আমি তখন বেশ ছোট। সদ্য সদ্য দেখা বোঝা শুরু হয়েছে এ পৃথিবীকে। আমার সেই সুদূর গ্রামের বাড়িতে থাকি।উত্তর চব্বিশপরগনার গোপালপুর। একদিন বোধহয় আট নয় বছর বয়স। বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। আমাদের বাড়ির ঠিক পাশ দিয়ে চলে গেছে গ্রামের প্রধান রাস্তা। তখন অবশ্যই কাঁচা রাস্তা। একটু বড় আমার এক জাঠতুত দাদা আমাদের মত সাইজের বাচ্চাগুলোকে চেঁচিয়ে বলে উঠল, “ওই আসছে রে সবাই সরে যা”। বলে ছুটে একটা গাছের গুঁড়ির আড়ালে চলে গেল। আমরা আরো নিরাপদ স্থান বলে দাদাদের বাড়ির বারান্দায় উঠে পড়লাম।
ভয়ে ভয়ে দেখলাম একটু দূরের বাঁকটা ঘুরেই সামনে চলে এল দুই মূর্তি। একজনের পোশাক আশাক বেশ ঝকমকে,
আর একজন অত্যন্ত নোংরা হাফ প্যান্ট( আমরা তখন শর্ট প্যান্ট বলতাম), তেল জলের অভাবে শুকনো লালচে চুল, না কামনো দাড়ি। চোখ মুখে অত্যন্ত বিরক্তি। আমাদের গ্রামের পরিচিত দুই ‘ পাগল’। আমার এ কাব্যের হিরো ওই দ্বিতীয় জন। ও ছিল স্কিজোফ্রেনিক। ঝকমকে জনের রোগটা হচ্ছে বাইপোলার ওয়ান। সে কথায় পরে আসব।
স্কিজোফ্রেনিয়া রোগটি সাধারণ মানুষ, ধর্মীয় নেতা, দার্শনিক, রাষ্ট্রপ্রধান সবাইকে চিরকাল ভাবিয়ে এসেছে। একজন পরিচিত মানুষ কি করে এরকম অপরিচিত অদ্ভুত মানুষ হয়ে যায় সেই রহস্য, ভয় যা থেকে মানুষগুলোর প্রতি হিংসা। সব মিলে সেই মানব সভ্যতার আদিকাল থেকে রোগটি মানুষের কাছে এক প্রহেলিকা।
নামকরণের ইতিহাসঃ
প্রথমে ভাবা হোত মানুষটির সময়ের আগেই (precox) স্মৃতিভ্রংশ অর্থাৎ ডিমেনিশিয়া (Dementia) হচ্ছে। তাই রোগটির নাম দেন মনোবিদ এমিল ক্রেপলিন (Emil Kraeplin) ১৮৯৬ সালে, ডিমেনসিয়া প্রিকক্স (Dementia Precom)। পরবর্তীকালে আর গভীর অনুসন্ধান করে দেখা গেল রোগটি স্মৃতিভ্রংশ রোগ নয়। এখামে মানুষটির যে পরিবর্তন আসে সেটা হচ্ছে তার আবেগ, চিন্তা, আচরণের সমস্যা থেকে। তখন নাম দেওয়া হয় স্কিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia) ।
একটা সাধারণ ধারণা আছে স্কিজোফ্রেনিয়া মানে দ্বৈত সত্ত্বা বা স্প্লিট পার্সোনালিটি( split personality)। আর এই ধারনা জোরদার হয় স্কিজম (schism) কথাটা থেকে। স্কিজম মানে খন্ডিত হওয়া এবং ফ্রেনাম (phrenum) মানে ব্যক্তিত্ব। এই দুই মিলে স্কিজোফ্রেনিয়া। ইউজেন ব্লিউলার (Eugen Bleuer) যিনি স্কিজোফ্রেনিয়া নামকরণ 1911 সালে করেছিলেন তিনি বলতে চেয়েছিলেন চিন্তা, আবেগ আর আচরণের মধ্যে ভারসাম্য খন্ডন। কিন্তু অনেকের কাছে সেটা হয়ে গেল ব্যক্তিত্বের খন্ডন। অর্থাৎ যেন দুটি আলাদা আলাদা মানুষ একই মানুষের মধ্যে বাস করে, যারা একে অপরকে চেনে না। স্কিজোফ্রেনিয়া আদতেই তা নয়,সেটা সম্পূর্ণ অন্য একটি মানসিক রোগ যাকে বলে ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার (Dissociative Identity Disorder। সুযোগ হলে সেটা নিয়ে বলা যাবে।
কি কারণে হয়?
পুরুষ নারী উভয়েরই স্কিজোফ্রেনিয়া হওয়ার হার সমান। মোটামুটি সারা জীবনে শতকরা ১ ভাগ লোকের স্কিজোফ্রেনিয়া হয়। ছেলেদের ১০ থেকে ২৫ এবং মেয়েদের ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে স্কিজোফ্রেনিয়া বেশি হয়।
কেন স্কিজোফ্রেনিয়া হয় তা নিয়ে অসংখ্য তত্ত্ব আছে। সেই পূর্ব জন্মের পাপ থেকে আধুনিক জৈবনিক তত্ত্ব। মূল জায়গাগুলো একটু বোঝা যাক।
ফ্রয়েড মনে করতেন মানুষের যে মানুষের যে আমিত্ত্ব যাকে বলা হয় ইগো (Ego) সেটি সঠিকভাবে তৈরি হবার আগের বিশৃঙ্খলা মানুষের এই রোগ তৈরি হয়। তার সাইকোটিক (Psychotic) বা বাস্তববিমুখ উপসর্গ তৈরি হয়।
আধুনিক গবেষণা দেখিয়েছে এই রোগ সৃষ্টিতে জিনের একটা ভূমিকা থাকে। বাবা মায়ের একজনের এই রোগ থাকলে সন্তানের হবার সম্ভাবনা ১২℅ এবং বাবা মা দুজনেরই থাকলে রোগটি হবার সম্ভাবনা ৪০%।
আমদের আবেগ, চিন্তা সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্কে বিভিন্ন স্থানকে সংযোগকারী কিছু রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে। এদের বলা হয় নিউরোট্রান্সমিটার। এরকমই একটির নাম হচ্ছে ডোপামিন (Dopamine)। ধরা হয় এই ডোপামিনের আধিক্যই স্কিজোফ্রেনিয়া রোগের মূল কারণ। এছাড়া সেরটনিন (Serotonin), গাবা (Gaba), অ্যাসিটাইলকোলিনের (Acetylcholine) মত আরো কিছু নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতাও রোগসৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করে।
এছাড়া খুব গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে স্ট্রেস বা মানসিক চাপ। আর্থসামাজিক চাপ বা ব্যক্তিগত চাপ এই রোগ সৃষ্টি করে, সেটা সম্পর্কের টানাপোড়েন হতে পারে বা কাজের জায়গায় হতে পারে। দেখা গেছে যাদের উত্তরাধিকার সূত্রে বা জিনগত কারনে হবার সম্ভাবনা বেশি তারা যদি মানসিক চাপে পড়ে স্কিজোফ্রেনিয়া হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
উপসর্গঃ
এই রোগটি খুব অদ্ভুত। একটা দুটো নির্দিষ্ট উপসর্গ দিয়ে এটা আসেনা। সবার সব উপসর্গ থাকেওনা। ছোটবেলায় হয়ত একা থাকতে ভালোবাসতেন। একা একাই টিভি সিনেমা দেখতেন। হয়ত অতিরিক্ত ধর্মীয় চিন্তা বা অবাস্তব দার্শনিক তত্ত্ব নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতেন। অনেক ক্ষেত্রেই নানারকম শারীরিক উপসর্গ দিয়ে রোগটি শুরু হয়। যেমন মাথা যন্ত্রনা, হাত পা ব্যথা দুর্বলতা এবং বদ হজম দিয়েও শুরু হতে পারে।
রোগটা শুরু হয়ে গেলে মানুষটির জামা কাপড়ের খেয়াল থাকেনা। অবিন্যস্ত পোশাক পরিচ্ছদ এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বিঘ্নিত হয়। অর্থাৎ চুল না আঁচড়ান, স্নান না করা ইত্যাদি।
কিন্তু স্কিজোফ্রেনিয়া রোগটি যে কারণে স্বতন্ত্র সেই উপসর্গগুলো দেখা যাক। এই রোগটি মূলত চিন্তার রোগ। চিন্তার জায়গাটা ওলট-পালট হয়ে যায়। আর যেহেতু ‘কথা’ হচ্ছে মানুষের ‘ চিন্তার’ প্রকাশিত রূপ তাই তার কথাবার্তাও অস্বাভাবিক হয়ে যায়। কথাগুলো অসংলগ্ন হয়ে যায়। একটির সাথে আর একটি বাক্যের কোনো সাজুয্য থাকে না। অর্থাৎ অর্থহীন হয়ে যায়। কথা বলতে হঠাৎ কথার প্রবাহ আটকে যায়। থট ব্লকিং। কখনো সে নতুন শব্দ সৃষ্টি করে যেটার কোনো মানে নেই অর্থাৎ কোনো অভিধানে সেই শব্দ নেই। নিওলগিজম। যার কথা শুনছেন সেটাই প্রতিধ্বনির মত আবার বলেন। ইকোলালিয়া। একই কথা বিনা কারনে বার বার বলেন। পার্সিভারেশান।
এবার আসা যাক ভ্রান্তি বা ডেলিউশানে (Delusion)। একটি মানুষ যদি এমন কোনো একটা বিশ্বাস নিয়ে থাকে যেটা তার সামাজিক বা সাংস্কৃতিক পরিবেশের অন্য মানুষরা বোঝেন, সম্পূর্ণ ভুল। তবে সব রকম বিরুদ্ধ যুক্তি দিয়েও তার সেই দৃঢ় বিশ্বাস ভাংগা না গেলে তাকে ভ্রান্তি বা ডেলিউশান (Delusion) বলে। যেমন কেউ একজন বিশ্বাস করে তার ঘরে কেউ সিসিটিভি বসিয়ে রেখে তাকে নজরদারি করছে। কারোর মনে হয় কিছু লোক তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। কারোর মনে হয় তার স্বামী বা স্ত্রী অন্য কোনো অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। কেউ ভাবে তার কেউ একজন তাকে কন্ট্রোল করছে। কারোর মনে হতে পারে তার পেটের ভেতরে নাড়িভুড়ি কিছু নেই, সেটা ফাঁপা।
এর পর আসে অনুভূতির অস্বাভাবিকতা। আমরা পাঁচটি ইন্দ্রিয় দিয়ে এই পৃথিবীর সব কিছু অনুভব করি। তার জন্যে চাই একটি উদ্দীপনা। যেমন দেখার জন্য চাই আলো বা শোনার জন্য চাই শব্দ। স্কিজোফ্রেনিয়াতে মানুষটির উদ্দীপনা ছাড়াই অনুভূতি হয়। একে বলা হয় অলীক অনুভূতি বা হ্যালুসিনেশান (Hallucination)। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা এবং ত্বক যে কোনো ইন্দ্রিয়েই এই অলীক অনুভূতি হতে পারে। তবে সবথেকে বেশি হয় অলীক শ্রবণ বা অডিটরি হ্যালুসিনেশান (Auditory hallucination)। আক্রান্ত মানুষটির মনে হয় তার কানে কানে কেউ কথা বলছে। তাকে নির্দেশ দেয় কখনো ভয় দেখায় বা হাঁসায়। স্কিজোফ্রেনিয়া রোগে যে রুগীটি আপন মনে বিড়বিড় করে তার কারন সে এই অলীক শ্রবণের উত্তর দেয়। কখনো কখনো মনে হয় দুটো গলা তাকে নিয়ে নানা কথা বলছে। কখনো মনে হয় কেউ একজন তার প্রত্যেকটি কাজকে ধারাবিবরণী দিচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রেই মানুষটির ঘুম ক্ষিধে কমে যায়। কেউ কেউ খুব উত্তেজিত থাকে। অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে বা বিচিত্রভাবে হাত পা নাড়ে। কেউ কেউ একদম চুপচাপ হয়ে যায়। কোনো কথা বলেনা, কাজ করেনা। চোখে চোখ রাখতে পারেনা। নিজের খেয়াল থাকেনা ঘরবন্দী হয়ে যায়। কারোর কারোর বাস্তববিমুখতা এমন পর্যায়ের হয় যে কেমন হতভম্ব হয়ে থাকে।
কিছু স্কিজোফ্রেনিয়া রুগী আত্মহত্যা করেন। মূল কারণ এই রোগের সাথে যদি ডিপ্রেশান বা অবসাদ রোগ থাকে। আর অনেক ক্ষেত্রে তার সেই কানে অলীক শ্রবন হয় তার নির্দেশে সে আত্মহত্যা করে।
চিকিৎসাঃ
চিকিৎসা হয় মূলত ওষুধ দিয়ে তাছাড়া সামাজিক পুনর্বাসনের জন্যে কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
ওষুধ মূলত দু ধরণের পুরানো প্রথাগত ওষুধ বা টিপিক্যাল অ্যান্টিসাইকোটিক, যেমন হ্যালোপেরিডল (Haloperidol), ট্রাইফ্লুওপারাজিন (Trifluoperazine), ক্লোরপ্রোমাজিন (Chlorpromazine), রিডাজিন (Ridazine) ইত্যাদি। এদের পার্শ্বক্রিয়া বেশি বলে ব্যবহার এখন অনেক কম। এবং নতুন ওষুধ এদেরকে বলা হয় অ্যাটিপিক্যাল অ্যান্টিসাইকোটিক। যেমন ক্লোজাপিন (Clozapine), ওলানজাপিন (Olanzapine), রিসপেরিডোন (Risperidone), কুইটিয়াপিন (QUetiapine) ইত্যাদি। এদের পার্শ্বক্রিয়া অনেক কম।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে ওষুধ কতদিন চালানো হবে। দেখা গেছে প্রথম আক্রমনের পর ওষুধ খেলেও 16 থেকে 23 ভাগ সম্ভাবনা থাকে রোগটি ফেরার আর ওষুধ নাখেলে সম্ভাবনা বেড়ে হয় শতকরা ৫৩থেকে ৭২ ভাগ। যাইহোক বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায় প্রথম আক্রমণের পর অন্তত দু বছর ওষুধ চালানো উচিত। আর যদি একাধিক আক্রমণ হয় অন্তত পাঁচ বছর। তবে একটা বড় সং্খ্যক মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ মনে করেন ওষুধ অনির্দিষ্টকাল বা সারাজীবন চালানো উচিত।
এছাড়া তাদের সোস্যাল স্কিল ট্রেনিং করানো হয়। যেমন এরা চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেনা, কেউ কথা বলার সময় অদ্ভুত মুখভংগি করে কারোর আবার কথা বলার সময় মুখ ভাবলেশহীন থাকে অর্থাৎ রাগ, দুঃখ, অভীমান, ভয় সবকিছুতেই পাথরের মত ভাবলেশহীন মুখ থাকে। কেউ কেউ যে কোনো বিশয়ে সাড়া দিতে অনেক সময় নেয়। এদেরকে ভিডিওর মাধ্যমে এই সব পরিস্থিতিতে অন্যদের মুখভঙ্গি দেখিয়ে শেখানো হয় কেমন হওয়া উচিত।
আসে তার ফ্যামিলিকে রোগ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। রোগের একটা আক্রমণ শেষ হলেই অনেক পরিবার আশা করে রুগী সব কিছু আগের মত করতে পারবে। সেটা সম্ভব নয়। ধাপে ধাপে তাকে পূর্বাবস্থায় নিয়ে যেতে হবে। নাহলে আবার রোগের আক্রমণ হবে।
এছাড়া নানারকম ভোকেশানাল ট্রেনিং আছে। এমন কিছু কাজ করান উচিত যেখানে মস্তিষ্কে চাপ কম পড়ে। ধীরে ধীরে পুনর্বাসনে গেলে অনেক স্কিজফ্রেনিক খুব ভালো কাজ করেন এবং একটা সম্মানজনক জীবন যাপন করেন।
রোগের ভবিষ্যৎঃ
নানারকম সমীক্ষা হয়েছে কোথাও দেখা গেছে শতকরা পঞ্চাশভাগ কোথাও পঁয়ষট্টিভাগ বেশ ভালো থাকে। তবে নির্যাস হিসেবে বলা যায় মোটামুটি এক তৃতীয়াংশ রুগী পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়, এক তৃতীয়াংশ ওষুধ খেয়ে সন্তোষজনক জীবন কাটায় আর বাকি এক তৃতীয়াংশ পুরোপুরি অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
একটা সময় ভাবা হোত স্কিনোফ্রেনিয়া রোগটি কেবলমাত্র খারাপই হতে থাকবে। কিন্তু বর্তমানে খুব কার্যকরী ওষুধ বার হয়েছে আর তার সাথে রোগীদের পুনর্বাসন নিয়ে ভাবনা চিন্তাও অনেক উন্নত হয়েছে। তাই স্কিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত মানুষদের জীবন আগের মত দুর্বিষহ নেই। মানুষ এখন হতাশা থেকে আশার আলো দেখতে পেয়েছে।












