অভয়া আন্দোলনে আমাদের দিক থেকে যে দশদফা দাবিকে সূচিমুখ করে আমরা লড়াই চালিয়েছিলাম এবং যে দাবিগুলির সাথে আপামর বাংলার জনগণ সম্পৃক্ত হয়েছিলেন, এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বারবার সব দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে/ হবে বলে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেই দাবিগুলো কে আরও একবার নবনির্বাচিত সরকার ও নবনিযুক্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরে তার দ্রুত কার্যকরী করার দাবিতে আজকের এই বক্তব্য।
প্রথম দাবি অবশ্যই অভয়ার ন্যায়বিচার। যারা যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই নারকীয় ঘটনার সাথে যুক্ত তাদের কঠোরতম শাস্তি আমাদের প্রাথমিক দাবি।এক্ষেত্রে বিভিন্ন অফিসিয়াল বা চিকিৎসক কে সাসপেন্ড করলেই চলবে না তাদের ভূমিকা প্রকাশ্যে আনতে হবে ও তাদের তদন্ত এবং আইনের আওতায় আনতে হবে।
এর সাথে দুর্নীতিপরায়ণ র্স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগম এর অপসারণ আমাদের দ্বিতীয় দাবি, বিগত শাসকের আমলে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বিপুল দুর্নীতিতে তার ভূমিকা জানা সত্ত্বেও তাকে অপসারণ না করে তার বিরুদ্ধে তদন্ত না করে তাকে একই দায়িত্বে রেখে দেওয়া কেন হচ্ছে তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না।
সাথে WBMC, হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ডে চরম দুর্নীতি, স্বজনপোষণের দুর্নীতির তদন্ত ও করতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে থ্রেট কালচারের কিংপিনেরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তারা যাতে কোনোভাবেই দলবদল করে কোনো সুরক্ষা না পায় তা নিশ্চিত করা নতুন সরকারের দায়িত্ব।
প্রতিটি মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষা করতে হবে, ছাত্র সংসদ নির্বাচন, রেসিডেন্ট ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন এর নির্বাচন নিয়মিত করতে হবে। যৌন হেনস্থা, র ্যাগিং এর মত ঘটনা ঘটলে দ্রুত আইসিসি, এন্টি রাগিং কমিটি বসিয়ে তদন্ত করে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। এই কমিটি গুলিতে, রোগী কল্যাণ সমিতি, কলেজভিত্তিক টাস্কফোর্সে নির্বাচিত ছাত্রছাত্রী ও জুনিয়র চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষক চিকিৎসক, স্পেশালিস্ট চিকিৎসক, নার্সিং স্টাফ, মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের শূন্যপদে প্রতিবছর স্বচ্ছভাবে নিয়োগ করতে হবে। সরকারি হাসপাতাল গুলোতে স্থায়ী সাফাইকর্মী, লিফটম্যান, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগ করতে হবে। বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে মিডিয়া ক্যামেরার সামনে গিমিক তৈরি না করে সমস্যার প্রকৃত সমাধান এর এই পথগুলো নিতে হবে। সিনিয়র চিকিৎসক দের স্বচ্ছ ট্রান্সফার নীতি বানাতে হবে, যাতে পোস্টিং এর ক্ষেত্রে স্বজন পোষণ বা প্রতিহিংসা কোনোটার সুযোগ না থাকে। এবং জুনিয়র ডাক্তারদের ডিগ্রি/ ডিপ্লোমা পাশের পর বন্ড পোস্টিং এর ক্ষেত্রে মেধাভিত্তিক কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে পোস্টিং দিতে হবে।
‘রেফার করা যাবেনা’ বলে নিদান দিয়ে রেফার রোগ সারবে না। যথাযথ পরিকাঠামোর উন্নতি করতে হবে। সেন্ট্রাল রেফারেল সিস্টেম এর মাধ্যমে রোগীদের দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিকাঠামো সম্পন্ন হাসপাতালে বেডের ব্যবস্থা করতে হবে, রোগীদের যাতে হাসপাতালে না ঘুরে ঘুরে বেড খুঁজতে হয় তা সুনিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালে কত শয্যা খালি আছে তার তথ্য ডিজিটাল মাধ্যমে রোগীদের কাছে জানাতে হবে, যাতে বেড না পেলে স্বাস্থ্যকর্মীদের অযথা রোগীর বাড়ির লোকের রোষের মুখে না পড়তে হয়।
স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত এর জন্য সিসিটিভি, কার্যকরী প্যানিক বাটন এর ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামীণ হাসপাতাল গুলো কার্যত শেষ দু বছর বিনা নিরাপত্তায় রয়েছে, সেখানে স্থায়ী পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করতে হবে।
এবং সব শেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অভয়া আন্দোলনের ফলে প্রতিটি মেডিকেল কলেজে থ্রেট কালচারের সিন্ডিকেটের যে অসংখ্য অপরাধের অভিযোগ এর তদন্ত হয়েছিল, যেগুলিকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ মদতে ঠান্ডাঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই ফাইল গুলো খুলতে হবে। এবং যারা এই অপরাধের সাথে যুক্ত তাদের প্রত্যেকের যথাযথ শাস্তি দিতে হবে। শুধু অভীক বিরূপাক্ষ এর বিরুদ্ধে তদন্ত চালালে হবে না, এই সিন্ডিকেট এর সারা রাজ্যের বিভিন্ন কলেজভিত্তিক যে নেটওয়ার্ক তাকে জনগণের সামনে আনতে হবে ও তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এই বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে কারণ অত্যন্ত আশঙ্কার বিষয় হল তাদের অনেকেই সরকার বদলের সাথে সাথে নিজেদের রঙ পাল্টে নব্য শাসকের ঘনিষ্ঠতা ইতিমধ্যে অর্জন করেছে। কিন্তু নতুন সরকারকে মনে রাখতে হবে সাধারণ মানুষ যাদের ঔদ্ধত্য, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির জন্যে ক্ষোভে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছেন, তাদের আশ্রয় দিয়ে অপরাধকে প্রশ্রয় দিলে তাদের ভবিষ্যৎ পরিণতিও আগের সরকার এর থেকে আলাদা কিছু হবে বলে আমরা মনে করিনা ।











