সরকারের বিরুদ্ধে আলোচনা, কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্ক ও দেশের অন্য রাজ্য নিয়ে সমালোচনা বন্ধ করতে ক্ষমতায় বসেই নতুন সরকার জারি করলেন নিষেধাজ্ঞা। সরকারি অফিসার, কর্মী , সরকারি স্কুলের শিক্ষক অধ্যাপক এবং সরকারের অধীনস্থ বা সাহায্যপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কেউ আর সরকার সমালোচনা করে সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বা পত্র পত্রিকায় কিছুই লিখতে পারবেন না। ফলে গণতান্ত্রিক অধিকার, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার পাশাপাশি মুক্ত চিন্তা ও বিকল্প ভাবনার ক্ষেত্রে বাংলার জ্ঞান, চেতনা ও বোধের বিকাশে শিক্ষক ও চিকিৎসক সমাজ এবং সরকারি কর্মী – আমলারা এতদিন যেভাবে বাঙালিকে সমৃদ্ধ আলোচনায় পথ দেখাতেন, এবার থেকে সেটা রুদ্ধ হল।
সরকারের এই নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় পাচ্ছেন কি সরকার সাহায্যপুষ্ট স্কুলগুলির শিক্ষক শিক্ষিকারা? তাঁরা এই নির্দেশের বাইরে বলে একটা দাবি উঠেছিল। ১৯ মে প্রকাশিত সার্কুলারটি পরদিন পরিবর্তিত রূপে প্রকাশিত হওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল যে সরকারই হয়ত ছাড় দিয়েছে, কিন্তু পরে নবান্নের সরকারি অফিসারদের একাংশের বক্তব্য, পরিবর্তিত নির্দেশিকায় ‘parastatal’ শব্দটি জুড়ে দেওয়ার ফলে সব ধরনের সরকার সাহায্যপুষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কলেজ, বিদেবিদ্যালয়ের শিক্ষক ও চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মীর উপর এই নির্দেশ কার্যকর হতে আর বাধা রইল না। অর্থাৎ বেসরকারি আর অস্থায়ী শিক্ষক কর্মীরাই কেবল মাত্র বাদ। এছাড়া আর কোনো ধরনের সরকারি, আধা সরকারি বা সরকারের সাহায্যপ্রাপ্ত (গ্রান্ট ইন এইড) স্কুলের শিক্ষক, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সহ সরকারি কর্মী এবং সরকারি চিকিৎসকরা ও স্বাস্থ্য কর্মীরা কোনো সরকারের কোনো কাজ নিয়ে কোনো রকম বিরূপ আলোচনা, মন্তব্য, সমালোচনা কোনো সামাজিক মাধ্যমে করতে পারবেন না। পত্রপত্রিকায় লেখা লেখি তো একেবারেই নয়।
অনেকে বলতে পারেন, সরকারি কর্মী শিক্ষক-অশিক্ষক – অধ্যাপক সকলের জন্য এমন নিষেধাজ্ঞা আগেও ছিল। কথাটা আংশিক সত্য। সরকার সমালোচনা করে লেখালেখির ক্ষেত্রে বিধান রায়ের আমলে ১৯৫৯ সালে প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়। জ্যোতিবাবুর আমলে সেটাকে শিথিল করা হয়। ১৯৮০ সালের নির্দেশে তার প্রকোপ কমানো হয়েছিল। কিন্তু এবার যা হল সেটা আগে কখনও হয় নি।
১৯৫৯ সালের নির্দেশিকা এবং ১৯৮০ সালের নির্দেশিকার মধ্যে মৌলিক ফারাক ছিল। আইনি পরিধি এবং অধিকারের ব্যাপ্তি নিয়ে পূর্বতন কংগ্রেস সরকারের করা বিধি লাঘব করেছিলেন জ্যোতিবাবু ক্ষমতায় এসে। আর শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতায় আসার এক সপ্তাহের মধ্যেই এমন নির্দেশ জারি করলেন যে এরপর কোনোভাবেই কোনো সরকারের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কোনো স্থায়ী কর্মী আর সরকার বিরোধী কোনো আলোচনা সামাজিক মাধ্যমেও করতে পারবেন না। আগের নির্দেশগুলির মূল নির্যাসকে আরো বাড়িয়ে এবং তীক্ষ্ণ করে এক কথায় সমস্ত ধরণের সরকার বিরোধী আলোচনা ও মুক্তচিন্তার বিকাশ রুদ্ধ করে দেওয়া হল—সরকারের সমালোচনা করে লেখালেখি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হল যেভাবে সেটা এই রাজ্যে অভূতপূর্ব। যাঁরা বলছেন, আগেও কোনো রাজ্য সরকার তার কর্মীদের সমালোচনার অধিকার দেয়নি, একথার সঙ্গে এই সরকারের নির্দেশে ফারাক অনেকখানি।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যসচিবের দপ্তর থেকে জারি করা কড়া নির্দেশিকাটি (সার্কুলার নং: ১৩৯-সিএস/২০২৬) ১৯৫৯ সালের প্রাচীন আচরণ বিধি এবং ১৯৮০ সালের কর্তব্য ও অধিকার বিধির আলোকে পাশাপাশি রেখে বিচার করলে ফারাক স্পষ্ট হয়।
১. ১৯৫৯ সালের নির্দেশিকা (The West Bengal Government Servants’ Conduct Rules, 1959) এটি ছিল মূলত ব্রিটিশ আমলের অনুকরণে তৈরি অত্যন্ত কঠোর একটি ‘আচরণ বিধি’ (Conduct Rules)।
লেখালেখি ও সংবাদমাধ্যম: সরকারের আগাম অনুমতি ছাড়া কোনো সংবাদপত্রে নিবন্ধ লেখা, চিঠি পাঠানো, বই প্রকাশ বা রেডিও সম্প্রচারে অংশ নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের যেকোনো নীতি বা সিদ্ধান্তের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বৈরী সমালোচনা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল।
২. ১৯৮০ সালের নির্দেশিকা (The West Bengal Services Duties, Rights and Obligations of Government Employees Rules, 1980) এনে বাম সরকার পূর্বতন সরকারের কঠোর বিধি লাঘব করে কর্মী ও শিক্ষকদের মুক্ত চিন্তা ও সরকারের সমালোচনা করার অধিকার ফিরিয়ে দেয় : পূর্বের ১৯৫৯ সালের নিয়মটিকে রদ (Repeal) করে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার কর্মচারীদের কিছু গণতান্ত্রিক অধিকার দিতে এই নতুন নিয়ম আনে।
নতুন এই নিয়মে মূলত অধিকারের অন্তর্ভুক্তি ঘটে। কর্মচারীদের ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’ (Democratic Rights) এবং সংগঠন বা ইউনিয়ন করার অধিকার দেওয়া হয়।
তবে এর সীমাবদ্ধতা ছিল। সমালোচনা করার অধিকার দেওয়া হলেও, সেখানে স্পষ্ট বলা হয় যে দেশের প্রচলিত আইন বা নিয়মের বাইরে যাওয়া যাবে না। সরকারি কর্মচারী হিসেবে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। ফলে, দায়িত্বশীল পদে থেকে সরকারের নীতি বা সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা করার পথ পুরোপুরি খোলা রাখা হয়নি।
বিজেপির রাজ্য সরকার যে নতুন সার্কুলার জারি করেছে, তাতে কংগ্রেস আমলের ১৯৫৯ সালের আচরণ বিধি সামনে রেখে এবং কিছুটা বাম আমলের ১৯৮০ সালের বিধি—উভয়কেই হাতিয়ার করে এক নতুন এমন নির্দেশ জারি করল যে এরপর সরকারি কর্মী ও শিক্ষক চিকিৎসকরা সরকারের চাকরি করে আর পত্র পত্রিকা শুধু নয়, নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়া আকাউন্টেও সরকারের সমালোচনা করে কিছু লিখতে পারবেন না। ফলে ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইউটিউব, ব্লগ এবং যেকোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা বা পোস্ট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
সংবাদমাধ্যম ও লেখালেখির উপর ‘সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা’ (Complete Prohibition) জারি করা হয়েছে।
বর্তমান ফারাক ও কড়াকড়িগুলি নিচে দেওয়া হলো:
১. ১৯৫৯ ও ১৯৮০ সালের মূল রূপ আজকের দিনে বাস্তব প্রয়োগ ও কড়াকড়ি (২০২৬ সার্কুলার)এ
শুধু সংবাদপত্র, বই ও রেডিওর উল্লেখ ছিল। এখন ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইউটিউব, ব্লগ এবং যেকোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা বা পোস্ট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
২. লেখালেখি ও নিবন্ধ প্রকাশ সরকারের অনুমতি নিয়ে লেখা যেত। বর্তমানে আগাম লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো সংবাদপত্র বা সাময়িকীতে নিবন্ধ লেখা বা চিঠি পাঠানো সম্পূর্ণরূপে বন্ধ।
৩. নিষেধের আওতা বা পরিধি শুধু সরাসরি সরকারি কর্মচারীদের (WBCS, WBPS বা ক্লার্ক) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। এখন এই নিয়ম সাধারণ সরকারি কর্মচারী ছাড়াও সরকার-পোষিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল-কলেজ), স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, বোর্ড এবং কর্পোরেশনের কর্মচারীদের ওপরেও সমভাবে বলবৎ করা হয়েছে।
৪. আন্তঃরাজ্য সম্পর্ক ক্ষুণ্ন করা সরকারের সমালোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এবার যুক্ত হল কেন্দ্রীয় রাজ্য সম্পর্ক নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা। এমন কোনো লেখালেখি বা মন্তব্য করা যাবে না যা কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক বা অন্য কোনো রাজ্যের সাথে পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্ক নষ্ট করে।
সংক্ষেপে: ১৯৮০ সালের আইনটি সরকারি কর্মচারীদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও ইউনিয়ন করার মতো কিছু অধিকার থেকে লেখালেখি ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দিলেও, এটা বলার দরকার, সরকারের নীতি বা সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা করার অধিকার কোনো সরকার কাউকেই দেয়নি। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, ১৯৫৯ ও ১৯৮০ সালের এই বিধিনিষেধগুলিকেই আরও আধুনিক রূপ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে কার্যকর করা হচ্ছে।
অনেকে বলছেন, শিক্ষক অধ্যাপকরা সরকারের সমালোচনা করে লিখতে পারবেন। না। ঠিক বলা হচ্ছে না। মডিফাইড সার্কুলারে parastatal শব্দটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ।এই শব্দটি ব্যাপ্তি প্রচুর এবং খুব অস্পষ্ট। আইনি ভাষায় যা এর মানে তার মধ্যে পড়ে স্কুল, কলেজ সহ সব ধরনের সমস্ত প্রতিষ্ঠান যেখানে সরকারের অর্থে বেতন বা প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো খরচ চলে। আইনের হিসেবে: “Public universities, state-funded colleges, and government schools can be classified as parastatal bodies, while private educational institutions are not.
A parastatal body is defined as an organization or institution that is wholly or partially owned, funded, and managed by the government but operates with some degree of autonomy. Whether an educational institution falls under this category depends entirely on its ownership and funding structure.”
অর্থাৎ শুধু শিক্ষক অধ্যাপক নন, কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠান যা সরকারের নিয়ম বা অর্থে পরিচালিত তার সঙ্গে যুক্ত কোনো স্থায়ী কর্মী আর সরকারের কাজকর্ম কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্ক বা অন্য কোন রাজ্য নিয়ে ও সরকারকে সমালোচনা করে লিখতে পারবেন না।
তবে এই সরকারি নিষেধাজ্ঞা যেহেতু সংবিধানের ১৯/১ এ উল্লেখিত বাক স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করছে,তাই এই নিয়ে মামলা হতে পারে। কর্মী শিক্ষক ও চিকিৎসক সংগঠনগুলি আদালতে যাওয়ার কথা চিন্তা ভাবনা করছেন। উচ্চতর আদালতের নির্দেশেই চূড়ান্ত হতে পারে সরকারি কর্মী, শিক্ষক, চিকিৎসক সমাজ কতটা স্বাধীনতা পেতে পারেন।










