(এক)
‘বাঙালি’ মানে কখনোই শুধু ইসলামিরা নন। শুধু হিন্দুরাও নন। অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসীরাও নন। ধর্মীয় বিচারে ‘বাঙালি’ যা-কিছুই হতে পারে। কিন্তু ভাষিক বা সাংস্কৃতিক বিচারে যাঁরাই বাঙালি পরম্পরার ধারক-বাহক, তাঁরাই বাঙালি।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শয়তানরাই বাঙালি জাতির মধ্যে ইসলামি-হিন্দুতে গভীর ও স্থায়ী ভাগাভাগির পরিকল্পনা ফাঁদে। কারণ সারা ভারতবর্ষ জুড়ে ব্রিটিশ-বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের যে জোয়ার শাসকদের কাঁপিয়ে দিয়েছিলো, তার প্রধান শক্তিই ছিলো বাঙালিরা। অনেকবার আমি একথা লিখেছি – আন্দামান সেলুলার জেলে যতশত বিপ্লবী বন্দী ছিলেন, ফাঁসিতে বা অত্যাচারে নিহত হয়েছিলেন, কেউ বা পাগল হয়ে গিয়েছিলেন, তার মধ্যে প্রায় ৭০ভাগ ছিলেন বাঙালি; বাকি প্রায় ৩০ভাগ পাঞ্জাবি। তাই হিন্দু-ইসলামি বৈরিতা বাড়িয়ে তুলে, বাঙালি ও পাঞ্জাবি জাতির সর্বনাশ ঘটাবার জন্য ধুরন্ধর চেষ্টা চালিয়েছিলো ইংরেজ শয়তানের দল। এমনকি, বাঙালি জাতির ক্ষতি করার জন্য ভারতবর্ষে তাদের রাজধানীও কলকাতা থেকে সরিয়ে দিল্লীর মতো তখনকার এক অনুন্নত জায়গায় নিয়ে যায়।
শতসহস্র বছরে বাঙালি জাতির হিন্দু-ইসলামিতে বন্ধুত্ব-ঝগড়া-মারামারি হয়েছে। কিন্তু পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় ছিলো। ঈদে হিন্দুদের যোগদান আর দুর্গাপূজায় ইসলামিদের অংশগ্রহণ ছিলো বাঙালি সংস্কৃতির স্বাভাবিক চেহারা। গত ৭৯ বছরে, উগ্র-ইসলামি আর উগ্র-হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির দাপটে সবকিছুই তছনছ হয়ে গেছে! হিন্দু মহাসভা, কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চবর্গের আর উচ্চবর্ণের নেতারা হিন্দু-ইসলামির মধ্যে পাকাপাকি শত্রুতার বীজ পুঁতেছিলেন ১৯৪৭ সালের ২০ জুন। বাংলা-ভাগের সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিয়েছিলেন সকলে মিলে। তারপর থেকে হিন্দু-ইসলামিতে পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস আর বৈরিতা ক্রমশই বেড়ে উঠেছে। আগে ‘ইসলামি’ পরে বাঙালি অথবা আগে ‘হিন্দু’ পরে বাঙালি, এই আত্মঘাতি বোধ ক্রমশই আশঙ্কাজনকভাবে জোরদার হয়ে উঠছে!
(দুই)
বাঙালি জাতি প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত।
১) অর্থনৈতিক দিক থেকে: বড়লোক-গরিব, মালিক-শ্রমিক, ভূস্বামী-ভূমিহীন। তুলনামূলক বিচারে বড়লোক, মালিক আর ভূস্বামীদের সংখ্যা খুবই কম। গরিব, শ্রমিক আর ভূমিহীন শ্রমজীবীদের সংখ্যা কোটিকোটি; এঁরাই বাঙালি জাতির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ।
২) ধর্মীয় দিক থেকে: ইসলামি হিন্দু খ্রিস্টান বৌদ্ধ জৈন শিখ ইত্যাদি। সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ইত্যাদি নানা টানাপড়েনের কারণে বহু বাঙালিকে তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় গোপন করতেও দেখা যায়। শতশত বছর যাবৎ, বাঙালি সমাজে ইসলাম-বিশ্বাসী গোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ, হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ শতাংশ। অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
বাঙালি জাতির সবরকম দুরবস্থার মূল কারণ, কোটিকোটি মেহনতী বাঙালির সুখ-দুঃখ আশা-আকাঙ্খা কোনও ‘শাসক’ কখনোই বুঝলো না! নিম্নবর্গীয় মেহনতী মানুষরাও ক্ষমতায় বসতে পারলো না। অবিভক্ত বাংলার মানব সম্পদ (২৮ কোটি), প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য, বাঙালির অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংস্কৃতিক সম্ভার, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মেধা, এসবের সুদূরপ্রসারী ও অসীম তাৎপর্য কোনোদিন বুঝলোই না রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ! ধনপতিদের স্তাবকতাই তাঁদের পছন্দ। প্রথমে ‘পূর্ববঙ্গ’ পরে ‘বাংলাদেশ’ আর ‘পশ্চিমবঙ্গ’, দুদিকের একই ইতিহাস। ইসলামি-হিন্দু নির্বিশেষে, উচ্চবর্গীয় মানুষরাই পুরো সমাজের উপর মাতব্বরি করে চলেছে। চাষের জমিতে জল-কাদা-লাঙল-কাস্তে অথবা কারখানায় তেল-কালি-হাতুড়ি-রেঞ্জ, কোনোকিছুতে হাত না-লাগিয়েই তাঁদের জীবন দিব্যি চলে যায়। যাঁরা ‘বাবু’ হয়ে শ্রমজীবীদের উপর মোড়লি করতেই অভ্যস্ত। ‘বাঙালি’ বলতে যেনো শুধু এইসব উচ্চবর্গের ও উচ্চবর্ণের মানুষজনকেই বোঝায়! সমাজের ৯০% যে শ্রমজীবী মানুষ, সরকার পরিচালনায় কোনোদিনই তাঁদের কোনও ভূমিকা থাকেনা।
(তিন)
বাঙালি জাতির যে অকল্পনীয় সামাজিক-মূলধন আছে, তা পৃথিবীর যেকোনও জাতির কাছেই ঈর্ষনীয় হতে পারে। যা গড়ে উঠেছে সহস্রাধিক বছর ধরে। বারবার আধিপত্যবাদীরা একে তছনছ করে দেবার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু পারেনি। সে চেষ্টা আজও চলছে। ১৯৪৭ সালের পর থেকে এই আধিপত্যবাদী চেষ্টা আরও গভীর হয়েছে।
বাঙালির ভাষা বাংলা। পশ্চিমবাংলায় তা প্রবলভাবে ‘হিন্দী’-র দাপটে আক্রান্ত। অনেকদিন ধরেই। বাঙালির সংস্কৃতিও গো-বলয়ের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে বিপর্যস্ত। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ – এই প্রবাদটি গড়ে উঠেছে সহস্রাধিক বছরে নদনদী খালবিল দীঘিপুকুরে ভরা বাংলায় মাছের, আর উর্বর জমিতে উৎপন্ন ধানের প্রাচুর্যের কারণেই। গরু-গোবর-গোমূত্রের দর্শন আর নিরামিষাশী খাওয়াদাওয়া নিয়ে জীবন কাটানো অবাঙালি আধিপত্যবাদীদের কাছে ‘বাঙালি’ তাই অসহ্য! বাঙালি কখনোই তাদের কাছে ‘মাছ খেতে হবে’ এই আব্দার করেনি। কিন্তু সকলেই মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ করুক – এই হাস্যকর অসহ্য আগ্রাসী চেষ্টা ভারতের নানা অঞ্চলে শুরু করেছে ‘শাসক’ দল। নানা কৌশলে। বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও।
১৯৪৭ থেকে ‘পশ্চিমবঙ্গে’ আর ১৯৭১ থেকে ‘পূর্ববঙ্গে’ / ‘বাংলাদেশে’, বাঙালির শাসন চলছে। কিন্তু আক্ষেপের কথা, সমগ্র বাঙালি জাতির বিকাশে ‘এপার বাংলা’ কিংবা ‘ওপার বাংলা’, কোনও বাংলার শাসকই যথাযথভাবে যত্নশীল হলেন না! দূর্ভাগ্যজনক, পূর্ববাংলা ধীরে ধীরে হয়ে উঠলো ‘ইসলামি বাংলা’ আর পশ্চিমবাংলা হয়ে উঠলো ‘হিন্দু বাংলা’! একের মনে অপরের সম্পর্কে বেড়ে উঠলো সন্দেহ, অবিশ্বাস, ঘৃণা। বাঙালি ঐক্যর বদলে জায়গা করে নিলো ‘ইসলামি ঐক্য’ আর ‘হিন্দু ঐক্য’! উগ্র ইসলামি সাম্প্রদায়িকতাবাদী আর উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদী শক্তিগুলো মহাখুশি! সমগ্র ‘বাঙালি জাতির ঐক্য’ ক্রমশই দুর্বল হয়ে চলেছে।
(চার)
গত ৭৯ বছরের ইতিহাস তর্কাতীতভাবে একথা প্রমাণ করেছে, বৃটিশ শয়তানদের এঁকে দেওয়া ‘সীমান্ত’-র দুদিকেই বাংলার শাসকরা শুধু নানা ‘দল’-এর প্রতিনিধি ছিলেন। পুরো ‘বাঙালি’ জাতির প্রতিনিধি তাঁরা কখনোই না। একথা আগেই বলেছি, বাঙালি সমাজের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষই শ্রমজীবী। কৃষক শ্রমিক মজুর।
‘সংসদীয় রাজনীতি’-র পোষাকি কায়দায়, ‘নির্বাচিত’ সব শাসকদেরই নাকি মেহনতী মানুষ ভোটে নির্বাচিত করেন। কিন্তু কৃষকরা বহুবার তাঁদের ন্যায্য দাবি জানালেও, কোনও সরকারেরই তানিয়ে মাথাব্যথা থাকে না। কিন্তু যেই তাঁরা ন্যায্য ও মানবিক দাবি আদায়ের তাগিদে শেষপর্যন্ত আন্দোলন-সংগ্রামের রাস্তায় হাঁটেন, ওমনি তাঁদের উপর লাঠি-গ্রেপ্তার-গুলি সবই চলে। শ্রমিকদেরও একই হাল। পশ্চিমবাংলায় প্রফুল্ল ঘোষ, বিধানচন্দ্র রায়, প্রফুল্লচন্দ্র সেন, অজয় মুখার্জী, সিদ্ধার্থশংকর রায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় – সকলেই ছিলেন ‘বাঙালি’ মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু উচ্চবর্গ আর উচ্চবর্ণ থেকে আসা এঁরা সকলেই কমবেশি একই পাপ করেছেন: অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী-প্রতিরোধী বাঙালিকে কেউই রেয়াত করেন নি।
অকল্পনীয় অসভ্যতার নজিরও তৈরি করেছেন ‘নির্বাচিত’ বাঙালি শাসকরা! ভাতের ব্যবস্থা করতে না-পারলেও, লক্ষলক্ষ হকারের আয়ের একমাত্র ব্যবস্থা বারবার ভেঙেচুরে তছনছ করে দিয়েছে ‘নির্বাচিত’ বাঙালি শাসকের দল; একেরপর এক হকার আত্মহত্যা করতেও বাধ্য হয়েছেন। লক্ষলক্ষ বাঙালি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অকল্পনীয় জালিয়াতি করে তাঁদের জীবনকে শেষ করেও দিয়েছেন ‘বাঙালি’ শাসক!
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১০৫ বছর আগে থেকে লোকসাধারণকে আত্মশক্তির, আত্মনির্ভরতার ও সমবায় আন্দোলনের শিক্ষা দিয়েছিলেন; বাস্তবে সেই কর্মপ্রচেষ্টাও শুরু করেছিলেন ‘শ্রীনিকেতনে’। পৃথিবীর নানা দেশেই এখন সেই শিক্ষার কদর বাড়ছে। কিন্তু সব বাঙালি ‘শাসক’ রবীন্দ্রনাথের আদর্শকে চিরদিন উপেক্ষা করেই চললেন! তাঁরা শুধুই বহুজাতিক সংস্থা, বড়ো বড়ো পুঁজিপতি আর বড়ো ভূস্বামীদের স্বার্থ রক্ষা করেছেন। কারণ কোনও ‘সরকার’ বাস্তবিকপক্ষে সমাজের নিম্নবর্গের কোটিকোটি মেহনতী জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধি কখনোই হননি। তাই প্রতিটি সরকারের আমলে নিম্নবর্গীয় মেহনতী মানুষ বারবার দমনপীড়নের আর উপেক্ষা ও অবহেলার শিকার হয়েছেন। কিন্তু উচ্চবর্গীয় শোষক-অত্যাচারীদের কখনও কোনও সরকার টিঁকিটিও ছোঁয় নি। এব্যাপারে পূব-পশ্চিম একই ইতিহাস।
‘সীমান্ত’-র দুদিকেই কোটিকোটি শ্রমজীবী বাঙালি সব বিষয়ে চিরকালই অসহায়; তাঁরা শাসকের সবরকম জনবিরোধী কাজকর্মের ভুক্তভোগী মাত্র। কদিন আগে পুরানো শাসক ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ গিয়ে নতুন শাসক ‘ভাজপা’ এলো পশ্চিমবাংলায়, ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’-র নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনে জিতে। এঁরা এসেই একেরপর এক জায়গায় শুরু করেছে ‘অবৈধ নির্মান’ ভাঙা। বিকল্প কোনও ব্যবস্থা না করে, শতশত মানুষের একমাত্র রোজগারের জায়গাগুলো – বুলডোজার দিয়ে রাতারাতি অমানবিকভাবে গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন। অভিজ্ঞতা বলছে, ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’-র পথে কোটিকোটি বাঙালির কপালে যুগযুগ ধরে শুধু শোষিত, বঞ্চিত ও অত্যাচারিত হওয়াই লেখা আছে!
(পাঁচ)
আজ থেকে ১১২ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক মহাসত্য বলেছিলেন, “আমাদের ভদ্রসমাজ আরামে আছে, কেননা আমাদের লোকসাধারণ নিজেকে বোঝে নাই। এইজন্যই জমিদার তাহাদিগকে মারিতেছে, মহাজন তাহাদিগকে ধরিতেছে, মনিব তাহাদিগকে গালি দিতেছে, পুলিশ তাহাদিগকে শুষিতেছে, গুরু ঠাকুর তাহাদের মাথায় হাত বুলাইতেছে, মোক্তার তাহাদের গাঁট কাটিতেছে, আর তাহারা কেবল সেই অদৃষ্টের নামে নালিশ করিতেছে যাহার নামে সমন-জারি করিবার জো নাই। আমরা বড়োজোর ধর্মের দোহাই দিয়া জমিদারকে বলি তোমার কর্তব্য করো, মহাজনকে বলি তোমার সুদ কমাও, পুলিসকে বলি তুমি অন্যায় করিয়ো না – এমন করিয়া নিতান্ত দুর্বলভাবে কতদিন কতদিক ঠেকাইব। চালুনিতে করিয়া জল আনাইব আর বাহককে বলিব যতটা পারো তোমার হাত দিয়া ছিদ্র সামলাও – সে হয় না; তাহাতে কোনো এক সময়ে এক মুহূর্তের কাজ চলে কিন্তু চিরকালের এ ব্যবস্থা নয়। সমাজে দয়ার চেয়ে দায়ের জোর বেশি।” (প্রবন্ধ ‘লোকহিত’)
ইতিমধ্যে বাংলা তথা ভারতবর্ষ ‘স্বাধীন’ হয়েছে। ‘আজাদিকা অমৃত্ মহোৎসব’ পালিত হচ্ছে; ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ নীতি লাগু হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার খবর অনুযায়ী, ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’-র পথে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোট প্রায় ১.৩৫ লক্ষকোটি টাকা খরচ হয়েছে; কয়েকদিন আগে, পশ্চিমবাংলার বিধানসভা নির্বাচনে মোট সরকারি ও প্রশাসনিক খরচ প্রায় ২০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কিন্তু আজও ‘দারিদ্র্য সীমা’-র নীচে বাস করেন পশ্চিমবাংলার প্রায় এক কোটি মানুষ! ১১২ বছর আগে লেখা রবীন্দ্রনাথের কথাগুলো আজও সমান সত্য।
একই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “যদি নিজেদের হৃদয়ের দিকে তাকাই তবে একথা স্বীকার করিতেই হইবে যে, ভারতবর্ষকে আমরা ভদ্রলোকের ভারতবর্ষ বলিয়াই জানি। বাংলাদেশে নিম্নশ্রেণীর মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা যে বাড়িয়াই গিয়াছে তাহার একমাত্র কারণ হিন্দু ভদ্রসমাজ এই শ্রেণীয়দিগকে হৃদয়ের সহিত আপন বলিয়া টানিয়া রাখে নাই।”
এখানেই রয়েছে বাঙালি জাতির মুক্তিমন্ত্রের প্রথম ধাপ। ধর্ম-বর্ণ-জাত-ভাষা নির্বিশেষে বাঙালি জাতির ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার দিশা। বাঙালির মধ্যে ধর্মের নামে ভাগাভাগি করা মানে বাঙালির ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে দুর্বল করা। শোষক ও অত্যাচারি শক্তির দালালি করা। বাঙালি জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা।
ঠিক ১০০ বছর আগে (১৩৩৩), বাঙালির শেষ আশ্রয় রবীন্দ্রনাথের আরেকটি লেখার কথা এখানে উল্লেখ না করে উপায় নেই। “যাঁদের আমরা ভদ্রলোক বলে থাকি তাঁরা স্থির করেছিলেন যে, রাজপুরুষে ও ভদ্রলোকে মিলে ভারতের রাজগদি ভাগাভাগি করে নেওয়াই পলিটিক্স। সেই পলিটিক্সে যুদ্ধবিগ্রহ সন্ধি শান্তি উভয় ব্যাপারই বক্তৃতামঞ্চে ও খবরের কাগজে, … তখন দেশের যারা মাটির মানুষ তারা সনাতন নিয়মে জন্মাচ্ছে মরছে, চাষ করছে, কাপড় বুনছে, নিজের রক্তে মাংসে সর্বপ্রকার শ্বাপদ মানুষের আহার জোগাচ্ছে, যে দেবতা তাদের ছোঁয়া লাগলে অশুচি হন মন্দির-প্রঙ্গনের বাইরে সেই দেবতাকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করছে, মাতৃভাষায় কাঁদছে হাসছে, আর মাথার উপর অপমানের মুষলধারা নিয়ে কপালে করাঘাত করে বলছে ‘অদৃষ্ট’। দেশের সেই পোলিটিশান্ আর দেশের সেই সর্বসাধারণ, উভয়ের মধ্যে অসীম দূরত্ব।” (প্রবন্ধ ‘রায়তের কথা’)
আমরা রবীন্দ্রনাথ-বর্ণিত এই সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মৌলিক কোনও পরিবর্তন আজও দেখতে পাচ্ছি কী! পরাধীন ও ‘স্বাধীন’ অবস্থার মধ্যে কোনও গুণগত তফাত দেখা যাচ্ছে? ঔপনিবেশিক আর ‘সংসদীয় গণতান্ত্রিক’ ব্যবস্থায়, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘দেশের যারা মাটির মানুষ’, তাঁদের বাস্তব অবস্থার মধ্যে ফারাক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে কী?
শতকরা ৯০ ভাগ মানুষকেই ভাবতে হবে, এই দুর্বিসহ জীবনের শেষ কীভাবে হবে। বাঙালিকে শেষ করে দেবার লক্ষ্যে, দেড়শো বছর যাবৎ নানা কু-যুক্তিতে ‘বাংলা’-কে বারবার ভাঙা চলছে। এখনও সেই অপচেষ্টা শেষ হয়ে যায় নি! বাঙালি তার নিজস্ব দর্শন, ভাষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান চেতনা, অর্থনীতি, মূল্যবোধ, ইত্যাদি নিয়ে ইজ্জতের সঙ্গে বাঁচতে চাইলে, তাঁদের নিজেদেরই সেব্যাপারে হিম্মতের সঙ্গে তৎপর হতে হবে। ধনপতিদের সেবাদাস উচ্চবর্গীয় ও উচ্চবর্ণীয় রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের উপর ভরসা করে তিলমাত্র লাভ নেই। তাঁরা শুধু নানা নামে নানারকম ‘ডোল’ দিয়েই বাঙালিকে খুশি রাখতে চায়। আর চায় নিজেদের রাজনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি। যুগযুগ ধরে ‘নির্বাচন’ হয়, নানা দলের সরকারও ক্ষমতায় আসে। কিন্তু শ্রমজীবীদের হাল চিরকাল শোষিত ও অবহেলিতই থেকে যায়; তবে ধনপতিরা সবসময়েই ফুলেফেঁপে ওঠে।
রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে ধনপতিদের হাতে তুলে দেবার কাজ আমরা আগেই দেখেছি পশ্চিমবাংলায়, ‘বামফ্রন্ট’ আমলে। বিদ্যুৎ শিল্পকে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী গোয়েঙ্কাদের হাতে আর ‘গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল’-কে পাঞ্জাবি ব্যবসায়ী ললিত সুরির হাতে তুলে দিতে। শ্রমিকদের পক্ষে সর্বনাশা ‘এসইজেড’ তৈরির প্রথম চেষ্টাও হয়েছে ‘বাম’-আমলে, ‘বাঙালি’ শাসিত ফলতায়। এখন রাজনৈতিক নেতারা শুরু করেছেন নতুন খেলা: আধুনিক বড়ো শিল্পে ‘কর্মসংস্থান’-এর মিথ্যা স্বপ্ন দেখানো। যতো ‘আধুনিক’ শিল্প, ততো ‘প্রযুক্তি’-নির্ভর; ততো কম লোক লাগে। কিন্তু কর্মহীন ও অসহায় যুব সম্প্রদায়ের সামনে এই মূল সত্যটাকে চাপা দিয়ে, তাঁদের সামনে মিথ্যা স্বপ্ন হাজির করাই ধনপতিদের নয়া-কৌশল। ‘নির্বাচিত’ শাসকরাও তাদের সঙ্গে গলা মেলায়। এখন চলছে গুজরাটি ব্যবসায়ী আদানিকে ডেকে এনে ‘সুনার’ পশ্চিমবাংলা তৈরির কথাবার্তা। কিন্তু ৫০ বছর আগে যে কারখানায় ৩০০ শ্রমিক লাগতো, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর শিল্পে সেখানে শ্রমিক লাগবে মাত্র ৩ জন: ১০০ ভাগের এক ভাগ। এই সত্যি কথাটা ধনপতিরা আর তাদের স্তাবক ‘শাসক’-রা কখনোই বলে না।
ধর্ম-জাত-বর্ণ-ভাষা (বাঙাল-ঘটি) ভিত্তিক ভাগাভাগির সর্বনাশা চক্রান্তকে পরাস্ত করে, নিম্নবর্গীয় ‘শ্রমজীবী বাঙালি’-র ঐক্য স্থাপনের দিশাকে কাজে পরিণত করতে হবে। ধনপতিদের দাসত্ব করার ভাবনা বিদায় দিয়ে, রবীন্দ্রনাথের দেখানো নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতার পথেই এগোতে হবে। সেটাই বাঙালি জাতির কাছে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার একমাত্র পথ।।











