পুজো কেটে গেল। কালীপুজো, ভাইফোঁটাও পেরিয়ে গেল ক্যালেন্ডারের ঘর – পলাশকান্তির সঙ্গে আকাশমণির পরিচয়টা আর এগরোলে আটকে রইল না। আলুকাবলি, ফুচকা, নন্দন, অ্যাকাডেমি, প্রিন্সেপ ঘাট, ভিক্টোরিয়ার বাগান ছাড়িয়ে প্রায় গগন মুখুজ্যের ভিটে পর্যন্ত পৌঁছে গেল।
মেরি কুপার্স ওল্ড এজ হোমের কেয়ারটেকার আকাশমণি সেখানে একটি এক কামরার কোয়ার্টারে থাকে। আর কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতি নিয়ে সপ্তাহে তিন দিন দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটের একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পরিচালিত সান্ধ্য ইস্কুলে, ভদ্দরলোকেদের ভাষায় “খারাপ পাড়ার” মেয়েদের ছেলেপুলেদের বিনা বেতনে পড়ায়। এইটুকু প্রথম আলাপের দিনেই জেনেছিল পলাশ।
তারপর জানল আকাশমণি অনাথ। বাঁকুড়ার সারেঙ্গার গাঁয়ের পাঠশালা থেকে জেলা স্কুল হয়ে ক্রিশ্চান কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন – তার একাকী পথ চলার নাতিদীর্ঘ ইতিবৃত্তান্তও জানল সে। ধীরে ধীরে পরিচয় গাঢ় হতে জানল আরও অনেক কিছু।
আকাশমণি বেমক্কা সাহসী। মারাত্মক ঝগড়াটে। আর সেই সঙ্গে প্রচন্ড প্রতিবাদীও বটে।
একদিন খিদিরপুরের বাসে ভিড়ের মধ্যে টাল সামলাতে না পেরে পলাশকান্তি এক জিন্স-টপ পরিহিতা, কপালের টঙে রোদচশমা টাঙানো আধুনিকার ঘাড়ের উপর গিয়ে পড়েছিল। মহিলা ‘শ্লীলতাহানি, শ্লীলতাহানি’ বলে চিৎকার করে পলাশের গণক্যালানি অর্জন করিয়ে ছাড়ব ছাড়ব করছে, এমন অবস্থায় লেডিস সিট থেকে টর্পেডোর মতো ভিড় ফুঁড়ে উদয় হয়েছিল আকাশমণি।
“এই যে বোনটি, এটা ভিড় বাস, বুঝলে? দেখনহাসি ফেসবুক নয়। এখানে বেমক্কা মিটু কপচিও না। পাবলিকের ধাক্কায় তুমি আমার ঘাড়ে এসে পড়লে আমি যদি তোমায় ছিনতাইবাজ, সোনার হার চুরির মতলবে ধাক্কা দিয়েছ বলে পেটানি খাওয়াই, ভাল্লাগবে, বোনটি?”
হাতা গুটোনো মারমুখী সহযাত্রীরা এই অপ্রত্যাশিত কাউন্টার অ্যাটাকে একটু থমকে গিয়েছিল। আকাশমণির পরের বাক্য শুনে তারা একেবারে ব্যোমকে গেল। কান লাল করে নতমস্তকে পলাশকান্তি শুনল, মধুর কন্ঠে জ্ঞানাঞ্জন শলাকা দিয়ে তার বান্ধবী সেই আধুনিকার চোখ ফোটাবার চেষ্টা করছে – “শত্রু আইডেন্টিফাই করতে শেখো মামণি! খুব যে লাফালাফি করে ঝগড়া করছিলে, সেই সুযোগে তোমার পাশের সিটের এই হত্তুকি মার্কা বুড়োটা যে কন্টিনুয়াসলি তোমায় কনুই মারার তাল করে যাচ্ছিল, সেটা বুঝতে পারোনি একটুও?”
পরের বাক্য সেই সুযোগসন্ধানী প্রৌঢ়কে – “এই যে কাকু, সামলে বসুন। নয়ত ঠিক দু’মিনিটের মধ্যে বদনখানির ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেবো, বউ ছুটবে ডিভোর্স ফাইল করতে, তখন বুঝবেন!”
মোট কথা, পলাশ যা যা নয়, আকাশমণি ঠিক তাই-ই। সে নির্ভীক, স্পষ্টবাক এবং প্রচন্ড রকম আশাবাদী।
তাই এক বিষণ্ণ হৈমন্তী বিকেলে, সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালের সামনের ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আকাশমণি যখন শান্তভাবে বলল –“শোনো, আসছে রোববার তোমাদের বাড়িতে নিয়ে যেও আমাকে”, পলাশের গলায় চিনেবাদাম আটকে গেলেও সে চমকাল না।
বস্তুত, আকাশমণি কখনো আব্দার করে না, সে শুধু তার ইচ্ছেটুকু জানিয়ে দেয়। তার কথায় ‘না’ করে দেবে, এত জোর পলাশের হয়নি কোনোদিন।
ফলে অফিসে বসের কোঁচকানো ভুরু, ইনচার্জের বিরক্তি, সহকর্মীদের কাঁচা খিস্তি, সব অগ্রাহ্য করে গোবেচারা পলাশকান্তি রবিবারের ছুটিটা ম্যানেজ করেই ফেলল শেষমেশ।
অঘ্রাণের ধোঁয়াটে সাঁঝে, হালকা চাঁপা রঙের লিনেনের শাড়িটায় ভারি স্নিগ্ধ লাগছিল আকাশমণিকে। দুরু দুরু বুকে, পায়ে পায়ে সদরের গলিটুকু পেরিয়ে যখন মেয়েটাকে নিয়ে ঠাকুরদালানের উঠোনে এসে দাঁড়াল পলাশ, তেতলার আলসে থেকে সরোজবাসিনীরও ভারি চমৎকার লাগল তাকে।
এ যে উল্টো শ্যাম রাই গো! তা ফর্সা রঙের গুমর কি চিরকাল রাধারাণীরই থাকবে? গৌরবন্ন নাড়ুগোপালের পাশে যেন শ্যামাকালী রাই এসে দাঁড়িয়েছেন। আহা, নয়ন সাত্থক হলো আমার, দাদাশ্বশুরের ভিটে আলো হয়ে উঠল।
মঞ্জুরানী তখন ঠাকুরদালানে চাট্টি নকুলদানা আর শশার কুচি দিয়ে গোবিন্দের শীতলভোগের যোগাড় করছিল। আকাশমণি এসে জোড়হাতে ঠাকুর নমস্কার করে, মঞ্জুরানীর পায়ের কাছে গড় করল। মঞ্জু আঁতকে উঠে বলল –“এ কি করলে মা? ঠাকুরের কাছে মানুষকে প্রণাম করতে নেই, পাপ হয় যে!”
আকাশমণি কুন্দদন্তে হেসে বলল – “আমি ক্রিশ্চান তো, অত নিয়ম টিয়ম জানি না। আপনি শিখিয়ে নেবেন মা।”
সম্ভাব্য পুত্রবধূর চেহারা দেখেই মঞ্জুর পিলে চমকে উঠেছিল, এবার মুখের কথা শুনে বাক্যি একেবারে হরে গেল তার।
পলাশকান্তি আকাশমণিকে রায়বাহাদুর গগন মুখুজ্যের হৃতজৌলুস অট্টালিকার সফর করাচ্ছিল পরম যত্নে – “এইটে হলো মহাফেজখানা, বুঝলে? মানে, দলিল দস্তাবেজ রাখার অফিসঘর আর কি। ওই কড়িকাঠের মাঝে আংটা দেখছ, ওগুলো তে টানাপাখা ঝুলত, ওই দেয়ালের চাকা দেখছ কপিকলের মতো, ঘরের বাইরে থেকে পাঙ্খাপুলার সেটাকে টেনে টেনে ঘরের পাখাকে সচল রাখত। প্রথম দিকে বিজলি আসেনি তো, সেই জন্য এইরকম ব্যবস্থা। আর এই যে বৈঠকখানার সিলিং দেখছ, এখন ল্যাপাপোঁছা, ওখানে কি চমৎকার একটা ঝাড়লন্ঠন দুলত – আমার ছেলেবেলাতেও ছিল, জানো’’-
বলতে বলতে ম্লান হয়ে আসে তার মুখ, স্বর রুদ্ধ হয়ে আসে গ্লানিতে –“তারপর আর রাখতে পারিনি’’।
লালমাটি, শিমুল পলাশ আর দলমার হাতির দেশের মেয়ে বিস্মিত পুলকে চেয়ে চেয়ে দেখে ধ্বংসের গায়ে ঠেকনা দিয়ে দাঁড়ানো এক অসহায় অভিজাতককে – “এমা, মন খারাপ করছ কেন? কে বলে রাখতে পারোনি? এত বছর ধরে অবচেতনে জমিয়ে রেখেছ তোমার অমূল্য ভালবাসা – এই পৈতৃক ভিটেটার জন্যে – সেটা বুঝি কিছু নয়?”
ওদিকে ভেজা দালানে থেবড়ে বসে অশান্তভাবে হাওয়ায় হাত ঘুরোচ্ছিল মঞ্জুরানী –
“না না না, ওই রক্ষেকালীর প্রতিমাকে আমি কিছুতেই ছেলের বউ করতে পারব না, সে আপনি যাই বলুন” –
“এঁঃ, উটকপালি উনুনমুখো মাগীর গুমোর দেখে মরি! ঐ রংটাই যা কেবল গোরা, আয়নায় নিজের মুখখানা দেকোচো কোনোদিন? ঐ মেয়েই এবাড়ির বউ হবে, এ আমি পষ্ট জানিয়ে দিলুম! এ কথার নড়চড় হলে কুরুক্ষেত্তর লেগে যাবে কিন্তু — হ্যাঁ” –
“কিন্তু, খ্রিস্টান মেয়ে যে! বিধর্মী! ছি ছি, বাড়িতে গোপাল আছেন, এখনও নিত্যপুজো হয়” – গলা ডুবে যায় মঞ্জুরানীর।
“চোপ বলচি, এক্কেবারে চোপ! বলি, মুখুজ্যে বাড়ির ব্যাটাছেলেদের মোচলমান রাঁড় রাকলে দোষ নেই, ইংরেজ কোম্পানির নায়েব হয়ে কেরেস্তান সায়েবের পোঁদ চাটতে দোষ নেই, আর আমাদের মানিক একটা ভালমানুষ মেয়েকে বিয়ে কল্লেই দোষের? কোন শাস্তরমতে রে আবাগীর বেটি?”
“আপনার আর কি? কুরুক্ষেত্তর বাঁধিয়ে ছবির ভেতর সেঁধিয়ে যাবেন, কেউ তো আর আপনাকে সাক্ষী মানতে আসবে না! আমার হবে যত্ত জ্বালা!” –
মঞ্জুর সখেদ উক্তি শুনে আত্মপ্রসাদের হাসি হাসেন সরোজবাসিনী, তারপর ফিসফিসিয়ে বলেন – “তোরই বা সোমসারে অত নাক গলানোর দরকার কি? গড়িমসি কত্তে শেক! নকল স্বামীর ঘর আর সোহাগ সিঁদুর নামে যে দুটো নতুন সিরিয়াল শুরু হচ্চে, হেবোটা ঘুমুলে পরে তোতে আমাতে দেকব। পেত্থম থেকে না দেকলি গুলোয়ে যায়, বোজা যায় নাকো, বুজলি উটকপালি?”
মাঘ মাসের এক শীতার্ত শান্ত সন্ধ্যায়, গগন মুখুজ্যের ভিটেয় সামান্য কিছু আত্মীয়বন্ধু এবং রেজিস্টার মশাইকে সাক্ষী রেখে বিনা ধুমধামেই আকাশমণি আর পলাশকান্তির চার হাত এক হয়ে গেল।
ফুলশয্যার দিন দুয়েক পরে, খুব ভোরবেলায় পায়ের তলায় সুড়সুড়ি দিয়ে পলাশকে জাগিয়ে দিল আকাশমণি।
“উমমম, এত তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙালে কেন? কি হয়েছে?” -পলাশের গলায় তখনও তন্দ্রার মাধুর্য জড়ানো।
“ওঠো না! চলো, একটা জিনিস দেখাব তোমাকে।
আমার মাথায় একটা দারুণ প্ল্যান এসেছে, জানো? আঃ, কি গড়িমসি করছ? ওঠো না” –
অগত্যা পলাশকে লেপের ওমবিলাস ছেড়ে উঠতে হয়। আকাশমণি তাকে প্রায় টানতে টানতে দোতলা থেকে নিচে নামায়। ভিতর বারান্দা আর ভাঁড়ার ঘর পেরিয়ে, পুরোনো গোয়ালঘরে পৌঁছে যায় দু’জনে।
“আচ্ছা, কখনও ভেবে দেখেছ, এই যে এতবড় ঘরটা অব্যবহৃত পড়ে আছে – এটা কত ভাবে ইউটিলাইজ করা যায়?” – আকাশমণির গলা উৎসাহে, উদ্দীপনায় যেন ফুটছে।
“ইউটিলাইজ? কি ভাবে? আমি তো কিছুই” – বাস্তবিকই পলাশের তখন একগাল মাছি।
“আরে, বুঝছ না, আমি যেখানে বাচ্চাগুলোকে পড়াই, ওই সোনাগাছি ছাড়াও কত রেড লাইট এরিয়া আছে আমাদের এই বাড়ির আশে পাশে – প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিট, হাড়কাটা গলি, বৌবাজার – এসব এলাকার মায়েরা কি অত দূরে বাচ্চাদের পড়তে পাঠাবে?”
পলাশ তা-ও চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে আছে দেখে ব্যাপারটা আর একটু খোলসা করে আকাশমণি।
“হোমের চাকরিটা তো ছেড়ে দিলাম। এখন দুর্গাচরণ মিত্তিরে তিনটে সন্ধেবেলা বাদ দিলে বাকি সময়টা তো ফাঁকাই থাকছি। সকালবেলায় যদি কাছের নিষিদ্ধ পল্লীর বাচ্চাগুলোকে পড়াই, ভালো হয় না, বলো?”
আগ্রহের আতিশয্যে পলাশের বুকের কাছে সরে আসে আকাশমণি, গভীর গলায় বলে – “প্রথম প্রথম বেশি ছেলেমেয়ে আসতে চাইবে না, তারপর একটি দুটি করে আসবে। গোড়ায় আমি একাই পড়াব’খন। তারপর, স্টুডেন্টের সংখ্যা বেড়ে গেলে পাড়ায় বেরোব কোমর বেঁধে – হায়ার সেকেন্ডারি, মাধ্যমিক পাশ মেয়ে বউ নিশ্চয় কম নেই এলাকায়। হাতে পায়ে ধরে তাদের রাজি করাবো, যদি দু’এক ঘন্টা করেও সময় দিতে পারে রোজ, তাহলেই অনেক।
আস্তে আস্তে ইস্কুল বড় হবে – এত বড় বাড়ি, জায়গার তো অভাব নেই। হ্যাঁ, একটু সারিয়ে সুরিয়ে নিতে হবে, বুঝলে? এই যেমন এই ঘরটা – গোয়ালঘর না কি বললে তুমি – ঐ কোণের দিকের মেঝে কেমন বসে গেছে, দেখেছ? ছেলেমেয়েরা হোঁচট খাবে তো! ওটাই প্রথমে সারিয়ে নিতে হবে।”
একটু দম নিয়ে ফের বলতে থাকে পলাশের নতুন বৌ –”এই ইস্কুল ঘিরে আমার অনেক স্বপ্ন, জানো? ফান্ডের জন্য যে দরজায় ঠকঠক করতে হয়, আমি করব, তুমি চিন্তা কোরো না। সে কৌটো নাড়া থেকে মন্ত্রী সান্ত্রী অবধি দৌড়নো, সব করব আমি” – আবেগে গলা দ্রব হয়ে আসে আকাশমণির, চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে। প্রায় রুদ্ধস্বরে সে বলে চলে –
“শুধু তুমি আমার পাশে থেকো, কেমন? তুমিই তো আমার আসল জোরের জায়গা – কি গো, থাকবে তো পাশে?”
গোয়ালের পুবদিকের গরাদ বিহীন জানলা দিয়ে কুয়াশা ছেঁড়া রোদ এসে পড়ে এবড়োখেবড়ো, কোণা উঁচু পাথরের মেঝের উপর। চিলের ছাদে বকবকম শুরু করে গোলা পায়রার দল। রাস্তায় কর্কশ আওয়াজ ওঠে ময়লা ফেলার ঠেলাগাড়ির, পাশের জেলেপাড়ার গলির বাতাস ভারি হয় উনুনের ধোঁয়ায়।
রায়বাহাদুর গগন মুখুজ্যের নিম্নতন ষষ্ঠ পুরুষ পলাশকান্তি স্ত্রীর মুখখানা নিজের দুই হাতের অঞ্জলিতে তুলে ধরে, নিবিড় দৃষ্টিতে চায় তার চোখের মধ্যে – বুভুক্ষুর মতো, প্রেমিকের মতো, পূজারীর মতো।
ডাকাবুকো আকাশমণিও লজ্জা পায়।
“কি দেখছ অমন করে?”
মৃদু হাসে পলাশ। অস্ফুটে বলে ওঠে – “আমার মোহরকে।”
তেতলার ঘরের ছবির ফ্রেম একটু নড়ে ওঠে।
“আহা মরি, মরি! বৈকুণ্ঠ থেকে সাক্ষাৎ লক্ষ্মীনারায়ণ যেন জোড়ে নেমে এয়েচেন! তবে কলিকাল কিনা, রংটা একটু পাল্টাপাল্টি হয়ে গেছে। রাধে গোবিন্দ!”
সমাপ্ত










