেনে থাকতে? না পোষালে চলে গেলেই পারো।”
এবম্বিধ রূঢ় কথার জবাবে, বাসন্তীর ফোঁস করে ওঠাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু, তার পরিবর্তে ঠোঁটের কোণে একটা দুর্বোধ্য হাসি টেনে এনে চোখ ঘুরিয়ে উত্তর দিয়েছিল সে – “যাব গো যাব। সময় হলেই যাব। তোমাদের বাড়িতে আমিত্যু থাগতে আসেনি বাসন্তী! সময়টা হোক আগে, নিশ্চই যাব” –
মনটা কেমন কু গেয়ে উঠেছিল মঞ্জুরানীর। বলে কি ঝি-টা? সময় হোক মানে? কিসের সময়?
পুরোনো অভ্যেসে চারদিকে তাকিয়ে ডাকসাইটে দিদিশাশুড়িকে খুঁজে ফিরেছিল তার উতলা দৃষ্টি। বাসন্তী যদি কোনো বদ মতলব ভেঁজে থাকে, তার মোকাবিলা করা সাদাসিধে মঞ্জুর কর্ম নয় – যেমন বুনো ওল তেমনি বাঘা তেঁতুল প্রয়োজন।
গগন মুখুজ্যের বারমহলের বৈঠকখানার ছেঁড়া আরামকেদারাটায় আধশোয়া হয়ে অধৈর্যভাবে পা নাচাচ্ছিল হেবো, অর্থাৎ হর্ষবর্ধন মুখুজ্যে – রায়বাহাদুর গগনের নিম্নতন পঞ্চম পুরুষ, বাড়ির বর্তমান কর্তা।
গায়ের আধময়লা ফতুয়াটার বেশ কয়েক জায়গায় অলজ্জ গহ্বর দৃশ্যমান। শান্তিপুরী ধুতির পাড়টাও রীতিমত ফেঁসে গেছে, তবু খাঞ্জা খাঁয়ের নাতির তুল্য মেজাজি গলায় সে দাবড়াচ্ছিল –”বলো কি অকশনচন্দর, এই খাঁটি রুপোর গড়গড়া জোড়া মাত্তর বিশ হাজারে ছাড়তে বলচো? তুমি কি পাগল টাগল হয়ে গেলে না কি?”
উল্টোদিকের কেঠো তক্তপোশে বাবু হয়ে বসে হাত কচলাচ্ছিল অক্ষয় পুততুন্ড, পার্ক স্ট্রিটের নামজাদা নিলামের দোকানের সেজো কর্মচারী। উত্তর আর মধ্য কলকাতার পড়তি বড়মানুষদের ঝড়তি জিনিসপত্র সস্তায় কেনাই যার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য এবং বিধেয়। গগন মুখুজ্যের মালখানার সিংহভাগ আসবাব, বাসনপত্র মায় হিরে-জহরৎ-
সোনাদানা পর্যন্ত অক্ষয় পুততুন্ডের মালিকদের গুদামজাত হয়েছে।
তবে আর বিশেষ কিছু নেই, অক্ষয় জানে। মুখুজ্যেরা এখন ছিবড়ে বললেই চলে।
তবু কিসের লোভে শিকারি কুকুরের মতো হাওয়ায় নাক উঁচিয়ে গন্ধ শুঁকে শুঁকে, এবাড়ির আনাচে কানাচে এখনো উঁকি মেরে বেড়ায় অকশনচন্দর? আর কেউ বুঝুক না বুঝুক, ভূপালগঞ্জের ডাকাতপাড়ার মেয়ে বাসন্তী খুব বোঝে। তার দশটা চোখ, বিশটা কান – তাকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়। আদার ব্যাপারি আকাই শেখকে পরের বার ফোন করবার সময় জানিয়ে রাখতে হবে যে চোরাই মাল পাচার করার জাহাজের জোগাড় পর্যন্ত বাসন্তী করেই রেখেছে।
তেতলার কার্নিশ থেকে বৈঠকখানার দিকে বাসন্তীর ছোঁকছোঁকে উঁকিঝুঁকি বেশ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতেই লক্ষ্য করছিলেন সরোজবাসিনী। মাগীর চোখেমুখে যেন কথার খই ফুটছে। কোন আক্কেলে যে হেবোর বউ এই কুলগোত্তরহীন বউড়িটাকে কাজে রাখল কে জানে! মাগী আবার সক্কলের চোখ এড়িয়ে চ্যাপটামতো একটা খুদে বাসকো কানে চেপে কার সঙ্গে জানি ফুসুরফুসুর করে। নিঘ্ঘাত নষ্ট মেয়েছেলে!
সেদিন আবার গোয়ালঘরের মেজের উপর গোদা পায়ে থপ থপ করে নাচছিল পোড়ারমুখী। হুঁ, যা ভেবেছিলেন ঠিক তাই! ভাতারখাকি, ছেনাল মাগী – তোর পেটে পেটে এত! বংশের মানিকের জন্য রাখা ধনে নজর পড়েছে তোর? মর, মর, ওলাউঠো হোক, ন্যাবায় ধরুক, যে হাতে অন্নদাতার ঘরে সিঁদ দিবি ভেবিচিস, কুঠ হোক সে হাতে! গ্রীষ্মের দুপুরের ধুলোটে ঘূর্ণির মতো সরোজবাসিনীর উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস পাক খেতে খেতে ছাতের জলট্যাঙ্কির কাছে গিয়ে আছড়ে পড়ে। দাদাশ্বশুরই এবার এর একটা বিহিত করুন!
সেদিন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। আকাশে তখনো চাপ চাপ মেঘ জমে রয়েছে। ফুরফুরে বাদলা হাওয়ায় বাসন্তীর মুখুজ্যেবাড়ির খোলা ছাতে বেড়িয়ে ফিরতে বেজায় ইচ্ছে হলো।
তা, ছাতটা এদের দেখার মতো বটে। নবাবি ধাঁচের ঢালা ছাত, এইয়া উঁচু তার পাঁচিল – মধ্যে আবার ফুটো ফুটো নকশা করা ডিজাইন। হাঁটু গেড়ে বসে ফুটোয় চোখ রাখলে নিচের জনবিরল গলিপথে ত্বরাহীন দু’একটি টানা রিকশা ঠুনঠুন করতে করতে চলে যাচ্ছে দেখা যায়। দূরে অক্রূর দত্ত লেনের বসাকবাড়ির ছাদে পায়রা ওড়াচ্ছে কারা।
কাদের বাড়ির টবের বাগান থেকে ভেসে আসছে বেলফুলের মিষ্টি সুবাস। আবেশে বাসন্তীর দু’চোখ যেন জড়িয়ে আসে। বৃষ্টির জল যাওয়ার ঝাঁঝরিটার পাশে ঠান্ডামতো জায়গাটায় আঁচল পেতে শুয়েই পড়ে সে।
চোখ বুজতেই রাজ্যের ভাবনারা সুখের স্বপন হয়ে বেড়াতে এলো যেন। জেগে জেগেই বাসন্তী দেখতে লাগল, তার ভূপালগঞ্জের বাপের বাড়ি – মাতাল ঘরজামাই স্বামী – বাপের দেওয়া দু’কাঠা জমিতে ঘর তুলেছে সে – পাথরের মেঝে, ডিসটেম্পার করা দেয়াল, মোমপালিশ করা বক্স খাট, বাহারি ডুমের বাতি, জানলায় সাটিনের ফুলছাপ পর্দা – সব হয়েছে তার, সঅঅব!
বাসন্তীর চোখের সামনে নাচতে থাকে ঘড়া ঘড়া মোহর! মোহর মানে সোনার টাকা, সে জানে। আকাই শেখ বলেছে। উঃ, কি ভারি একেকটা। না, তার ভাগের সবগুলো মোহর সে মোটেও বিক্রি করবে না, কিছু রেখে দেবে। পাটিহার গড়াবে একটা, আর একজোড়া কানপাশা – তার বহুদিনের শখ। ছোটভাইয়ের বউটার বাপের বাড়ি থেকে দিয়েছিল – তার বড় ইচ্ছে হয়েছিল একদিন পরবে, ভাইবউ ছুঁতে অবধি দেয়নি। ইঃ, ডাঁটে একেবারে মটমট করছিল বাপসোহাগী মেয়েটা। ওর চাইতেও বড় পাশা গড়িয়ে থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দেবে বাসন্তী।
বরটার জন্য একটা মোটা দেখে চেনও করিয়ে নেবে কিনা ভাবল। ব্যাটা পেঁচো মাতাল, কিন্তু হাজার হোক, সোয়ামি তো বটে। আচ্ছা, মোটার দরকার নেই, বেচেবুচে খেয়ে ফেলবে শেষকালে – সরু গোছের একটা চেনই না হয় কিনে দেবে ওকে।
নরম গদির মতো ভাবনার বিছানায় ডুবে যেতে যেতে হঠাৎই বাসন্তীর কানে এলো একটা সুর, বাঁশির সুর।
চমকে উঠে চোখ মেলল সে। ঝুপসি আকাশখানা মাথার উপর নেমে এসেছে যেন। এত কাছে, মনে হচ্ছে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। মাঝে মাঝে চমকে উঠছে বিদ্যুৎ। আচমকা বাসন্তীর মনে হলো, এই বিশাল ছাতে সে যেন আর একা নেই। ঘাড় ফিরিয়ে চাইতেই বুকের রক্ত যেন শুকিয়ে গেল তার।
সিঁড়ির গোড়ায় ও কে দাঁড়িয়ে? শ্যামলারঙের ছোঁড়া – মাথায় শিখীপাখা, বাহুতে, কানে, গলায় ঝলমলে সব অলংকার, চোখধাঁধানো বিজলির আলোয় ঝিকমিক করে উঠছে। এইগুলোই সে এতক্ষণ ধরে স্বপ্নে দেখছিল না? অবাক দৃষ্টিতে বাসন্তী দেখে শ্যামলা ছোঁড়ার দু’চোখে দুষ্টু হাসি, হাতে আড়বাঁশি। ছোঁড়া ফুঁ দিচ্ছে সেই বাঁশিতে – পৃথিবী, আকাশ, ছাদ, সব যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বাসন্তীর চোখের সামনে। ঈশান থেকে নৈঋত, অগ্নি থেকে বায়ুকোণে ছড়িয়ে পড়ছে সে বাঁশির পাগল করা সুর। দু’হাতে কান চাপা দেয় ডাকাতপাড়ার মেয়ে। নাঃ, সুরে তো কই ছেদ পড়ল না। বাসন্তীর অন্তস্থল যেন উথাল পাথাল করে উঠল – হৃদমাঝারে অকাল কালবোশেখির তুফান উঠল যেন। চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। কিন্তু নিস্তার মিলল কই? সেই বংশীধারী মোহন ছেলের ছবি ঝলসে উঠতে লাগল চোখের পর্দায়। কে গা তুমি? কোন ভিনদেশ থেকে ভুলোতে এলে আমায়? চোখ খুললে তুমি, বুজলেও যে তুমিই।
শঙ্কামিশ্রিত এক অনাস্বাদিত ভালোলাগায় বিবশ বাসন্তী, গগন মুখুজ্যের ছাত থেকে নামার সিঁড়িটা হারিয়ে ফেলল বিলকুল।
(ক্রমশ)









