সহরচনাকারঃ পারমিতা দাশ
অন্যদিকে, পনীর ভিত্তিক মেনুর ক্ষেত্রে আলাদা আয়োজন করতে হবে সেই সব শিশুদের জন্যে, যাদের মিল্ক এলার্জি আর ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স – এ দুয়ের মধ্যে কোনো একটি সমস্যা আছে। ভারতীয় জনগোষ্ঠীর এক বিপুল অংশ কমবেশি ল্যাকটোজ ইন্টোলেরান্সে ভোগেন, উত্তর ভারতের স্কুল পড়ুয়া শিশুদের মধ্যে এই অনুপাত আনুমানিক ৩০% বা তার বেশি, তার মধ্যে জিনগত বৈষম্যের কারণে পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে সেটা আরো বহুগুণ বেশি (৩, ৫, ৮)।এদের সবার না হলেও অন্তত একটা অংশের পনীর হজম করতে অসুবিধা হবে। তার সঙ্গে ধরতে হবে আরো ০.৪-০.৫% যাদের মিল্ক এলার্জি আছে। এক কথায় বলতে গেলে, পনীর ভিত্তিক মেনুর ক্ষেত্রে ডিম-ভিত্তিক মেনুর তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সংখ্যক শিশুর জন্যে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে।
সয়াবিন বা রাজমার ক্ষেত্রে এলার্জির হার তুলনামূলক ভাবে কম বলে বিকল্প ব্যবস্থার দরকার হয়তো ডিম-ভিত্তিক মেনুর মতোই, ১% এর কম। কিন্তু সংখ্যার হিসেবে একই রকম ব্যবহারিক সুবিধে থাকলেও খাদ্যগুণ এবং বাঙালি স্বাদ ও রুচির বিচারে ডিম সয়াবিন বা রাজমাকে গুনে গুনে দশ গোল দেবে ! সয়াবিন যতই প্রোটিন-সমৃদ্ধ হোক, বড়ি বা chunk হিসেবে যে প্রসেস্ড আকারে তা পাওয়া যায় তা বেশি পরিমানে হজম করা সহজ নয় আর বাঙালি শিশুর অনভ্যস্ত জিভে তা ডিমের তুলনায় বিস্বাদ। পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও, ডিম প্রাণীজ প্রোটিন বলে এর মধ্যে এমন কিছু অপরিহার্য অ্যামিনো আসিড, আয়রন, এন্টি অক্সিড্যান্ট, মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়ক কোলিন, DHA এবং ভিটামিন (A, D, E, B12) আছে যার জন্য ডিমকে সুষম আর পরিপূর্ণ পুষ্টির (complete protein) উৎস বলে মনে করা হয় । এখনো মনে আছে অপুষ্টি নির্মূল করার জন্য আশির দশকের জনমাধ্যমে সরকারী প্রচার – সানডে হো ইয়া মানডে রোজ খাও অন্ডে’। ডিম আঞ্চলিক রুচির সাপেক্ষে সবচেয়ে জনপ্রিয় (বিশেষত শিশুদের কাছে) এবং একই সঙ্গে সুলভ প্রোটিনের উৎস; আর তাই ডিম খেতে বাধা নেই এরকম শিশুর জন্যে পুষ্টিবিজ্ঞানের বিচারে এর থেকে ভালো প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবার হয় না।
মিড ডে মিল কর্মীদের বদলে ইস্কনের মতো সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়ার ফলে এক বিপুল সংখ্যক নিম্নবিত্ত মহিলার রুটিরুজির ওপরও সরাসরি আঘাত হানা হয়েছে, যা PM-POSHAN স্কিমের (৭) অন্যতম ঘোষিত উদ্দেশ্য মহিলা স্বনির্ভরতার পরিপন্থী । উক্ত স্কিমের অপর একটি লক্ষ্য হল জাতিগত বিভাজন ভুলে সব শিশু যাতে একসাথে বসে খাদ্য গ্রহণ করে সেবিষয়ে সচেষ্ট থাকা। কিন্তু ইস্কনের মেনুতে যা থাকে তা হলো পেঁয়াজ রসুন বিবর্জিত তথাকথিত `সাত্ত্বিক’ খাবার, যা কতিপয় উচ্চবর্ণের হিন্দু ও জৈন ধর্মাবলম্বী মানুষের খাদ্যাভ্যাস, যার বিপরীতে আছে তামসিক খাদ্য, এবং যাঁরা তা গ্রহণ করেন তাঁরা সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ বলে পরিগণিত হন। এইভাবে বর্ণ রাজনীতিকে সরাসরি শিশুদের খাবারের থালায় নিয়ে আসা হয়েছে (৬)।
ভারতের যে রাজ্যগুলিতে নিরামিষাশীর হার পশ্চিমবঙ্গের মতোই অল্প, সেখানে মিড ডে মিলে ডিমই দেওয়া হয়, যেমন তামিলনাডু (২%), অন্ধ্রপ্রদেশ (২%), এমনকি অধুনা বিজেপি শাসিত ওড়িশা (৩%), যেখানে ইস্কন সাধারণ ভাবে এই মিলের দায়িত্ত্বে থাকলেও আলাদা ভাবে ডিম দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে (৪) । এটাই স্বাভাবিক এবং যুক্তিসঙ্গত, কারণ ৯৯% এর বেশি মানুষ যা খেতে পছন্দ করে সেটাকে মূল মেনুতে রেখে বাকিদের জন্যে বিকল্পের আয়োজন করাই উচিত। এটা সংখ্যাগরিষ্ঠের খাদ্যাভ্যাস সংখ্যালঘুর ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং একেবারে হাতে গোনা, মুষ্টিমেয় (২০০ তে ১ বা দেড় জন!) ব্যতিক্রমের জন্যে সযত্নে অন্য ব্যবস্থা করা। ভারতের যে রাজ্যগুলোয় সিংহভাগ মানুষ শাকাহারী, যেমন উত্তর প্রদেশ (৪৭% নিরামিষভোজী), মধ্যপ্রদেশ (৫০%), রাজস্থান (৭৫%) ইত্যাদি, সেখানে হয়তো নিরামিষ মেনু উপযুক্ত ও সঠিক, কিন্তু কোনো ভাবেই পশ্চিমবঙ্গে নয়। নতুন সরকারের বাজেটে সরকারি স্কুলের মিড ডে মিল প্রকল্পে বরাদ্দ টাকার (দিনপিছু, মাথাপিছু) অঙ্ক ছয়টাকা থেকে বাড়িয়ে দশ টাকা করা হয়েছে, তার সদ্ব্যবহার করা যেত সপ্তাহে এক দিন থেকে বাড়িয়ে দুই বা তিন দিন ডিম দিয়ে, আর আগামীতে তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রের মত সপ্তাহে ৫ দিন ডিম দেওয়ার লক্ষ্য রেখে।
এ সব জেনে বুঝেও আমাদের রাজ্যে নিরামিষ মেনু চালু করার উদ্যোগ আসলে বিজেপি-আরএসএস এর শক্তিকেন্দ্র গোবলয়ের খাদ্যাভ্যাসকে বাঙালির ওপর জোর করে চাপানোর চেষ্টা। মাছ হাতে নিয়ে বিজেপি প্রার্থীরা বিধানসভা ভোটের প্রচার করেছিলেন কি বাঙালীকে এই ভবিতব্য ভুলিয়ে রাখার জন্য? মনগড়া ইউনিভার্সাল খাদ্যের মতোই এক অলীক, নিরেট হিন্দুত্বের ফ্যাসিবাদী নির্মাণ ও তাকে সারা দেশের চেতনা ও সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার যে ষড়যন্ত্র চলছে কর্পোরেট পুঁজিবাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে, পশ্চিমবঙ্গের মিড ডে মিল এর নতুন ব্যবস্থাকে তার অংশ হিসেবে চিহ্নিত ও প্রতিরোধ করা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র:
১) https://www.foodallergy.
https://indiadatamap.com/2026/
৩) Am J Clin Nutr 1981 May;34(5):943-6. doi: 10.1093/ajcn/34.5.943.
৫) Herders of Indian and European Cattle Share Their Predominant Allele for Lactase Persistence
August 2011 Molecular Biology and Evolution 29(1):249-60 DOI: 10
৬) https://www.inuth.com/
৭) https://pmposhan.wb.gov.
৮) আমিষ `আউট’, প্রসাদ `ইন’- মিড্ ডে মিলের রাজনীতি: ১ম ও ২য় পর্ব, অরিজিৎ মুখার্জী, মার্ক্সবাদী পথ (https://marxbadipath.org/
৯) `আসল প্রশ্ন রইলো আড়ালে’, গৌতম কুমার পাল, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৮-ই জুলাই ২০২৬
১০) `ডিমের চেয়ে ভালো আর কী ‘, দেবাশিস গোস্বামী, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৪ জুলাই ২০২৬











